Sunday, June 30, 2013

আমার প্রিয় পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা - ১ - শারদীয়া ১৩৯৪

এই লেখাটা খুব গম্ভীর বা গভীর তত্ববোধক লেখা নয় (আমার কোন লেখাই বা হয়!)। অত্যন্ত অগোছালো একটি  লেখা এবং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হল আমার ছোটবেলার স্মৃতিচারণ। তবে এই লেখা পড়ে আর কেউ যদি তাঁদের ছোটবেলার পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগেন তাহলে মন্দ কি?

প্রথমের ভূমিকার সঙ্গে আরো একটু না লিখলে হয়তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না। গত কয়েক বছরে বহু লোকের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার অধঃপতনের বিষয়টা অনেকবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে আমার নিজের ৩০-৩২টি আনন্দমেলার সংগ্রহ থেকে খুব সহজেই বুঝতে পারি কিভাবে ৮০-এর দশকের দুর্লভ মণি-মুক্তোর মত আনন্দমেলার মান পড়তে পড়তে বর্তমানে তা শুধুমাত্র কিছু মধ্য মানের গোয়েন্দা গল্প-উপ্পন্যাস সংকলনে পরিণত হয়েছে। আর সেই আলোচনার ফলশ্রুতিই এই লেখা। বর্তমানের পূজাবার্ষিকী না হয় ভালো নয় কিন্তু ঐ সারা জীবনের মত মনে রেখে দেওয়ার আনন্দমেলাগুলো নিয়ে কয়েক কথা লিখলে মন্দ কি?
আর সেখান থেকেই আজকের লেখা যেখানে ফিরে দেখব বাংলা ১৩৯৪ সনের (ইংরেজি ১৯৮৭) শারদীয় আনন্দমেলার কিছু লেখা।

প্রথমেই স্বীকার করে নিই যে, ১৯৯২-এর আগের যে পূজাবার্ষিকীগুলো আমার কাছে আছে তা কলেজ স্ট্রিট এবং গোলপার্কের বিভিন্ন পুরোন বইয়ের দোকান থেকে কেনা, এর ফলে কিছু কিছু বইয়ের অবস্থা বেশ খারাপ। যেমন, ১৩৯৪-এর যে পূজাবার্ষিকীর কথা বলছি তার শুধুমাত্র ১৩ থেকে ৫১৮ পাতা অবধি দেখতে পাচ্ছি, প্রথম ১২ পাতা (যার অধিকংশই বিজ্ঞাপন এবং সূচিপত্র) এবং শেষের কিছু পাতা নেই। তাই আমি জানি না, ১৯৮৭ সালে এই বইয়ের দাম কত ছিল বা সম্পাদক কে ছিলেন।
তবে খুঁজে দেখলাম যে, ১৯৮৬-র পূজাবার্ষিকীর দাম ৩২ টাকা, সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং ১৯৮৮-র পূজাবার্ষিকীর দাম ৪০ টাকা, সম্পাদক অভীক সরকার। সহজেই বলা যায় যে ১৯৮৭-র পুজোসংখ্যার দাম ৩৬ টাকা, তবে সম্পাদক কে ছিলেন নিশ্চিত হওয়া গেল না।

একবার দেখে নেওয়া যাক, কি কি উপন্যাস ছিল ঐ পুজোসংখ্যায়...

সমরেশ বসুর ‘বিদেশী গাড়িতে বিপদ’
বিমল করের ‘কালবৈশাখীর রাতে’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রাজবাড়ির রহস্য’
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’
সমরেশ মজুমদারের ‘জুতোয় রক্তের দাগ’
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘সবুজ সঙ্কেত’ (যে উপন্যাসের একটি চরিত্রের নাম তপোব্রত!!)
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘ইতি তোমার মা’
শৈলেন ঘোষের ‘সোনালির দিন’

এ তো গেল উপন্যাস, সঙ্গে শঙ্কু কাহিনী ‘শঙ্কুর পরলোকচর্চা’, অসংখ্য গল্প, ৪টি বিদেশী কমিক্স, জ্ঞান-বিজ্ঞান, খেলা নিয়ে একাধিক লেখা এবং সব শেষে সেই নিয়মিত ‘কী করে নম্বর বাড়াতে হয়’... সব মিলিয়ে এক জমজমাট পুজোসংখ্যা!

প্রথমেই বলি, রাজবাড়ির রহস্যের কথা। এটা কাকাবাবুর সুবর্ণযুগের লেখা। যে লেখা পড়ে কাকাবাবু বা পাঠক কারও চোখেই জল আসে না। রাজবাড়ির রহস্য আমার সবচেয়ে প্রিয় তিনটি কাকাবাবুর উপন্যাসের মধ্যে একটি। এরকম সহজ, সরল ভাবে লেখা কিন্তু একই সঙ্গে চরম উত্তেজনা, সব সময় একটা কি হয় কি হয় ভাব, লেখাটাকে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে। গল্পের প্লটটাও অত্যন্ত আকর্ষণীয় (ভুল-ভুলাইয়া সিনেমাটা ভাল না লাগার একটা কারণ ঐ প্লটের গল্প আগেই পড়েছি, রাজবাড়ির রহস্যতে) আর সবচেয়ে বড় কথা, হিপনোটিজম, তান্ত্রিক, পুনর্জন্মের মত বেশ কিছু অলৌকিক বিষয় থাকলেও উপন্যাসটাকে কখোনই গাঁজাখুরি বলে মনে হয় না, বরং শেষে গল্পের দুষ্টু লোক গুরুদেবের জন্য খারাপই লাগে সবার।
এই গল্পের প্রথমদিকে সন্তু কিন্তু ছিল না। শুধু কাকাবাবু আর দেবলীনা কেওনঝড়ের রাজবাড়ি গেছিল। জোজো আর সন্তু কলেজের পরীক্ষা থাকায় গেছিল পরে। তখন অবশ্য রহস্য ঘনীভূত এবং শুধু শেষের রহস্যোদ্ধার এবং দেবলীনা উদ্ধার পর্বেই কাকাবাবুর সঙ্গী ছিল সন্তু আর জোজো।

আর একটা উপন্যাস মনে দাগ কেটে গেছিল এই পুজোবার্ষিকীর, ‘ইতি তোমার মা’, একেবারেই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ঘরানার লেখা। অত্যন্ত আদর্শবাদী একটি পরিবার এবং তাঁদের কাছের কিছু লোকজন আর তার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ কিছু লোকের সংঘাত এবং শেষ অবধি শুভবোধের জয় আর অশুভের পরাজয়। খুবই প্রত্যাশিত, সরলরেখায় ঘটনা এগিয়েছে, কিন্তু যখন প্রথম পড়ি ছোটবেলায় তখন অত কিছু ভাবতাম না, দারুণ লেগেছিল আর শেষটা পড়ে কষ্ট হয়েছিল খুব। তারপর দীর্ঘদিন সেই কষ্টের কথা ভেবে উপন্যাসটা আর পড়িনি। সাম্প্রতিককালে পড়েছি, অত ভালো না লাগলেও খারাপ লাগেনি।

বাকি গোগোল, অর্জুন, কর্নেল কোন উপন্যাসই খারাপ লাগেনি, মুস্তাফা সিরাজের ‘সবুজ সংকেত’ উপন্যাসটা আর একবার পড়ে ফেললাম এই লেখা লিখতে লিখতে। সেই বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত, ডিটেকটিভ হালদার আর ধুন্ধুমার নামক রোবটের গল্প।
বানী বসুর ‘জেগে ওঠো’ গল্পের কথা মনে আছে? সেই যে গল্পে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কোন দুঃখের বা হিংসার ঘটনা দেখলেই ঘুমিয়ে পড়ছিল চিরকালের জন্য। যে গল্পের শেষে ছিল বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রনেতাদের প্রতিশ্রুতি,

“আমাদের বড় প্রিয় খোকাখুকুরা, মন দিয়ে শোনো। কোনও বিশ্বযুদ্ধই আর পৃথিবীতে হবে না। আমাদের ধনসম্পত্তি আমরা সব ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছি। কোনও দেশ থেকে কোনও প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আর প্রশ্ন নেই। সমস্ত দেশের প্রতিনিধি দিয়ে আমরা বিশ্ব-রিপাবলিক গড়েছি। আমাদের কোনও অভাব, কোনও অশান্তি নেই। ধর্ম নিয়েও আমরা আর মারামারি করি না। কোনও কষ্টকর প্রতিযোগিতায় তোমাদের আর কোনওদিন নামতে হবে না। যে কাজটা করতে সবচেয়ে ভালবাসো, সেটাই করতে দেওয়া হবে তোমাদের। শুধু একবার জেগে ওঠো তোমরা, জেগে উঠে দ্যাখো, তোমাদের চারপাশের পৃথিবীটা কত সুন্দর! কী বিশাল! কী মহান! স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে, তো, খোকাখুকুরা, সে এখানেই, এইখানেই, এইখানেই... ।”

আর ভালো লেগেছিল আশাপুর্ণা দেবীর ‘পাড়ার ছেলে’, এনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাস্তা’, শেখর বসুর ‘দায়িত্ব পেল দস্যিরা’। মনে রাখার মত গল্প ছিল ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের ‘প্রেতাত্মার উপত্যকা’! উরুগুয়ের পটভূমিকায় লেখা এই বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পে খুব সহজভাবে বোঝানো হয়েছিল স্পঞ্জের দেওয়ালের ধাক্কা লেগে শব্দ কি করে বারবার ফিরে আসে আর মানুষের মনে রহস্যের সৃষ্টি করে।

ভাল লেগেছিল ‘দ্বীপের রাজা’ নামের কমিক্স যেখানে অনাথ আশ্রমের চার বন্ধু তাদের অত্যাচারী সুপারিন্টেনডেন্টের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে গেছিল সমুদ্রের মধ্যের এক দ্বীপে। মনে হয়েছিল, এরকম যদি আমার সঙ্গেও হত!

আর সবার শেষে বলব এই শারদীয়ায় আমার প্রিয় উপন্যাসের কথা, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’। সেই চিরন্তন শীর্ষেন্দু, অনাবিল হাসি, মজা আর তার মধ্যেই আবার গা-ছমছম করা জমজমাট রহস্য। হ্যাঁ এই উপন্যাসে ভূত নেই কিন্তু আছে অনু আর বিলুর মত ভাই-বোনের জুড়ি আর নবীনের মত একজন সাধারণ কিন্তু বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নমতি নায়ক। আর অবশ্যই গুপ্তধন যা শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ঝিলের নিচের মন্দির থেকে।  

জানি না এই লেখাটা আদৌ কারও ভাল লাগবে কিনা কিন্তু এই লেখা লিখতে গিয়ে গিয়ে ১৩৯৪ সনের শারদীয়া আনন্দমেলাটা আমার একবার নেড়েচেড়ে দেখা হয়ে গেল। এই লেখা থেকে সেটাই আমার প্রাপ্তি!

Saturday, June 22, 2013

মৃত্যু

মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান...

শুধু ওপরের ঐ লাইনটাই নয়, রবীন্দ্রনাথ মৃত্যু নিয়ে বহু লেখা লিখে গেছেন
আচ্ছা, আপনারাও কি আমার মত মাঝেমধ্যে মৃত্যু নিয়ে ভাবেন? আমার যেমন সেই ছোটবেলা থেকেই অনেক সময় মনে হত! খুব অদ্ভুত না? যেন একদিন ঘুমোতে গেলাম, তারপর আর ঘুম ভাঙল না। সেই যাকে বলে চিরনিদ্রা। ওদিকে অ্যাকসিডেন্ট হলে আবার অন্য রকম গল্প। নিজে যেহেতু একবার গাড়ির গুঁতো খেয়েছি তাই জানি, বেশ একটা জলজ্যান্ত লোক কীভাবে হঠাৎ তার সমস্ত চেতনা হারিয়ে ফেলতে পারে। আবার ধরুন সেইসব প্রাকৃতিক বিপর্যয়, যেখানে হঠাৎ করে কয়েক হাজার লোক কয়েক মুহূর্তে শেষ হয়ে যেতে পারে।
গত কয়েক বছরে পর পর এত জন বিখ্যাত, বিখ্যাত বললে কম বলা হবে, এতজন কিংবদন্তী মারা গেছেন যে আমি অনেক সময়ে ভেবে অবাক হয় যাই। শুধু গত বছরেই দেখতে গেলে দারা সিং, রাজেশ খান্না, সুনীল গাঙ্গুলি, রবিশঙ্কর, জসপাল ভাট্টি... আমার পুরো ছোটবেলাটাই যেন হঠাৎ করে অনেকটা শেষ হয়ে গেল এক বছরে। পুজোর নবমীর দিন যখন বাবা ফোন করে সুনীলের মৃত্যুর খবরটা দিয়েছিল তখন কতটা খারাপ লেগেছিল বলে বোঝানো যাবে না। হঠাৎ করে একটা প্রচন্ড মন খারাপ। তার একটু পরে কান্না পেল, হাউ হাউ করে কেঁদেছিলাম, অনেক দিন পর। একের পর এক কাকাবাবুর গল্প, নীল মানুষের গল্প, সেই সময়ের কথা মনে পড়ছিল আর কান্না চেপে রাখতে পারছিলাম না।
এই বছরেও প্রথম ছ মাসের মধ্যে দুটো মৃত্যু দাগ কেটে গেল, ঋতুপর্ণ ঘোষ আর জিয়া খান। তারপর তো জিয়ার মৃত্যু নিয়ে অনেক নাটক ও হয়ে গেল মিডিয়ায়ে।
২০১২-র আর একটা মৃত্যু আমার মনে গভীর দাগ কেটে গেছে। খুব অদ্ভুতভাবে, এনার সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কোনদিন। কিন্তু সেটা আমার দুর্ভাগ্য। আমি মনে করি যে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা করা উচিত ছিল, প্রয়োজন ছিল।
কিন্তু তাঁকে না দেখা সত্বেও তাঁর কতটা প্রভাব ছিল খুব পরিষ্কার ভাবেই সেটা বুঝতে পারি। বুঝতে পারি কিভাবে একটা মানুষ তাঁর কাজ দিয়ে, ব্যবহার দিয়ে এতগুলো মানুষকে কাছে টেনে শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। দেখতে পাই, তাঁর মৃত্যুর জন্য কতটা শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তাঁর কাছের মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনে।
আমি কি মরতে ভয় পাই? পাই। তবে ভয় নয়, সত্যি বলতে মৃত্যুকে অপছন্দ করি আমি। সবাই, সব কিছু থাকবে পৃথিবীতে আর আমি থাকব না এই চিন্তাটাই খুব বিরক্তিকর। তবে যারা মৃত্যুকে ভয় পায়, আমার মনে হয় যে, ভয়টা আসে মৃত্যুর অজানা, অচেনা ব্যাপারটার জন্য। মানুষ চিরকালই অজানা জিনিসকে ভয় পায়। তাই অন্ধকার মানুষের চিরকালের ভয়ের জায়গা। মৃত্যুও আমার মনে হয় তাই। আজকে আমি মরে গেলে ভূত হয়ে থাকব না পুনর্জন্ম নেব নাকি শুধু একটা শবদেহ হয়ে পড়ে থাকব এটা যতদিন না আগে থেকে জানতে পারছি মৃত্যু নিয়ে আমাদের অস্বস্তি থাকবেই। কিন্তু ধরুন, আজ যদি জানতে পারি যে, মৃত্যুর পরের জীবনে ভূত হয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতে পারব, ডন ব্র্যাডমানের ব্যাটিং দেখতে পাব, রবিশঙ্করের বাজনা শুনতে পাব তাঁর সামনে বসে বা পড়তে পারব শরদিন্দুর নতুন ব্যোমকেশের উপন্যাস, তাহলে মনে হয় না এই মৃত্যু ব্যাপারটা সবার কাছে খুব একটা অপছন্দের হবে।
আর সেটা জানতে যতদিন পারব না ততদিন মানুষ তার বুকের ভেতর মৃত্যুভয় নিয়ে ঘুরে বেড়াবে।
সত্যজিৎ রায়ের ‘কম্পু’ গল্পের সুপার-কম্পিউটার ধ্বংস হওয়ার আগে সেই চরম সত্য খুঁজে পেয়েছিল। তাই ধ্বংস হওয়ার চরম মুহূর্তে তার অপার্থিব, ধাতব কন্ঠে বলে উঠেছিল, “মৃত্যুর পরের অবস্থা আমি জানি!”

মানুষ কি কোনদিন সেটা বলতে পারবে?

Saturday, June 15, 2013

ভ্রমণপিপাসু বাঙালী

"...প্রবাসে দৈবের বশে
জীবতারা যদি খসে..."

সেই কোন কালে মাইকেল মধুসূদন লিখে গেছিলেন, তারপর মধুকবির প্রিয় কপোতাক্ষ নদের অনেক জল বয়ে গেছে। প্রবাসী বাঙ্গালী এখন ফিজি থেকে শুরু করে দামাস্কাস অবধি পৃথিবীর সব দেশেই পাওয়া যায়। নিউইয়র্কের রাস্তায় সকাল সাতটার সময়, পোখরানের দুপুর ১২টায় ৪৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় বা মেলবোর্নের পার্টিতে মধ্যরাতে, বাঙ্গালী খুঁজে পাওয়া কোন কঠিন কাজ নয়।
বন্ধুবর কণাদ এবং পাভেলদা (যার বাড়ির দরজার পাপোষ থেকে শুরু করে চিরুনি অবধি সবেতেই আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের প্রতীক খুঁজে পাওয়া যায়) একবার উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম অংশের পোর্টল্যান্ড শহরের সুপারমার্কেটে মহিলা-দর্শন সহযোগে সবজি বাজার করছিল। সহসা একটি ভারতীয় মহিলা (যার সঙ্গে তার মাও ছিলেন) দেখে তারা নিজেদের মধ্যে বাংলায় মেয়েটিকে নিয়ে নানাবিধ আলোচনা করতে করতে শোনে ভারতীয় মাসিমা বাংলায় বলছেন, “বুঝলি মিলি, টমেটোগুলো ভাল নয়!” তবে এই উক্তিটি কনাদ বা পাভেলদাকে নিয়ে করা কিনা সে আলোচনায় আমরা যাব না!
সে যাই হোক, বাঙ্গালী আরও উন্নতি করুক, লক্ষ লক্ষ বাঙ্গালী ছেলে-মেয়ে জিআরই দিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে প্রবাসী হোক। নাসা, ন্যাসডাক বা বার্কলেতে ছড়ি ঘোরাক বাঙ্গালীরা।
কিন্তু আমি আজকে যাদের নিয়ে লিখব তাঁরা হলেন সেই সব বাঙ্গালী যাঁরা ভ্রমণার্থে কিছুদিনের জন্য প্রবাসী হন। বাঙ্গালী ঘুরতে ভালোবাসে। পাঞ্জাবীরা খেয়ে, তামিলরা সোনা কিনে আর মারোয়াড়িরা বাড়ী কিনে বা বানিয়ে পয়সা খরচা করে। আর বাঙ্গালী খরচা করে দেশ ভ্রমণে। সাধে কি আর ব্যানার্জী স্পেসাল আর কুন্ডু স্পেসালের এত রমরমা!
আর কত জায়গায় যে বাঙ্গালী ঘুরতে যায়! হরিদ্বার থেকে কন্যাকুমারিকা, আন্দামান থেকে অমৃতসর... আজকাল আবার ৩ দিন-৪ রাতের প্যাকেজ ডিলে বাঙ্গালী ব্যাংকক, ফুকেত আর সিঙ্গাপুরও ঘুরে আসছে।
তা যাচ্ছেন যান, কেউ আটকাচ্ছে না কিন্তু সব জায়গায় গিয়ে এত হল্লা করেন কেন? সত্যি বলছি বাইরে ঘুরতে গেলে, কোন দ্রষ্টব্যস্থান দেখতে গেলেই যেটা নিয়ে আমি সবচেয়ে ভয় ভয় থাকি তা হল, আরো কিছু বাঙ্গালী পাবলিক নিশ্চয় সেখানেও ঘুরতে এসেছে! তাঁরা গাঁক গাঁক করে চেঁচান, গান্ডেপিন্ডে গেলে্ন, সারাক্ষণ কলকাতার সঙ্গে তুলনা করেন আর চারদিকের বাকি সবাইকে বিরক্ত করেন! আর সেই নিয়েই আমার এই লেখা!
২০১০ সালে আমি ১২ দিন ধরে দিল্লি-রাজস্থান ঘুরেছিলাম। তা যেখানেই যাই... সে উদয়পুরের লেক পিছোলাই হোক বা জয়সলমীরের সোনার কেল্লা... মোট পর্যটকদের একটা খুব পরিষ্কার শ্রেণীবিভাগ আছে যেটা নিচে দিলাম,

রাজস্থানের মোট পর্যটকের ৫০% বিদেশী, যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত যেমন ইজরায়েল, ইতালি বা কানাডা থেকে প্রাচ্যের অভিজ্ঞতা নিতে এবং ভারতীয় গরু আর সন্ন্যাসীদের দেখতে এসেছেন। ১০% হল ভারতেরই অবাঙ্গালী জনগণ, এরা মাঝেমধ্যে (৫ বছরে ১ বার) ঘুরতে বেরোন। আর বাকি ৪০%ই হল আমাদের প্রিয় পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসী। শুধু কলকাতা নয়, মানকুন্ডু থেকে শুরু করে কাকদ্বীপ অবধি সব জায়গার বাঙ্গালীরাই ঘুরতে ভালোবাসেন, দলবল নিয়ে বেরিয়ে পরেন আর ঘুরতে গিয়ে জায়গাটার শান্তি নষ্ট করেন।

এই ধরুন রাজস্থানেই, সব সাহেব-সুবোরা নিঃশব্দে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বিজ্ঞের মত রাজা রাজড়াদের পুরনো চটি, পিকদানি আর মর্চে পড়া তলোয়ার দেখছেন (কতটা বুঝছেন তা মা গঙ্গাই জানেন!), অবাঙ্গালীরাও নিজেদের মধ্যে আছেন, চুপচাপই ঘুরছেন, মাঝেমধ্যে এদিকওদিক পানের পিক ফেলছেন... আর বাঙ্গালীরা!! তাঁরা নিজেদের মধ্যে দল বেঁধে ঘুরছেন, লাইন করে হাঁটার নামে প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা তৈরী করছেন আর অবধারিত ভাবেই অত্যন্ত জোরে জোরে কথা বলে সবাইকে বিরক্ত করছেন, “অ্যাই বাবলি, এইদিকে আয়; বাবলু তোর জন্য পরোটা রেখেছি, খেয়ে নে; বাব্বা আগেকার দিনে নবাবগুলো হেভি নবাবী করতো তো!; আরে ঐ ছবিটা দেখ, ইস্‌ কি অসভ্য ছিল আগেকার দিনের লোকজন!”
(টীকাঃ দলে একজন থাকেন যার কাজই হল গলায় ঝলানো এসএলআর দিয়ে বেছে বেছে ঐ সব তথাকথিত অসভ্য ছবির ছবি তুলে রাখা!)
এবং এসবই তাঁরা করছেন নির্বিকারভাবে, আশেপাশে বাকিদের যে বিরক্তি হতে পারে, তার কোন হুঁশই নেই তাঁদের। বরং ভাবটা এমন যেন, বাকিরা তাঁদের বিজ্ঞের মত মতামত শুনে ধন্য হয়ে যাচ্ছে! এই যেমন গত সপ্তাহেই হায়দ্রাবাদের সালার জং মিউসিয়ামে ঘুরতে ঘুরতে একটি অকালপক্ব বাঙ্গালী আমি বাঙ্গালী বুঝতে পেরে বলল, “অনেক মিউজিয়াম দেখেছি, কিন্তু এতো ভালো দেখিনি।”
তা এটা শুনে আমি কি করব! আমি পাতি কাটিয়ে দিলাম, কণাদটা দেখি মজা নেওয়ার জন্য, “হ্যাঁ তা তো বটেই” বলে মাথা নাড়ছে! যাকগে এর কথায় পরে আবার আসা যাবে!
তা সেই রাজস্থান ভ্রমণের সব জায়গাতেই এইসব ভ্রমণপিপাসু বাঙ্গালীদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। আরো বিরক্তিকর হচ্ছে তাঁদের হিন্দি! আরে দাদা, হিন্দি বলতে পারবেন না তো তামিল-তেলুগুদের মতো ইংরেজী বলার চেষ্টা করুন! তা না যত ভুলভাল হিন্দি বলবেন আর সারা ভারতের হিন্দিভাষী জনগণ খিল্লি ওড়াবে!
ঐ বারেরই আরেকটা ঘটনা বলি, স্থান জয়সলমীর, সারাদিন ঘুরে বিকেলের দিকে এসে পৌঁছেছি, তার পর আবার অনেক ঘোরাঘুরি করে হোটেল করে পাওয়া গেছে! সঙ্গীরা (তাঁরাও বাঙ্গালী, দিদি-জামাইবাবু আর তাঁদের কন্যা!) জানালেন, তাঁরা খুবই ক্লান্ত, বেরোবেন না। আমি একটু বেরোলাম, সারাদিন গাড়িতে বসে কোমর ধরে গেছিল, তাছাড়া আসার সময় মিনিট দশেক হাঁটা দূরত্বে একটা বড় মোড়, দোকান-পাট দেখেছিলাম, সেই অবধি ঘুরে আসবো ঠিক করলাম।
মিনিট পনেরো ঘুরে, পরের দিনের ঘোরার সঙ্গের হালকা খাবার-টাবার কিনে ফিরছি, দেখি উল্টোদিক থেকে নানা বয়সী এবং নানা সাইজের গোটা ১০-১২ বাঙ্গালীর একটা দল আসছে। আধ মাইল দুর থেকেই বুঝলাম যে, তাঁরা বাঙ্গালী! (কি করে আবার? তাঁরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলেন যে!)
যাই হোক, রাস্তায় অন্ধকার বলেই হোক বা আমার অবাঙ্গালীসুলভ চেহারার জন্যেই হোক তাঁরা বুঝতে পারেননি যে আমি বাঙ্গালী, তো আমার কাছাকাছি এসে নিজেদের মধ্যে ফিস্‌ফিস্‌ করে বলল, “এ বলতে পারবে, জিজ্ঞেস করে দেখ...” তারপর তাঁদের মধ্যে এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি এগিয়ে এসে, সেই বিখ্যাত শ্যামবাজারী হিন্দি উচ্চারণে বললেন, “ভাইয়া, ইধার বাজার কিধার হ্যায়?”
প্রথমে ভাবলাম খিল্লি করি, তারপর মনে হল হাজার হোক দ্যাশের লোক, বল্লুম, “সামনে গিয়ে বাঁ দিকে...”
পুরো দলের মুখে হাসি ফুটল, “ওহ্‌ বাঙ্গালী! বাঙ্গালী!”
বাঙ্গালীরা ঘুরতে গেলে, আরও বেশ কিছু চিহ্ন আছে যা দিয়ে সহজেই তাঁদের চেনা যায়। যে কোন ঠান্ডা জায়গায় তাঁদের সোয়েটার যতই পাতলা হোক মাথায় মাঙ্কি ক্যাপ অবশ্যই থাকে, যে কোন জায়গাতেই তাঁরা তাঁদের হজম আর অম্বলের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। বাইরের যে কোন মন্দির, রাজবাড়ি বা লেক দেখলেই তাঁরা কলকাতার বিড়লা মন্দির, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল বা গোলপার্ক লেকের সঙ্গে তুলনা করবেন!
তবে সবচেয়ে সমস্যা হল বাঙ্গালী পর্যটকদের সঙ্গে বাস বা অন্য কোন পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ভ্রমণ করা। বাঙ্গালীরা অন্য আর যেখানেই দলাদলি করুক না কেন ঘুরতে বেরিয়ে বাসে উঠতে হলে তাঁদের দলগত ঐক্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তাই এসব ক্ষেত্রে যখনই লাইন দিয়ে ভিড় বাসে উঠতে হয়ে তাঁরা তাঁদের দলের কাচ্চা-বাচ্চাদের বা বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এগিয়ে দেন। স্বাভাবিকভাবেই অন্যরা এঁদের আগে এগিয়ে যেতে তেমন বাধা দেন না। আর তার পরেই দেখা যায়, বাঙ্গালীর বুদ্ধি! তাঁরা বাসে উঠে একটা সিটে বসেন, সঙ্গে আরো চারটে সিট দখল করে দলের অন্যদের জন্য জায়গা রাখেন এবং তারস্বরে, “গোপাল, এদিকে, বেচারাম এই যে এখানে ব্যাগ দাও...” বলে চিৎকার শুরু করেন।
আর এসবের পরে যখন বাকিরা বিরক্ত হয়ে খিস্তি করেন তখন বাঙ্গালীরা, ‘ওরা তো পাতি পাঁইয়া, ওরা মেড়ো, ওরা গুজ্জু’ বলে কাটিয়ে দেন নাহলে তাঁদের বিখ্যাত হিন্দিতে ঝগড়া শুরু করেন!
যাই হোক, একটা ভালো ব্যাপার হল এইসব বাঙ্গালীরা পর্যটকরা এখনও তুলনামূলক ভাবে দক্ষিণ ভারতে অনেক কম আসেন, হয়ত খাওয়া পোষায় না! তাছাড়া আর একটা কারণ বোধ হয় ভাষা, তাঁদের ঐ বিখ্যাত হিন্দি দাক্ষিণাত্যে চলবে না এটা মেনে নিতে তাঁদের বোধ হয় খুবই কষ্ট হয়!
তবু মাঝেমধ্যে এঁদের দেখা মেলে, যেমন আমি দেখলাম হায়দ্রাবাদে! সেই গল্পটাই বলে শেষ করি।
আগেই বলেছি সালার জং মিউজিয়াম গেছিলাম। তা সেখানে ঢোকার আগেই এনাকে দেখলাম, চিরন্তন বাঙ্গালী চেহারা, তেল দেওয়া চুল পাট করে আঁচড়ানো, সরু গোঁফ, হলুদ রঙের ফুল শার্ট, পুরো হাতা বোতাম দিয়ে লাগানো, একটা মোবাইল ফোনে গাঁক গাঁক করে কাউকে বলেছিলেন, “আমরা চলে এসেছি... ইয়ে... সালার জং... চলে আসুন টেম্পো করে... ষাট টাকা নেবে... হ্যাঁ হ্যাঁ সিক্সটি... আসুন আমরা আছি...” চারদিকে সবাই জেনে গেল। তারপর যেখানেই যাই লোকটি তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছে যান। ভালো করে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে দেখলাম, লোকটি মোটেই মন দিয়ে দ্রষ্টব্যগুলো দেখছে না, তাঁর প্রধান কাজই হল দলের বাকিরা একসঙ্গে আছে কিনা সেটা দেখা, আর সবাই একসঙ্গে গ্যালারীতে ঢুকে গেলে তারপরে হয়তো দুটো-একটা ছবি বা মূর্তি দেখা এবং আমার মত অচেনা বাঙ্গালী দেখলে তাঁদের সঙ্গে ভাব জমানোর চেষ্টা করা!
সত্যিই তো বিদেশে বাঙ্গালীকে বাঙ্গালী না দেখিলে আর কে দেখিবে!