Saturday, January 31, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৬

(আগে যা ঘটেছে)

গরুমারা
কাকুর বাড়ির সাঁওতালি নাচ, যাত্রাপ্রসাদের গন্ডার

গরুমারার গল্প বলার আগে বলতে হবে গরুমারা পৌঁছনোর গল্প। ততদিনে বিট্টু মানে আমাদের ড্রাইভারের ওপর আমাদের বিরক্তি চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। ব্যাটা অর্দ্ধেক জায়গায় যায় না। যেখানে যায়, সেখানে রাস্তা চেনে না। রাস্তার লোককে জিজ্ঞেস করে করে রাস্তা চিনে গাড়ী চালায়। গত দুদিন ধরে লোলেগাঁওতে বসে বসে শুধু ছুটি কাটিয়েছেএমনকি আগের দিন সন্ধ্যেবেলা লোকটাকে দেখেছিলাম ওখানকার স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে একটা ছোট্ট রেস্তোঁরায় সামনে বোতল-গেলাস নিয়ে বসে থাকতে।
তাই গরুমারা যাওয়ার সময় যখন ও বলল যে, লাভা হয়ে লোলেগাঁও যাওয়ার রাস্তায় অনেক ঘুরতে হয়। তাই সেটার বদলে ও একটা নতুন রাস্তা জেনেছে, যেটার প্রথম ছ-সাত কিলোমিটার রাস্তা খারাপ কিন্তু তারপর পিচের রাস্তা এবং সময় কম লাগবে তাই ও সেটা দিয়ে যাবে তখন আমরা খুব একটা ভরসা করিনি।
যাত্রা শুরু করার পনেরো মিনিটের মধ্যে আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ল যখন আমরা একটা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। রাস্তা খারাপ বলেছিল, কিন্তু আসলে বলা উচিত ছিল যে রাস্তা বলে কিছু নেই। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে গাড়ি চলল। দুদিকে মাঝারি ঘন জঙ্গল, মোবাইল নেটওয়ার্কের নামগন্ধ নেই। এইভাবে চলেই যাচ্ছি, ঘন্টা খানেক হয়ে গেল, রাস্তার কোন উন্নতি নেই। বিট্টুর মতলবটাও কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে। সে সত্যিই রাস্তা চেনে না নাকি কোন নাটক করছে তা বোঝারও কোন উপায় নেই।
মাঝখানে তিনটে কাঠুরেকে দেখে সে গাড়ী থামিয়ে রাস্তা জিজ্ঞেস করছিল, শ্রেয়াসী দেখি আমার হাত আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ফিসফিস করে আবার বলল, “গাড়ী লক করে রাখো!”
যাই হোক, খারাপ কিছুই হয়নি, ঐ লোকগুলোর দেখানো পথেই এগিয়ে গিয়ে শেষ অবধি ভালো রাস্তা পাওয়া গেল, তারপরেও আরও ঘন্টা খানেক ভালো-খারাপ রাস্তা মিলিয়ে চলার পর শেষ অবধি লাটাগুড়ির কাছে গিয়ে শহরের রাস্তায় পড়লাম।
শেষ কয়েকদিন লাভা-লোলেগাঁওয়ের মত ছোট্ট জায়গায় কাটানোর পর ঐ লাটাগুড়ির শহরতলি দেখেও কী ভালোই না লাগলো। দোকান-পাট, বাজারের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ী চলল চালসার দিকে। আমাদের রিসর্টের নাম ছিল কা-কুর-বাড়ি। যদিও সেটা কার কাকার বাড়ী সে নিয়ে আমাদের কোন ধারণা নেই।

আমরা যখন রিসর্টে ঢুকলাম তখন বারোটা বেজে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন বিকেলের অরণ্যভ্রমনের ব্যবস্থা করা গেল না। কিন্তু পরের দিন ভোর চারটের জন্য জিপের ব্যবস্থা করে রাখলাম। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টেরই জিপ, সেটা নিয়েই জঙ্গলের মধ্যে ওয়াচ টাওয়ারে চলে যাওয়া যাবে।
এরপর সারাদিন রিসর্টেই ল্যাধ খেয়ে কাটালাম। কিছুই বিশেষ করার ছিল না, এমনকি কা-কুর-বাড়ির কাছের মূর্তি নদীর জলও শীতকালে শুকিয়ে যাওয়ায় সেটা দেখতেও যাওয়া হয়নি।
সন্ধ্যেবেলা রিসর্টের ম্যানেজারের উদ্যোগে আরও একটি বাঙালী পরিবারের সঙ্গে বসে সাঁওতালি নাচ দেখার সুযোগ হল। রিসর্টের মধ্যেই মাঠের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনকে ঘিরে পনেরো জন সাঁওতালি মেয়ের নাচ। সঙ্গে তাদের আদিম সঙ্গীত। এই জিনিস সামনে থেকে দেখার মজাই আলাদা। শেষের দিকে আমাদের তথাকথিত শহুরে মহিলারাও নাচে যোগদান করলেন। পুরুষদের যোগ দেওয়ারও প্রস্তাব ছিল কিন্তু আমি নাচার বদলে ঐ নাচকে ক্যামেরাবন্দী করায় মন দিলাম।

৩১শে ডিসেম্বরের সকাল শুরু হল ভোর সাড়ে তিনটের সময়। তখন কী জানি যে পরের কুড়ি-একুশ ঘন্টায় কত কী হতে চলেছে। যাক গে, শুরু থেকেই শুরু করি।
চারটে বাজার একটু পরেই আমাদের জিপ এসে আমাদের নিয়ে চলল গরুমারা জাতীয় উদ্যানের টিকিটঘরের উদ্দেশ্যে। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা, হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেছিল আমাদের। পাঁচটার আগে কাউন্টারে পৌঁছেও দেখলাম আমার সামনে নজন ততক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়ে পরেছেন। টিকিটঘর যদিও খোলার কথা ছটায়।
ঠিক ছটায় টিকিটঘর খুলল। তার আগে টুরিস্টদের বদলে স্থানীয় লোকেদের লাইনে জায়গা রাখা নিয়ে সামান্য ঝামেলা হয়ে গেল ছোট করে। টিকিট নিয়ে, গাইড ঠিক করে তাকে তুলে নিয়ে আমাদের জিপ ছুটল যাত্রাপ্রসাদ ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। লোকে বলে ঐ যাত্রাপ্রসাদ ও রাইনো অবসার্ভেশান পয়েন্ট থেকেই গন্ডার দেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশী।

সাড়ে ছটা নাগাদ জঙ্গলে ঢুকতে পেলাম। আমাদের জিপই সেদিনকার প্রথম জিপ। দূরে দেখতে পাচ্ছি কাঞ্চনজঙ্ঘা। জঙ্গলের মধ্যে যাত্রাপ্রসাদ যাওয়ার পথে একটা বাইসন আমাদের সামনে দিয়ে ছুটে রাস্তা পের হয়ে গেল। আর দেখলাম বার্কিং ডিয়ার।
নদীর ধারে একটা সল্ট লিকের ঠিক সামনে ওয়াচ টাওয়ার যাত্রাপ্রসাদ। সেখান দাঁড়িয়ে সামনের দৃশ্য দেখে মনে ভরে গেল। সামনেই মূর্তি নদী, তারপর অনেকটা খোলা জায়গা, তার পেছনে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কুয়াশার ঘন আস্তরণ। সবার পেছনে আবছা হয়ে আছে বিভিন্ন পাহাড়চূড়া, যদিও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল না ওখান থেকে। এসবের মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখের সামনে দিনের সূচনা হল। আকাশের ছাই ছাই আবছা রং পরিবর্তিত হল সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে।


আমাদের পর আরও বেশ কিছু টুরিস্ট গ্রুপ সেখানে এসে জায়গা নিল, প্রত্যেক গ্রুপের সঙ্গেই একজন করে গাইড নেওয়া আবশ্যক। বাচ্চারা থাকায় কিচিরমিচির বাড়ল একটু। সেখানে প্রথম দেখতে পেলাম একটা ময়ূর। যদিও কানপুরে থাকার দরুন এবং রাজস্থান ঘুরে আসার পর ময়ূর দেখে আর নতুন লাগে না। ময়ূরের সঙ্গে সঙ্গেই অন্যান্য পাখী দেখতে পেলাম, মাছরাঙা দেখলাম, ধনেশ পাখীও দেখলাম, যদিও এদের ছবি তুলেছি পরে।
কিছুক্ষণ পর গাইডরা দেখালো বহু দূরে একটা হরিণ নদী পার হচ্ছে। সে প্রায় আবছা এতটাই দূর। আরও কিছুক্ষণ পর গাইডদের মধ্যে আবার চাঞ্চল্য দেখা দিল। জিজ্ঞেস করায় আঙুল তুলে দেখাল দূরে বন দফতরের হাতি বেরিয়েছে, সম্ভবত গন্ডার খোঁজার জন্য, যাতে গন্ডাররা তাদের বাসস্থান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দর্শন দেয়। তাদের কথামতই একটু পরে হাতির তাড়া খেয়ে একটা গন্ডার বেরিয়ে এল। যদিও সেও অনেকটাই দূরে। দূরবিন বা ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে জুম না করে দেখলে সেই গন্ডার পরিষ্কার দেখা সম্ভব নয়।















পঁয়তাল্লিশ মিনিট যাত্রাপ্রসাদে কাটিয়ে আমাদের গাইডের কথামত আমরা চলে এলাম রাইনো পয়েন্টে। এটার সামনে দিয়েও মূর্তি নদীর একটা শাখা বয়ে চলেছে। এখানে পাখীর সংখ্যা আরো বেশী... নদীর বুকে বক জাতীয় নানা রকমের পাখী ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আসছিল, আবার একটু বসে উড়ে চলে যাচ্ছিল। ওখানেই এক ধনেশ দম্পতির ছবি তুলতে পেরেছিলাম।




একটু পরে, দূরে গন্ডার দেখা গেল। প্রথমে একটা একা, তারপর একটা বড় গন্ডারের সঙ্গে একটা বাচ্চাও। সেগুলো মোটামুটি পরিষ্কারই দেখা গেল। তারপর গাইডরা জানালেন যে, দূরে নাকি একটা বাইসনের পাল বেরিয়েছে, “কিন্তু আপনাদের চোখে সেটা ধরা পড়বে না।”
অনেক কষ্ট করে জঙ্গলের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকার পর দূরবিন আর ক্যামেরার জুম দিয়ে জঙ্গলের ধারে সত্যিই একপাল বাইসন দেখতে পাওয়া গেল। কিন্তু ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন যে বাইসনগুলো সত্যিই কতটা দূরে ছিল।
সাড়ে ছটা থেকে আটটা অবধি সময় ছিল। তারপর আমরা গুটি গুটি ফেরার পথ ধরলাম। সেখানেই দেখলাম, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাংলো, রাইনো পয়েন্টের ঠিক পাশেই। জঙ্গলে থাকার পক্ষে এরকম আদর্শ জায়গা আর হয় না। পরের বার গরুমারা এলে এখানেই থাকার চেষ্টা করব এইসব ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে এলাম গরুমারা ন্যাশানাল পার্ক থেকে। আমাদের জিপ ছুটল কা-কুর-বাড়ি রিসর্টের দিকে।

সুনীল লিখেছিলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি’... আমিও কথা রাখতে পারলাম না। এই সপ্তাহে অফিসের চাপে সময় করে এইটুকুই লিখতে পেরেছি। রবিবার আবার ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছি দিন চারেকের জন্য। সুতরাং শেষ পর্ব লিখতে পারব সেখান থেকে ফেরার পরেই।

সুতরাং এই লেখার আরো এক পর্ব বাকি। জলদাপাড়ার টুরিস্ট লজের গল্প বাকি আছে এখনো। জে কে রাওলিং সাত পর্বে হ্যারি পটারের গল্প লিখেছিলেন আর আমি নাহয় সাত পর্বে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের গল্প লিখছি, মন্দ কী!

                                                                                                                         (চলবে)

Saturday, January 24, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৫

(আগে যা ঘটেছে)


লাভা-লোলেগাঁও
নট আ গুড ‘চয়েস’

কালিম্পঙে আমাদের এক রাত্তিরই থাকার কথা। পরদিন সকালে উঠেই ব্যাগ-ট্যাগ গুছনোর ব্যাপার ছিল। তাছাড়া আমি রোজ সকালে বেরোবার আগে সারাদিনের প্ল্যান করে নিতাম বা কোথায় কখন কি কাগজ-পত্র লাগবে সেগুলো দেখে নিতাম। সেদিন সকালে উঠে লাভার হোটেলের বুকিঙের কাগজ দেখতে গিয়ে ঘাবড়ে গেলাম। আমরা হলিডেহোমইন্ডিয়া বলে একটা ওয়েবসাইট থেকে লাভার হোটেল চয়েসে বুকিং করেছিলাম। ওরা পোস্টেই বুকিং স্লিপ পাঠিয়ে দিয়েছিল। তখন কীভাবে জানি না নজর এড়িয়ে গেছে, এখন দেখলাম আমাদের হোটেল বুকিং ঠিক এক মাস আগের। মানে ২৭শে ডিসেম্বরের বদলে ২৭শে নভেম্বর। কেলেঙ্কারী ব্যাপার! এদের দিয়েই লোলেগাঁওর বুকিংও করানো হয়েছিল। সুতরাং সবার আগে সেটার তারিখ চেক করলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার যে সেটার বুকিং ঠিক তারিখেই হয়েছে। ভুল শুধু হয়েছে লাভার কেসটায়।
কী আর করি। স্লিপে যেসব নম্বর দেওয়া ছিল, তার কয়েকটায় ফোন করলাম, বেশীরভাগ সুইচ অফ, নাহলে বেজে যাচ্ছে। অতঃপর গুগল থেকে খুঁজে পেতে একটা নম্বরে ফোন করায় ফোন লাগল। ভদ্রলোক ঐ হোটেলের কলকাতা অফিসে বসেন। ওনাকে বুঝিয়ে বললাম প্রবলেমটা। উনি ব্যাপারটা বুঝলেন, তারপর বললেন যে, ঘর পাওয়া যাবে। চাপ হওয়া উচিত নয়। তবে দশটার পর ফোন করলে উনি সেটা কনফার্ম করবেন।
টেনশান কমিয়ে আবার প্যাকিং-এ মন দিলাম। এর মধ্যে পিউ উঠল, তাকে এইসব জানানো হল। সেও খুব একটা চাপ না নিয়ে ব্রেকফাস্টে মন দিল।
সব গুছিয়ে নিয়ে দশটা নাগাদ বেরনো হল। এর মধ্যে আমাদের নতুন ড্রাইভার বিট্টু তার অল্টো নিয়ে হাজির হয়ে গেছিল। কালিম্পং থেকে ঘন্টা তিনেক জার্নি করে এসে পৌঁছলাম লাভা। এর মধ্যে হোটেলে ফোন করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হোটেল চয়েসে ঘর ফাঁকা আছে যেখানে থাকা যাবে।
লাভা একটা খুবই ছোট্ট জায়গা। তার মধ্যে রাস্তার দুদিকে একের পর এক হোটেল। সেগুলোর মধ্যেই এক গলির মধ্যে আমাদের হোটেল চয়েস খুঁজে বের করলাম। প্রথম দর্শনেই মনটা বেশ দমে গেল। ছোট্ট হোটেল, সামনে একটা লাউঞ্জ মত জায়গা, এক পাশে রান্নাঘর। লাউঞ্জের পাশেই আমাদের ঘরটাও খুবই ছোট, বিছানার চাদরটাও খুব পরিষ্কার নয়, রুম-হিটার নেই। একেবারেই সাধারণ ব্যবস্থা আর তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা! কালিম্পঙের চেয়ে লাভায় অনেকটাই ঠাণ্ডা বেশী ছিল। ঘরে গিয়েই লেপের তলায় ঢুকতে হল।
যাই হোক একটু ধাতস্থ হয়ে আমি আর পিউ দুপুরের খাওয়া খুঁজতে বেরোলাম। গলি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হেঁটেই দেখি, একটা বাঙ্গালী হোটেল এবং খাবার জায়গা যেখানে অনেক লোক একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছে। সেখান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বসার জায়গা পাওয়া গেল। খাওয়া হল ভাত, ঘি, ডাল, পাঁপড়, বাঁধাকপি আর ডিমের ডালনা। শেষ কদিনের থুকপা আর স্যান্ডউইচের পর ডাল-ভাত দারুণই লেগেছিল। কিন্তু রাত্তিরে ঠান্ডার মধ্যে আবার ওখানে আস্তে ইচ্ছে করবে কিনা সেই ভেবে রাতের খাবার অর্ডার করলাম না। আসলে লাভা এতটাই ছোট জায়গা যে সব হোটেলই রাতের জন্য বিকেলের মধ্যে অর্ডার নিয়ে সেই মত মাথাগোনা খাবারের ব্যবস্থা করে।

লাঞ্চ করে সামান্য মিনিট পনেরো ঘোরাঘুরি করতেই লাভার প্রধান রাস্তাটা আমাদের দেখা হয়ে গেল। তখন বুঝলাম যে জায়গাটা কত ছোট। হোটেলগুলোও বেশীরভাগই যে খুব ভালো লাগলো তা নয়, মনে হল আমাদের হোটেলটার মতই হবে। আর কিছু ছোটখাট দোকান, ঘর সাজানোর জিনিস, মুর্তি, খেলনা, পুতুল, শাল... এইসব সামগ্রী নিয়ে বসে আছে। সঙ্গে অতি অবশ্যই ল্যেজ, কোল্ড ড্রিঙ্কস, বিস্কুটের মত দরকারী জিনিসগুলোও আছে।
আমাদের গাইডবই অনুযায়ী লাভায় প্রধান দুটো দেখার জায়গা নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক আর ছ্যাঙ্গে ফলস্‌। সেদিনকার মত কাটিয়ে দিয়ে আমরা হোটেলের ঘরে লেপ মুড়ি দিয়ে সেট ম্যাক্সে ‘মোহব্বতে’ দেখতে বসলাম। প্ল্যান করলাম পর দিন সকালে লোলেগাঁও যাওয়ার আগে এ দুটো দেখে নেওয়া যাবে।
সারা বিকেল-সন্ধ্যে আধা ঘুম-আধা আড্ডা মেরে কাটল। সঙ্গে মাঝে মাঝে কফি, ম্যাগি এইসব উপাচার তো ছিলই। মাঝখানে একবার হোটেলের মালিক মিঃ রোবেনের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা মারলাম। জানতে পারলাম যে, হোটেলের পেছনে পাহাড়ের ঢালে ওদের বাড়ী। ও  আর ওর বউ মিলে হোটেলটা চালায়, এছাড়া সাইট সিইং-এর গাড়ীর ব্যবসাও আছে। আরো জানতে পারলাম যে, নেওড়া ভ্যালি বা ছ্যাঙ্গে ফলস্‌ যাওয়ার রাস্তা এতটাই দুর্গম যে আমাদের ছোট অল্টো গাড়ী কোনমতেই যাবে না। তার জন্য আলাদা বড়, ভারী গাড়ী ভাড়া করতে হবে।
শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল যে, হয়তো নিজের গাড়ী গচানোর জন্য এইসব বলছে, তাই অতটা পাত্তা দিইনি। পরের কথায় একটু পরে আসছি।
রাত্তিরে মুর্গির মাংস-ভাত অর্ডার দেওয়া ছিল। খাওয়া-দাওয়া হয়ে যাওয়ার পর রোবেন এসে জিজ্ঞেস করল, “অর কুছ চাহিয়ে সাব?” কিছু লাগবে না বলায়, “তো হাম আতা হ্যাঁয় সাব” বলে সে চলে গেল। তখন কিছু সন্দেহ হয়নি। কিন্তু মিনিট দশেক পর মনে হল, বাইরে থেকে একেবারেই কোন আওয়াজ আসছে না। দরজাটা খুলতেই দেখি বাইরেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। লাউঞ্জের সব আলো নেভানো, জনপ্রাণী নেই। প্রথমে দেখে দুজনে ঘাবড়েই গেছিলাম। মনে হল হিন্দি-ইংরেজি ভূতের সিনেমার মতই কোন ভূতুড়ে হোটেলে এসে পৌঁছেছি। মোবাইলের টর্চের আলোয় হাতড়ে হাতড়ে সুইচ বোর্ডটা পাওয়া গেল। লাউঞ্জের আলোটা জ্বলে উঠতেই পরিবেশটা একটু উন্নত হল। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে যা দেখলাম সেটা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। লাউঞ্জে কেউ নেই, ঐ ফ্লোরের অন্য ঘরটায় লোক নেই, সেটা আমি জানতাম। আরো দুটো দরজা, একটা খুলে দেখলাম ওটা একটা বাথরুম, অন্যটা পেছনদিকে একটা বারান্দা। বুঝতে পারলাম যে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটাও বাইরে দিয়ে। হোটেলের কাঁচের দরজাটা টেনে দেওয়া, বাইরে থেকে সহজেই খুলে ফেলা যায়। সামনের ধাতব শাটারটা তিন-চতুর্থাংশ নামানো।
এসবের মধ্যে আরো খেয়াল হল সারাদিনে রোবেনের ফোন নম্বরটাও নেওয়া হয়নি। কী আর করি, ঐ বারান্দায় গিয়ে “রোবেন, রোবেন” বলে হাঁক পাড়তে লাগলাম। একটা আবছা “আয়া”ও শুনতে পেলাম বলে মনে হল। আবার লাউঞ্জে ফিরে হোটেলের রেজিস্টারটা ঘাঁটব ভাবছি এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে রোবেন এসে হাজির। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো যে, এটাই তার হোটেলের সিস্টেম। তারা সকলেই রাত্তিরে নিজেদের বাড়ী চলে যায়। লাউঞ্জটা ফাঁকাই থাকে। চিন্তার কিছু নেই, ওপরে দোতলায় অন্য গেস্টরা আছে। এইসব বলে-টলে নিজের ফোন নম্বরটা দিয়ে রোবেন কেটে পড়ল। আমরা আর কী করি। ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিটা শক্ত করে লাগিয়ে দিয়ে দরজার গায়ে আমাদের ভারী সুটকেস, ব্যাগ, চেয়ার ঠেকিয়ে রেখে দিলাম। পিউ দাবী জানিয়েছিল যে আলো জ্বেলে ঘুমনোর জন্য, কিন্তু ঘরের নাইট ল্যাম্পটার আলোর রং লাল! তাতে ভয় যত না কমল তার চেয়ে বেশী ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হল। সুতরাং শেষ অবধি টিভিটা চালিয়ে রেখে ঘুমোতে যাওয়া সব্যস্ত হল। ঠান্ডাটা ততক্ষণে অস্বাভাবিক রকমের বেড়ে গেছে।
সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম আগের রাতের বিভীষিকা(!) তখন আর নেই। বাইরে উজ্জ্বল আকাশ। ঘরের বাইরে থেকে রোবেন আর হোটেলের বাকি লোকেদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ঠান্ডা যদিও কমেনি।
রেডি হয়ে, কফি খেয়ে বেশী দেরি না করেই বেরিয়ে পড়া গেল। বিট্টু মানে আমাদের ড্রাইভারকে যখন নেওড়া ভ্যালি আর ছ্যাঙ্গে যাওয়ার কথা বললাম, তখন সে আমতা আমতা করে যা বলল তা হল, তার গাড়ী ওইসব জায়গায় যাবে না। গেলেও রাস্তাতেই আটকে যাবে। ঐসব জায়গার জন্য বড় গাড়ীর প্রয়োজন, ঠিক যা রোবেন বলেছিল। সে আরো যা বলল, তাকে বলা হয়েছে যে, তার গাড়ী নিয়ে আমাদের শুধু কালিম্পং থেকে লাভা, লাভা থেকে লোলেগাঁও... এই জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। এইসব সাইট সিইং সে করাবে না। তার চেয়েও বড় কথা এই ছোট অল্টো গাড়ী অধিকাংশ জায়গায় যাবেই না।
যার কাছ থেকে গাড়ী নিয়েছি তার এটা বোধহয় জানানো উচিত ছিল। তাকে ফোন করেও বিশেষ লাভ হয়নি। নানা রকম বাহানা করে সে কাটিয়ে দিল। সুতরাং এই ফাঁকে এখানে একটা উপদেশ দিয়ে রাখি, উত্তর বাংলায় ঘুরতে গেলে দুজনই যান বা দশজনই যান সবসময় বোলেরো-সুমো বা ঐ জাতীয় বড় গাড়ী ভাড়া করবেন। দরকার হবে না ভেবে বা পয়সা বাঁচানোর চক্করে ছোট গাড়ী ভাড়া করলে সেই গাড়ী অর্দ্ধেক জায়গাতেই যাবে না! আপনার ঘোরার বারোটা বেজে যাবে!
এইসব ঝামেলায় মুড একেবারেই খিঁচরে গেল। আর অন্য গাড়ী নিতেও ইচ্ছে করছিল না। নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্কের শুরুতে কিছুটা জায়গা নিয়ে গোটা পার্কের একটা ছোট রেপ্লিকা আছে। সেটা আমরা দেখে নিলাম। বিভিন্ন গাছপালা আর পাখীর মডেল ছাড়াও একটা স্টাফড্‌ ভাল্লুকও ছিল। পুরোটা দেখতে দশ মিনিটও লাগলো না। পিউ যদিও তার মধ্যেও ভয় পাওয়ার চেষ্টা করেছিল!
তারপর সেখান থেকে সোজা লোলেগাঁও। একই রকমের পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়া। যদিও রাস্তার হাল বেশ খারাপ। ঘন্টা দুয়েক পর লোলেগাঁও পৌঁছে দেখলাম সেটা লাভার চেয়েও ছোট একটা জায়গা। তবে এখানকার হোটেলটা বাইরে থেকে দেখে বেশ ভালোই লাগল। আর হোটেলের ঠিক সামনে থেকে দেখা যাচ্ছে আমাদের পুরনো বন্ধু কাঞ্চনজঙ্ঘা। যদিও হোটেল কাফালের মালকিন জানালো যে আমাদের ঘর এখনো রেডি নেই। সুতরাং রিশেপসানের এক পাশে আমাদের ব্যাগ-পত্তর রেখে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ‘হ্যাঙ্গিং ব্রিজ’ দেখতে।


কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া জঙ্গলের মধ্যে ঐ কাঠের ব্রিজটাই লোলেগাঁওয়ের প্রধান দ্রষ্টব্য। জঙ্গলের মধ্যে ভালোই লাগল সেই ব্রিজ। তবে আরো অন্যান্য টুরিস্ট এবং বাচ্চাদের ক্যাঁই-ম্যাই এর জন্য জঙ্গলের শান্তি অনেকটাই বিঘ্নিত হয়েছিল। সেখানেই রাস্তার ধারে একটা নীচু গাছের ডালে চড়ে ছবি তোলা হল। পিউয়ের সেই ‘শাখামৃগ’ নামের ছবিটা ফেসবুকে এত বিখ্যাত হয়ে গেছিল যে দেখলাম আমার ব্রাজিলিয়ান সহকর্মী পর্যন্ত এসে সেটা লাইক করে গেছে!
হোটেলে ফিরে ঘর দেখে মন ভরে গেল। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। কাঠের দেওয়াল, দুদিকে বড় বড় জানলা, সেই ঘরের আবার একটা নামও আছে, ‘কস্তুরি’। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, ঘরের বারান্দা থেকে বটেই এমনকি জানলার পর্দা সরালে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলাম যে, এই লোলেগাঁওতে দেখার মত আরো দুটো জায়গা হল একটা সানসেট পয়েন্ট আর একটা সানরাইজ পয়েন্ট। বিশেষ করে সেই সানরাইজ পয়েন্টের সূর্যোদয় নাকি টাইগার হিলের সূর্যোদয়ের মতই সুন্দর! এবার আপনারাই বলুন একবার ঠান্ডায় জমে বরফ হতে হতে সানরাইজ দেখার পর আবার কেউ সেই জিনিস দেখার জন্য ভোর চারটের সময় ওঠে! সুতরাং সানরাইজ আর সানসেট, দুটোই কাটিয়ে দিয়ে আমরা পরের দিনের রিষপ যাওয়ার প্ল্যান বানালাম। বলাই বাহুল্য সেই রাস্তাতেও আমাদের বিট্টুর গাড়ী চলবে না। তাই লোলেগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে পরের দিনের জন্য বোলেরো গাড়ী ভাড়া করে ফেলা হল। তারপর বাকি দিনটা নির্ভেজাল বিশ্রাম, আড্ডা, কফি-পাকোড়া খাওয়া, টিভি দেখা আর ঘুম!
পরদিন সকালে নিজেরা সূর্যোদয় দেখতে না গেলেও হোটেল সুদ্ধু লোকের উৎসাহের চোটে ভোর চারটের সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল। কী করব? চারদিকে যা হইচই হচ্ছিল সে কহতব্য নয়, আর ঐ কাঠের পাতলা দেওয়াল ভেদ করে সেইসব আওয়াজ আমাদের ঘুমেরও সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দিল। যাই হোক, সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চারদিক শান্ত হলে আমরা আবার একটু ঘুমিয়ে নিলাম। তারপর হঠাৎ ছটা নাগাদ ঘুম ভাঙ্গল। কী মনে হল, জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে লাল রং ছড়িয়ে গেছে। পুরো গোলাপী রং ধরেছে  চূড়ায়। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। জানি না, যারা সানরাইজ পয়েন্টে গেছিল তারা বিশেষ কী দেখেছে কিন্তু আমার ঘরে বসে সেদিন যে অভিজ্ঞতা হল তার তুলনাও সহজে মেলা ভার।

দশটা বাজার আগেই আমরা দুজন রিষপের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। লোলেগাঁও থেকে রিষপের রাস্তা সত্যিই খুব খারাপ। জায়গায় জায়গায় রাস্তা বলে কিছুই নেই। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও হয়তো শুধু পাথর। জায়গায় জায়গায় খাড়াইটাও বেশ চোখে পড়ার মত। ঐ রাস্তা দিয়ে ঘন্টা দুয়েক যাওয়ার পর আমাদের ড্রাইভার (নাম ভুলে গেছি) গাড়ী থামিয়ে বলল, “এবার ঘুরে আসুন।”
গাড়ী থেকে নেমে দেখি রাস্তার ধারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের গায়ে ঢালু পথ উঠে গেছে। একটা গাছের ডালে আটকানো বোর্ডে লেখা ‘টিফিন ডেরা’। ঠিক জানতাম না ওখানে কী আছে। ড্রাইভার ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করায় যা বলল তাতে মনে হল যে, ওপরে মাইল খানেক গেলেই একটা ভিউ পয়েন্ট আছে। ভাবলাম, ওপরে গেলে নিশ্চয়ই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে। যাই হোক, দুজনে মিলে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। জঙ্গল খুব একটা ঘন না হলেও খাড়াই। সেই খাড়াই পথ দিয়ে মিনিট পনের হাঁটার পরেও জঙ্গল ছাড়া যখন কিছুই দেখতে পেলাম না তখন সন্দেহ হল যা ভেবে হাঁটছি সেটা ঠিক নাও হতে পারে। আরো পাঁচ মিনিট হাঁটার পরও যখন জঙ্গল আরো গভীর হতে লাগল, তখন আমরা ফিরে যাওয়াই উচিত বলে মনে করলাম।
গাড়ীর কাছে গিয়ে আমাদের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভিউ পয়েন্ট কাঁহা হ্যাঁয়?”
তাতে সে খুব অবাক হয়ে রাস্তার উল্টোদিকে একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে বলল, “ইঁহা!”

ভগবান জানতে পারে কিন্তু আমি আজও জানি না ও আগেরবার ঠিক কী বুঝেছিল!
এবারের দেখানো জায়গাটায় গিয়ে দেখতে পেলাম উজ্জ্বল নীল আকাশের বুকে ঝলমল করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এটা ভিউ পয়েন্টই বটে, কোন ভুল নেই। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ সময়ে কাটিয়ে এবং নানাবিধ চিত্রকর্মের পর আমরা লোলেগাঁও ফেরার পথ ধরলাম। অনেক বুঝিয়েও আমাদের ড্রাইভারকে রাজী করানো গেলনা রিষপ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। যতই বলি চলো, সে মাথা নেড়ে বলে, “ও ছোটা বস্তি হ্যাঁয়, দেখনে লায়েক কুছ নেহি হ্যাঁয়!”
আমাদের লাভা-লোলেগাঁওয়ের গল্প মোটামুটি এখানেই শেষ। সত্যি বলতে কী বোরই হয়েছিলাম ঐ কদিন। হয়তো এই লেখাতেও সেটা বেরিয়ে এসেছে। পড়তে গিয়ে আপনিও বোর হয়েছেন হয়তো।

পরের পর্বে আসছে গরুমারা-জলদাপাড়ার গপ্প। আর সেটাই এই লেখার শেষ পর্ব। দয়া করে আর কদিন ধৈর্য ধরুন।
(চলবে)

Saturday, January 17, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - 8


কালিম্পং
ভূত বাংলো

দার্জিলিং থেকে কালিম্পঙের রাস্তাটা বেশ অন্যরকম। প্রথমে কিছুটা শহরের মধ্যে দিয়ে, তারপর পাহাড়, আবার লামাহাট্টার পর কিছুটা গেলেই তিস্তা দেখতে পাওয়া যায়। এরপর তিস্তা বাজারের কাছে অনেকটা রাস্তা তিস্তার সঙ্গে সঙ্গে চলা, তারপর তিস্তার ব্রিজের ওপর দিয়ে এসে ফের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে ওপরে ওঠা। প্রায় তিন ঘন্টার রাস্তা, তাতে আবার আমরা দুবার ব্রেক নিলাম।
দার্জিলিং থেকে হোটেলের সব হিসেব মিটিয়ে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে আমার বেরিয়েছিলাম নটা নাগাদ। পর পর দুদিন বেশ পরিষ্কার আকাশের পর সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকাশও বলল যে, “আজ গড়বড় হ্যায়।” আজও আগের দিনের মতই ঘুম স্টেশন অবধি এসে তারপর ডানদিক না নিয়ে সোজা এগিয়ে গেলাম। তার পরেই একটা বাঁদিকের রাস্তায় গাড়ী ঘুরল। একটু পর থেকেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু। টুকটাক গল্প করতে করতে এগোচ্ছি, আমি মাঝখানে আমার টিনটিন মার্কা নোটবুক খুলে একটু হিসেব করতে বসলাম, কিন্তু ঐ এবড়োখেবড়ো পাহাড়ির রাস্তায় চলন্ত গাড়ীতে হিসেব লেখার চেষ্টা যে খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় সেটা বুঝে রণে ভঙ্গ দিতে হল খুব তাড়াতাড়িই।
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়ী থামল একটা বেশ সুন্দর দেখতে পার্কের সামনে। বিকাশ জানালো যে, এই জায়গার নাম লামাহাট্টা। লামাহাট্টাও একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম তবে এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল পাহাড়ের ঢালে বানানো চমৎকার ঐ পার্ক। বেশ যত্ন করে বানানো এবং সেই একই যত্ন নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়। পুরো পার্ক জুড়ে রংবেরঙয়ের ফুল গাছগাছালির সারি। ততক্ষণে সকালের মুখ ভার কেটে গিয়ে রোদ উঠে গেছে। পার্কের একদিকে উঁচু উঁচু পাইন আর বার্চ গাছের বন, তার সামনে লাইন দিয়ে লাল-হলুদ-সবুজ-নীল রঙের পতাকা সকালের হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে।
আকাশের অন্যদিকের উজ্জ্বল নীল রঙের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের চেনা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পার্কের মধ্যে জায়গায় ছোট ছোট ছাউনির মত বানানো আছে। শুধু তাই নয়, এই সবের মধ্যেই আছে একটা ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে উঠলেই একসঙ্গে লামাহাট্টার পুরো গ্রামটা দেখা যায়। আর কাঞ্চনজঙ্ঘা তো আছেই। মনের আনন্দের প্রকৃতি এবং পিউয়ের প্রচুর ছবি তুলে ফেলা গেল।
পিউ সকালে ব্রেকফাস্টে বেশী কিছু খায়নি। তাই ওখানে একটা দোকানে গরম গরম ম্যাগি খেয়ে নিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আধ ঘন্টা পরেই পরবর্তী বিরতি নিতে হল। পাহাড়ের রাস্তার বাঁকে এক জায়গায় বেশ কিছু গাড়ী দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে আমাদের গাড়ীটাও থামিয়ে দিয়ে বিকাশ বলল, “চলুন, তিস্তা নদী দেখবেন।”
দেখলাম, পাহাড়ের গায়ে বাঁধানো উঠোনের মত জায়গা, লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে নানা রকমের। কিন্তু ওখানকার প্রধান আকর্ষণ হল দূরে পাহাড়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর সঙ্গম। বিকাশ বলল, ওখানটাকে বলে ত্রিধারা, কিন্তু অন্য নদীগুলোর নাম বলতে পারল না। অবশ্য তাতে কী বা আসে যায়? নদীর সৌন্দর্য কি আর তার নামের ওপর নির্ভর করে? তিস্তা নদী ভীষণ সুন্দর। আর এই নদীর জলের রঙ সবুজ। না পান্নার মত উজ্জ্বল সবুজও নয়, কচি কলাপাতার মত চোখ ঝলছে দেওয়া সবুজও নয়। এই সবুজ হালকা, পেস্তা রঙের, সামান্য নীল রঙ ঘেঁষা। এই যাত্রায় সেই প্রথম তিস্তা দর্শন। নদী দেখে, তার ছবি তুলে, তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা আবার এগিয়ে গেলাম আমাদের পথে।

তিস্তা নদী তখনকার মত বিদায় নিলেও একটু পর আবার আমাদের পথের সঙ্গী হল। জায়গাটার নাম তিস্তা বাজার। বুঝতেই পারছেন এখানে এসে দেখলাম আমাদের রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। সেই নদীর সঙ্গে খানিকটা পথ চলার পর তিস্তা নদীর ওপরের ব্রিজ টপকে ওপাশে গিয়ে আমরা আবার পাহাড়-জঙ্গলের পথে ফিরে গেলাম। বিকাশ জানাল, কালিম্পং পৌঁছতে আর ঘন্টা খানেকের বেশী লাগবে না।

এই ফাঁকে কালিম্পঙে আমাদের থাকার ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলে নি। আমি যখন হোটেল বুক করছিলাম তখন সব জায়গাতেই আগে দেখছিলাম যে সরকারী থাকার জায়গাগুলোতে জায়গা আছে কিনা এবং সেগুলো অনলাইন বুক করা যাচ্ছে কিনা। দুটি ক্ষেত্রে দুটো প্রশ্নের উত্তরই হ্যাঁ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টুরিস্ট লজে থাকার ব্যবস্থা করি। সত্যি বলতে কি WBTDC-এর ওয়েবসাইটটা বেশ ভালোই। সেখানেই দেখেছিলাম যে, কালিম্পঙে তিনটি সরকারী অতিথিশালা রয়েছে যেগুলোর মধ্যে আমি পছন্দ করেছিলাম মর্গান হাউস। বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে জেনেছিলাম যে, ওটা একটা ব্রিটিশ আমলের বাংলো, যেটা এখন সরকার অধিগ্রহন করে টুরিস্ট লজ বানিয়েছে। মর্গান হাউসের ছবি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই পছন্দ হয়ে গেছিল আর যতই হোক সত্যজিৎ রায়ের গল্পের চরিত্রদের মত পুরনো বাংলোতে থাকার লোভ সামলানোও সহজ কাজ নয়। যেটা পরে জানলাম তা হল, মর্গান হাউসের নাকি ভূতের বাড়ী বলে কিঞ্চিৎ নাম আছে... (“নাম বলছেন কেন? বদনাম বোলেন...”) বাড়ীর প্রাক্তন মালকিন মিসেস মর্গানকে নাকি মাঝেমধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। আমার সঙ্গিনী সেটা শুনে আসার আগেই আমাকে বলে রেখেছিলেন যে ওখানে গিয়ে ভূতের সামান্য নামগন্ধ পেলেই তিনি ঘর ছেড়ে রিসেপশনে গিয়ে থাকবেন। যদিও ওনাকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করা হয়নি যে, ভূতেদের রিসেপশন এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে!

যাই হোক, কালিম্পং শহরে ঢুকে রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে আমরা মর্গান হাউসের দিকে এগিয়ে চললাম। যাকেই জিজ্ঞেস করি, সে বলে আরো সামনে যেতে হবে। সে এক মজার ব্যাপার। আমরা পাহাড়ের ওপরে উঠেই চলেছি কিন্তু মর্গান হাউস আর আসে না। যাকেই জিজ্ঞেস করি সে মাথা নেড়ে বলে, “আগে”। এইভাবে দোনামোনা করতে করতে এগোতে এগোতে দেখি আমাদের গাড়ী প্রায় একটা মিলিটারি ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে। ততক্ষণে আমি ধরেই নিয়েছি যে, কোন অজ্ঞাত কারণে কালিম্পঙের জনগণ আমাদের সঙ্গে খিল্লি করে আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় পাঠিয়ে দিয়েছে! কিন্তু ঐ মিলিটারি ক্যাম্পের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোককে আমতা আমতা করে যেই বলেছি, “ইয়ে... মর্গান হাউস যানা থা...” ভদ্রলোক মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বাঁদিকে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন, “উধার চলে যাইয়ে!”
বোঝো কান্ড! সেই রাস্তা দিয়ে আরো মিনিট দুয়েক ওপরে ওঠার পর অবশেষে মর্গান হাউস খুঁজে পাওয়া গেল। ছবি দেখা ছিল তাই দূর থেকে দেখেই চিনে ফেললাম। বিকাশও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার আগে অবধি ও ভাবছিল, আমরা ভুল রাস্তায় এসেছি, আর ওকে এখন আমাদের ওর গাড়ী করে নিয়ে ঠিক হোটেল খুঁজে বের করতে হবে!
অত কষ্ট করে খুঁজে পেতে হলেও মর্গান হাউসের সামনে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। চমৎকার দেখতে, পুরনো ধাঁচের বাড়ী, তার চারদিকে বাগান, শুধু তাই নয় সামনের বারান্দার নীচেই সারি দিয়ে রাখা টবে ফুলগাছ। এমনকি বাড়ীটার বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারও বাইরের দেওয়াল বেয়ে গাছের শিকড় নেমেছে। কিন্তু সেটা পুরোটাই বাড়ীটার সৌন্দর্যের একটা অংশ, বাড়ীটা ভাঙ্গাচোরা মোটেই নয়।
বিকাশ আমাদের মালপত্র নামিয়ে দিয়ে, টাকা-পয়সা নিয়ে ‘টা টা’ বলে ফিরে গেল দার্জিলিং। আমরা চেক ইন করেই হোটেলে কথা বলে কালিম্পং ঘোরার জন্য একটা গাড়ীর ব্যবস্থা করে ফেললাম। কথা হল গাড়ী আসবে ঠিক পনেরো মিনিট পর। আমরা ততক্ষণে ঘরে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নেব। আর ঠিক এই সময়ে, মাঝ দুপুরে আমরা ভূতের খপ্পরে পড়লাম!!

গাড়ী আসার তাড়া ছিল। পিউ যথারীতি তার মধ্যেও ল্যাধ্‌ খাচ্ছিল, সুতরাং আমিই আগে বাথরুমে গেলাম ফ্রেস হওয়ার জন্য। হাত-মুখ ধুয়ে-টুয়ে বেরিয়ে দেখি, পিউ ঘরের মধ্যে এক জায়গায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ গম্ভীর, কপালে ভ্রূকুটি, আমাকে দেখে বলল, “এই, একটা খট্‌ খট্‌ করে আওয়াজ হচ্ছে মাঝে মাঝে!”
বুঝলাম পিউয়ের কল্পনায় মিসেস মর্গানের ভূত হাই হিল জুতো পরে হাঁটতে বেরিয়ে আওয়াজ করছেন। পিউয়ের আরো নাকি মনে হয়েছিল যে, ও যখন ঘরের পুরনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিল তখনই আওয়াজটা প্রথম হয়। মানে মিসেস মর্গানের ভূতের বোধহয় পছন্দ নয় পিউ ওনার ড্রেসিং টেবিল ব্যবহার করে। মনে মনে একমত হতেই হল, হাজার হোক, ভূত বা পেত্নি যাই হোন না কেন মিসেস মর্গান তো মহিলাই বটে! এইসবের মাঝেখানেই আমি শুনতে পেলাম ‘খট্‌’ আওয়াজটা। পিউ চোখ বড় বড় করে বলল, “শুনলে?”
নিজের কানে শোনা শব্দকে অস্বীকার করি কী করে? বলতেই হল যে, শুনেছি। তারপর সেই শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়েই পেয়ে গেলাম... কী আবার? রুম হিটার!!
আরে হয়েছে কী, পুরনো দিনের বাংলোর রুম হিটারও পুরনো দিনের, সেটা আমাদের বেয়ারা, আমাদের ঘরে রেখে চালিয়ে দিয়ে গেছিল। সেই হিটার যখন মাঝে মাঝে গরম হয়ে যাচ্ছে, তখন সেটা নিজে থেকেই আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং আবার একটু পরে চালু হয়ে যাচ্ছে। আর ওই চালু-বন্ধের চক্করেই ঐ ‘খট্‌ খট্‌’ শব্দের উৎপত্তি! ভূতের রহস্য সেই যে সমাধান হয়ে গেল তারপর রাতের দিকে হোটেলের বাইরে ঘোরাঘুরি করেও ভূতের নামগন্ধ পর্যন্ত দেখা গেল না। পিউ পরে বলেছিল যে, ঐ খট্‌ শব্দটা যদি শুধু ও শুনত আর আমি শুনতে পেতাম না, তাহলে নাকি ঐ ঘর তো বটেই এমনকি ঐ হোটেল ছেড়েই নাকি ও চলে যেত।

তার আগে তো আমরা সাঙ্গের গাড়ী করে কালিম্পং ঘুরতে বেরোলাম। হ্যাঁ, আমাদের গাড়ীর চালক ভদ্রলোক তাঁর নাম ‘সাঙ্গে’ ই বলেছিলেন, অন্তত আমি সেটাই শুনতে পেয়েছিলাম। কালিম্পঙে মোটামুটি নটা দেখার জায়গা আছে। তার মধ্যে মন্দির, মনস্ট্রি, স্ট্যাচু, নার্সারি, কলোনিয়াল বাড়িঘর, প্রকৃতি... কোন কিছুই বাদ নেই!

সাঙ্গের সঙ্গী হয়ে আমরা প্রথমে গেলাম দুরপিন ডেরা মনস্ট্রি। পাহাড়ের আরো ওপরে সুসজ্জিত একটা বৌদ্ধ মঠ। যখন গেলাম, তখন প্রধান মন্দির বন্ধ থাকলেও চারপাশ ঘুরে দেখায় কোন বাধা নিষেধ নেই। এমনকি মঠের তিনতলাতেও উঠে গেলেও কেউ কিছু বলছে। অন্য যেকোন বৌদ্ধ মঠের মত এই মঠের রঙও উজ্জ্বল। আর ওপর থেকেই দেখা যায় পাশের মিলিটারি স্কুলের মাঠ, চারপাশের পাহাড় এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। খুব ভালো লেগেছিল ঐ দুরপিন ডেরা। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম পাইন ভিউ নার্সারি। কালিম্পঙে এরকম নার্সারি অনেকগুলোই আছে কিন্তু পাইন ভিউয়ের বৈশিষ্ট্য হল এখানকার ক্যাকটাস। এত বিভিন্ন রকমের ক্যাকটাস আর অন্য কোন নার্সারিতে নাকি নেই। অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের মত আমরাও দশ টাকার টিকিট কেটে ঘুরে এলাম, ভালোই লাগলো।
সেখানে থেকে বেরিয়ে একটা মন্দিরে ছোট্ট করে দর্শন সেরে আমরা চলে এলাম ডেলো পাহাড়ে। এখন ব্যাপারটা হল, ডেলো পাহাড়ের ডাকবাংলো যে গত কয়েক মাস ধরে সব খবরের কাগজের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে সেটা আমাদের ঠিক মনে ছিল না। নাহলে সেটাও নাহয় দর্শন করা যেত। আপাতত আমাদের গাড়ী ডেলো পাহাড়ের ওপরের একটা পার্কের সামনে আমাদের নামিয়ে দিল। ততক্ষণে প্রায় চারটে বেজে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছিল। সেই কনকনে ঠাণ্ডায় পিউ তো হাত-পা-দাঁত কেঁপে অস্থির। আমিও সেরকম জুত পাচ্ছিলাম না। সুতরাং মিনিট দশেক ঘুরে, ছবি-টবি তুলে, ফুচকা আর বাদাম ভাজা খেয়ে আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম।
সেখান থেকে বেরিয়ে সাঙ্গে আমাদের পরপর তিনটে বিশাল মূর্তি দেখাতে নিয়ে গেল। দুটো বুদ্ধ মূর্তি, আর একটা হনুমানের। আর সঙ্গে একটা দুর্গা মন্দিরেও নিয়ে গেছিল, কিন্তু সেটা ছিল বন্ধ। সব দেখে যখন মর্গান হাউসে ফিরলাম তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ঠাণ্ডাও সেরকমই জমাটি।

গরম গরম কফি, ভেজ পাকোড়া আর এগ পাকোড়া খেতে খেতে সান্ধ্য আড্ডা চলল আমার আর পিউয়ের। মধ্যে অবশ্য সামান্য টেনশন হয়েছিল। কারণটা ছিল আমাদের বাকি ট্রিপের গাড়ী। আসলে, পরদিন সকালে কালিম্পং থেকে বাকি ট্রিপ মানে লাভা, লোলেগাঁও, গরুমারা আর জলদাপাড়ার জন্য আমাদের একটা গাড়ী ঠিক করা ছিল। কিন্তু সারা সন্ধ্যে চেষ্টা করেও তার মালিকের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনি। মনে মনে ঠিক করেই ফেলেছিলাম যে, গাড়ি থেকে ফোন না এলে কাল সকালে আবার রিসেপশনে কথা বলে এই সাঙ্গের গাড়ী নিয়েই লাভা চলে যাবো। যাই হোক, রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ গাড়ীর মালিকের ফোন এসে গেল। জানিয়ে দিলেন কাল সকাল নটার মধ্যে ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে মর্গান হাউসে উপস্থিত থাকবে।
রাত্তিরে চাঞ্চল্যকর কিছুই ঘটল না। মিসেস মর্গানও এলেন না আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। বরং টিভিতে ‘বিগ বস’ আর ম্যান ইউনাইটেডের খেলার মধ্যে কোনটা দেখা হবে সেই নিয়ে তর্ক করতে করতেই পিউ ঘুমিয়ে পড়ল। তার আগে অবশ্যই পেট পুরে ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন আর ক্যারামেল কাস্টার্ড দিয়ে নৈশাহার হয়ে গেছিল।

পরের গন্তব্য লাভা, ভুটানি ভাষায় যার মানে, ‘Heavenly abode of the Gods’, মানে আমার সঙ্গী গাইডবুকটি অন্তত তাই বলছিল!
(চলবে)

                                                                                                                                                   

Saturday, January 10, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৩

(আগে যা ঘটেছে)

মিরিক-পশুপতি নগর
"লে লে বাবু ছে আনা"

পঁচিশে বৈশাখের মত পঁচিশে ডিসেম্বর তারিখটাও সারা বছর মনে থাক। বড়দিন বলে কথা! ২০১৪-র পঁচিশে ডিসেম্বর শুরু হল একদম সকাল সকাল কনকনে ঠান্ডার মধ্যেঅত ঠান্ডার মধ্যেও লেপ মুড়ি দিয়ে বিছানার ওম পোহাবার উপায় নেই। সকাল নটার মধ্যে বিকাশের গাড়ী নিয়ে হাজির হওয়ার কথা। সে তো টাইম মত এসে পড়তে চাইলেও আমাদের ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি খতম করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়তে বেজে গেল প্রায় দশটা
দার্জিলিং থেকে ঘুম স্টেশন অবধি গিয়ে তারপর আমাদের গাড়ী ডানদিকের রাস্তা ধরল। ওখান থেকে মিরিক অবধি রাস্তাটা সত্যিই খুব সুন্দর। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে এগিয়ে চলেছে। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। রাস্তার দুপাশে উঁচু উঁচু পাইন, বার্চ আর ওক গাছের সারি। রাস্তার বেশীরভাগ অংশই ছায়ায় ঢাকা, আবছা আবছা আবার কোথাও কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। হয়তো কুয়াশার মধ্যে এই রাস্তার সৌন্দর্য একটা অন্যধরণের রূপ নেয়। সে সৌন্দর্য আমাদের দেখা হয়নি আর তার জন্য আমাদের যে খুব আপশোস আছে তাও নয়। এত সুন্দর আবহাওয়ার জন্যেই তো রোজ নিয়ম করে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছি। কুয়াশা হলে তো সেটা পুরো মাটি।
ছোটখাট পাহাড়ি জনবসতি পার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। রাস্তার দু ধারে হয়তো ছ-সাতটা বাড়ি, কাঠের দেওয়াল, টিনের ছাদ, সামনের বারান্দায় সারি দিয়ে রাখা টবের গাছে ফুল ফুটে উজ্জ্বল হয়ে আছে।  সেগুলোর মধ্যেই হয়তো দু-তিনটে মনিহারি দোকান, চাল-ডাল-আটার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে ঝুলছে ল্যেজ-এর প্যাকেট, সাজিয়ে রাখা আছে পেপসি-কোকোকোলার বোতল, মার্কিনী ব্যবসায়িক প্রচারের নিদর্শন। কোথাও কোথাও দোকানের সামনে টেবিল পেতে সাজিয়ে রাখা আছে মোমো, চাটনি আর স্যুপের পাত্র। বাকি বাড়িঘর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।

ঘন্টা খানেক এইভাবে চলার পর আমরা একটা বেশ ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেটাও একটা ছোট বসতি, রাস্তার দুদিকে ঘরবাড়ি। আমাদের ড্রাইভার বিকাশ জানালো যে এই জায়গার নাম ‘সীমানা’। যে রাস্তায় আমরা চলেছি সেটা আসলে ভারত-নেপাল সীমান্ত। ঐ রাস্তার ডানদিকটা নেপাল আর বাঁদিকটা ভারত। বাঁদিকে কোন রকম গন্ডগোল হলে আসবে দার্জিলিং পুলিশ কিন্তু ডানদিকে কিছু হলে তার দায়িত্ব নেপাল পুলিশের। ভাবা যায়! এখানে ডানদিকের বাড়ির কোন মেয়ের সঙ্গে বাঁদিকের বাড়ির কোন ছেলের বিয়ে হলে কি রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশ আসার জন্য তার দেশ বদলে যাবে। এইসব নিয়ে বকতে বকতেই আমরা এসে  পড়লাম একটা বেশ জমজমাট জায়গায়। কিছুই না, একটা ছোট্ট খোলা জায়গা, সামনের দিকে ঢালু জমি নেমে গেছে, ইংরেজিতে যাকে ‘cliff’ বলেসেখানে বেশ কয়েকজন পুরুষ-মহিলা ছোট ছোট দোকানে চা-অমলেট, বিদেশী চকোলেট-বিস্কুট-চুইংগাম বিক্রি করছেন। এমনকি একটা অপেক্ষাকৃত বড় দোকানে উপহার সামগ্রী, উলের সোয়েটার-গ্লাভস্‌, টুপি আর স্কার্ফ বিক্রি হতেও দেখলাম। আর আমাদের দেখে তাঁদের কি ডাকাডাকি। আরো অনেকের মত আমরাও সেখানে একটা ছোট ব্রেক নিলাম।
ওখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ একটা ভিউ পাওয়া যায়, শুধু তাই নয় নেপালের বেশ কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল সেখান থেকে। ছবি তোলা তো হলই, সঙ্গে চা খাওয়া হল, চকোলেট কেনা হল, এমনকি ঐ উলের জিনিসের দোকানেও কেনাকাটা হল। আগের দিন ফেরার সময় আমি আমার ডানহাতের গ্লাভস্‌টা হারিয়েছিলাম। ঐ ঠাণ্ডায় শুধু এক হাতে গ্লাভস্‌ পড়ে চলে না। তাই নতুন গ্লাভস্‌ কেনা হল, তার সঙ্গে কিনে ফেললাম ব্রাজিল লেখা, লোগো আঁকা হলুদ-সবুজ স্কার্ফ। খারাপ স্মৃতিটাকে ভুলেই তো এগিয়ে যেতে হবে, তাই না। মিনিট কুড়ি বিরতি নিয়ে আবার গাড়ী চলল, এবার গন্তব্য মিরিক।
বারোটা নাগাদ মিরিক পৌঁছে ওখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য সুমেন্দু লেকের পার্কিং লটে আমাদের গাড়ী থেকে নামিয়ে বিকাশ একটা মস্ত হাই তুলে বলল, “যান, ঘন্টা খানেক ঘুরে আসুন। আমি এখানেই আছি।”
মিরিকের লেকটা মস্ত বড়, অনেকটা সেই উটির লেকের মতই। অবশ্যই অত ঘিঞ্জি নয়, তাহলেও লোক আছে, বোটিং করার ব্যবস্থা আছে, সাজানো পার্ক আছে, লোকের বসার ব্যবস্থাও করা আছে। লেকের ওপর কাঠের ব্রিজ, সেটা দিয়ে অপরদিকে গেলে সেখানে পাইন গাছের বন। তার মধ্যে পায়ে হেঁটে ঘোরা যায় আবার টাট্টু ঘোড়ার পিঠে চড়েও ঘোরা যায়। আমাদের ব্রিজের ওপরেই এক ঘোড়াওয়ালা ধরল, সে আমাদের ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি করতে চায়। কিন্তু সে চাইলেই তো আর করছি না! সত্যি কথা বলতে কী গত কয়েক বছরে আমার ওজন যে পরিমাণে বেড়েছে তাতে হাতি বা ডাইনোসর ছাড়া আর কারোর পক্ষেই আমাকে তোলা খুব একটা সহজ কাজ নয়। এমনকি কলকাতার রাস্তায় বেশ কিছু রিকশাওয়ালা আজকাল আমাকে আর পিউকে একসঙ্গে নিতে রাজী হয় না! এইসব ভেবেই আমি বেচারা টাট্টু ঘোড়ার ওপর এই বিষম ভার চাপাতে রাজী হলাম না। পিউয়ের হাতেও আগেরদিনের পরে যাওয়ার ব্যাথা ছিল। তাই সেও কাটিয়ে দিল, যদিও এখন মনে হচ্ছে পড়ে যাওয়ার ভয়ও পেয়ে থাকতে পারে (এটা বেশ ভয় ভয়েই লিখলাম, আশা করি ভদ্রমহিলার চোখ এড়িয়ে যাবে)!
ঘোড়া চড়ার বদলে আমরা পায়ে হেঁটেই ঘুরলাম। দার্জিলিং-এর কনকনে ঠাণ্ডার পর মিরিকের মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগছিল। ওখানেও ছোটখাট দোকানের অভাব ছিল না। আমরা প্রথমে হামলা করলাম খাবারের দোকানগুলোতে। পিউয়ের দাবী মত পেট পুরে ফুচকা খাওয়া হল সেই সঙ্গে পাপড়ি চাট আর ঘুগনি। তারপর এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন হাঁটা, লোক দেখা, ছবি তোলা... কোন চাপ নেই, তাড়া নেই, দিব্যি লাগছিল। একটু সময় করে ধারের ছোট ছোট উপহারের দোকানগুলোয় ঢুঁ মারলাম, দরাদরিও করলাম। যদিও কিনলাম না কিছুই কিন্তু দেখলাম অনেক কিছু, সোয়েটার, টুপি, স্কার্ফ, চাবির রিং, খেলনা, কাপ, ঘর সাজানোর জন্য শৌখিন জিনিসপত্র।
বেরোবার আগে ঠিক করলাম ওখানেই ভালো করে পেট ভরে খেয়ে নেব। সেইমত দু প্লেট চিকেন মোমো অর্ডার দেওয়া হল। মোমগুলো সত্যিই বড় ভালো ছিল, কলকাতার যেকোন মোমোর তুলনায় সে মোমো অনেক বেশী সুস্বাদু। সুতরাং দু প্লেটের পর আরো এক প্লেট আমরা সহজেই গলাধঃকরণ করে ফেললাম। ভরপেট, খুশী মনে আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম আমরা।
আমাদের ফেরার পথের প্রধান আকর্ষণ ছিল ভারত-নেপাল সীমান্তে পশুপতি নগর মার্কেট। আগেই শুনেছিলাম যে নেপালের সীমান্ত থেকে দু-তিন কিলোমিটার ভিতরে এই বাজার অঞ্চলে অত্যন্ত সস্তায় জ্যাকেট, জুতো এবং কসমেটিকস সামগ্রী পাওয়া যায়। আমরাও ঠিক করলাম ঘুরে দেখে আসব একবার। সীমান্তে চেকপোস্টে নাম লিখিয়ে, প্যান কার্ড দেখিয়ে ঢুকে পড়লাম আমরা। জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম যে সিগারেট এবং অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোন কিছু আনার ব্যাপারেই কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
 স্বাভাবিকভাবেই বিকাশের গাড়ী নেপালে চলবে না তাই ওখান থেকে অন্য একটা মারুতি ভ্যানে করে পাঁচ মিনিট যেতেই সেই মার্কেট এসে হাজির। মোটামুটি এক কিলোমিটারেরও কম একটা রাস্তা, রাস্তার দুধারে পর পর জ্যাকেট আর কসমেটিক্সের দোকান। এমনকি অনেক দোকানে জ্যাকেট আর কসমেটিক্স একসঙ্গেই বিক্রি হচ্ছে।
পিউয়ের জ্যাকেট কেনার ইচ্ছে ছিল তাই অনেকগুলো দোকান ঘুরে প্রচুর দরাদরি করে দুটো জ্যাকেট কেনাও হল। এখানে কেনাকাটা করতে হলে যেটা মনে রাখবেন তা হল দোকানীরা যা দাম বলবে তার মোটামুটি ৩০% দাম থেকে দরাদরি শুরু করবেন এবং কয়েকটা দোকানে হতাশ হয়ে ফিরলেও শেষ অবধি এমন দোকানও পাবেন যেখানে ঐ একই জিনিস দোকানী প্রথমে যা চেয়েছিলেন (যেটা এমনিতেই কলকাতায় ঐ জিনিসের যা দাম তার থেকে ৩০-৪০% কম) শেষ পর্যন্ত তার অর্দ্ধেকেরও কম দামে জিনিসটি দিতে রাজী হয়ে যাবেন। পিউয়ের জ্যাকেট আর আমার পারফিউম কিনে সেটাই আমাদের অভিজ্ঞতা। কেনাকাটার পর আবার মারুতি ভ্যানে করে ফিরে যখন সীমান্ত পেরোচ্ছি তখন আমাদের ব্যাগ চেক তো দূরের কথা বুথের পুলিশগুলো একটা প্রশ্ন অবধি জিজ্ঞেস করেনি।
ফেরার রাস্তায় আমরা গল্প জুড়লাম বিকাশের সঙ্গে। ওর বাড়ীর গল্প, আর কে কে আছে, কবে থেকে ও গাড়ী চালাচ্ছে, গাড়ী চালিয়ে কত টাকা পায়, কোথায় কোথায় ঘোরে সেই নিয়ে প্রাণখোলা আড্ডা। ছেলেটা ভালো ছিল, মিশুকেও। গল্প করতে করতেই জানালো যে মাঝে মাঝে ও কলকাতায় গিয়ে গাড়ী চালাবার প্রস্তাব পায় কিন্তু যেতে চায় না। পাহাড়ের ছেলের কলকাতা শহরের প্রতি লোভ নেই, বরং কলকাতার গরম ওর ভালো লাগে না। আমরাও ওকে বারণ করলাম কলকাতা যেতে। দিব্যি আছে সহজ সরল পাহাড়ি ছেলে, শুধু শুধু কলকাতার বদমাইশ লোকেদের মধ্যে যাওয়ার দরকার কী ওর! সেটাই বললাম ওকে।

এই প্রসঙ্গে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেনের ব্যাপারটা লিখে রাখি। এমনিতে আমরা যখন গেছিলাম তখন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেন বন্ধ ছিল। যদিও কেউ একজন আমাদের বলল যে ঐ লাইন নাকি বড়দিনের পর চালু হবে, কিন্তু সেটা চালু হয়েছে কিনা জানি না। এখন টয়ট্রেন শুধু চলে ঘুম স্টেশন থেকে দার্জিলিং স্টেশন অবধি। দিনের মধ্যে চারবার স্টিম ইঞ্জিনে টানা ট্রেন আর অনেকবার ডিজেল ইঞ্জিনের টানা ট্রেনে। রাস্তার ধার দিয়ে পাতা সেই ট্রেন লাইন। ট্রেনও চলে রাস্তার গাড়ীগুলোর পাশ দিয়ে এবং সত্যি বলতে দেখে খুব ইন্টারেস্টিং লাগেনি। তা সত্ত্বেও প্রচুর চাহিদা এবং স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেনের টিকিট দু মাস আগে থেকে কেটে রাখতে হয় নাহলে ব্ল্যাকে কাটতে হয়! এইসব দেখেই আমরা আমাদের টয়ট্রেন ভ্রমণের প্ল্যান বাতিল করে দিয়েছিলাম। বিকাশও আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থনই করল, মাঝে তো একবার বলল, “আরে এই একই রাস্তা দিয়ে তো ট্রেন যাবে, ভেবে নিন না যে ট্রেনেই আছেন!” বলে নিজেই মুখে “কূঊঊঊঊঊ...” শব্দ করে বলল, “এই যে সিটিও দিয়ে দিলাম!”
বিকাশ যখন আমাদের হোটেলের সামনে নামালো তখন অন্ধকার নামছে পাহাড়ের গায়ে। সেদিনকার মত হিসেব মিটিয়ে বিকাশ চলে গেল বাড়ী। ভালো করে দেখে নিলাম গাড়ীর মধ্যে কিছু পড়ে রইল কিনা। যদিও কাল সকালে সে আবার আসবে আমাদের কালিম্পং নিয়ে যাওয়ার জন্য।

প্রথমে ভেবেছিলাম ম্যালে একবার যাব কিন্তু সারাদিনের ঘোরার ক্লান্তি আর ঐ প্রচণ্ড ঠান্ডার জন্য সে প্ল্যান বাতিল করলাম। হোটেলের ঘরেই রইলাম সন্ধ্যেটা, টিভি দেখলাম, বই পড়লাম, থুকপা দিয়ে ডিনারও হল। সময় করে সুটকেসটাও গুছিয়ে নিলাম। নতুন জ্যাকেটগুলোর জন্য জায়গা বের করার দরকার ছিল, তাছাড়াও বাকি জামাকাপড়ও পুরে ফেললাম। আমাদের এবারের দার্জিলিং পর্বের আজকেই শেষ রাত্তির। আগেই লিখেছি কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ব কালিম্পঙয়ের জন্য। 

Wednesday, January 7, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ২


দার্জিলিং-২
দার্জিলিং জমজমাট

রক গার্ডেনের পর আমাদের গন্তব্য ছিল পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিকাল পার্ক এবং হিমালয়ান মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউট। একই ক্যাম্পাসের মধ্যে পাশাপাশি এই চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম এবং সেই সঙ্গে পর্বতারোহণ শেখার স্কুল। চিড়িয়াখানাটা সত্যিই ভাল, বিভিন্ন পাহাড়ি ছাগল, হরিণ, ইয়াক, ভাল্লুক, বিভিন্ন ধরনের লেপার্ড, বাঘ এবং অবশ্যই বিরল প্রজাতির লাল পান্ডা এবং নানা ধরনের পাখী এই চিড়িয়াখানার বাসিন্দা। তাদের এবং তাদের সঙ্গে আমাদেরও প্রচুর ছবি তোলা হল।
এভারেস্ট মিউজিয়ামটাও বেশ ভাল, যত্নের ছাপ সর্বত্র। তেনজিং নোরগে ও অন্যান্য পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত পোশাক, সরঞ্জাম, গাঁইতি, তাঁবু এসব দেখার মধ্যে সত্যিই একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে আছে হিমালয়ের বিভিন্ন মডেল ছাড়াও পাহাড়ের বুকে পাওয়া বিভিন্ন পাখী, সাপ ও অন্যান্য মৃত জন্তুদের স্টাফড দেহ।
তবে শুধু জন্তু জানোয়ার নয় ওখানে গিয়েই আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মানুষটির সঙ্গে। তাঁর নাম রূপেন। পাহাড়ি লোকটি ছিলেন চিড়িয়াখানা এবং মিউজিয়ামে আমাদের গাইড। বেশ জ্ঞানী এবং মিশুকে লোক এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই ফটো তলায় তাঁর খুব উৎসাহ। মাঝে মাঝে তিনি আমার ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে আমার এবং পিউয়ের বেশ কিছু ন্যাচারাল ছবি এবং পশুপাখীদের ছবি তুলে ফেলেছিলেন। এরপর মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউটের কাছে এসে তিনি একটু বেশীই উৎসাহিত হয়ে পড়েন। দেওয়ালে করা পর্বতারোহণের একটি মুরালের সামনে তিনি আমার আর পিউয়ের নীচের ছবিটি তোলেন এবং তারপর মন্তব্য করেন, “এই দেখুন, তেনজিং নোরগে ছন্দা গায়েনকে পাহাড়ে উঠতে হেল্প করছেন!”

এর কিছুটা পর হঠাৎ একটা গাছের সামনে এসে ভদ্রলোক দাবী করলেন যে, আমাকে ঐ গাছটায় উঠতে হবে এবং তিনি সেটার ছবি তুলবেন। অনেক বুঝিয়েও যখন তাঁকে নিরস্ত করা গেল না তখন বাধ্য হয়েই দুরু দুরু বক্ষে আমাকে সেই শ্যাওলাধরা গাছে উঠতে হল এবং সেই প্রচণ্ড নার্ভাসনেসকে ঢেকে দেওয়ার জন্য মুখে একটা বীরের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হল আর ভদ্রলোক পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললেন।
মিউজিয়াম দেখে আমরা যখন আবার চিড়িয়াখানা ফিরে এলাম ততক্ষণে আমি আমার ক্যামেরার ওপর থেকে আমার সমস্ত দাবী প্রত্যাহার করে নিয়েছি। সেটা রূপেনের কাছেই আছে এবং সেই দিয়ে তিনি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, লেপার্ডের খাঁচায় প্রায় ঢুকে পড়ে আমাকে ছবি তুলে এনে দিচ্ছেন।
তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রানিং কমেন্ট্রি চলছে অবশ্য, যেমন বাঘের খাঁচায় দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রারত বাঘটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, “ইসকা নাম হ্যায় সৌরভ গাঙ্গুলী, বেঙ্গল টাইগার!”
ভদ্রলোক বোধহয় ‘গুণ্ডা’ দেখেননি নাহলে জানতেন যে পৃথিবীতে বেঙ্গল টাইগার বলতে মিঠুনদাকেও ডাকা হয়!
ভাল্লুকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে ছবিও হল রূপেনের খেয়ালে। তবে রূপেন সবচেয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল লাল পান্ডার ছবি তুলতে গিয়ে। লাল পান্ডা বিরল প্রাজাতির অত্যন্ত অলস একটি প্রানী। আমরা যেটিকে দেখেছিলাম সেটি একটি গাছের ডালে বসে ছিল। আমরা যখন তার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম তখন সে মুখ তুলে আমাদের দেখছিল কিন্তু তারপর বোধহয় সে বোর হয়ে গিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়েই পড়লমাঝে আমাদের দেখে একবার মাথা তুলেছিল কিন্তু ওইটুকুই। তাও পরে হোটেলে ফিরে দেখলাম রূপেন ঐ লাল পান্ডাটির পনেরো খানা ছবি তুলেছে যার অন্তত বারোটা ছবির ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই!

কিন্তু এসব সত্ত্বেও বলতেই হবে যে রূপেন দেখিয়েছিল খুব ভালো করে, আর আপনারা ওখানে গেলে ওকে গাইড নিলে খুব একটা ঠকবেন না।
চিড়িয়াখানা থেকে আমরা গেলাম একটা চা-বাগানে যেটার নাম আমার মনে নেই। তবে সেখানে থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম, তার সঙ্গে লেবং রেসকোর্সেরও ছবি তোলা হল। চা বাগানের লাগোয়া দোকানে চা খাওয়া হল সঙ্গে ঐ বাগানের চা-পাতা কেনাও হল। ভালোই!
সেখান থেকে আমরা গেলাম শহরের আর-এক চত্বরে জাপানী মন্দির আর পিস্‌ প্যাগোডা দেখতে। রাস্তায় আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার বিকাশ সেন্ট পলস্‌ স্কুল দেখিয়ে দিল যেখানে ‘ম্যায় হুঁ না’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল! শান্তি স্তুপ দেখে ভালই লাগলো যদিও ঐ ধরণের স্তুপ আমি আগে রাজগীরেও দেখেছি। তবে স্তুপের দেওয়ালের কিছু কিছু কাজ সত্যিই বেশ ভালো এবং যথারীতি ঐ স্তুপের ওপরে উঠলেও দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
শান্তি স্তুপ ছিল সেদিনকার মত শেষ ঘোরার জায়গা। তারপর বিকাশ আমাদের দার্জিলিং চৌরাস্তায় ঠিক কেভেনটার্সের সামনে নামিয়ে দিয়ে, “কাল আবার দেখা হবে বলে” কেটে পড়ল। বিকাশকে আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেছিল তাই পরের দিন ওর গাড়ীতেই মিরিক যাওয়া হবে বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম।
সারাদিন ঘুরে খিদে তো পেয়েইছিল তাছাড়াও আমাদের দুজনের জন্যেই কেভেনটার্স ছিল অবশ্য দ্রাষ্টব্যএকদিকে আমি ভাবছি ওখানে ফেলুদা সেই কোন ছোট্টবেলায় তোপসেকে নিয়ে গেছিল আর অন্যদিকে পিউ ভাবছে ওখানেই রণবীর কাপুর থুড়ি বরফি শ্রুতিকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। পিউ এটাও আশা করেছিল যে ওর জন্যও কেউ ক্লক টাওয়ারে চড়ে হাত-পা নাড়বে তবে আমি অবশ্যই সে রিস্ক নিইনি। অত পুরনো ক্লক টাওয়ার, ধসে গেলে দেখবে কে!
কেভেন্টার্সে গিয়ে আমার ক্যামেরা হারাল। মানে হঠাৎ দেখলাম আমার সঙ্গের ব্যাগে আমার ক্যামেরা নেই। খাওয়া মাথায় উঠল! ব্যাগের সব জিনিস বের করে বার দুয়েক ঘেঁটেও যখন পাওয়া গেল না তখন বিকাশকে ফোন করা হল, তার গাড়ীতে পড়ে আছে কিনা জানার জন্য। সেও ‘দেখে দু মিনিট পর ফোন করছি’ বলে ফোনটা দিল কেটে। সে এক অসহ্য দু মিনিট! যাই হোক দ্বিতীয়বার তাকে ফোন করে জানা গেল যে ক্যামেরা তার গাড়ীতেই আছে এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে নিজে কেভেনটার্সের দোতলায় এসে ক্যামেরা দিয়ে গেল।
ক্যামেরা পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেল আমাদের। সকালের সেই ব্রেকফাস্টের পর থেকে কিছু না খেয়েই ঘুরছি। সুতরাং দু প্লেট চিকেন স্যান্ডুইচার সঙ্গে দু প্লেট অমলেট এবং বেকন অর্ডার হয়ে গেল প্রথমেই। সঙ্গে কফি। তারপর আরো দু প্লেট হ্যাম স্যান্ডউইচ খাওয়ার পর আমাদের আত্মা সন্তুষ্ট হল। খাওয়ার আসার ফাঁকে মনের সুখে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম। পিউ একগাদা সেলফি তুলল, পাশের টেবিলের একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে গল্প করল আর ওখানকার কর্মচারীদের মধ্যে কাকে কাকে বরফি সিনেমায় দেখিয়েছে সেই নিয়ে গবেষণা করল।
আধ ঘন্টা পরে যখন আমরা কেভেন্টার্স থেকে মৌরি চিবোতে চিবোতে বেরোলাম তখন আমাদের পেট ভর্তি, মন প্রসন্ন! অতঃপর শুরু হল দার্জিলিং-এর শেষ বিকেলের মিঠে রোদে আমাদের উদ্দেশ্যহীন পদচারণা।
এই দোকান, সেই দোকান... কোনটা কিউরিও শপ তো কোনটা কেকের দোকান, আর গরম কাপড়ের দোকান তো আছেই। ঘোরাই আসল, তার সঙ্গে যদি কোন জ্যাকেট পছন্দ হয় এবং পছন্দমত সস্তা দামে পাওয়া যায় তাহলে কেনেকাটাও হবে। জ্যাকেট যদিও হল না কিন্তু বেশ কয়েকটা কিউরিও শপ ঘুরে শেষ অবধি ‘নেপাল কিউরিও শপ’ (হুঁ হুঁ বাওয়া! ফেলুদা ওখানেই গেছিল) থেকে আমি আমার জন্য একটা ইয়াকের হার দিয়ে বানানো তিব্বতী ধাঁচের গনেশ, বন্ধু মৃন্ময়ের জন্য জপযন্ত্র (যার ভেতরে মন্ত্র লেখা কাগজ আছে কিনা দেখে নিয়েছিলাম), বাবার জন্য ছোট্ট ভোজালীর মত দেখতে পেপার নাইফ... এইসব কিনে ফেললাম। জিনিসপত্র কিনতে কিনতে এবং আরো অনেক রকমের ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ম্যালে।
দার্জিলিং-এর ম্যাল আমার খুব পছন্দ হয়েছে। সুন্দর ছড়ানো একটা জায়গা। একদিকে ক্রিসমাস উপলক্ষে বানানো একটা স্টেজের ওপর বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে, অন্যদিকে পরপর পুরনো পুরনো চায়ের দোকান। জায়গায় জায়গায় বেঞ্চ পাতা আছে যেখানে বসে আড্ডা মারা যায়। আবার চাইলে কোন চায়ের দোকানে ঢুকে পৃথিবীবিখ্যাত কোন চায়ের কাপে চুমুক মারাও যায়। ফেলুদা মকাইবাড়ির চা ফ্রি-তে পেত। আমরা না হয় পাই না কিন্তু তাই বলে খাব না তা কি হতে পারে! সুতরাং আমরা দুজনে গোল্ডেনটিপসে ঢুকে পড়ে দু কাপ মকাইবাড়ির চা অর্ডার দিয়ে দিলাম। একটু পরেই দুটো বেশ বড় কাপে প্রায় কমলা রঙের সেই মহার্ঘ্য পানীয় এল। আমরা দুজনে খেলাম এবং দুঃখের বিষয় তেমন কিছুই আলাদা করে বুঝলাম না! বেরসিক আর কাকে বলে!
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকেই ঠাণ্ডাটা বেশ তাড়াতাড়িই বাড়ছিল। সেই শীত উপেক্ষা করেই ঘুরছিলাম তবে সাড়ে ছটা নাগাদ রণে ভঙ্গ দিলাম। চৌরাস্তায় এসে একটা গাড়ি নিয়ে নিলাম আমাদের হোটেলে পৌঁছনোর জন্য। আমাদের হোটেল মানে পাহাড়ী সোলের ঘরোয়া ব্যবহার এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ ভিউয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান যে সমস্যাটি আছে সেটা হল হোটেলটা ম্যাল থেকে প্রায় পাঁচ-ছ কিলোমিটার দূরে। তাই রীতিমত ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে হোটেলে ফিরতে হল। হোটেলে ফিরে সোজা লেপের তলায়। তার আগে ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম, দু বাটি চিকেন থুকপা, আমার এবং পিউয়ের জন্য। ঐ কনকনে ঠান্ডার মধ্যে এর থেকে ভালো খাবার আর হয় না।
শুয়েও পড়লাম তাড়াতাড়ি। কাল পঁচিশে ডিসেম্বর, বড়দিন। দার্জিলিং দেখা শেষ তাই আমাদের কালকের প্ল্যান মিরিক যাওয়া আর সঙ্গে সামান্য বিদেশ ভ্রমণ, যদিও বিনা পাসপোর্টে!
(চলবে)