Tuesday, April 28, 2015

ভূমিকম্প

ফেসবুক প্রোফাইল – ১

জোকসটা পড়ে হাসতে হাসতে পেট ব্যাথা হয়ে গেল। এই তো ভূমিকম্পের একটু পরেই দেখলাম ফেসবুকে। হেব্বি জোক! রজনীকান্ত বলছে, “Sorry people! The earthquake happened because I just kept my phone in vibration mode!
হাসতে হাসতেই জোকসটা নিজের ওয়ালে কপি-পেস্ট করে দিলাম, সঙ্গে Feeling Excited!
পোস্ট করতে যাচ্ছি, দেখি অমিতদা পিং করছে। অমিতদা আমার অফিসের টিম লিড। সামলে চলি। সাবধানে লিখলাম,

-       হাই
-      তোমার নেপালে চেনা কেউ আছে?
-      না, মানে... any problem?
-      আমার মা-বাবা একটা ট্যুর গ্রুপের সঙ্গে নেপালে গেছে। লাস্ট এক ঘন্টা ধরে কোন কনটাক্ট করতে পারছি না... feeling very worried
-      ওহ্‌... না আমার তো সেরকম চেনা কেউ নেই...
-      ওকে... দেখো যদি কেউ চেনা থাকে, আমি তোমাকে আমার মা-বাবার নামটা বলে রাখছি... বাড়ির সবাই বড্ড টেন্সড্‌... কিছু লোক এই নিয়েও কী করে এত ইয়ার্কি মারছে কে জানে!
-      ঠিক বলেছেন... এত সিরিয়াস একটা ব্যাপার... আমি দেখছি অমিতদা... চিন্তা করবেন না...

স্ট্যাটাসটা উড়িয়ে দিলাম। ভাগ্যিস পোস্ট করিনি!
------------------XXXXXXXXXXXXXXXXXX----------------------------------


ফেসবুক প্রোফাইল – ২

খবরগুলো দেখার পর থেকে মন খারাপ হয়ে গেছে। কী বীভৎস ভূমিকম্প! কত কত লোক মারা গেছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে ডেডবডি বের করে আনছে পর পর। তাকিয়ে দেখা যায় না। ফেসবুকেও দেখছি আপডেট আসছে নানা রকমের। প্রার্থনা করছে সবাই নেপালের জন্য।
আরো কিছু লিঙ্ক আসছে দেখছি। সাহায্য করার জন্য... ডোনেশান পাঠানোর লিঙ্ক। আমিও এরকম দুটো লিঙ্ক শেয়ার করলাম আমার ওয়ালে। ভালো লাগল।

আরে, অফিসের পাপিয়া পিং করেছে! কী সৌভাগ্য! সব সময় তো আমিই পিং করে ভ্যাজ ভ্যাজ করি, আজকে আবার কী হল?

-      হাই... ঐ লেটেস্ট লিঙ্কটায় কি নেট ব্যাঙ্কিং করে টাকা পাঠানো যাচ্ছে?
-      না... মানে... আমি তো পাঠাইনি... ঠিক বলতে পারব না
-      তুমি কি অন্য কোন লিঙ্ক ইউজ করে ডোনেট করেছ?
-      ইয়ে... আমি শেয়ার করলাম... যাতে বাকিরা হেল্প করতে পারে...
-      আর তুমি?
-      আমি আর কতটা কী করতে পারব?
-      আমরা সবাই মিলেই তো সামান্য হলেও সাহায্য করতে পারি...
-     Be right back

অনেকক্ষণ ফেসবুক করছি, একটু টিভি দেখি। পরে অফলাইন হয়ে যাব।
------------------XXXXXXXXXXXXXXXXXX----------------------------------

ফেসবুক প্রোফাইল – ৩

অরিজিৎ পিং করে বলল, ‘শুনেছিস তো দুপুর তিনটের সময় আবার একটা ভূমিকম্প আসছে!’
‘তাই নাকি? তুই কদ্দিয়ে জানলি?’
‘কে একটা বলল... নিউজেও নাকি দেখিয়েছে... ইউ কে না ইউ এসের কোন একটা রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে বলেছে শুনলাম।’
‘ওহ্‌... তাহলে তো হবেই... এরা সব হাই ফাই মাল ইউজ করে ফোরকাস্ট করে... দাঁড়া ফেসবুকে শেয়ার করে দি...’
ফেসবুকে পোস্ট করে দিলাম, 
‘দুপুর তিনটের সময় আর একটা ভূমিকম্প আসছে। ওই সময় সাবধানে থাকুন। বাড়ির বাইরে থাকুন!’... Feeling worried!

ভালো ঘ্যাম নেওয়া গেল। সবাই এসব খবর পায় না। সোর্স থাকা চাই!

একটা কমেন্ট হয়েছে, নোটিফিকেশান এল। গিয়ে দেখি বাবার বন্ধু সুনীলকাকু কমেন্ট করেছে। যাব্বাবা! বুড়ো লিখেছে, ভূমিকম্প নাকি এভাবে আগে থেকে বলা যায় না। আমি নাকি গুজব রটাচ্ছি! কে রে ভাই! গুজব হলে গুজব... আমার ওয়াল... আমি বুঝব।

আপাতত চুপচাপ থাকি... পরে মালটাকে ব্লক করে দেব। দেখা হলে বলে দেব, ফেসবুকে আজকাল আর নেই কাকু! যত্তসব!

Sunday, April 26, 2015

পকেট সচেতন পর্যটক

আমার  সঙ্গে অজিত হালদার মহাশয়ের আলাপ হয় কণাদের সৌজন্যে। যদিও সঠিক ভাবে বলতে গেলে আমার আলাপ হয়েছে শুধুমাত্র ওনার লেখার সঙ্গে। কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এই ভ্রমণপিপাসু, মিশুকে, উৎসাহী কিন্তু হিসেবী, বয়স্ক মানুষটিকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
অবশ্য বয়স্কই বা বলি কী করে? যে মানুষটি এই বয়সেও ছয়-আট বিছানার ডর্মেটরিতে রাত কাটিয়ে, দুধ-পাউরুটি দিয়ে পেট ভরিয়ে, পদব্রজে বা ট্রেন-বাসে করে পৃথিবী বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত পর্যটক দ্রষ্টব্যগুলো ঘুরে বেড়ান তাঁকে কী বয়স্ক বলা চলে!
সে কথায় পরে আসব। আগে তাঁর বইয়ের কথা বা তাঁর নিজের কথা বলি। ড. অজিত হালদার একজন অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতির অধ্যাপক। দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্বভারতী এবং বর্দ্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের বিষয় নিয়ে পড়াশুনো-লেখালেখি ছাড়াও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা ভ্রমণ।
এখন কথা হল, ভ্রমণের নেশা অনেকের মধ্যেই থাকে। নতুন, নতুন দেশ দেখতে কারই না ভালো লাগে? কিন্তু সেই নেশাকে সর্বোচ্চ পর্যায় নিয়ে গিয়ে তার পরিপূর্ণতার জন্য কৃচ্ছসাধন করতে সবাই প্রস্তুত থাকে না। আর এখানেই অজিতবাবুর বিশেষত্ব। ওনার বইয়ের পেছনে লেখা ওনার পরিচিতিতে দেখতে পাচ্ছি যে, খুব অল্প বয়স থেকেই উনি সারা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন। মোটর সাইকেল নিয়ে ভারত পরিক্রমা করেছেন চারবার। হিমালয় থেকে থর মরুভূমি, চীন সীমান্ত থেকে আন্দামান, বাদ যায়নি কিছুই।

কিন্তু শুধু নিজের দেশেই নয়, অজিতবাবু পা বাড়িয়েছেন দেশের বাইরেও... এবং আজকের থেকে অনেকদিন আগেই। আজ তো নাহয় সস্তার বিমান কোম্পানিগুলোর দৌলতে ব্যাংকক-পাটায়া ভ্রমণ বাঙালীর স্ট্যাটস সিম্বলের অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু অজিতবাবু প্রথম ব্রিটেন গেছেন ১৯৮৭ সালে। শুধুই ঘুরতে। এর পরে আবার গেছেন দুবার।
কিন্তু শুধু ব্রিটেন কেন, আমেরিকা, কানাডা, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, মিশর, ইরান এমনকি লাটভিয়া বা আইসল্যান্ডের মত ইউরোপের ছোট্ট, দুর্গম দেশগুলোও বাদ পড়েনি ওনার ভ্রমণের আওতা থেকে। সব মিলিয়ে ঘুরেছেন প্রায় সত্তরটি দেশে। এশিয়া, ইউরোপ, দুই আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া... ছটি মহাদেশে পা ফেলেছেন তিনি।
আর এই দেশগুলোর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখেছেন তাঁর ভ্রমণ-গ্রন্থ, ‘বিশ্বভ্রমণ স্বল্পবিত্তে’। এই বইয়ের ছটি খন্ডের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ওনার ঘোরার গল্প। সে লেখায় যদি আপনি ঝঙ্কারময় বাংলা গদ্যের খোঁজ করেন তাহলে সে লেখা আপনার না পড়াই ভালো। কিন্তু হালকা, ঝরঝরে ভাষায় একটা দেশ ভ্রমণের দিন কয়েকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যদি আপনি সেই দেশের মানুষগুলোকে একটু হলেও চিনতে চান, সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনার ভালো লাগা উচিত। শুধু তাই নয়, নিজে যদি যেতে ইচ্ছে করে, তাহলেও ঠিক মত ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্যও এই বইগুলো দুর্দান্ত। কারণ অজিতবাবু নিজে অত্যন্ত বিবেচনা করে, সব দিক ভেবে ছক কষে পরিকল্পনা করে ঘুরেছেন। আর নিজের থাকা-খাওয়ার ক্ষেত্রে হিসেব করে চললেও ভ্রমণের ব্যাপারে খুব বেশী কার্পন্য উনি করেননি।
ওনার ঘোরার এই দিকটার কথা আগেই বলেছি। বইয়ের নামেও বোঝাই যাচ্ছে অজিতবাবু পয়সার দিকটা হিসেব করে ঘোরেন। তেমন কিছুই না, উনি ইউথ হোস্টেল অ্যাসোসিয়েশান অফ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং তার দৌলতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইউথ হোস্টেলে ঘর ভাড়ায় ছাড় পান। কিন্তু এর জন্য তাঁকে থাকতে হয় ডর্মেটরিতে আরও সাত-আট জন পর্যটকের সঙ্গে। সাধারণত একাই ঘোরেন এবং হোস্টেল থেকে শহরের মধ্যে দু-তিন কিলোমিটার অবধি দূরত্ব পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যান। তার বেশী দূরত্ব হলে বাসে ওঠেন। বিভিন্ন পর্যটন স্থানেও যান বাসে করে বা সারাদিনের ঘোরার প্রোগ্রামে নাম লিখিয়ে। ট্যাক্সি চড়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। রেস্টুরেন্টে খেতে যান না। নিজেই বাজার থেকে দুধ, সিরিয়াল, পাউরুটি, কলা বা বার্গার কিনে পেট ভরিয়ে নেন। কিছুই না, এইসব দিকে পয়সা বাঁচাতে পারলে সেই দিয়ে হয়তো আরও একটা নতুন দেশ ঘুরে আসবেন তিনি।
দু-একবার অবশ্য উনি ওনার স্ত্রীকে নিয়ে বা ছেলে-বউয়ের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছেন তবে সেগুলো তেমন জমেনি। সবদিক হিসেব করা না চলতে পারার হতাশার দিকটা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। এছাড়া কোন কোন জায়গায় তাঁর লেখা শুষ্ক বর্ণনায় ভরা। অন্যান্য লেখকদের তুলনায় সাহিত্যগুণ কম এবং ঘটনাবহুল নয়। সেটা সম্ভবত তাঁর নিয়মিত লেখার চর্চা না থাকার ফল।
অজিতবাবুর লেখার আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হল স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ওনার আলাপচারিতাযদিও অজিতবাবু একাই ঘোরেন কিন্তু যে দেশে যাচ্ছেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে ছাড়েন না। তাদের সঙ্গে সেই দেশ নিয়ে কথা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করেন। কখনো সে দেশের সুপার মার্কেটে গিয়ে চালের দাম দেখে বর্দ্ধমানের চালের দামের সঙ্গে তুলনা করেন, কখনো বা সেই দেশের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে ভারতের একজন অধ্যাপকের পারিশ্রমিকের তুলনা করে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করেন।
যারা ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন তাঁদের অবশ্যই উচিত অজিতবাবুর বইগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা। কিছুই না এই ভ্রমণ-প্রেমিক মানুষটির দেশভ্রমণের গল্পগুলো পড়লে নিজেদের ঘোরার ইচ্ছেগুলোও মনের গোপন থেকে বেরিয়ে এসে উঁকিঝুঁকি মারবে! তখন শুধু বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা!

Thursday, April 23, 2015

পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের উপকারিতা

এক কালে পাকিস্তান ক্রিকেট টিম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দলগুলোর মধ্যে ছিল। ছোটবেলায় রীতিমত ভয় পেতাম পাকিস্তান আর ওয়াসিম আক্রমকে। কিন্তু আজ তাদের সেই গৌরব আর নেই। আজকাল পাকিস্তান বড্ড উপকারী দল। সেই নিয়েই কয়েকটি কথা!

১. আপনি কি আপনার প্রিয় ভারতীয় বা অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়কে তাঁর অবসরের পর মিস্‌ করেন? কিন্তু আপনি কখনোই আপনার প্রিয় পাকিস্তানি খেলোয়াড়টিকে মিস্‌ করবেন না। এমনকি তিনি অবসর নেওয়ার পরেও না। কে বলতে পারে যে আগামী কালই তিনি তাঁর অবসর ভেঙ্গে ফিরে আসবেন না? তাঁর নাম আফ্রিদি হলে হয়তো আজকেও ফিরে আসতে পারেন!

২. দল হারলে কখনোই একা অধিনায়কের ওপর দায়িত্ব চাপাতে পারবেন না। দলে সব সময় চার-পাঁচ জন প্রাক্তন অধিনায়ক উপস্থিত থাকেন। তাই কেউ “ক্যাপ্টেনের জন্য দল হেরেছে” বললেই প্রশ্ন করুন, “কোন ক্যাপ্টেন?”

৩. ক্রিকেটের সঙ্গে সঙ্গে কুস্তি বা কিক্‌ বক্সিং খেলারও খোঁজ রাখুন। মাঝে মধ্যেই খেলোয়াড়রা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ঐসব খেলায় তাঁদের প্রতিভার পরিচয় দেবেন।

৪. আপনার ক্রিকেট টিম খেলায় জিততে পারে না? যেকোন ম্যাচ হেরে গেলেই বঞ্চনার নামে আইসিসি, সি কে নাইডু, বারাক ওবামা বা উইন্সটন চার্চিলকে দোষ দিয়ে ধিক্কার মিছিল করে চোখের জল ফেলেন? পাকিস্তান ক্রিকেট টিমকে ডেকে তাঁদের হারিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ান। আপনার ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং গড় আর বোলারদের বোলিং গড় অদলবদল হয়ে যাবে!

৫. পাকিস্তানের খেলা দেখুন আর শাহিদ আফ্রিদির দেখানো পথে বিকেলের হালকা ক্ষিদের মুখে ক্রিকেট বল বা অন্যান্য সরঞ্জাম কামড়ে খাবার আইডিয়া পান!

৬. অনিদ্রা রোগে ভুগছেন? যেকোন পাকিস্তানি অধিনায়কের প্রেস কনফারেন্সের ভিডিও ইউটিউব থেকে চালিয়ে দিন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘুম আপনার চোখের ডগায় এসে কিত্‌ কিত্‌ খেলবে।

৭. শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতির উত্তরণ দেখতে চান? পাকিস্তানের প্রাক্তন খেলোয়াড়দের ধারাবিবরণী শুনুন। যে ভদ্রলোক নিজে ১০০ বলে ৩০ রানের বেশী করতেন না তিনি আজকালকার ব্যাটসম্যানদের ১০ ওভারে ৮০ রান করতে না পারলে ধিক্কার দেন। যিনি রান আউট নিয়ে সবচেয়ে বেশী হাহাকার করেন তাঁর নিজের রান আউটের রেকর্ড আছে! লোকজন অকারণে মারতে গিয়ে আউট হলে শাহিদ আফ্রিদি সবচেয়ে বেশী হতাশ হন!

৮. আপনার চেনা পরিচিত কেউ কি নিজের কাজ বা পড়াশুনো নিয়ে হতোদ্যম? তাঁকে পাকিস্তান দলের ফিল্ডিং করার ভিডিও দেখিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়ান। ওই ফিল্ডিং করার পরেও যখন ওনারা ক্রিকেট খেলতে পারছেন তাহলে অংকে সাড়ে ১৩ পেয়েছেন বলে তিনিই বা অংক নিয়ে পি এইচ ডি করবেন না কেন?


(সূত্রঃ ইউটিউব)

Monday, April 20, 2015

বাংলা মেগা সিরিয়ালের উপকারিতা

বছর দুয়েক আগে এই ব্লগেই লিখেছিলাম আনন্দবাজারপত্রিকার উপকারিতার কথা। সেই পথেই এগিয়ে গিয়ে এবার বাংলা মেগা সিরিয়ালগুলো আমাদের জীবনে কত কাজে লাগে সেই নিয়েই দু-চার কথা।

১. বাংলা সিরিয়ালের দৌলতেই যে আজকালকার ছেলেপুলেরা একটু-আধটু আত্মীয়স্বজনের নাম জানতে শিখেছে সেটা মানতেই হবে। বিশেষ করে আজকের এই নিউক্লিয়াস ফ্যামিলির যুগে ফুলপিসি বা ন-কাকিমার মত চরিত্রগুলো বাংলা সিরিয়াল না থাকলে খুঁজেই পাওয়া যেত না। মনে রাখবেন বাংলা সিরিয়ালের পরিবার মানেই সেটা আবশ্যিকভাবেই একটা একান্নবর্তী পরিবার যেখানে পিসি, মাসি বা জামাইয়ের মাসতুতো ভাইয়ের শালার মত যেকোন আত্মীয়ই যখন তখন এসে হাজির হোন!
যদিও নিজের মায়ের প্রথম বরের দ্বিতীয় বউ, যে আবার মায়েরই বৈমাত্রেয় বোন, তাকে মাসী বা কাকিমা কী বলে ডাকা উচিত? এই প্রশ্নটা বাঘা বাঘা লোককে ঘাবড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট।

২. বিদ্যাসাগর আমাদের সুবোধ বালক গোপালের কথা বলে গেছিলেন। আর তার চেয়েও সুবোধ বালিকাদের দেখা পাওয়া যায় আজকের বাংলা সিরিয়ালগুলোতে। এখানে অবিশ্যি সব চরিত্রই হয় কালো নয় সাদা। নাহলে দর্শকদের বুঝতে অসুবিধা হতে পারে কিনা। তাই ধূসর কোন চরিত্রের জায়গাই নেই এখানে। এদের মধ্যে আবার সবচেয়ে সুবোধমতি হলেন সিরিয়ালের নায়িকারা।
বিছানা গোছানো থেকে বাসন মাজা অবধি বাড়ির সব কাজই এঁদের ঘাড়ে সমর্পিত থাকে। এমনকি দরকারে বাড়ির ছোট মেয়ের বদমাইশ প্রাক্তন প্রেমিককে গুলি করে মারার কাজটাও এঁদের কাছে চা বানানোর মতই সহজ!
এনারা খারাপ কাজ করেন না, খারাপ কাজ দেখেন না, খারাপ কিছু বলেন না, খারাপ কথা শোনেন না, এমনকি ভুল করে কাউকে নিয়ে খারাপ কথা ভেবে ফেললে বা খারাপ স্বপ্ন দেখলে বাড়ির পাশের মন্দিরের গুরুদেব বা গোমাতার চরণামৃত খেয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে যান। গল্পের খলনায়িকা যদি নায়িকাকে বিষ খাইয়ে মারতে গিয়ে, বা বারে গান গাওয়াতে (অবশ্যই রবীন্দ্রসঙ্গীত) গিয়ে ধরা পড়ে জেলে যান তাহলে পুলিশকে যুক্তির জালে হার মানিয়ে তাঁকে জেল থেকে বের করে আনাও গল্পের নায়িকার দায়িত্বের মধ্যেই পরে!

৩. প্রায় সব বাংলা সিরিয়ালেই একটি বা দুটি বিশেষ চরিত্র থাকেন। কেউ হয়তো হুইল চেয়ার নিয়ে ঘোরেন, কেউ সারাক্ষণ আধো আধো করে কথা বলেন, কেউ আবার কিছুই করেন না শুধু এক জায়গায় চেয়ারে বসে দোলেন (টেমপ্লেটঃ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় – শাখাপ্রশাখা)। কিন্তু এঁরা প্রত্যেকেই মুখ খুললে প্লেটো কিম্বা সক্রেটিস, ছবি আঁকলে পিকাসো কিম্বা ফিদা হুসেন আর গান গাইলেই শ্রাবনী সেন! আমার তো সন্দেহ হয় শ্রাবনী সেনের গাওয়া দু-তিনটি গান বোধহয় এই সিরিয়ালের প্রযোজকদের কাছে রাখা আছে। সেগুলোকেই বিভিন্ন সিরিয়ালে বিভিন্ন সময়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করা হয়।

৪. গত বিশ্বকাপের সময় একটা জোকস্‌ ফেসবুকের দেওয়ালে দেওয়ালে ঘুরছিল। ভারতীয় দলের খেলোয়াড় স্টুয়ার্ট বিনি দলে জায়গা না পেয়ে দিনের পর দিন বোর হয়ে একদিন তাঁর স্ত্রী ময়ান্তী ল্যাঙ্গারকে বললেন, “চল না কোথাও ঘুরে আসি।” ময়ান্তী, স্টার স্পোর্টসের উপস্থাপক, গম্ভীরভাবে (গৌতম গম্ভীর নয়) বললেন, “তোমার কাজ না থাকলেও আমার আছে!”
কিন্তু স্টুয়ার্ট বিনির চেয়েও করুণ অবস্থা বাংলা সিরিয়ালগুলোর পুরুষ অভিনেতাদের। এঁরা থাকেন, মাঝেমধ্যে বাক্যালাপেরও সুযোগ পান কিন্তু সেগুলো কেউ তেমন পাত্তা দেয় না। নায়িকার স্বামীই হোন বা খলনায়িকার স্বামী, এই ব্যাপারে সব পুরুষই সমান সমান।
এঁরা রোজ একসঙ্গে খাবার খান, সেখানে নানারকম কূটকাচালী (কে কাকে কখন কার দিকে কী ভাবে তাকিয়ে কী খাবার দিয়ে কী বলল!) দেখার পর কোন এক রহস্যজনক অফিসে চলে যান। মাঝেমধ্যে পরিচালকের ইচ্ছে না হলে অফিসে না গিয়ে বাড়িতে ঘুরে বেরান (ছুটি কী করে ম্যানেজ হয় সেটা জিজ্ঞেস করা মানা!), বাড়িতে কোন অনুষ্ঠান চললে খুব ব্যস্ত হয়ে কোন কাজ না করে এদিক ওদিক যাওয়া আসা করেন, সেরকম বিশেষ ঘটনা ঘটলে ক্যামেরা তিনবার করে তাঁদের দেখায়। কিন্তু সব মিলিয়ে এরা সারাক্ষণই ভ্যাবা গঙ্গারামের মত আচরণ করেন যেটাকে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির মেয়েরা এবং টিভির মহিলা দর্শকরা গুরুত্ব না দিয়ে কাটিয়ে দেন।

৫. বাংলা সিরিয়ালগুলো তাদের দর্শকদের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। দর্শকদের সুবিধা-অসুবিধার দিকে তাদের বিশেষ নজর থাকে। এই ব্যাপারে অর্ণব (গ্রেট বং) আগেই লিখে গেছে তবু একবার লিখি। ধরুন আপনি একটি বাংলা সিরিয়াল খুব মন দিয়ে দেখেন। কিন্তু বাচ্চাদের গরমের ছুটিতে দশদিনের জন্য সিকিম বা উত্তরাঞ্চল গেলেন যেখানে সিরিয়াল দেখার সুযোগ পেলেন না। তাহলে ফিরে এসে গল্প যদি পাঁই পাঁই করে এগিয়ে যায় তাহলে তো আপনি অথৈ জলে পড়বেন।
সেই কারণেই এখানে গল্প শামুকের চেয়েও ধীরগতিতে এগিয়ে চলে। এমনকি আপনার ভাগ্য ভালো থাকতে এসে দেখতে পারেন গল্প এক লাইনও এগোয়নি। কারণ গত দশ দিনে ধরে হয় বড়ির আদরের মেয়ে তাঁর গানের অনুষ্ঠানের জন্য বাড়ির সবাইকে নিয়ে রেওয়াজ করে গেছেন (সব নারী কন্ঠই শ্রাবনী সেন, পুরুষ কন্ঠ... ৪ নম্বর পয়েন্ট দেখুন!) অথবা বাড়ির বড় ছেলের ছোট মেয়ের ননদের বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ের তত্ব সাজানোর জন্য দশটি এপিসোড খরচ হয়ে গেছে!

৬. বাংলা সিরিয়ালের আর একটা উপকারিতা দিয়ে শেষ করি। ‘গরুর রচনা’ প্রবাদটা মাঝে মধ্যেই ব্যবহৃত হয়। সেই যে ছোট্ট ছেলেটি শুধু গরুর রচনা মুখস্ত করেছিল বলে পরীক্ষার যেকোন রচনাতেই শেষ অবধি গরুর বিবরণ লিখে ফেলত। 
এখানেও সেই একই অবস্থা। সিরিয়ালের শুরুটা থ্রিলারধর্মী হোক বা ছোট্ট বাচ্চাদের নিয়ে শেষ অবধি সবই গিয়ে দাঁড়ায় শাশুড়ী-বউমা-জা-ননদের ল্যাং মারামারির গল্পে। এমনকি সেই ল্যাং মারার পদ্ধতিগুলো পর্যন্ত মোটামুটি একই... রান্নায় নুন মিশিয়ে দেওয়া, প্রাক্তন প্রেমিক-প্রেমিকাকে ডেকে এনে ঝামেলা করানো বা গয়না চুরির বদনাম দেওয়া... মানে যতটা কিম্ভুত কিছু হতে পারে আর কি! এর সুবিধাও কম নয়... ১ নম্বর এপিসোড থেকে না দেখলেও চলে, ১০০ এপিসোড বা ৫০০ এপিসোড, যখন ইচ্ছে দেখা শুরু করুন, গল্প বুঝতে পাঁচ মিনিটও সময় লাগবে না!