Monday, October 21, 2013

স্বঘোষিত সিনেমাবোদ্ধাদের নিয়ে দু-চার কথা

ফেসবুক অতি কাজের জিনিস! পুরনো বন্ধু-বান্ধব, রেলাবাজ পাড়ার দাদা, বিরক্তিকর কলেজের জুনিয়ার, অফিসের সুন্দরী সহকর্মিনী সবার সব খবর সময় মত পাওয়া যায়। কে কাকে বিয়ে করল, কার কবার ব্রেক-আপ হল, কে অফিসের ট্যুরে বিদেশ গেল, কে অফিস কেটে হিমাচলে গিয়ে গাঁজা খেল সব খবরই যাকে বলে আঙ্গুলের ডগায়! এছাড়া ফেসবুকে নানা বিষয় নিয়ে নিজেদের মতামত প্রদান করাও যায় বৈকি। সে আপনি খেলা বলুন, সাহিত্য বলুন কিম্বা দেশ-বিদেশের চলচিত্র। আর ফেসবুকের এইসব বাঙ্গালী সিনেমাবোদ্ধাদের চারিত্রিক বিশিষ্টের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার জন্যই এই লেখা।

১. Angry Young Man

এরা সকলেই সবসময়েই অত্যন্ত রেগে আছেন। যেকোন সিনেমা(নাকি ফিল্ম!) দেখে খারাপ লাগলে হতাশা বা দুঃখের কোন জায়গা নেই এদের কাছে। এদের শুধু হয় দাঁত কিড়মিড়ে  রাগ এবং তারপর ফেসবুকে এসে তাদের আখাম্বা লম্বা লম্বা পোস্ট দিয়ে তাদের সেই রাগেরই বহিঃপ্রকাশ।

২. অপছন্দেই আনন্দ

এদের প্রায় সকলেরই সিনেমা নিয়ে প্রচন্ড তীব্র পছন্দ-অপছন্দ আছে। বিশেষ করে এদের অপছন্দের নায়ক বা পরিচালকদের গালমন্দ করতে এরা কোনদিনই ক্লান্ত হয় না। কিন্তু তারপরেই... যে মুহূর্তে তাদের অপছন্দের নায়ক/নায়িকা বা পরিচালকদের সিনেমা বাজারে এল সঙ্গে সঙ্গে হলে গিয়ে, দরকার হলে ব্ল্যাকে টিকিট কেটে প্রথম সপ্তাহেই সেটা না দেখলে তাদের চলে না। আর তারপরেই গোটা ফেসবুক জুড়ে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ, আগেই যার কথা বলেছি।

৩. রেখেছ বাঙ্গালী করে...

এরা প্রধানত বিদেশী (আজকাল ইরানি, জাপানী এবং পূর্ব ইউরোপীয় সিনেমা আঁতেলদের মধ্যে চলছে ভাল!) সিনেমা দেখে। ভারতীয় সিনেমা যে এরা দেখে না তা নয় তবে সেগুলো শুধু সেই ভাষারই যেটা তারা জানে না। বাংলা বা হিন্দিতে তৈরী যেকোন সিনেমাই এদের কাছে ট্র্যাশ আর বাজার-চলতি বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা তো এদের কাছে আলোচনারই যোগ্য নয়। যদিও সেই সিনেমাটি যে তামিল বা তেলেগু সিনেমা থেকে বানানো হয়েছে সেই নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পোস্ট করে যেতে এরা ক্লান্ত হয় না, লোকে প্রাদেশিক বলবে যে!

৪. ভাষায় আমায় ভুলাবি কত...

Novelistic realism, Anti-intellectualism, Orientalist… এখানেই থামি! এইসব শব্দগুলোর অর্থ যদি আপনিও না জানেন তাহলে চুপি চুপি জানিয়ে রাখি যে ওই সব বোদ্ধারা সিনেমা নিয়ে আলোচনা করার সময় এইসব শব্দের গোলাগুলি চালিয়ে লোককে ঘাবড়ে দিতে বিশেষ পছন্দ করেন। শব্দগুলোর মানে আমি জানি না, এদের জিজ্ঞেস করলে যে তিন পাতা লম্বা উত্তর আসে সে বোঝার ক্ষমতা ভগবান আমাকে দিতে ভুলে গেছেন।

৫. পড়াশুনো করে যে...

Source: Google Image (http://www.soundonsight.org/)
এরা যতটা সময় সিনেমা দেখে তার চেয়ে অনেক বেশী সময় ব্যয় করে উইকিপিডিয়া থেকে সেই সিনেমার মানে বুঝতে! সত্যি বলছি!! এমনকি কয়েকজনের ক্ষেত্রে তো আমার মনে হয়ে যে এরা সময়ের অভাবে সিনেমাটা না দেখে শুধু উইকিটা পড়ে নেয় যাতে ফেসবুকে আলোচনায় অংশ নিতে পারে। যেকোন আলোচনা বা তর্কতে পাত্তা না পেলেই এরা নানাবিধ বই-এর নাম বা সিনেমা সমালোচকদের নাম ছুঁড়তে শুরু করে যেগুলো আপনার জানার সম্ভাবনা খুবই কম! আর তার পরেই এদের ভাবখানা হয়, একটা সিনেমা দেখার পর যারা সেই সিনেমা নিয়ে গোটা কুড়ি বই পড়েনি তাদের সঙ্গে আর এরা কি আলোচনাই বা করবে!
এতে সমস্যা তেমন নেই। তবে ওগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তারা যদি বেশ কিছু ভালো সাহিত্য পড়ত, বিশেষ করে কোন সিনেমা নিয়ে আলোচনার আগে সেটার মূল বইটা পড়ে নিত তাহলে যে একটু লাভ হত সেটা এদের ঘটে ঢোকানো বেশ শক্ত কাজ, অভিজ্ঞতা থেকে বলছি!

৬. তুই আমার হিরো...

একটু আগে এদের অপছন্দের কথা বলেছি। এবার এদের পছন্দের কথা বলি। এদের সকলেরই এক বা একাধিক পছন্দের পরিচালক আছেন। কোন কোন ক্ষেত্রে অভিনেতাও থাকতে পারেন। তা এদের কাছে এদের পছন্দের পরিচালক মোটামুটি ব্যাটম্যান, সুপারম্যান বা রজনীকান্তের ছোটখাট সংস্করণ! তাঁদের বানানো এক একটা সিনেমা যেন ছোট্ট একটা অ্যাটম বোম। প্রত্যেকটাই পৃথিবীর ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘটনা। আর শুধু সিনেমা নয়, তাদের প্রিয় পরিচালকের বানানো কলেজ প্রজেক্ট, শর্ট ফিল্ম, এমনকি দশ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনও তাদের কাছে বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসের একেকটা হীরকখণ্ড এবং সেগুলোর প্রত্যেকটা দৃশ্যের মূল বক্তব্য তারা যেরকম বুঝেছে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় বোধ হয় যিনি পরিচালক তিনি নিজেও অত ভালো করে বুঝতে পারেননি!
এই প্রসঙ্গে, সিনেমা বোদ্ধা হতে চাওয়া পাঠকদের একটা ছোট্ট টিপস্‌ দিয়ে রাখি, যদি বাঙ্গালী পরিচালক পছন্দ করতে চান তাহলে সব সময় ঋত্বিকের ভক্ত হন এবং সত্যজিতের নিন্দে করুন। ওইসব গ্রুপে আপনার শত্তুর তো অনেক কমে যাবেই তার সঙ্গে আমি ঋত্বিককে বুঝি আর কেউ বোঝে না, এটা ভেবে যথেষ্ট শ্লাঘা বোধ করারও সুযোগ পাবেন!

আজকে আপাতত এখানেই শেষ করা যাক। সিনেমা দেখি বরং একটা। একটা সহজ সরল সিনেমা যেটা বোঝার জন্য আমাকে গুগল্‌ বা উইকিপিডিয়ার সাহায্য নিতে হবে না!

নিচের ফ্লো-চার্টটা বেশ পছন্দ হল, সেটাও দিলাম... 
Source: http://squathole.files.wordpress.com/2013/01/how-to-be-a-clever-film-critic.gif