Showing posts with label Book Review. Show all posts
Showing posts with label Book Review. Show all posts

Friday, March 4, 2016

বইমেলা ২০১৬ থেকে পছন্দের দুই রম্য গ্রন্থ

ফটকেমি
এবারের বইমেলার যে বইগুলো এখনো অবধি পড়লাম সেগুলোর মধ্যে ফটকেমি সবচেয়ে ভালো লেগেছেনিজেদের ছোটবেলার স্কুলের স্মৃতি তো আমাদের সবার কাছেই খুব মূল্যবান। আর এই বইয়ের বিশেষ গুন হল পড়তে পড়তে মনে হয় এর অনেকগুলো ঘটনা যেন আমাদের স্কুলে আমার সামনেই ঘটেছে। আর ফটিক, তার কথা কী বলব। কখনো সে পাগলা দাশুর মত বুদ্ধিমান, কখনো গাবলুর মত আলাভোলা, কখনো ক্যালভিনের মত দার্শনিক আবার কখনো ডেনিসের মতই বদমাশ। তার কাণ্ডকারখানা পুরো স্কুলের মাস্টারমশাইদের বিরক্তির কারণ, অবশ্য মাস্টারমশাইরাও তো ছোট ছিলেন তাই মাঝে মাঝে ফটিকের কথায় মুখ নিচু করে হাসতেও দেখা যায় তাঁদের।

সব মিলিয়ে ফটিকের ফটকেমির গল্পগুলো আমাদের হৃদয়ের বড় কাছের। আজকাল চারদিকে যা চলছে তাতে সোজা কথা সোজা ভাবে বললে যে কোন সময়েই সমূহ ঝামেলা হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। তাই ফটিক যখন ক্লাসে মাস্টারমশাইদের কঠিন প্রশ্নের সরলতম উত্তর দিয়ে বিপদে পড়ে তখন হাসির সঙ্গে সঙ্গে তার প্রতি সমর্থনে মাথা নাড়তেই হয়।
গল্পে ফটিক ছাড়াও এসেছেন তার মাস্টার মশাইরা, হেডমাস্টারমশাই, ক্লাসের ফার্স্ট বয় প্রদীপ, যার সঙ্গে ফটিকের বেশ খানিকটা রেষারেষিও আছে। এবং আছেন ফটিকের বাবা, প্রায় প্রতি গল্পের শেষের যাঁর ডাক পড়েছে স্কুলে হেডমাস্টারমশাইয়ের ঘরে।
ডায়েরির ফর্মে লেখা গল্পগুলোয় লেখকের সাধু ভাষার ওপর দখল সাধুবাদযোগ্য। শুধু তাই নয়, গল্পগুলোর পরিমিত এবং পরিচ্ছন্ন হাস্যরস আমার মত পাঠকের জন্য বেশ স্বস্তিদায়ক এবং উপভোগ্য। আরিফবাবুর লেখা এই প্রথম পড়লাম। ভবিষ্যতে তাঁর অন্যান্য লেখা পড়ার ইচ্ছে রইল।

লাকি থারটিন
লাকি থারটিন বইয়ের লেখক সুমন সরকার আমার প্রেসিডেন্সী কলেজের জুনিয়ার। সুতরাং অগ্রজ হিসেবে তার লেখার প্রতি একটা পক্ষপাতের সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু তার থেকে বেরিয়ে এসেও নিরপেক্ষভাবেই বলা যায়, “সুমন তুই বেশ লিখিস।”
আমাদের চারদিকের দৈনন্দিন জীবনের ঘটনাপ্রবাহ থেকে কয়েকটা বেছে নিয়েই তার রম্যরচনার সংগ্রহ। কখনো কলকাতার অটো, কখনো পরীক্ষার চোতা, কখনো গুল নিয়ে গুলতানি... আমাদের চেনা-পরিচিত বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের চারদিকের চেনা মুখগুলোকে নিয়ে লেখা ছোট ছোট গল্প, স্মৃতি, মজার ঘটনা। তার সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাবলী নিয়ে টিপ্পনী... সব মিলিয়ে বেশ মনে রাখার মত তেরোটা রম্যরচনা নিয়ে লেখা বই লাকি থারটিন।
আমার বিশেষ করে পছন্দ হয়েছে বইয়ের শেষ লেখা, ‘তেলি বড়ার চপ’। আমাদের সকলেরই ছোটবেলার এরকম বেশ কিছু স্মৃতি থাকে। সুমনকে ধন্যবাদ ওর কলমের জোরে আমাদের ছোটবেলার সেইসব চিরন্তন স্মৃতিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

Saturday, December 12, 2015

সঙ্খ্যাতাত্বিক বিশ্লেষণঃ ঐতিহাসিক উপন্যাস – শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

কয়েকমাস আগে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সিকে সংখ্যার ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করে একটা ব্লগপোস্ট লিখেছিলাম। সেটা অনেকেরই বেশ ভালো লেগেছিল। তাই এই নতুন প্রচেষ্টা। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশের গল্পগুলোর সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক গল্প এবং উপন্যাসগুলোও আমার মত অনেক পাঠকেরই অতি প্রিয়। আর ঐ গল্প-উপন্যাসগুলো নিয়েই এই ব্লগপোস্ট।

কোন লেখাগুলোকে ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসের শ্রেণীতে ফেলা হবে সেটা অনেকাংশেই পাঠকের দৃষ্টীভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। এই লেখায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধায়ের মোট ৩০টি গল্প-উপন্যাসকে ঐতিহাসিক লেখা হিসেবে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ২৫টি গল্প এবং পাঁচটি উপন্যাস। ২৫টি গল্পের মধ্যে ১৭টি গল্প রয়েছে শরদিন্দু অম্‌নিবাসের ষষ্ঠ খণ্ডে। সদাশিবের পাঁচটি গল্পসহ আটটি গল্প রয়েছে চতুর্থ খণ্ডে এবং উপন্যাস পাঁচটি রয়েছে শরদিন্দু অম্‌নিবাস তৃতীয় খণ্ডে

রচনাকালের দিক দিয়ে দেখলে ‘অমিতাভ’ এবং ‘রক্ত-সন্ধ্যা’ এই দুটি গল্প সর্বপ্রথম, সময়কাল ১৯৩০। এরপর ১৯৪০ থেকে ১৯৪৬ অবধি সময় বাদ দিলে মোটামুটি প্রতি বছরেই একটা-দুটো ঐতিহাসিক লেখা হয়েছে। শেষ লেখা ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’, যে লেখার জন্য ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার পান শরদিন্দু।


লেখার দৈর্ঘের ব্যাপারে বিশেষ বৈচিত্র আছে। গল্পের মধ্যে যেমন ‘রেবা রোধসি’ বা ‘ইন্দ্রতূলক’এর মত ছোট গল্প আছে সেরকমই ‘শঙ্খ-কঙ্কণ’ বা ‘বিষ কন্যা’র মত গল্পও আছে যেগুলোকে খুব সহজেই নভেলা বলা যেতে পারে। অন্যদিকে ‘রুমাহরণ’ গল্পের দৈর্ঘকে বলা যেতে পারে ঠিক মাঝামাঝি।
উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘কুমারসম্ভবের কবি’র দৈর্ঘ সবচেয়ে কম। বাকি উপন্যাসগুলো যদিও দৈর্ঘের দিক দিয়ে কাছাকাছি তবে সর্ববৃহৎ উপন্যাস অবশ্যই 'তুমি সন্ধ্যার মেঘ।'

গল্পগুলোর বিষয়বৈচিত্রের দিকে দেখলে দেখা যাবে বিভিন্ন থিমে গল্পগুলো লেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে ‘অষ্টম সর্গ’, ‘প্রাগ্‌জ্যোতিষ’ বা ‘মরু ও সঙ্ঘ’-এর মত প্রেমের গল্প রয়েছে, ‘বিষ কন্যা’ বা ‘তক্ত্‌ মোবারক’-এর মত প্রতিশোধের গল্প রয়েছে আবার আছে ‘মৃৎপ্রদীপ’, যে গল্পের থীম বিশ্বাসঘাতকতা। ‘বাঘের বাচ্চা’, ‘রুমাহরণ’ বা সদাশিবের অসাধারণ গল্পগুলোকে বলা উচিত অ্যাডভেঞ্চার। কিন্তু শুধু অ্যাডভেঞ্চার নয়, অ্যাডভেঞ্চার আর রোমান্সের মিলন ঘটিয়ে শরদিন্দু লিখেছেন ‘চুয়াচন্দন’, ‘কালের মন্দিরা’, ‘তুমি সন্ধ্যার মেঘ’, ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’র মত অসাধারণ সব সৃষ্টি। তবে একটা কথা সবসময় মাথায় রাখতে হবে, শরদিন্দুর এই গল্পগুলো তাঁর নিজের ভাষায়, “Fictionised History নয়, Historical fiction.”

শরদিন্দু ‘জাতিস্মর’ বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এই বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধও রয়েছে। তাঁর প্রথম দিককার বেশ কিছু গল্প জাতিস্মর ভিত্তিক। গল্পগুলো হল ‘অমিতাভ’, ‘রক্ত-সন্ধ্যা’, ‘মৃৎপ্রদীপ’, ‘রুমাহরণ’, ‘বিষ কন্যা’ এবং ‘সেতু’। এই শ্রেণীর গল্প রচনায় দুজন বিদেশী লেখক, জ্যাক লন্ডন ও স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, শরদিন্দুকে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিলেন। পরের দিকে তাঁর লেখায় অবশ্য জাতিস্মর সম্পূর্ণ ভাবেই অনুপস্থিত। যদিও আমার নিজের অন্তত ওনার গল্পগুলো পড়ে বারবার এটাই মনে হয়েছে, জাতিস্মর হতে পারলে কি ভালোই না হত! চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মগধে বা শশাঙ্কোত্তর মাৎস্যন্যায়ের বঙ্গদেশে আমি ছিলাম কিনা বা থাকলে কোন ভূমিকায় ছিলাম সেই নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখতে কার না ভালো লাগে!

শরদিন্দু তাঁর ঐতিহাসিক গল্প-উপন্যাসে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়কালকে ছুঁয়ে গেছেন। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে, মৌর্য-গুপ্ত যুগকে ছুঁয়ে শরদিন্দুর লেখা পৌঁছেছে মোগল যুগেও। কোন কোন গল্পে এই সময়কাল অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উল্লেখিতযেমন ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ উপন্যাসের শুরুতেই বলা হয়েছে,
 “বৈশাখ মাসের অপরাহ্ণ। ১৩৫২ শকাব্দ সবে মাত্র আরম্ভ হইয়াছে
আবার ‘রক্ত-সন্ধ্যা’ বা ‘বাঘের বাচ্চা’ গল্পের মূল চরিত্রগুলো যেমন ভাস্কো ডা গামা বা শিবাজির সময়কাল ইতিহাসের পাতা থেকে সহজেই তুলে নেওয়া যায়। এবং অধিকাংশ গল্পেই সেই সুবিধা রয়েছে। যদিও ‘রুমাহরণ’ বা ‘প্রাগ্‌জ্যোতিষ’এর মত যেসব গল্পের সময়কাল অতি প্রাচীন সেগুলোতে আমাকেও আন্দাজেই কাজ চালাতে হয়েছে।


গল্পের কাল এবং পাত্র নিয়ে কথা হল যখন তখন স্থান নিয়েও কিছু কথা থেকে যায়। শরদিন্দুর ঐতিহাসিক গল্পের অধিকাংশই ভারতের বিভিন্ন জায়গায়। তার মধ্যে পাটলিপুত্র এসেছে অনেকবার। বঙ্গদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আছে একাধিক গল্প, যেমন, ‘গৌড়মল্লার’, ‘চুয়াচন্দন’ এবং ‘ময়ূরকূট’। ছত্রপতি শিবাজি এবং সদাশিবের সব গল্পের পটভূমিই মহারাষ্ট্র। আবার ‘তুঙ্গভদ্রার তীরে’ উপন্যাস বা ‘রক্ত-সন্ধ্যা’ গল্পের পটভূমি দক্ষিণ ভারত। আবার ‘ইন্দ্রতূলক’ হল আর্যদের মধ্য এশিয়া থেকে ভারতে আসার গল্প। নিচের ম্যাপে বিশদে সমস্ত গল্পের স্থান চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছি। যদিও ‘আদিম’ গল্পের পটভূমি প্রাগৈতিহাসিক মিশর, ‘মরু ও সঙ্ঘ’ গল্পটি লেখা হয়েছে মধ্য এশিয়ার পটভূমিতে। ‘রুমাহরণ’-এর ভৌগোলিক সীমা কিছুটা ধোঁয়াটে।

শরদিন্দুর ঐতিহাসিক রচনাগুলো বাংলা সাহিত্যের কিছু অসাধারণ মণি-মানিক্য। শরদিন্দুর নিজেরও অত্যন্ত পছন্দের ছিল এই লেখাগুলো। এগুলির প্রসঙ্গে নিজের ডায়েরিতে লিখেছিলেন (তারিখ ২৩.২.১৯৫১)-

“আমি আমার অনেকগুলি গল্পে প্রাচীন ভারতের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধরিবার চেষ্টা করিয়াছি। কেহ কেহ বলেন এইগুলি আমার শ্রেষ্ঠ রচনা। শ্রেষ্ঠ হোক বা না হোক, আমি বাঙ্গালীকে তাহার প্রাচীন tradition-এর সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছি। এ চেষ্টা আর কেহ করেন না কেন? বাঙ্গালী যতদিন না নিজের বংশগরিমার কথা জানিতে পারিবে ততদিন তাহার চরিত্র গঠিত হইবে না; ততদিন তাহার কোন আশা নাই। যে জাতির ইতিহাস নাই তাহার ভবিষ্যৎ নাই।”

শেষ কথাগুলো বোধহয় শুধু বাঙালী নয়, এই দেশের অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রেই সত্যি।

Saturday, August 1, 2015

ব্যোমকেশ বক্সী – কিছু সংখ্যা

সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সীর সহিত আমার প্রথম পরিচয় হইয়াছিল সন তেরশ’ একত্রিশ চোদ্দশ সালে।

তার আগেই ভদ্রলোকে্র এবং তাঁর স্রষ্টার নাম শুনেছিলাম, সদাশিব আর জেনারেল ন্যাপলার গল্প পড়াও হয়ে গেছিল। কিন্তু টেলিভিশানের পর্দায় ভদ্রলোককে দেখার পর থেকে ব্যোমকেশের বই পড়ার জন্য খেপে  উঠলাম। তখন আমার বছর দশেক বয়স। বই পেয়েও গেলাম হাতের কাছে, ‘শরদিন্দু অম্‌নিবাস – প্রথম খণ্ড’। সেই শুরু, তারপর গত বাইশ বছর ধরে সেইসব গল্প-উপন্যাস উল্টেপাল্টে কতবার যে পড়লাম তার হিসেব রাখা শক্ত।
আর পড়তেই পড়তেই মনে হল ব্যোমকেশকে অংকের হিসেবে সামান্য কাটা-ছেঁড়া করে দেখলে মন্দ হয় না আর সেইসব কিছু সংখ্যা নিয়েই এই লেখা।

মোট গল্প বত্রিশটি। ‘পথের কাঁটা’ দিয়ে শুরু, ‘লোহার বিস্কুট’ দিয়ে শেষ। এই প্রসঙ্গে এটাও উল্লেখযোগ্য যে ব্যোমকেশ সমগ্র বা শরদিন্দু সমগ্রতে 'সত্যান্বেষীে' আগে থাকলেও সময়কালের দিক দিয়ে 'পথের কাঁটা' লেখা হয়ে গেছে এক বছর আগেই। ১৯৩২ সালে 'পথের কাঁটা' এবং 'সীমন্ত-হীরা লেখার পর শরদিন্দু যখন ঠিক করেন যে ব্যোমকেশ চরিত্র নিয়ে নিয়মিত লিখবেন তখন তিনি 'সত্যান্বেষী' গল্পে ব্যোমকেশ এবং অজিত চরিত্র দুটিকে দাঁড় করান এবং তাঁদের আলাপ ঘটান। শেষ গল্পটি, ‘বিশুপাল বধ’, শরদিন্দুর মৃত্যুর কারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মাঝে পনেরো বছরের অনুপস্থিতি কিন্তু সেটা বাদ দিলে মোটামুটি নিয়মিত লেখা।


ব্যোমকেশের গল্পগুলোর দৈর্ঘ্যের কম বেশী আছে। ‘রক্তমুখী নীলা’ বা ‘লোহার বিস্কুট’ খুবই ছোট গল্প। আবার ‘চিড়িয়াখানা’ বা ‘আদিম রিপু’ পড়তে বসলে উপন্যাসের কথা মনে হয়। ‘রক্তের দাগ’ বা ‘ব্যোমকেশ ও বরদা’কে বলা যেতে পারে দৈর্ঘ্যের দিকে দিয়ে আদর্শ ব্যোমকেশের গল্প।


সেই ‘পথের কাঁটা’ থেকেই অজিত ব্যোমকেশের গল্প লিখে আসছিলেন কিন্তু ১৯৬৪ সাল নাগাদ অজিতের বইয়ের দোকানের ব্যস্ততা আর ব্যোমকেশের নতুন বাড়ি তৈরির দেখভাল গুরুদায়িত্বের  কারণে শরদিন্দু তাঁকে ‘নিষ্কৃতি’ দিলেন। ১৯৬৮ সালে প্রকাশিত ‘বেণীসংহার’ বইয়ের ভূমিকায় লিখলেন,


          “অজিতকে দিয়ে ব্যোমকেশের গল্প লেখানো আর চলছে না। একে তো তার ভাষা সেকেলে হয়ে গেছে, এখনো চলতি ভাষা আয়ত্ত করতে পারেনি, এই আধুনিক যুগেও ‘করিতেছি’, ‘খাইতেছি’ লেখে। উপরন্তু তার সময়ও নেই। পুস্তক প্রকাশকের কাজে যে-লেখকেরা মাথা গলিয়েছেন তাঁরা জানেন, একবার মা-লক্ষ্মীর প্রসাদ পেলে মা-সরস্বতীর দিকে আর নজর থাকে না। তাছাড়া সম্প্রতি অজিত আর ব্যোমকেশ মিলে দক্ষিণ কলকাতায় জমি কিনেছে, নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে; শীগ্‌গিরিই তারা পুরনো বাসা ছেড়ে কেয়াতলায় চলে যাবে। অজিত একদিকে বইয়ের দোকান চালাচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ি তৈরির তদারক করছে; গল্প লেখার সময় কোথায়?
          দেখেশুনে অজিতকে নিষ্কৃতি দিলাম। এখন থেকে আমিই যা পারি লিখব।


ব্যোমকেশের গল্পের বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে ব্যোমকেশ, অজিত, সত্যবতী, পুঁটিরাম ছাড়াও অনেকেই একাধিক গল্পে উপস্থিত। ‘উপসংহার’ গল্পে ‘সত্যান্বেষী’র অনুকূল গুহ প্রতিশোধের নেশায় ব্যোমকেশ বোস হয়ে ফিরে এসেছেন। পুলিশের ইনফর্মার বিকাশের সাহায্য ব্যোমকেশ নিয়েছে চারবার। আবার বিভিন্ন পুলিশ কর্তাদের মধ্যে অনেকেই একাধিকবার ব্যোমকেশের কেসে জড়িয়ে পড়েছেন বা ব্যোমকেশকে ডেকে পাঠিয়েছেন।


ব্যোমকেশ শার্লক হোমস নয়, তাই শার্লকের মত ব্যোমকেশের অধিকাংশ কেসেই মক্কেল তার দরজায় এসে কড়া নাড়েনি। হ্যাঁ তার মক্কেলদের মধ্যে জমিদার, ব্যবসায়ী, জহুরী, কয়লাখনির মালিক অনেকেই আছেন কিন্তু তা ছাড়াও অনেক গল্পেই ব্যোমকেশ হঠাৎ করে কোন কেসে জড়িয়ে পড়েছে। সে ‘অগ্নিবাণ’ হোক বা ‘চিত্রচোর’। সেইদিক দিয়ে ফেলুদার সঙ্গে বেশ মিল আছে। সেই ‘থ্রি মাস্কেটিয়ার্স’ও যে কত জায়গায় ছুটি কাটাতে গিয়ে অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিল তার হিসেব রাখা শক্ত।

আবার ‘অর্থমনর্থম্‌’ বা ‘দুর্গরহস্য’-র মত গল্পে পুলিশের বিধুবাবু বা পুরন্দর পাণ্ডেরাই ব্যোমকেশকে ডেকে পাঠিয়েছেন। অনেকে সময় কেন্দ্রীয় সরকারও ব্যোমকেশের শরণাপন্ন হয়েছিল, যেমন ‘অমৃতের মৃত্যু’। যদিও অধিকাংশ সরকারী কেসেই গোপনীয়তার কারণে ব্যোমকেশ অজিতকে সঙ্গী করেনি আর তাই অজিতেরও সেগুলো লেখা হয়ে ওঠেনি। নাহলে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের সঙ্গে ব্যোমকেশের ঠিক কি আলোচনা হয়েছিল সেটাও হয়তো জানা যেত।

এই প্রসঙ্গে টুক করে দেখে নিলাম ব্যোমকেশের গল্পের বিভিন্ন পুলিশ চরিত্রদের। অনেকেই একাধিকবার গল্পে ছিলেন। আর রাখালবাবু তো শেষ পাঁচটি গল্পেই উপস্থিত।


অন্যান্য গোয়েন্দাদের মত ব্যোমকেশও মাঝে মধ্যেই ছদ্মনাম বা ছদ্মবেশের সাহায্য নিয়েছে। যদিও দিগিন্দ্রনারায়ণ ধরে ফেলেছিলেন এবং অজিতের সরলতার সুযোগে অপদস্থ করতেও ছাড়েননি। ব্যোমকেশ নিশ্চয়ই এই ঘটনা ভুলে যায়নি। তাই ‘হেঁয়ালির ছন্দে’ বনমালীবাবুর ওপরে একই পদ্ধতি লাগিয়েছিল।

ফেলুদা-তোপসের মত না হলেও ব্যোমকেশের ঘোরাঘুরি কম হয়নি। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কেসই কলকাতায় হলেও ‘চিত্রচোর’ বা ‘বহ্নি-পতঙ্গের’ মত স্মরণীয় গুল্পগুলো কলকাতার বাইরেই। আবার ‘চিড়িয়াখানা’ গল্পে কলকাতা আর ২৪ পরগণা (সম্ভবত দক্ষিণ) সমানভাবেই উপস্থিত।

এবার আসা যাক ব্যোমকেশের গল্পের অপরাধীদের কথায়। একজন গোয়েন্দার জনপ্রিয়তা অনেকটাই নির্ভর করে তার বিপক্ষের সুচতুর মস্তিষ্কের ওপর। বুনো ওল না হলে কি আর বাঘা তেঁতুল হওয়া যায়। আর ব্যোমকেশের গল্পে আছে প্রফুল্ল রায়, অনুকূল গুহ, ভুজঙ্গধর-বনলক্ষ্মীর মত অবিস্মরণীয় সব চরিত্র।
ব্যোমকেশের অধিকাংশ কেসেই অপরাধীরা খুন করতে পিছপা হয়নি। তবে অনুকূলবাবুর মত অনেকেই কোকেন গ্যাং চালাতে চালাতেই দরকার মত ভাটিয়া লোকটাকে বা অশ্বিনীবাবুকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। আবার ‘খুঁজি খুঁজি নারি’ গল্পে অপরাধী কেউ ছিল না। গল্পের রহস্য লুকিয়ে ছিল একটি গুপ্ত উইল খুঁজে বের করার মধ্যে।

শধু পুরুষ নয়, মহিলা অপরাধীদেরও সম্মুখীন হতে হয়েছে ব্যোমকেশকে। ‘অদ্বিতীয়’র প্রমিলা পাল তো স্মরণীয়। যে একই সঙ্গে স্বামী-স্ত্রী শান্তা সেন-তপন সেন সেজে বসবাস করত এবং ধরা পড়ে যাওয়ার পর ছুরি হাতে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেছিল ব্যোমকেশের ওপর। আবার ভুজঙ্গধর-বনলক্ষ্মী, রতিকান্ত-শকুন্তলা বা হৈমবতী-বিজয় বিশ্বাসের মত জোড় বেঁধে অপরাধের পথে পা বাড়ানোর নজিরও কম নয়।


ব্যোমকেশের গল্পগুলোর ম্যাচুরিটি বোঝা যায় এই গল্পের অপরাধীদের পরিণতি দেখলে। ধরা হয়তো প্রায় সবাই পড়েছেন। কিন্তু অন্তত ৭টি গল্পে অপরাধীদের কোন শাস্তি হয়নি। এমনকি ‘রক্তের দাগ’ গল্পের ঊষাপতি বা ‘হেঁয়ালির ছন্দ’ গল্পের ভূপেশবাবুর প্রতি ব্যোমকেশের প্রচ্ছন্ন সমর্থনই ছিল। আবার প্রফুল্ল রায়, ভুজঙ্গধর-বনলক্ষ্মী বা সন্তোষ সমাদ্দারদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা গেলেও তাদের ধরার আগেই তারা পালাতে পেরেছে পৃথিবী থেকে। 
সত্যান্বেষী ব্যোমকেশকে নিয়ে সাংখ্যতাত্বিক বিশ্লেষণ এই পর্যন্তই।



Sunday, April 26, 2015

পকেট সচেতন পর্যটক

আমার  সঙ্গে অজিত হালদার মহাশয়ের আলাপ হয় কণাদের সৌজন্যে। যদিও সঠিক ভাবে বলতে গেলে আমার আলাপ হয়েছে শুধুমাত্র ওনার লেখার সঙ্গে। কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এই ভ্রমণপিপাসু, মিশুকে, উৎসাহী কিন্তু হিসেবী, বয়স্ক মানুষটিকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
অবশ্য বয়স্কই বা বলি কী করে? যে মানুষটি এই বয়সেও ছয়-আট বিছানার ডর্মেটরিতে রাত কাটিয়ে, দুধ-পাউরুটি দিয়ে পেট ভরিয়ে, পদব্রজে বা ট্রেন-বাসে করে পৃথিবী বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত পর্যটক দ্রষ্টব্যগুলো ঘুরে বেড়ান তাঁকে কী বয়স্ক বলা চলে!
সে কথায় পরে আসব। আগে তাঁর বইয়ের কথা বা তাঁর নিজের কথা বলি। ড. অজিত হালদার একজন অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতির অধ্যাপক। দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্বভারতী এবং বর্দ্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের বিষয় নিয়ে পড়াশুনো-লেখালেখি ছাড়াও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা ভ্রমণ।
এখন কথা হল, ভ্রমণের নেশা অনেকের মধ্যেই থাকে। নতুন, নতুন দেশ দেখতে কারই না ভালো লাগে? কিন্তু সেই নেশাকে সর্বোচ্চ পর্যায় নিয়ে গিয়ে তার পরিপূর্ণতার জন্য কৃচ্ছসাধন করতে সবাই প্রস্তুত থাকে না। আর এখানেই অজিতবাবুর বিশেষত্ব। ওনার বইয়ের পেছনে লেখা ওনার পরিচিতিতে দেখতে পাচ্ছি যে, খুব অল্প বয়স থেকেই উনি সারা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন। মোটর সাইকেল নিয়ে ভারত পরিক্রমা করেছেন চারবার। হিমালয় থেকে থর মরুভূমি, চীন সীমান্ত থেকে আন্দামান, বাদ যায়নি কিছুই।

কিন্তু শুধু নিজের দেশেই নয়, অজিতবাবু পা বাড়িয়েছেন দেশের বাইরেও... এবং আজকের থেকে অনেকদিন আগেই। আজ তো নাহয় সস্তার বিমান কোম্পানিগুলোর দৌলতে ব্যাংকক-পাটায়া ভ্রমণ বাঙালীর স্ট্যাটস সিম্বলের অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু অজিতবাবু প্রথম ব্রিটেন গেছেন ১৯৮৭ সালে। শুধুই ঘুরতে। এর পরে আবার গেছেন দুবার।
কিন্তু শুধু ব্রিটেন কেন, আমেরিকা, কানাডা, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, মিশর, ইরান এমনকি লাটভিয়া বা আইসল্যান্ডের মত ইউরোপের ছোট্ট, দুর্গম দেশগুলোও বাদ পড়েনি ওনার ভ্রমণের আওতা থেকে। সব মিলিয়ে ঘুরেছেন প্রায় সত্তরটি দেশে। এশিয়া, ইউরোপ, দুই আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া... ছটি মহাদেশে পা ফেলেছেন তিনি।
আর এই দেশগুলোর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখেছেন তাঁর ভ্রমণ-গ্রন্থ, ‘বিশ্বভ্রমণ স্বল্পবিত্তে’। এই বইয়ের ছটি খন্ডের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ওনার ঘোরার গল্প। সে লেখায় যদি আপনি ঝঙ্কারময় বাংলা গদ্যের খোঁজ করেন তাহলে সে লেখা আপনার না পড়াই ভালো। কিন্তু হালকা, ঝরঝরে ভাষায় একটা দেশ ভ্রমণের দিন কয়েকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যদি আপনি সেই দেশের মানুষগুলোকে একটু হলেও চিনতে চান, সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনার ভালো লাগা উচিত। শুধু তাই নয়, নিজে যদি যেতে ইচ্ছে করে, তাহলেও ঠিক মত ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্যও এই বইগুলো দুর্দান্ত। কারণ অজিতবাবু নিজে অত্যন্ত বিবেচনা করে, সব দিক ভেবে ছক কষে পরিকল্পনা করে ঘুরেছেন। আর নিজের থাকা-খাওয়ার ক্ষেত্রে হিসেব করে চললেও ভ্রমণের ব্যাপারে খুব বেশী কার্পন্য উনি করেননি।
ওনার ঘোরার এই দিকটার কথা আগেই বলেছি। বইয়ের নামেও বোঝাই যাচ্ছে অজিতবাবু পয়সার দিকটা হিসেব করে ঘোরেন। তেমন কিছুই না, উনি ইউথ হোস্টেল অ্যাসোসিয়েশান অফ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং তার দৌলতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইউথ হোস্টেলে ঘর ভাড়ায় ছাড় পান। কিন্তু এর জন্য তাঁকে থাকতে হয় ডর্মেটরিতে আরও সাত-আট জন পর্যটকের সঙ্গে। সাধারণত একাই ঘোরেন এবং হোস্টেল থেকে শহরের মধ্যে দু-তিন কিলোমিটার অবধি দূরত্ব পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যান। তার বেশী দূরত্ব হলে বাসে ওঠেন। বিভিন্ন পর্যটন স্থানেও যান বাসে করে বা সারাদিনের ঘোরার প্রোগ্রামে নাম লিখিয়ে। ট্যাক্সি চড়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। রেস্টুরেন্টে খেতে যান না। নিজেই বাজার থেকে দুধ, সিরিয়াল, পাউরুটি, কলা বা বার্গার কিনে পেট ভরিয়ে নেন। কিছুই না, এইসব দিকে পয়সা বাঁচাতে পারলে সেই দিয়ে হয়তো আরও একটা নতুন দেশ ঘুরে আসবেন তিনি।
দু-একবার অবশ্য উনি ওনার স্ত্রীকে নিয়ে বা ছেলে-বউয়ের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছেন তবে সেগুলো তেমন জমেনি। সবদিক হিসেব করা না চলতে পারার হতাশার দিকটা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। এছাড়া কোন কোন জায়গায় তাঁর লেখা শুষ্ক বর্ণনায় ভরা। অন্যান্য লেখকদের তুলনায় সাহিত্যগুণ কম এবং ঘটনাবহুল নয়। সেটা সম্ভবত তাঁর নিয়মিত লেখার চর্চা না থাকার ফল।
অজিতবাবুর লেখার আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হল স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ওনার আলাপচারিতাযদিও অজিতবাবু একাই ঘোরেন কিন্তু যে দেশে যাচ্ছেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে ছাড়েন না। তাদের সঙ্গে সেই দেশ নিয়ে কথা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করেন। কখনো সে দেশের সুপার মার্কেটে গিয়ে চালের দাম দেখে বর্দ্ধমানের চালের দামের সঙ্গে তুলনা করেন, কখনো বা সেই দেশের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে ভারতের একজন অধ্যাপকের পারিশ্রমিকের তুলনা করে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করেন।
যারা ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন তাঁদের অবশ্যই উচিত অজিতবাবুর বইগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা। কিছুই না এই ভ্রমণ-প্রেমিক মানুষটির দেশভ্রমণের গল্পগুলো পড়লে নিজেদের ঘোরার ইচ্ছেগুলোও মনের গোপন থেকে বেরিয়ে এসে উঁকিঝুঁকি মারবে! তখন শুধু বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা!

Tuesday, October 14, 2014

Yatrik: The Journey Within

It was a Saturday evening in South City, the shopping mall. And it was chaturthi, just before the Durga Puja. A huge number of people focussing on their last moment Puja shopping were strolling through various floors, moving in and out of different shops. But Shreya and I were not visiting Pantaloons or Shoppers Stop. We were in Starmark, the book store which also sells DVDs, gift items, folders, perfumes and even foreign chocolates. Just near the entrance there is a rack with all the latest books, a few books on politics, Mahabharata, sports. There were a few books from foreign authors. Also there were books from so-called new age Indian writers who wrote about sweet love and college hotties in their books intended for India’s youth.

We however were looking for a different book and despite searching through various sections of the store we started fearing that the book may not be yet released in Kolkata. Hence we asked one attendant in the shop and he after consulting with another couple of his colleagues finally handed me the book from one of the almost-hidden corners of the fiction section. They said that the book arrived just day before and I wondered how that could reach such a farthest corner in just a day! The book we were looking for was Yatrik, the third book written by Arnab Ray aka Greatbong. Well, I just wanted to write this to show like everything in life how in the publishing industry also it all depending on the marketing and publicity but not on the quality. Not good news for potential writers with no connections like me!!

Arnab has a long presence in the Indian blogger community. After spending a considerable time writing blogs on topics ranging from Lambu Ata (Who ultimately got his 'Maut ki Chnata' in the movie Gunda) to Twilight saga to his local sweet shop he ventured into writing books. Obviously his first book was different from his regular blog posts in the web but the themes were similar based on his style of humour and satire. He did not only get the attention but rather turned a few heads on the way.
His second book ‘The Mine’ can boast as the first Indian horror novel. A rather dark plot line with multiple twists to shock the reader, the mine is a wonderful psychological thriller which made me finished that book at one go. At that time I could not stop myself from writing a review for ‘The Mine’.

Yatrik is nothing like any of the first two books. Yes, it may come as similar to ‘The Mine’ but that may be because of the death being a common theme in both the books but the similarities just end there.
Yatrik means a traveller. And the book focuses on the journey of Anushtup, the main protagonist of this book, the journey of his life. Although the book started with a death in the first chapter but Yatrik eventually talks about the life.
Anushtup is a typical Bengali guy. Like any one of us he gets confused about life, makes glaring mistakes while judging someone, get disillusioned of politics once he knows all the dirty tricks of it and has a huge ego which make him leave his home and stay in a slum but stops him from taking unfair help from others, even if they are their closest relatives. And despite being the story of a regular Bengali guy, the book does not move in a straight, one-directional way. It moves with twist and turns. Old myths were broken; truth starts to lift his ugly head from the past, people changes, perception changes too.
Questions were answered, unanswered questions like ones which keep bugging us all through our life. Don’t all us have some questions in our life for which we never know the answers! Why everyone in my class did get 82 in life science in the board examination? Why that one close friend of mine stopped contacting me just without any reason? Why do I did not crack the interview I was so confident about? Yatrik tried to identify some of such answers and tried to break the myth about destiny. Ultimately every event in life has some explanation which may not be clear to us because it happened when we were not looking.
Despite being in US for quite a long time Arneb can still paint the city of Kolkata quite accurately with its various characters. There is a call centre boss, a shopping mall bunny, a political leader, a financial chit fund… small incidents which brings out the uniqueness of the city through Anushtup’s journey of life.
Yatrik is a beautiful read and I want to make just a couple of points for Arnab to keep in mind while writing his next (And I know he is busy in quite a few ongoing projects). I was not convinced with some part of the book near the end and think that plot could have been tighter but again Arnab being the storyteller can argue that he was convinced when he thought about that part of story and he thought that plot was the best for the overall story.
The second observation is regarding the dialogues. I think it is already mentioned in Abhishekda’s blog and I kind of agree with him. I feel Arnab gets confused about what should be the right mix of English for his Indian characters. It’s always easy if you are writing dialogues for an American or a British character as they are speaking English all the time and has a significantly different way of expressing themselves. Whereas for a Bengali character, who is a simplest of common man in his mid forties, it’s not always easy to picture in one’s mind regarding how he would speak in English without sounding too snobbish or sounding too cool.

At the end I would say, after ‘The Mine’, the expectation was very high from Arnab and to me he has delivered successfully with Yatrik, the story of one’s journey of life. Now the appetite has just increased and I am waiting eagerly for his next.

Sunday, June 30, 2013

আমার প্রিয় পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা - ১ - শারদীয়া ১৩৯৪

এই লেখাটা খুব গম্ভীর বা গভীর তত্ববোধক লেখা নয় (আমার কোন লেখাই বা হয়!)। অত্যন্ত অগোছালো একটি  লেখা এবং এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হল আমার ছোটবেলার স্মৃতিচারণ। তবে এই লেখা পড়ে আর কেউ যদি তাঁদের ছোটবেলার পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলা নিয়ে নস্টালজিয়ায় ভোগেন তাহলে মন্দ কি?

প্রথমের ভূমিকার সঙ্গে আরো একটু না লিখলে হয়তো ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে না। গত কয়েক বছরে বহু লোকের সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আড্ডায় পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলার অধঃপতনের বিষয়টা অনেকবার ফিরে এসেছে। বিশেষ করে আমার নিজের ৩০-৩২টি আনন্দমেলার সংগ্রহ থেকে খুব সহজেই বুঝতে পারি কিভাবে ৮০-এর দশকের দুর্লভ মণি-মুক্তোর মত আনন্দমেলার মান পড়তে পড়তে বর্তমানে তা শুধুমাত্র কিছু মধ্য মানের গোয়েন্দা গল্প-উপ্পন্যাস সংকলনে পরিণত হয়েছে। আর সেই আলোচনার ফলশ্রুতিই এই লেখা। বর্তমানের পূজাবার্ষিকী না হয় ভালো নয় কিন্তু ঐ সারা জীবনের মত মনে রেখে দেওয়ার আনন্দমেলাগুলো নিয়ে কয়েক কথা লিখলে মন্দ কি?
আর সেখান থেকেই আজকের লেখা যেখানে ফিরে দেখব বাংলা ১৩৯৪ সনের (ইংরেজি ১৯৮৭) শারদীয় আনন্দমেলার কিছু লেখা।

প্রথমেই স্বীকার করে নিই যে, ১৯৯২-এর আগের যে পূজাবার্ষিকীগুলো আমার কাছে আছে তা কলেজ স্ট্রিট এবং গোলপার্কের বিভিন্ন পুরোন বইয়ের দোকান থেকে কেনা, এর ফলে কিছু কিছু বইয়ের অবস্থা বেশ খারাপ। যেমন, ১৩৯৪-এর যে পূজাবার্ষিকীর কথা বলছি তার শুধুমাত্র ১৩ থেকে ৫১৮ পাতা অবধি দেখতে পাচ্ছি, প্রথম ১২ পাতা (যার অধিকংশই বিজ্ঞাপন এবং সূচিপত্র) এবং শেষের কিছু পাতা নেই। তাই আমি জানি না, ১৯৮৭ সালে এই বইয়ের দাম কত ছিল বা সম্পাদক কে ছিলেন।
তবে খুঁজে দেখলাম যে, ১৯৮৬-র পূজাবার্ষিকীর দাম ৩২ টাকা, সম্পাদক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং ১৯৮৮-র পূজাবার্ষিকীর দাম ৪০ টাকা, সম্পাদক অভীক সরকার। সহজেই বলা যায় যে ১৯৮৭-র পুজোসংখ্যার দাম ৩৬ টাকা, তবে সম্পাদক কে ছিলেন নিশ্চিত হওয়া গেল না।

একবার দেখে নেওয়া যাক, কি কি উপন্যাস ছিল ঐ পুজোসংখ্যায়...

সমরেশ বসুর ‘বিদেশী গাড়িতে বিপদ’
বিমল করের ‘কালবৈশাখীর রাতে’
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘রাজবাড়ির রহস্য’
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’
সমরেশ মজুমদারের ‘জুতোয় রক্তের দাগ’
সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ‘সবুজ সঙ্কেত’ (যে উপন্যাসের একটি চরিত্রের নাম তপোব্রত!!)
সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ‘ইতি তোমার মা’
শৈলেন ঘোষের ‘সোনালির দিন’

এ তো গেল উপন্যাস, সঙ্গে শঙ্কু কাহিনী ‘শঙ্কুর পরলোকচর্চা’, অসংখ্য গল্প, ৪টি বিদেশী কমিক্স, জ্ঞান-বিজ্ঞান, খেলা নিয়ে একাধিক লেখা এবং সব শেষে সেই নিয়মিত ‘কী করে নম্বর বাড়াতে হয়’... সব মিলিয়ে এক জমজমাট পুজোসংখ্যা!

প্রথমেই বলি, রাজবাড়ির রহস্যের কথা। এটা কাকাবাবুর সুবর্ণযুগের লেখা। যে লেখা পড়ে কাকাবাবু বা পাঠক কারও চোখেই জল আসে না। রাজবাড়ির রহস্য আমার সবচেয়ে প্রিয় তিনটি কাকাবাবুর উপন্যাসের মধ্যে একটি। এরকম সহজ, সরল ভাবে লেখা কিন্তু একই সঙ্গে চরম উত্তেজনা, সব সময় একটা কি হয় কি হয় ভাব, লেখাটাকে একটা অন্য মাত্রা দিয়েছে। গল্পের প্লটটাও অত্যন্ত আকর্ষণীয় (ভুল-ভুলাইয়া সিনেমাটা ভাল না লাগার একটা কারণ ঐ প্লটের গল্প আগেই পড়েছি, রাজবাড়ির রহস্যতে) আর সবচেয়ে বড় কথা, হিপনোটিজম, তান্ত্রিক, পুনর্জন্মের মত বেশ কিছু অলৌকিক বিষয় থাকলেও উপন্যাসটাকে কখোনই গাঁজাখুরি বলে মনে হয় না, বরং শেষে গল্পের দুষ্টু লোক গুরুদেবের জন্য খারাপই লাগে সবার।
এই গল্পের প্রথমদিকে সন্তু কিন্তু ছিল না। শুধু কাকাবাবু আর দেবলীনা কেওনঝড়ের রাজবাড়ি গেছিল। জোজো আর সন্তু কলেজের পরীক্ষা থাকায় গেছিল পরে। তখন অবশ্য রহস্য ঘনীভূত এবং শুধু শেষের রহস্যোদ্ধার এবং দেবলীনা উদ্ধার পর্বেই কাকাবাবুর সঙ্গী ছিল সন্তু আর জোজো।

আর একটা উপন্যাস মনে দাগ কেটে গেছিল এই পুজোবার্ষিকীর, ‘ইতি তোমার মা’, একেবারেই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের ঘরানার লেখা। অত্যন্ত আদর্শবাদী একটি পরিবার এবং তাঁদের কাছের কিছু লোকজন আর তার সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ কিছু লোকের সংঘাত এবং শেষ অবধি শুভবোধের জয় আর অশুভের পরাজয়। খুবই প্রত্যাশিত, সরলরেখায় ঘটনা এগিয়েছে, কিন্তু যখন প্রথম পড়ি ছোটবেলায় তখন অত কিছু ভাবতাম না, দারুণ লেগেছিল আর শেষটা পড়ে কষ্ট হয়েছিল খুব। তারপর দীর্ঘদিন সেই কষ্টের কথা ভেবে উপন্যাসটা আর পড়িনি। সাম্প্রতিককালে পড়েছি, অত ভালো না লাগলেও খারাপ লাগেনি।

বাকি গোগোল, অর্জুন, কর্নেল কোন উপন্যাসই খারাপ লাগেনি, মুস্তাফা সিরাজের ‘সবুজ সংকেত’ উপন্যাসটা আর একবার পড়ে ফেললাম এই লেখা লিখতে লিখতে। সেই বিজ্ঞানী চন্দ্রকান্ত, ডিটেকটিভ হালদার আর ধুন্ধুমার নামক রোবটের গল্প।
বানী বসুর ‘জেগে ওঠো’ গল্পের কথা মনে আছে? সেই যে গল্পে পৃথিবীর নানা প্রান্তের ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কোন দুঃখের বা হিংসার ঘটনা দেখলেই ঘুমিয়ে পড়ছিল চিরকালের জন্য। যে গল্পের শেষে ছিল বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্রনেতাদের প্রতিশ্রুতি,

“আমাদের বড় প্রিয় খোকাখুকুরা, মন দিয়ে শোনো। কোনও বিশ্বযুদ্ধই আর পৃথিবীতে হবে না। আমাদের ধনসম্পত্তি আমরা সব ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিয়েছি। কোনও দেশ থেকে কোনও প্রদেশ বিচ্ছিন্ন হওয়ার আর প্রশ্ন নেই। সমস্ত দেশের প্রতিনিধি দিয়ে আমরা বিশ্ব-রিপাবলিক গড়েছি। আমাদের কোনও অভাব, কোনও অশান্তি নেই। ধর্ম নিয়েও আমরা আর মারামারি করি না। কোনও কষ্টকর প্রতিযোগিতায় তোমাদের আর কোনওদিন নামতে হবে না। যে কাজটা করতে সবচেয়ে ভালবাসো, সেটাই করতে দেওয়া হবে তোমাদের। শুধু একবার জেগে ওঠো তোমরা, জেগে উঠে দ্যাখো, তোমাদের চারপাশের পৃথিবীটা কত সুন্দর! কী বিশাল! কী মহান! স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে, তো, খোকাখুকুরা, সে এখানেই, এইখানেই, এইখানেই... ।”

আর ভালো লেগেছিল আশাপুর্ণা দেবীর ‘পাড়ার ছেলে’, এনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়ের ‘রাস্তা’, শেখর বসুর ‘দায়িত্ব পেল দস্যিরা’। মনে রাখার মত গল্প ছিল ক্ষিতীন্দ্রনারায়ণ ভট্টাচার্যের ‘প্রেতাত্মার উপত্যকা’! উরুগুয়ের পটভূমিকায় লেখা এই বিজ্ঞানভিত্তিক গল্পে খুব সহজভাবে বোঝানো হয়েছিল স্পঞ্জের দেওয়ালের ধাক্কা লেগে শব্দ কি করে বারবার ফিরে আসে আর মানুষের মনে রহস্যের সৃষ্টি করে।

ভাল লেগেছিল ‘দ্বীপের রাজা’ নামের কমিক্স যেখানে অনাথ আশ্রমের চার বন্ধু তাদের অত্যাচারী সুপারিন্টেনডেন্টের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে গেছিল সমুদ্রের মধ্যের এক দ্বীপে। মনে হয়েছিল, এরকম যদি আমার সঙ্গেও হত!

আর সবার শেষে বলব এই শারদীয়ায় আমার প্রিয় উপন্যাসের কথা, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘ঝিলের ধারে বাড়ি’। সেই চিরন্তন শীর্ষেন্দু, অনাবিল হাসি, মজা আর তার মধ্যেই আবার গা-ছমছম করা জমজমাট রহস্য। হ্যাঁ এই উপন্যাসে ভূত নেই কিন্তু আছে অনু আর বিলুর মত ভাই-বোনের জুড়ি আর নবীনের মত একজন সাধারণ কিন্তু বুদ্ধিমান, প্রত্যুৎপন্নমতি নায়ক। আর অবশ্যই গুপ্তধন যা শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ঝিলের নিচের মন্দির থেকে।  

জানি না এই লেখাটা আদৌ কারও ভাল লাগবে কিনা কিন্তু এই লেখা লিখতে গিয়ে গিয়ে ১৩৯৪ সনের শারদীয়া আনন্দমেলাটা আমার একবার নেড়েচেড়ে দেখা হয়ে গেল। এই লেখা থেকে সেটাই আমার প্রাপ্তি!

Sunday, November 11, 2012

দুই Genius-এর গপ্পো


“কিস্তিমাত!”

কথাটা শুনে দাবার বোর্ড থেকে মুখটা তুলে একবার প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখের দিকে তাকালেন আর্থার। চশমার আড়ালে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চোখগুলো তখন খুশীতে জ্বলজ্বল করছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বোর্ডের দিকেই চোখ ফেরালেন তিনি। কোন রাস্তা আছে কি কিস্তি বাঁচানোর?
বোর্ডের ওপর গুটি বেশি নেই অনেকক্ষণ ধরে খেলা হচ্ছে তাই বেশিরভাগ গুটিই বোর্ডের বাইরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর্থারের সাদা রাজার সঙ্গে তিনটে বোড়ে, একটা গজ আর একটা নৌকো আছে। উল্টোদিকে রাজার সঙ্গে গজ, নৌকো তো আছেই আর আছে একটা ঘোড়া আর সেটা দিয়েই জব্বর কিস্তিটা খেয়েছেন তিনি, রাজাকে সরানোর কোন রাস্তাই তাঁর কাছে নেই, সরালেও সেটা পড়ে যাবে গজ বা নৌকোর সামনে। অনেকক্ষণ ভেবেও কোন রাস্তা না পেয়ে বোর্ড ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। তাঁর প্রতিপক্ষ এতক্ষণ মুচকি মুচকি হাসছিলেন। এবার তাঁকে উঠতে দেখে বললেন, “কি হল হে ডাক্তার? Dark Knight-এর চালটায় রণে ভঙ্গ দিলে আজকের মত? আচ্ছা হিসেবটা লিখে রাখি! কত হল বল তো? ২৩৮৭-২৩৪২?”
এই শেষ কথাটায় কাজ হল! তার আগে অবধি আর্থার কিছু বলেননি, হিসেবটা শুনে তেড়ে উঠে বললেন, “২৩৪২ বললেই হল? কালকেই তো জিতে ২৩৪৫ করলাম! আর তোমারই বা ২৩৮৭ হল কি করে? এক-একবারে ৫ টা করে বাড়িয়ে নিচ্ছ নাকি ব্যানার্জী?”
“আচ্ছা-আচ্ছা, ঐ তোমার ২৩৮৩-২৩৪৫ ই না হয় হল!” দুষ্টু হেসে ছোট্ট নোটবইটা বন্ধ করলেন ব্যানার্জী, তবে তাঁর মুখ দেখে কিন্তু মনে হল যে, ঠিক হিসেবটাই তিনি জানতেন, শুধু আর্থারকে একটু রাগিয়ে দেওয়ার জন্যেই এটা তাঁর একটা প্রচেষ্টা।
সেটাতে কাজও হয়েছে। আর্থার গজগজ করতে করতে বললেন, “নেহাত বয়সে ছোট, তাই তোমাকে জিততে দি, নাহলে...”
“বয়সে ছোট কথাটার মানে কি? আমার বয়সও ৭১, তোমার সমান!”, তাঁকে মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন অন্যজন, মানে যাকে আমরা এখনও ব্যানার্জী বলেই জানি।
হাত তুলে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে আর্থার বললেন, “আঃ! বয়স এক তো কি হয়েছে? আমি তোমার ৪০ বছর আগে পৃথিবীতে গেছিলাম, তোমার অনেক আগে থেকে পৃথিবী দেখেছি আমি!”
“হ্যাঁ, তাতে কি মাথা কিনে নিয়েছ নাকি ডাক্তার? আমি তোমার ঠিক ৪০ বছর পর পৃথিবী থেকে পরলোকে এসেছি। তোমার চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আমার। তুমি তো ১৯৩০-এই কেটে পড়েছিলে পৃথিবী থেকে! আমি ১৯৭০ অবধি ছিলাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ভারতের স্বাধীনতা, Cold war... অনেক কিছুই দেখেছি, বুঝলে!” বলে উঠলেন ব্যানার্জী!
************************************************************************************************
বুঝতেই পারছেন যে আমি পরলোকের কথা বলছি। যেখানে মানুষ বিভিন্ন সময়ে এসে পৌঁছলেও তাঁদের মধ্যে আলাপ জমতে বেশী সময় লাগে না। যেমন ধরুন না এই দুই বৃদ্ধেরই কথা। জীবিত অবস্থায় দ্বিতীয় জন প্রথম জনের নাম ভালভাবেই জানতেন, কিন্তু দ্বিতীয় জনের কথা প্রথম জন পরলোকে আসার আগে শুনেছিলেন বলে মনে হয় না। এখনকার ঘনিষ্ঠতা অবশ্য এনাদের কথা শুনলে আর দাবার রেষারেষি দেখলেই বোঝা যায়। হবে নাই বা কেন? দুজনের মধ্যে মিলের অভাব নেই। দুজনেই লেখালেখি করে থাকতেন। সামান্য বলতে পারলাম না, অন্তত যার লেখা নিয়ে ১২টা রচনাসমগ্র হয় তাঁর লেখার পরিমান সামান্য বলি কি করে।
প্রথম জন জাতিতে স্কটিশ, পেশায় ডাক্তার, লেখালেখিতে পারদর্শী। লেখার মধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প, ভূতের গল্প তো আছেই তবে তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি একটি গোয়েন্দা চরিত্রের রচনার জন্য। চরিত্রটি আমাদের অতি প্রিয় শার্লক হোমস, সুতরাং ভদ্রলোক যে আর্থার কোনান ডয়াল সেটা বোধ হয় না লিখলেও চলত।
দ্বিতীয় জন বাঙ্গালী সেটা নিশ্চয়ই ওনার নামের শেষাংশ শুনেই বুঝেছেন, ইনি আইন পাস করলেও লেখার ক্ষেত্রেই এনার খ্যাতিটি“লেখার মধ্যে ঐতিহাসিক উপন্যাস, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প, ভূতের গল্প তো আছেই তবে তাঁর সর্বাধিক খ্যাতি একটি গোয়েন্দা চরিত্রের রচনার জন্য।” এতক্ষণে বুদ্ধিমান পাঠক/পাঠিকারা নিশ্চয়ই বুঝেই ফেলেছেন তবু বলি এনার নাম শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্যোমকেশের স্রষ্টা।
পরলোকে এদের বন্ধুত্ব প্রবাদপ্রতিম, রোজই আড্ডা, দাবা খেলা, নিজেদের আর অন্যদের লেখা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলতেই থাকে। শরদিন্দু কিছুদিন বলিউডে চিত্রনাট্য লিখেছিলেন, সেই সিনেমাগুলোও দেখা হয়, আর সেগুলো দেখতে গিয়েই কোনান ডয়ালের হিন্দি সিনেমা দেখার বেশ নেশা হয়ে গেছে। শরদিন্দু অবশ্য আজকালকার হিন্দি সিনেমা দু চোখে দেখতে পারেন না, তাই কোনান ডয়াল কখোন-সখোন তাঁর কাছ থেকে লুকিয়ে-চুরিয়ে বলিউডি সিনেমা দেখে থাকেন!
মাঝেমধ্যে হয়তো এঁদের আড্ডায় আগাথা ক্রিস্টি, আলফ্রেড হিচকক বা সত্যজিৎবাবুও যোগদান করেন তবে তা বেশ অনিয়মিত। সত্যজিতের আসলে বেশিরভাগ সময়টাই কেটে যায় আকিরা কুরসোয়ার সঙ্গে, এখানে এসেও ভালো সিনেমা দেখায় কোন ক্লান্তি নেই তাঁদের! যাকগে সে অন্য গল্প, অন্য আরেকদিন হবে!
************************************************************************************************
দুই বৃদ্ধ হাঁটতে হাঁটতে বারান্দায় এসে বসলেন। এখান থেকে দূরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকা যায়। সামনে টেবিলে কফি রাখা ছিল। শরদিন্দু তার থেকে কফি ঢাললেন দুটি কাপে। একটি এগিয়ে দিলেন কোনান ডয়ালের দিকে। কোনান ডয়াল তখনও বেশ অন্যমনস্ক, হয়তো এখনও দাবার চালের কথাই ভাবছেন। শরদিন্দুর বাড়িয়ে দেওয়া কফির কাপ নিয়ে তাতে আলতো একটা চুমুক দিলেন।
“চিনি ঠিক আছে?” শরদিন্দুর প্রশ্নের উত্তরে আনমনেই মাথা নাড়লেন তিনি। দৃষ্টি তখনও দিগন্তে।
শরদিন্দু পাশের টেবিল থেকে একটা বই তুলে নিয়ে সেটা কোনান ডয়ালের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই বইটা দেখেছ?”
এতক্ষনে কোনান ডয়াল তাকালেন শরদিন্দুর দিকে, শরদিন্দুর হাতের বইটার নাম ‘The House of Silk
“হুম... এইটা পড়েছি। বছর খানেক আগেই বেড়িয়েছিল।”
“তা ঠিক, আমি অবশ্য এই কদিন আগেই পড়লাম। কেমন বুঝলে ডাক্তার?’’
“মন্দ কি? অ্যান্টনি হরউইজ ছেলেটি ভালই লেখে, বাচ্চাদের জন্য আগেও বেশ কিছু জনপ্রিয় বই লিখেছে। লেখার হাত বেশ মসৃণ।”
“তা তো হতেই হবে। নাহলে তোমার এস্টেট ওকে লেখার দ্বায়িত্বই বা দেবে কেন? ভেবে দেখ তোমার মৃত্যুর ৮০ বছর পর প্রথম কাউকে দেওয়া হল এটা লিখতে!”
“ঠিক বলেছ। এদিক-ওদিকে বেশ কয়েকজন লিখেছে, তার কয়েকটা পড়েওছি, বেশিরভাগই অপাঠ্য!” মাথা নাড়লেন আর্থার, “তুমি তো নিজে লেখক ব্যানার্জী, তুমি নিশ্চয়ই জানো যে, নিজের সৃষ্টি নিয়ে এরকম নয়ছয় করলে কেমন লাগে!”
“সে আর বলতে!” নিজের মনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শরদিন্দু।
“তবে এই বইটা আলাদা...” শরদিন্দুর হাত থেকে বইটা নিয়ে পাতা ওলটাতে ওলটাতে বললেন কোনান ডয়াল, “আমার লেখার style অনেকটাই ধরে রেখেছে হরউইজ। সেই বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিককার লন্ডন, কুয়াশা, ঘোড়ার গাড়ি... সেই সঙ্গে শার্লক আর ওয়াটসনের সম্পর্ক, শার্লকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, ছদ্মবেশ... সবই এসেছে গল্পটায়
মাথা নাড়লেন শরদিন্দু, “ঠিক বলেছ, এগুলো আমিও লক্ষ্য করেছি, বিশেষ করে চরিত্রগুলো যেভাবে ধাপে ধাপে গড়ে তুলেছে সেটা ভালো লাগল, তবে গল্পের প্লটটা একটু যেন বেশি জটিল...”
“একদম!” তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন কোনান ডয়াল, “শার্লকের কিছু গল্পের প্লট কিন্তু বেশ জটিল এবং দীর্ঘ, যেমন ধর ‘The Hound of Baskervilles’কিন্তু এই গল্পটার প্লট পুরো অন্যরকম, সেই আমেরিকায় ছবি চুরি দিয়ে শুরু, তারপর আইরিশ চোরের দল, আফিমের আড্ডা, শার্লককে ফাঁসিয়ে দেওয়া, সত্যি কথা বলতে কি, আমার তো এটা পড়তে পড়তে অনেক সময় আগাথার লেখার কথা মনে পরে যাচ্ছিল!”
“সেটা অবশ্য আমার তেমন মনে হয়েনি।”
“না ব্যানার্জী, তুমি ভেবে দেখ, এই গল্পে ওদের যে adventure বা ধর ঐ climax টা, সেগুলো কিন্তু আমার গল্পের চেয়ে আগাথার গল্পের সঙ্গেই মিল বেশি। আমি চাইলে হয়তো ওরকম লিখতে পারতাম কিন্তু অত ঘটনাবহুল করিনি খুব বেশি সময়।”
“তা ঠিক!” মেনে নিলেন শরদিন্দু। কফির কাপে একটা চুমুক দিয়ে বললেন, “তবে যাই বল, হোমসকে নিয়ে কিন্তু বেশ অভিনব কিছু কাজ হচ্ছে আজকাল।”
“তা হচ্ছে।” স্বীকার করে নিলেন আর্থার, “তা ধর, BBC  তো ঐ ৬টা এপিসোড দেখাল ‘শার্লক’-এর। শার্লক আর জন একবিংশ শতাব্দীর লন্ডনে, সমস্ত রকম অত্যাধুনিক গবেষণার সুযোগ শার্লকের হাতের মুঠোয়। জনের সঙ্গে প্রথম আলাপে জনের ফোন দেখে ওর সমন্ধে সব তথ্য দিয়ে চমকে দেয় শার্লক, আইরিন অ্যাডলারের smartphone এ থাকে রাজবাড়ির কোন অল্পবয়স্ক সদস্যের গোপন ছবি, বাস্কারভিল হয়ে যায় সেনাবাহিনীর গোপনীয় গবেষণাগার... কিন্তু তবুও দেখতে ভালো লাগে। কারণ গল্পগুলো যারা লেখে শার্লকের গল্পের মূল চরিত্রটাকে ধরে রাখতে পেরেছে, হ্যাঁ শার্লক হোমস প্রচন্ড খামখেয়ালি, এমনকি অনেক জায়গাতেই কর্কশ, অপরাধ ঘটলে খুশী হয় সে, show-off ও কম নেই, কিন্তু তবু কোথাও যেন আমার সৃষ্টি শার্লকের সঙ্গে এই শার্লকের আত্মার যোগ, আর তাই এটা দেখতে এত ভালো লাগে।”
শরদিন্দু বললেন, “আমি কিন্তু দেখতে চাই ঐ নকল আত্মহত্যার ঘটনাটা কিভাবে ব্যাখ্যা করে ওরা। কারণ দেখে কিন্তু খুব সহজ সরল মৃত্যু মনে হয়েছে। সন্দেহের কোন জায়গাই নেই।”
“ঠিক বলেছ, সেটা আমিও দেখতে চাই, ২০১৩-র শুরুর দিকে নাকি পরের এপিসোডগুলোর শুটিং শুরু হবে শুনলাম, তবে আমার একটা জিনিস ভালো লেগেছে। শার্লক যে বেঁচে আছে সেটা কিন্তু ওরা শেষ করার আগে দেখিয়ে দিয়েছে!”
“দেখ, ‘The Final Problem’ গল্পটা হোমসের সবচেয়ে বিখ্যাত গল্পগুলোর মধ্যে একটা, খুব কম লোকই আছে যারা শার্লক পড়েছে কিন্তু এই ঘটনার কথা জানে না, তাই এই জিনিসটা চেপে রাখলেও লাভ হত না।”
আর্থার হাসলেন, “বাব্বা! আমার এখনও মনে আছে, সেই যেবার আমি শার্লককে মেরে ফেললাম, তারপর কত যে চিঠি এসেছিল কি বলব! কি করব বল, শার্লক যে আমার সেরা কীর্তি সেটা আমি বুঝেছিলাম কিন্তু আমার তো অন্য লেখালেখিও ছিল, বল। ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো নিয়ে কি পরিমাণ পড়াশুনো করতে হয় সেটা আর কেউ না জানুক, তুমি তো জানো ব্যানার্জী। তাই মেরেই ফেললাম শার্লককে। তখন কি আর জানি যে, আরও ২৫ বছর ধরে লিখতে হবে শার্লকের গল্প।”
শরদিন্দু হাসলেন। খুব ভালো করেই জানেন তিনি। তবে ব্যোমকেশকে নিয়ে লিখতে গিয়ে ১৯৬৫ সালের ‘তুঙ্গাভদ্রার তীরে’-এর পর আর ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখা হয়ে ওঠেনি তাঁর। অবশ্য ঐ উপন্যাসের জন্যেই রবীন্দ্র পুরষ্কার পেয়েছিলেন তিনি। তাঁর অনেক পাঠকের মতে ওটাই ওনার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, তাই শেষটা মন্দ হয়নি বোধহয়।
ব্যোমকেশকে নিয়ে অবশ্য শেষ দিন পর্যন্ত লিখে গেছেন। ‘বিশুপাল বধ’টা শেষ করে আসা হয়নি। একটু মন খারাপ তো থেকেই যায়। গল্পটা মন্দ ভাবেননি তিনি। যাকগে কি আর করা যাবে!
শরদিন্দু যখন এসব ভাবছিলেন ততক্ষনে আর্থার কফিটা শেষ করলেন, তারপর ফাঁকা কফির কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বললেন, “তবে ঐ সিনেমা দুটো আমার মোটেই পছন্দ হয়েনি!”
“কোন সিনেমা দুটো?”
“আরে ঐ যে গাই রিচি বলে লোকটা বানিয়েছে, রবার্ট ডাউনি বলে ছেলেটা শার্লক হয়েছে! ওটা শার্লক হোমস না জেমস বন্ড সেটাই আমি মাঝে মধ্যে বুঝতে পারি না!”
“ও... ওইটা? আমি তো ওটার সেকেন্ডটা দেখিওনি এখনও, প্রথমটাই যে কি বিচ্ছিরি লেগেছিল কি বলব! কিছু মনে কর না ডাক্তার, তবে ঐ সিনেমা দুটো একদম পদের নয়!”
কোনান ডয়াল শরদিন্দুকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “আরে বাবা, মনে করার আছেটা কি? ও জিনিসটাকে আমি ত্যাজ্য করেছি। ওগুলোকে শার্লকের সিনেমা বলেই আমি মনে করি না। তার চেয়ে বরং তোমার ব্যোমকেশকে নিয়ে বানানো সিনেমাগুলোর কথা বলা ভালো!”
“ব্যোমকেশ নিয়ে সিনেমা! সেগুলো নিয়ে বেশি কথা না বলাই ভালো।” শরদিন্দু মাথা নাড়লেন।
“কেন? এখনও অবধি তো তোমার লেখা ব্যোমকেশ নিয়েই কাজ হচ্ছে। শার্লকের মত নতুন কোন গল্প লেখার সাহস কেউ দেখায়নি।”
“সেটা ঠিক, বাংলাতে সেরকম কাজ কখোনই খুব বেশি হয়নি, ফেলুদা বল, ব্যোমকেশ বল... কিন্তু আমার গল্প নিয়েও যা হচ্ছে তাতে অনেক সময় মনে হয় আমার কপালে ওকে নিয়ে বানানো ভালো সিনেমা দেখা নেই!”
“কেন বল তো?”
শরদিন্দু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তা ধর, ব্যোমকেশকে নিয়ে কাজ তো আজ থেকে হচ্ছে না। সেই চিড়িয়াখানা নিয়ে মাণিক সিনেমা বানিয়েছিল আজ থেকে ৪৫ বছর আগে, ১৯৬৭তে। মাণিকের সিনেমা, তাতে উত্তম ব্যোমকেশ, ভেবেছিলাম দারুণ হবে কিন্তু...”
“হ্যাঁ, ওটা দেখেছিলাম বলে মনে হচ্ছে।”
“হ্যাঁ, দেখেছ... তাই জানবে, মাণিক ওটা কি বানিয়েছিল! চিত্রনাট্য একদম জোরদার নয়, ব্যোমকেশের পোষা সাপ, ব্যোমকেশ বিবাহিত... পুরো চরিত্রটাই বদলে দিয়েছিল। তারপর তো আবার চীনে না জাপানী সেজে গিয়ে হাজির হবে গোলাপ কলোনিতে! পুরো ব্যাপারটাই ঘেঁটে গেছিল একদম!”
“তুমি মাণিককে জিজ্ঞেস করনি কখনো এই সিনেমাটার কথা?”
“কথা বলেছি, জান তো ডাক্তার। মাণিকেরও একদমই পছন্দ নয় সিনেমাটা। আগেও বলেছে এটা ওর নিজের বানানো সবচেয়ে অপছন্দের সিনেমা। আসলে এই ‘whodunit’ জাতীয় গল্প নিয়ে সিনেমা বানাতে ও একদম স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না। শুনেছি এটা নাকি আসলে ওর কোন সহকারীর বানানোর কথা ছিল, সে ব্যাটা শেষ মুহূর্তে নার্ভাস হয়ে পড়ায় মাণিক ওটা বানায়। ওর পরিকল্পনা ছিল না ওটার।”
“এহেহ!” মাথা নাড়লেন কোনান ডয়াল, “গল্পটা নিয়ে কিন্তু ভালো সিনেমা হতে পারত, এতগুলো অদ্ভুত চরিত্র তোমার বেশী গল্পে নেই!”
“জানি আমি, আর তাই তো মনে হয় যে ব্যোমকেশের কপালটাই খারাপ!”
“হুঁ... তারপর?”
“তারপর আর কি?” শরদিন্দু বললেন, “১৯৭৪ সালে মঞ্জু দে ‘সজারুর কাঁটা’ নিয়ে সিনেমা বানিয়েছিল, ব্যোমকেশ করেছিল সতিন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলে একটা ছেলে, কিন্তু চলেনি ভালো, খুব বেশী লোক দেখেছিল বলেও মনে হয় না!”
“আমিও দেখিনি!” স্বীকার করলেন কোনান ডয়াল!
“এর পর আবার ব্যোমকেশ নিয়ে কাজ হয়ে ১৯৯৩ তে! তবে বাংলায় নয় হিন্দিতে। বাসু চ্যাটার্জী বলে এক পরিচালক ব্যোমকেশকে নিয়ে টিভিতে সিরিয়াল বানিয়েছিল। অনেকগুলো এপিসোড, আর একদম প্রথম থেকে আমার গল্পের order মেনে একটার পর একটা বানিয়েছিল। বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছিল সেই সময়!”
“ব্যোমকেশের অভিনয় কে করেছিল?” কোনান ডয়ালের প্রশ্ন।
“ব্যোমকেশ হয়েছিল রজিত কাপুর বলে একটি ছেলে, আর অজিত হয়েছিল কে. কে. রায়না! রজিত ছেলেটি মূলত নাটকে অভিনয় করত। খুব ভালো করেছিল, আজ অবধি শ্রেষ্ঠ ব্যোমকেশ ওই। তবে কি জান, ঐ ৯৩-৯৪ সালে আমিও যখন দেখেছিলাম ভালোই লেগেছিল, তবে পরে আবার দেখেছি, বেশ কিছু গন্ডগোল আছে। আসলে কম পয়সায় বানানো তো, সেট সেরকম উন্নত মানের নয়, কাপড়ের দেওয়াল দেখলেই বোঝা যায়। এমনকি আভিনয়ও অনেকেরই বেশ খারাপ!”
“সে যাই হোক, তবু তুমি যখন বলছ যে রজিত ছেলেটি শ্রেষ্ঠ ব্যোমকেশ তখন দেখা উচিত। কোথায় পাব?”
“ডিভিডি আছে বাজারে, তবে চাইলে টরেন্ট থেকেও নামিয়ে নিতেই পারো।”
কোনান ডয়াল মাথা নাড়লেন।
শরদিন্দু বলে যাচ্ছিলেন, “এরপরে আর কিছু ছোটখাটো বাংলা সিরিয়াল, সিনেমা এসব হয়েছে, মাঝে কথা হয়েছিল যে ঐ ঋতুপর্ণ ছেলেটি প্রসেনজিৎ কে ব্যোমকেশ বানিয়ে সিনেমা বানাবে...”
ফিক করে হেসে ফেলেছিলেন কোনান ডয়াল, সামলে নিলেন।
“...শেষ অবধি সিনেমা বানালো অঞ্জন দত্ত!”
“অঞ্জন দত্ত! সে কে?”
“এটার উত্তর যদি জানা থাকতো! ছোকরা এক কালে সিনেমায় অভিনয় করত, মৃণালের বেশ কিছু ছবিতে ছিল। তারপর গান লিখতে আর গাইতে শুরু করল। জীবনমুখী, ঐ সুমন, নচিকেতাদের সঙ্গে। সে ভয়ঙ্কর সব গান... হয় দার্জিলিং নাহলে ব্যর্থ প্রেম... এই দুটোই বিষয়...”
“এই দার্জিলিং আমি জানি! ওখানে ‘ম্যায় হুঁ না’-র শুটিং হয়েছিল!” বলে উঠলেন কোনান ডয়াল!
শরদিন্দু প্রখরভাবে কোনান ডয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আজকাল এইসব সিনেমা দেখছ নাকি হে ডাক্তার! বয়স তো কম হল না!!”
কোনান ডয়াল একটু থতমত খেয়ে গিয়ে বললেন, “আহা রাগ করো না ব্যানার্জী। তুমি দেখ, তোমারও দারুণ লাগবে! খুব মজার সিনেমা! আমি তো পুরোটা দেখিনি তাতেই ৭৩টা ভুল আর ২৭টা টোকা জায়গা খুঁজে পেয়েছিলাম! Amazing!”
শরদিন্দু গজগজ করতে করতে বললেন, “তা বসেছিলে যখন পুরোটা দেখেই উঠতে, তোমার গঙ্গাপ্রাপ্তি সম্পূর্ণ হত!”
“ আরে পুরো দেখারই তো প্ল্যান ছিল, আসলে তোমাদের ঐ হিরো যখন একটা সাইকেল রিকশা নিয়ে একটা বোলেরোকে ধাওয়া করল তখন আমি হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে পড়ে গেছিলাম! বিশ্বাস কর! যাকে বলে literally ROTFL!!”
“যাকগে, বাজে কথা ছাড়। তা এই অঞ্জন ছোকরা আজকাল সিনেমাও বানায়, উদ্ভট যত নাম দিয়ে। সে ঠিক করল যে ব্যোমকেশ নিয়ে সিনেমা বানাবে। আদিম রিপু নিয়ে প্রথম সিনেমাটা বানাল, নাম দিল ব্যোমকেশ বক্সী!”
“যাহ্‌! গল্পের নাম দিল না!” অবাক হলেন কোনান ডয়াল!
“শুধু তাই নয়, গল্পের সময়কাল বদলে দিল, চরিত্রগুলোকে বদলে দিল, ব্যোমকেশকে বারে বসিয়ে মদ খাওয়ালো... এমনকি শেষটাও বদলে দিল!”
“শেষটা বদলে দিল মানে? আদিম রিপু গল্পের শেষটাই তো আসল হে! সেই যে তোমাদের স্বাধীনতার দিন ব্যোমকেশ গরম লোহার আংটা দিয়ে একটা একটা করে টাকা পুড়িয়ে ছাই করে দিল! Impact টাই অন্য রকম!”
“তাহলে আর বলছি কি! এক তো ছোকরা গল্পটাকে ১৯৬০ সালে এনে ফেলেছিল, কেন কে জানে! আর শেষে ব্যোমকেশ নাকি টাকাগুলো নিয়ে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে এলোতার চেয়ে পুরো সিনেমাটাই ধরে গঙ্গায় ফেলে এলে পারতো।”
শরদিন্দু উঠে একটা জলের বোতল নিয়ে এলেন, “দ্বিতীয়টা আর এক কাঠি সরেস। চিত্রচোর নিয়ে সিনেমা, গল্পটা মোটামুটি ঠিকই ছিল, কিন্তু চরিত্রগুলোর কোন মাথা মুণ্ডু নেই। ব্যোমকেশ মাঝখানে বন্দুক বের করে চালিয়ে দিল। দুর... দুর, তার মধ্যে আবার এই সিনেমার নাম ‘আবার ব্যোমকেশ’, ছোকরা নাকি একটা তিন নম্বর সিনেমাও বানাবে ‘কহেন কবি কালিদাস’ নিয়ে, সেটার নাম কি দেবে ভেবে আতঙ্কিত হচ্ছি!!”
“বারবার ব্যোমকেশ!” মুচকি হেসে বললেন কোনান ডয়াল! “এটাতে আবার ব্যোমকেশ কে হল?”
“হয়েছে আবীর বলে একটি ছেলে, অভিনয়টা মন্দ করে না, ওর বয়সী বাকি বাঙ্গালী অভিনেতাদের চেয়ে ভাল, আর অজিত হয়েছে শাশ্বত...”
“এক মিনিট! শাশ্বত মানে ঐ বব বিশ্বাস আর হাতকাটা কার্তিক?”
“হ্যাঁ ঠিকই ধরেছ! ওহ... সে আর এক কান্ড! আচ্ছা বল দেখি ব্যোমকেশের সহকারী কে? আমি?”
“না, অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, তোমার alter-ego বলা যায়।”
“একদম! কিন্তু এই ‘আবার ব্যোমকেশ’ দেখতে গিয়ে জানতে পারলাম যে ব্যোমকেশের সহকারী নাকি আমি নিজেই! আয়্যসা রাগ হয়েছে কি বলব!”
“মানে? সে আবার হয় নাকি?”
“আর বল কেন? হঠাৎ দেখি একটা চরিত্র এসে শাশ্বতকে বলছে, আপনার লেখা আমার দারুণ লাগে, ঝিন্দের বন্দী পড়ে খুব ভালো লেগেছিল! আর আবীর মানে সবজান্তা ব্যোমকেশ তাকে বোঝাচ্ছে যে, ঐ যে ঝিন্দের বন্দী ওটা কিন্তু অ্যান্টনি হোপের ‘Prisoner of Zenda’ থেকে টোকা!”
কোনান ডয়াল নিজেই উত্তেজিত হয়ে বললেন, “এটার মানে কি! এর চেয়ে খারাপ তো আর কিছু হতে পারে না! ভয়ঙ্কর!!”
“হ্যাঁ” শরদিন্দু হতাশ ভাবে মাথা নাড়লেন, “এই সবই হচ্ছে, বাঙ্গালীরাও দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত এইসব জিনিস দেখছে। সাধে কি বলেছি যে, ব্যোমকেশের ভাগ্যটাই খারাপ!”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। শরদিন্দু একটু আনমনা হয়ে পড়েছিলেন। কোনান ডয়ালই বা কি বলবেন। তাঁরা লেখক, তাঁরা সাহিত্য সৃষ্টি করেন, এরপর তা যখন সিনেমা বা টিভি তে রূপান্তরিত হয় তখন তাঁদের আর কিছু করার থাকে না। শুধু আশা থাকে যে, হয়তো তাঁদের লেখা যোগ্য মর্যাদা পাবে, হয়তো পরিচালক তাঁদের লেখার মূল সুরটিকে ধরে রাখতে পারবেন। এটুকুই হয়তো তাঁদের প্রাপ্য।



·         লেখার অধিকাংশ মতামত আমার নিজের, অনেকে এর সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন, তবে সেই নিয়ে আলোচনা সব সময়ই স্বাগত।
·        কোনান ডয়াল আর শরদিন্দু নিজেদের মধ্যে কোন ভাষায় কথা বলতেন সেটা নিশ্চয়ই কেউ জানতে চাইবেন না, চাইলে বলি পরলোকে সবাই সব ভাষাতেই পারদর্শী, অসুবিধা হয় না!
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”