Sunday, April 26, 2015

পকেট সচেতন পর্যটক

আমার  সঙ্গে অজিত হালদার মহাশয়ের আলাপ হয় কণাদের সৌজন্যে। যদিও সঠিক ভাবে বলতে গেলে আমার আলাপ হয়েছে শুধুমাত্র ওনার লেখার সঙ্গে। কিন্তু তাঁর লেখা বইগুলো পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এই ভ্রমণপিপাসু, মিশুকে, উৎসাহী কিন্তু হিসেবী, বয়স্ক মানুষটিকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
অবশ্য বয়স্কই বা বলি কী করে? যে মানুষটি এই বয়সেও ছয়-আট বিছানার ডর্মেটরিতে রাত কাটিয়ে, দুধ-পাউরুটি দিয়ে পেট ভরিয়ে, পদব্রজে বা ট্রেন-বাসে করে পৃথিবী বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত পর্যটক দ্রষ্টব্যগুলো ঘুরে বেড়ান তাঁকে কী বয়স্ক বলা চলে!
সে কথায় পরে আসব। আগে তাঁর বইয়ের কথা বা তাঁর নিজের কথা বলি। ড. অজিত হালদার একজন অবসরপ্রাপ্ত অর্থনীতির অধ্যাপক। দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্বভারতী এবং বর্দ্ধমান রাজ কলেজে অধ্যাপনা করেছেন। নিজের বিষয় নিয়ে পড়াশুনো-লেখালেখি ছাড়াও তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় নেশা ভ্রমণ।
এখন কথা হল, ভ্রমণের নেশা অনেকের মধ্যেই থাকে। নতুন, নতুন দেশ দেখতে কারই না ভালো লাগে? কিন্তু সেই নেশাকে সর্বোচ্চ পর্যায় নিয়ে গিয়ে তার পরিপূর্ণতার জন্য কৃচ্ছসাধন করতে সবাই প্রস্তুত থাকে না। আর এখানেই অজিতবাবুর বিশেষত্ব। ওনার বইয়ের পেছনে লেখা ওনার পরিচিতিতে দেখতে পাচ্ছি যে, খুব অল্প বয়স থেকেই উনি সারা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন। মোটর সাইকেল নিয়ে ভারত পরিক্রমা করেছেন চারবার। হিমালয় থেকে থর মরুভূমি, চীন সীমান্ত থেকে আন্দামান, বাদ যায়নি কিছুই।

কিন্তু শুধু নিজের দেশেই নয়, অজিতবাবু পা বাড়িয়েছেন দেশের বাইরেও... এবং আজকের থেকে অনেকদিন আগেই। আজ তো নাহয় সস্তার বিমান কোম্পানিগুলোর দৌলতে ব্যাংকক-পাটায়া ভ্রমণ বাঙালীর স্ট্যাটস সিম্বলের অংশ হয়ে গেছে, কিন্তু অজিতবাবু প্রথম ব্রিটেন গেছেন ১৯৮৭ সালে। শুধুই ঘুরতে। এর পরে আবার গেছেন দুবার।
কিন্তু শুধু ব্রিটেন কেন, আমেরিকা, কানাডা, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, মিশর, ইরান এমনকি লাটভিয়া বা আইসল্যান্ডের মত ইউরোপের ছোট্ট, দুর্গম দেশগুলোও বাদ পড়েনি ওনার ভ্রমণের আওতা থেকে। সব মিলিয়ে ঘুরেছেন প্রায় সত্তরটি দেশে। এশিয়া, ইউরোপ, দুই আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া... ছটি মহাদেশে পা ফেলেছেন তিনি।
আর এই দেশগুলোর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়েই লিখেছেন তাঁর ভ্রমণ-গ্রন্থ, ‘বিশ্বভ্রমণ স্বল্পবিত্তে’। এই বইয়ের ছটি খন্ডের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে ওনার ঘোরার গল্প। সে লেখায় যদি আপনি ঝঙ্কারময় বাংলা গদ্যের খোঁজ করেন তাহলে সে লেখা আপনার না পড়াই ভালো। কিন্তু হালকা, ঝরঝরে ভাষায় একটা দেশ ভ্রমণের দিন কয়েকের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যদি আপনি সেই দেশের মানুষগুলোকে একটু হলেও চিনতে চান, সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চান, তাহলে এই বই আপনার ভালো লাগা উচিত। শুধু তাই নয়, নিজে যদি যেতে ইচ্ছে করে, তাহলেও ঠিক মত ভ্রমণ পরিকল্পনার জন্যও এই বইগুলো দুর্দান্ত। কারণ অজিতবাবু নিজে অত্যন্ত বিবেচনা করে, সব দিক ভেবে ছক কষে পরিকল্পনা করে ঘুরেছেন। আর নিজের থাকা-খাওয়ার ক্ষেত্রে হিসেব করে চললেও ভ্রমণের ব্যাপারে খুব বেশী কার্পন্য উনি করেননি।
ওনার ঘোরার এই দিকটার কথা আগেই বলেছি। বইয়ের নামেও বোঝাই যাচ্ছে অজিতবাবু পয়সার দিকটা হিসেব করে ঘোরেন। তেমন কিছুই না, উনি ইউথ হোস্টেল অ্যাসোসিয়েশান অফ ইন্ডিয়ার সদস্য এবং তার দৌলতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইউথ হোস্টেলে ঘর ভাড়ায় ছাড় পান। কিন্তু এর জন্য তাঁকে থাকতে হয় ডর্মেটরিতে আরও সাত-আট জন পর্যটকের সঙ্গে। সাধারণত একাই ঘোরেন এবং হোস্টেল থেকে শহরের মধ্যে দু-তিন কিলোমিটার অবধি দূরত্ব পায়ে হেঁটেই পৌঁছে যান। তার বেশী দূরত্ব হলে বাসে ওঠেন। বিভিন্ন পর্যটন স্থানেও যান বাসে করে বা সারাদিনের ঘোরার প্রোগ্রামে নাম লিখিয়ে। ট্যাক্সি চড়ে যাওয়ার প্রশ্নই নেই। রেস্টুরেন্টে খেতে যান না। নিজেই বাজার থেকে দুধ, সিরিয়াল, পাউরুটি, কলা বা বার্গার কিনে পেট ভরিয়ে নেন। কিছুই না, এইসব দিকে পয়সা বাঁচাতে পারলে সেই দিয়ে হয়তো আরও একটা নতুন দেশ ঘুরে আসবেন তিনি।
দু-একবার অবশ্য উনি ওনার স্ত্রীকে নিয়ে বা ছেলে-বউয়ের সঙ্গে ভ্রমণে বেরিয়েছেন তবে সেগুলো তেমন জমেনি। সবদিক হিসেব করা না চলতে পারার হতাশার দিকটা তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে। এছাড়া কোন কোন জায়গায় তাঁর লেখা শুষ্ক বর্ণনায় ভরা। অন্যান্য লেখকদের তুলনায় সাহিত্যগুণ কম এবং ঘটনাবহুল নয়। সেটা সম্ভবত তাঁর নিয়মিত লেখার চর্চা না থাকার ফল।
অজিতবাবুর লেখার আর একটা উল্লেখযোগ্য দিক হল স্থানীয় মানুষের সঙ্গে ওনার আলাপচারিতাযদিও অজিতবাবু একাই ঘোরেন কিন্তু যে দেশে যাচ্ছেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে ছাড়েন না। তাদের সঙ্গে সেই দেশ নিয়ে কথা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝতে চেষ্টা করেন। কখনো সে দেশের সুপার মার্কেটে গিয়ে চালের দাম দেখে বর্দ্ধমানের চালের দামের সঙ্গে তুলনা করেন, কখনো বা সেই দেশের একজন অধ্যাপকের সঙ্গে ভারতের একজন অধ্যাপকের পারিশ্রমিকের তুলনা করে সেই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাটা বুঝতে চেষ্টা করেন।
যারা ঘুরতে যেতে ভালোবাসেন তাঁদের অবশ্যই উচিত অজিতবাবুর বইগুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা। কিছুই না এই ভ্রমণ-প্রেমিক মানুষটির দেশভ্রমণের গল্পগুলো পড়লে নিজেদের ঘোরার ইচ্ছেগুলোও মনের গোপন থেকে বেরিয়ে এসে উঁকিঝুঁকি মারবে! তখন শুধু বেরিয়ে পড়ার অপেক্ষা!

2 comments:

  1. Bhalo laglo. Mohanlal Gangopadhyay r Lafa Yatra r kotha mone porlo. Tomar lekhar por boita kinte hobe.

    ReplyDelete
  2. Hna... boi gulo bhalo! Ei Lafa Yatra r kotha bodh hoe Nabarun er kono ekta boi te chhilo.

    ReplyDelete