Sunday, July 16, 2017

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৪

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ১     ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ২          ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৩ 


ছবিঃ কঙ্কনা
বালিতে নেমে যখন এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ালাম তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। বালিতে আমাদের হোটেল ছিল মায়া ভিলেজ, কুটা বিচের কাছেই। এয়ারপোর্ট থেকে ১০ কিলোমিটারও হবে না, কিন্তু তার জন্য প্রিপেড ট্যাক্সি ভাড়া দেখাচ্ছিল দু লাখ ইন্দোনেশিয়ান টাকা মানে ভারতীয় টাকায় ১০০০ টাকা। তখনই বালির খরচার ব্যাপারটা বুঝলাম। শেষ অবধি এক লাখ সত্তর হাজার টাকায় একটা গাড়ী ধরে বেরোলাম। এয়ারপোর্টের বাইরেটা বেশ সুন্দর কিন্তু লং উইকেন্ডের শুরু বলে একের পর এক প্লেন ভর্তি ট্যুরিস্ট নামছে বলে ভালোই জ্যাম ছিল। যাই হোক জ্যাম কাটিয়ে আধ ঘন্টার মধ্যে হোটেল খুঁজে বের করা গেল। এখানে একটা ড্যুপ্লেক্স ঠিক করা ছিল। হোটেলের একদম ধারে ঘরটা। প্রথমে একটা হল মত বসার জায়গা তারপর নিচে একটা ঘর, লাগোয়া বাথরুম। ওপরে আর একটা ঘর এবং বাথরুম। ভালোই ব্যবস্থা। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে নৈশাহারে স্থানীয় খাবার, স্টেক ইত্যাদি এবং বিন্টাং নামক স্থানীয় লেমন ফ্লেভারড বিয়ার খেয়ে ফিরতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি নেমেছে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই হোটেলে ফেরা হল। পরদিন ভোর ভোর বেরোনোর প্ল্যান। কুটার উত্তরে লিবার্টি নামক একটি অ্যামেরিকান জাহাজের ধ্বংসাবশেষে স্কুবা ডাইভিং করার পরিকল্পনা আছে। সকালে সাতটায় গাড়ী এসে নিয়ে যাওয়ার কথা।
স্কুবা ডাইভ বস্তুটা কী তা নিয়ে পাঠকদের (বহুবচন... হুঁ হুঁ বাওয়া!) ধারণা আছে আশা করি। তবু সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটা হল ভালো মত ট্রেনিং নিয়ে ধড়াচুড়ো পরে মুখে অক্সিজেন মাস্ক এবং পায়ে পাখনা লাগিয়ে জলের তলায় নামা এবং মাছেরদের রাজ্য থেকে ঘুরে আসা। সঙ্গে অবশ্যই ট্রেনার থাকেন। কুটার এই 'লিবার্টি শিপরেক' একটি পৃথিবী বিখ্যাত ডাইভ সাইট, সারা বিশ্বের ডাইভ-প্রেমিকরা আসেন এখানে। আমরাও গেলাম। প্রথমে শহরের মধ্যে যে সংস্থা আমাদের ডাইভের ব্যবস্থা করছে তাদের অফিসে গিয়ে ফর্ম-ফিলাপ, পোশাকআশাক পরে দেখে নেওয়া, সব ঠিক আছে কিনা। আমাদের ট্রেনার ছিলেন এক স্থানীয় ইন্দোনেশিয় যুবক এবং রবার্ট নামক বিশালদেহী এবং গম্ভীর এক জামাইকান। জামাইকান শুনেই ক্রিস গেলের কথা জিজ্ঞেস করায় খুব একটা পাত্তা পেলাম না বরং গম্ভীরভাবে তিনি যা বললেন, তা হল তাঁর এই ৪৫ বছরের জীবনে তিনি শুধু পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ডাইভিং করে গেছেন এবং অন্যান্য খেলাধুলো নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন।
ছবিঃ দেবা
সেখান থেকে দু ঘন্টারও বেশী রাস্তা ঘুমোতে ঘুমোতে এবং মাঝে মাঝে কানের ভেতরে বায়ুর চাপের সামঞ্জস্য রাখার প্র্যাকটিস করতে করতে যাওয়া হল। জলের তলায় নামলে এই বায়ুর চাপের সামঞ্জস্য রাখাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
যাই হোক, আমাদের যাত্রাপথের শেষে ঠিক সমুদ্রের ধারে একটা রিসর্টের মত জায়গায় পৌঁছনো গেল। সুন্দর পার্কের মত, ধার দিয়ে সমুদ্রে সিঁড়ি নেমে গেছে। পার্কের মধ্যে একটা সুইমিংপুল যেখানে আরো অনেকে ডুবসাঁতার প্র্যাকটিস করছেন। আমরাও একটু ধাতস্ত হয়ে নেমে পড়লাম পুলে। অবশ্যই সমস্ত জিনিসপত্র চাপিয়ে। আমাদের একেবারেই বিগিনার্স কোর্স, দেবার এসব আগেই করা, তাই ও চলে গেল একটা ডাইভে। দুই ট্রেনার পড়লেন আমাদের নিয়ে। ঈশিতা, ড্যুড আর কঙ্কনার সঙ্গে সেই ইন্দোনেশিয়ান ছেলেটি আর আমাকে এবং শ্রেয়সীকে নিয়ে পড়ল রবার্ট। পরবর্তী এক ঘন্টা জলের মধ্যে সাঁতার, আকার-ইঙ্গিত, দম নেওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দরকারী জিনিসের অনুশীলন চলল। আমি এবং শ্রেয়সী দুজনেই জলে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম না। রবার্টও যে খুব একটা সাহায্য করছিল তা নয়, মানে হয়তো চেষ্টা করছিল কিন্তু ওর গম্ভীর বকুনির চোটে আমি আর শ্রেয়সী দুজনেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম এবং শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম যে আমরা সমুদ্রের তলায় যাওয়া থেকে বিরত থাকব। কিছুই না, আমার মনে হয়েছিল যে, যদি জলের তলায় নেমে ছড়াই তখন আমার জন্য বাকিদেরও তাড়াতাড়ি উঠে আসতে হলে সেটা একটা লজ্জাজনক ব্যাপার হবে।
বাকিরা অনেক বোঝালেও আমরা রাজী হলাম না। সুতরাং মধ্যাহ্নভোজনের পর বাকি চারজন ট্রেনারদের সঙ্গে জলে নামল এবং আমি আর শ্রেয়সী সমুদ্রের ধারে বসে ঘন নীল জলের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।
মোটামুটি আধা ঘন্টার মধ্যেই একে একে চার মূর্তিমান/মতী জল থেকে উঠে এল। মোটামুটি কারো জলের তলায় কোন অসুবিধে হয়নি সেটা ভাল ব্যাপার।

ফেরার পথে ওদের জলের তলার গল্প শুনতে শুনতে এবং বিয়ার খেতে খেতে যখন আবার কুটায় ফিরলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। কিন্তু রাত তখনও বাকি!