Sunday, March 12, 2017

কেএলে কয়েক মাস - ২

দু সপ্তাহ ধরে এখানে থাকার পর আস্তে আস্তে এখানকার মানুষ, তাঁদের পছন্দ-অপছন্দের দিকটা পরিষ্কার হয়ে আসছে। এমনিতে কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন জনজাতির লোক দেখা যায়। দেশের প্রধান তিনটি জনজাতি হল মালয় (৪৬%), চাইনিজ (৪৩%) এবং ভারতীয় (১০%)। এই ভারতীয়দের অধিকাংশই দক্ষিণ ভারত থেকে কয়েকশো বছর আগে এখানে এসে স্থায়ীভাবে থেকে গেছেন। তাই এখানে ভারতীয় সংস্কৃতি বা খাদ্য বলতে মূলত দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি বা খাদ্যকেই বোঝায়। 
আমার সঙ্গে প্রথম আলাপচারিতায় এখানকার স্থানীয় ভারতীয়রা আমার তামিল না জানায় খুবই আশ্চর্য হয়েছেন। এখানকার লোকেদের বোধহয় ধারণা ছিল যে, তামিল ভারতের প্রধান ভাষা। সেই ভুল ভেঙে দিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা হিসেবে হিন্দির উল্লেখ করায় এঁরা বললেন, "ওহ, ইউ আর পাঞ্জাবি!" তখন তাঁদের ভারতের অন্যান্য ভাষা সম্বন্ধে জ্ঞান দিয়ে বাংলাদেশের লোকেরা এবং আমরা এক ভাষায় কথা বলি ইত্যাদি বলে কিছুটা বোঝানো গেল।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, কলকাতা থেকে কে এলে ঘুরতে এলে ভাষা এবং খাওয়া নিয়ে খুব একটা সমস্যা হবে না এবং তার প্রধান কারণ হল শহরের অন্যতম বড় বাংলাদেশী জনজাতি। এই শহরের রাস্তায় আমি হিন্দির চেয়ে বাংলা বেশী শুনেছি এখন অবধি। ছাত্র, চাকুরিরত, দোকানের বা রেস্তোরার কর্মচারী, এই শহরে বাঙ্গালদেশীর অভাব নেই। সত্যি কথা বলতে, দোকানে-টোকানে আমাদের মত চেহারার লোকজন দেখলে, "বাংলা জানেন?" দিয়ে শুরু করাই ভালো। এবং এঁরা দেশের লোকেদের ভালোই বাসেন। দ্বিতীয়বার গেলে চিনতে পারলে কুশল সংবাদ নেন।
দেশের কোন ডিস্ট্রিক্টের লোক জিজ্ঞেস করেন এবং "ডিস্ট্রিক্ট কলকাতা" শুনলেও এদের ব্যবহারের উষ্ণতা হ্রাস পায় না!
আমার সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকের 'মিনি পাশার' (মানে ছোট বাজার) নামক মুদির দোকানটা একদল বাংলাদেশী ছেলেই চালায়। সকালেই তাদের সাহায্য নিয়ে চাল, আলু, ডিম, নুন ইত্যাদি নিয়ে এলাম। দু সপ্তাহ বাইরের খাবার খেয়েছি। এবার নিজের হাতের রান্নার জন্য মন কেমন করছে!
এখানকার লোকেরা খেলা ভালোবাসে, অফিসে রোজ সকালে আলোচনাও হয় এবং সেটা প্রধানত ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে। এবং শুধু বাচ্চারা নয় বয়স্ক কাকু এবং মাসিমাদেরও দেখলাম খেলা নিয়ে দিব্যি ইন্টারেস্ট এবং বেশ মন দিয়ে ফলো করেন। যদিও এখানকার সময় ভারত থেকেও আড়াই ঘন্টা এগিয়ে তাই অধিকাংশ খেলাই হয় গভীর রাতে কিন্তু তাও অনেকেই দেখেন এবং আলোচনা করেন।
আর গত দু সপ্তাহে ফুটবলে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে লেস্টারের কাছে লিভারপুলের হার, তারপর লিভারপুলের আর্সেনালকে হারানো, জ্‌লাটানের সাস্‌পেন্সান, বার্সার ৬-১ কামব্যাক... এর সবগুলো নিয়েই অফিসে আলোচনা হয়েছে। ফুটবল ছাড়াও এখানকার লোকেরা ব্যাডমিন্টন আর হকি ফলো করেন। আমি কিছু পাবে লাইভ হকি ম্যাচ হতেও দেখেছি। ক্রিকেট সম্বন্ধে যা বুঝলাম, ব্যাপারটা অনেকেই জানেন, কোন দেশ খেলে সেগুলো জানেন, ভারতের জনপ্রিয়তাও জানেন তবে ডিটেল সেরকম কেউ জানেন না। কেউ বললেন, "ইন্ডিয়া এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান তো!" বুঝলাম যে, ২০১৫ সালের ওয়ার্ল্ড কাপের খবর পাননি। কেউ হয়তো ভিরাট কোহলির নাম জানেন কিন্তু সে কী করেছে খবর রাখেন না। ঐ ভারতে লোকে যেভাবে টেনিস বা রাগবি ফলো করে সেরকম আরকি।
যদিও এদেশে ক্রিকেটের ইতিহাস আছে এবং তার কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ১৯৫৭ সালের স্বাধীনতা অবধি এখানে বসবাসকারী ব্রিটিশ জনসংখ্যা। আমার মনে আছে এখানে কিনারা ওভাল বলে একটা মাঠে একটা সময় খেলা হত। ২০০৬ সালে একটা ত্রিদেশীয় সিরিজও হয়েছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়ে। জায়গাটা ম্যাপে দেখে রেখেছি, কোন একটা উইকেন্ডে হয়তো দেখে আসব গিয়ে।
এখানে ইপিএল বা চ্যাম্পিয়ান্স লিগ প্রচার হওয়ার একটা বড় কারণ এখানকার খবরের কাগজগুলো। ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে ম্যাচ রিপোর্ট তো বটেই রীতিমত আলোচনাভিত্তিক প্রবন্ধ বেরোয় খেলোয়াড় এবং কোচেদের নিয়ে। ক্রিকেট নিয়ে রিপোর্টিং খুবই অদ্ভুত। এই কদিনে শুধু ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট নিয়ে সামান্য রিপোর্টিং দেখলাম। অনেকটা আমাদের দেশের ডোমেস্টিক ম্যাচ রিপোর্টগুলোর মত। কিন্তু শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ বা নিউজিল্যান্ড-সাউথ আফ্রিকা টেস্ট ম্যাচগুলো নিয়ে একটা লাইনও চোখে পড়েনি।

সারা সপ্তাহে অফিসে ভালোই চাপ ছিল তাই কাল খুঁজে খুঁজে একটা হট এয়ার বেলুন শোয়ে গেছিলাম বিকেলের দিকে। প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূরে। একটা বেশ বড় খোলা জায়গায় বেশ মেলার মত বসেছিল। প্রায় হাজার পাঁচেক লোক হয়েছিল মনে হল। বেশ নাচ-গান, কনটেস্ট, ছোট ছোট খাবার দোকান ভালোই ছিল। কিন্তু চার খানা গোদা বেলুন দাঁড় করিয়ে সেগুলো ওড়ালো না কেন বুঝলাম না। হয়তো যখন তখন বৃষ্টি হতে পারে ভেবে ওড়ায়নি কিন্তু ব্যাপারটা বেশ অ্যান্টিক্লাইম্যাটিক!


আর সকালে বেরিয়েছিলাম মিউজিয়াম দেখতে। টেলিকন মিউজিয়াম, ন্যাশানাল টেক্সটাইল মিউজিয়াম, কুয়ালালামপুর সিটি গ্যালারি আর থ্রিডি আর্ট মিউজিয়াম দেখে এলাম। সিটি গ্যালারিতে পুরো শহরের মিনিচেয়ার ভিউয়ের সঙ্গে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোটা বেশ ভালো লেগেছে। তবে ৫০ রিঙ্গিট (৭৫০ টাকা) দিয়ে ঐ থ্রিডি আর্ট গ্যালারি মোটেই সুবিধার নয়।







সঙ্গের ছবিগুলো কালকে তোলা।

Saturday, March 4, 2017

কেএলে কয়েক মাস - ১

সপ্তাহখানেক হল কুয়ালালামপুরে এসে আস্তানা গেড়েছি। অফিসের চক্করেই। আপাতত মাস তিনেক থাকার কথা। এক-দেড় মাস বাড়তেও পারে। পার্ক রয়্যাল কোম্পানির সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টে একটা সুইটে বেশ গুছিয়ে বসেছি।

বেশ ভালো জায়গা এই কেএল। অনেক রকমের মানুষ। আসলে মালয়শিয়া দেশটাই বিভিন্ন জনজাতির সম্বনয়ে তৈরি। ধরুন তিনটি মানুষের নাম যথাক্রমে চে চুন লিম, মহম্মদ বিন আসলাম, নাগাশেখরন জালাকাট্টি। এরা তিনজনেই কিন্তু মালয়শিয়ার আদি বাসিন্দা হতে পারেন। এর সঙ্গে কর্মসূত্রে এবং ভ্রমণের কারণে একপাল ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশী, মধ্য এশিয়ার লোক, আমেরিকান এবং ইউরোপীয়রা এই শহরে ঘুরে বেরাচ্ছেন। একেবারেই কসমোপলিটন এবং সেইজন্যেই রেস্তোরা, কারেন্সি কনভার্টার আর স্যুভেনির স্টোরের প্রাচুর্য্য।
এশিয়ার অন্যতম চকচকে শহর হওয়ায় এখানে সময় কাটানোর ব্যবস্থার অভাব নেই। যদিও সকালে কিছু করার সময় থাকে না। আটটায় ঘর থেকে নেমে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যাই। রাজা চুলান স্টেশন থেকে মনোরেলে করে যাই হাংটুয়া। সেখানে লাইন চেঞ্জ করে কেএলআরে চেপে যাই মসজেদ জামেক। সেখানে স্টেশন থেকেই বেরিয়েই আমার অফিস। সব মিলিয়ে গোটা পাঁচেক স্টেশন। ঠিকঠাক ট্রেন পেয়ে গেলে বারো-তের মিনিট লাগে। এখানকার এই মনোরেল এবং এলআরটির কভারেজ ভালোই। যেকোন জায়গায় যেতে গেলে শুধু বুঝে নিতে হয় যে কোন স্টেশনে গিয়ে লাইন চেঞ্জ করতে হবে। বাকিটা খুব সহজেই হয় যায়।

সাড়ে আটটা নাগাদ অফিসে ঢুকি। বেরোই সাতটা নাগাদ। তখন আমার ঘোরার সময়। কখনো হেঁটে ফিরি। আসলে আমার অফিস থেকে পার্ক রয়্যাল সোজা রাস্তা। মিনিট কুড়ি লাগে হেঁটে। আর ট্রেন লাইনটা ঘুরে যায়।
কিন্তু দিনের বেলা অত সময় থাকে না হাঁটার। জায়গাটা বেশ গরম, সেটাও একটা কারণ, সকালে না হাঁটার। যদিও গত সপ্তাহে প্রায় রোজই সন্ধ্যের দিকে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। তবে আমি যেখানে থাকি তার চারদিকে এত শপিং মল যে বৃষ্টি পড়লেই টুক করে কোথাও একটা ঢুকে পড়া যায়। আর এখানকার মলগুলো বিশাল জায়গা জুড়ে বানানো তাই কিছুক্ষণ টাইম-পাস হয়েই যায়।

আমি যে রাস্তায় থাকি তার নাম জালান নাগাসারি। জালান মানে রাস্তা তাই এখানকার ঠিকানায় জালানের ছড়াছড়ি। আর জালান নাগাসারি থেকে দু মিনিট হাঁটলেই বুকেত বিনতাং। বুকেত বিনতাং হল পাতি কথায় কুয়ালালামপুরের পার্ক স্ট্রিট যদিও অনেক বেশী ঝাঁ-চকচকে। সেখানে গাদা খানেক শপিং মল, গুচ্ছ গুচ্ছ খাবার জায়গা, দোকান-পাট, ফুড স্ট্রিট সব আছে! ফুড স্ট্রিটের নাম হল জালান আলোর। গত শনিবার সন্ধ্যেবেলা গেছিলাম। রাস্তার ওপর সারি সারি চেয়ার-টেবিল পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তাতে ভ্যারাইটির অভাব নেই।

খাবারের প্রসঙ্গে বলে রাখি, আপাতত দোকানে-রেস্টুরেন্টেই খেয়ে বেরাচ্ছি এবং যেটা বুঝেছি যে, এখানকার ভারতীয় খাওয়ার জায়গার তুলনায় পাকিস্তানি (দেশদ্রোহী বলবেন না প্লিজ) এবং অন্যান্য মধ্য এশিয়ার (যেমন লেবানিজ, ইরানিয়ান) দোকানগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কারণ এখানকার অধিকাংশ ভারতীয় হোটেলই দক্ষিণ ভারতীয় স্টাইলে রান্না করে এবং কারিপাতাযুক্ত খাবারের প্রতি আমার বিতৃষ্ণার কথা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশী রেস্তোরাই দেখেছি, যার নাম 'ESO KHAI', এখনও খেতে যাওয়া হয়নি।

গত রবিবার গিয়ে সামনে থেকে বড়বাড়ি এবং জোড়াবাড়ি (বন্ধু দেবাদ্রির ভাষায়) দেখে এসেছি। এগুলো আর কিছুই নয়, যথাক্রমে কুয়ালালামপুর টাওয়ার আর পেট্রোনাস টাওয়ার। পেট্রোনাস টাওয়ারের নীচের সুরিয়া মল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত মলগুলোর একটা। গত রবিবার সেখানে ঘুরে নান্দোজে দিব্যি পর্তুগিজ চিকেন খেয়ে এসেছি!এছাড়া প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো সেন্ট্রাল মার্কেটও একটা বেশ দেখার মত জায়গা এবং সেটা আবার আমার অফিসের ঠিক পেছনেই।

আপাতত এই অবধিই। আগামী তিনমাসে আরো বেশ কিছু জায়গা ঘোরা হয়ে যাবে আশা করছি। সেগুলোর ছবিও ঠিক সময় মত ব্লগে চলে আসবে!



Tuesday, February 14, 2017

একটি সুপ্রাচীন কাহিনী

আমার এই কাহিনীর সময়কাল অতি প্রাচীন। কত প্রাচীন সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে সঠিকভাবে নাইএই মানব সভ্যতা তখন সবে হামাগুড়ি দিতেছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে গুরুজনদের সাহায্য গ্রহণ অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং শরদিন্দুর হইতে ঋণ লইয়া বলি,
'সন-তারিখ দিয়া বলিতে পারিব না। সন-তারিখ তখনও তৈয়ার হয় নাই। তখন আমরা কাঁচা মাংস খাইতাম।'
এই পৃথিবীতে সেই সময় দেশ বলিয়া কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। পর্বতময় অরণ্যসংকুল সেই স্থানে দুটি উপজাতি পাশাপাশি বসবাস করিত। অরণ্যের ঠিক মধ্যভাগ দিয়া একটি নদী বহিয়া গিয়াছিল। স্থানীয় ভাষায় সেটির নাম ছিল যশহোর। এই যশহোরের পূর্ব দিকে যে উপজাতিরা থাকিত তাহারা নিজের মাচস্‌ এবং পশ্চিমতীরের উপজাতিরা নিজেদের লোটস্‌ বলিয়া উল্লেখ করিত। নদীর নিকটবর্তী অরণ্যে পশু এবং নদীতে মৎস্য শিকার করিয়াই তাহারা দিন অতিবাহিত করিত
পশুপক্ষী শিকার ব্যতীত উহাদের কাজ ছিল পরস্পরকে উত্যক্ত করা লোটস্‌ এবং মাচস্‌ এই দুই উপজাতির মধ্যে দীর্ঘদিনের এক বিবাদ উপস্থিত ছিল। তাহারা একে অপরকে মনুষ্য পদবাচ্য বলেই মনে করিত না। একে অপরকে দেখিলেই মর্কট, অকালকুষ্মাণ্ড, বরাহনন্দন ইত্যাদি গালি পাড়িতশুধু তাহাই নহে, এক অপরের পৃষ্ঠের চর্মাবরণ তুলে দিবার সাবধানবাণী ঘোষণা করিত এবং সময়বিশেষে করিয়াও দেখাইতলোটস্‌ এবং মাচস্‌দের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগিয়াই থাকিত। তাহাতে দুই পক্ষেরই যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হইলেও কেহই ইহার অবসান ঘটাইতে প্রস্তুত ছিল না। এবং সময়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া তাহাদের যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল প্রস্তর খণ্ড যাহা দূর-দূরান্ত হইতে ইহারা পরস্পরের উপর নিক্ষেপ করিত। বর্তমানকালের ন্যায় ছুরি, পাইপগান বা পেটো সম্বন্ধে ইহাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটে নাই।
এই সময় মাচস্‌ উপজাতির তরুণ নেতা তব্রপোত ঠিক করিল এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাইতে হইবে। তন্মধ্যে ইহারা একে অপরের শিকার হরণ করিতে শুরু করিয়াছেন। এমনকি বেকায়দায় পাইলেই নানাবিধ অপমানেরও খামতি হইতেছিল না। কিছুদিন পূর্বেই একদল লোটস্‌ দুটি মাচস্‌ বালককে একাকী পাইয়া তাহাদের একে অপরে কর্ণ আকর্ষণ করিয়া তিন ঘটিকা দণ্ডায়মান রাখিয়াছিল। প্রত্যুত্তরে কল্য কিছু মাচস্‌ দুই স্নানরত লোটস্‌কে ধরিয়া ধারালো প্রস্তর দিয়ে মস্তকের অর্দ্ধেক কেশ কর্তন করিয়া একটি গর্দভের পৃষ্ঠে বসাইয়া তাহাদের নদীর পরপারে পলায়ন করিতে বাধ্য করিয়াছে। ফলস্বরূপ প্রভাত হইতেই লোটস্‌ ভূমি হইতে একের পর এক প্রস্তর খণ্ড উড়িয়া আসিতেছে এবং নদী কূলবর্তী গৃহগুলিতে বিস্তর ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি করিতেছে।
এহেন পরিস্থিতিতে তব্রপোত তার পোষ্য সারমেয়টিকে বগলদাবা করিয়া তাহার প্রধান পরামর্শদাতা কষেভি অবুবার উদ্দেশ্যে গমন করিল। কষেভি একাধারে জাদুকর, বৈজ্ঞানিক, রন্ধন-বিশারদ এবং অতিশয় জ্ঞানী ব্যক্তিকেহ কেহ ইহাও বলিয়া থাকে যে কষেভি ভবিষ্যৎ দর্শনেরও ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছে যদিও সে বিষয়ে তব্রপোত সম্যক ধারণা ছিল না। সে গিয়া দেখিল, কষেভি তাহার গৃহের পিছন দিকে এক বৃহৎ গর্ত খনন করিয়া তাহার ভিতর বিবিধ শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ড একত্র করিয়াছে। তব্রপোতকে দেখিয়া সে বলিল,
"এসো হে শাল-বৃক্ষ! কী সংবাদ?" অন্য মাচস্‌দের তুলনায় তব্রপোত উচ্চতায় অনেকটাই বেশি ছিল।
"তোমার কী সংবাদ? এই আয়োজন কীসের?"
"ইহা এক নতুন জাদু! কৃত্রিম পদ্ধতিতে অগ্নি জ্বালাইয়া এই শাখাপ্রশাখায় আমি তাহা ধরিয়া রাখিয়াছিসেই আগুনে ছাগ-মাংস, গো-মাংস, বন্য বরাহ-মাংস, কুক্কুট-মাংস ইত্যাদি সিদ্ধ করিয়া খাইতেছি। শুধু তাহাই নহে, তাহার সঙ্গে বিভিন্ন উদ্ভিদও সিদ্ধ অবস্থায় খাইয়া দেখিতেছি।"
"উদ্ভিদ খাইতেছ? বাণপ্রস্থে যাওয়ার সময় কি আগতপ্রায়?" তব্রপোত চক্ষু টিপিয়া জিজ্ঞাসা করিল।
"মুর্খ! শুধু উদ্ভহিদ ভক্ষণ যে সুখকর নহে তাহা আমিও জানি। কিন্তু এ সবই আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়। এহেন অগ্নি পৃথিবীর আর কোথাও এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। তাই ইহার ব্যবহার সম্বন্ধেও লোকের বিশেষ ধারণা নাই। আমি তাহাই বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছি। শুধু তাহাই নহে, তণ্ডুল-জাতীয় দানাশস্যকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা তাহাও আমার গবেষণার বিষয়। যাহা হউক তোমার এই দগ্ধস্থূলকন্দক পূর্ণ মস্তকে এসব প্রবেশ করিবে না? কী কারণে আসিয়াছ বল?"
"বলতেছি যে, লোটস্‌দের সঙ্গে যুদ্ধ করে তো আর পারিয়া উঠিতেছি না। এই যুদ্ধের তো কোনরূপ শেষ নাই! একটা কিছু সমাধান বের করিয়া দাও না!"
"যাও তো বাপু, বিরক্ত করিও না। ইহা তো তোমাদের শিশুদের মত যুদ্ধক্রীড়াপরস্পরের কেশাকর্ষণ তথবা কর্ণাকর্ষণ করিয়া মজা দেখিতেছে। বরং বাপু ওই দলের অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করিয়া কথা বলিলেই হয়। বাক্যালাপে সর্ব সমস্যারই সমাধান হয়।"
কষেভির দ্বারা বিতাড়িত হইলেও তাহার কয়েকটি কথা তব্রপোতের মনে বিশেষ রেখাপাত করিল। সে মনে মনে এক পরিকল্পনা করিয়া দূতকে তাহার সহিত দেখা করিবার জন্য খবর পাঠাইল।
লোটস্‌দের কাছে যেতে হবে শুনিয়াই দূতবাবাজী বাঁকিয়া বাসিয়াছিল। অনেক কষ্টে বিভিন্ন পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া তব্রপোত তাহাকে সম্মত করাইতে সক্ষম হইল। বাক্যালাপ যে প্রয়োজন সে বিষয়ে তব্রপোত কষেভির সহিত একমত হইয়াছিল। তাহা ব্যাতীত আরো কিছু প্রস্তাব তাহার মস্তিষ্কে ছিল, যাহা লইয়া চিন্তা ভাবনার জন্য কতিপয় দিবস হাতে রাখিয়া তব্রপোত চিঠি লিখিল লোটস্‌ দলপতির প্রতি। লিখিতে গিয়া সে উপলব্ধি করিল যে এত যুদ্ধ সত্ত্বেও লোটস্‌দের দলপতির পরিচয় সম্বন্ধে সে অবগত নহে। সাধারণ যুদ্ধ সেনাপতিরাই পরিচালনা করিয়া থাকেন,  সেই কারণে তব্রপোত লোটস্‌দের দলপতির সম্মুখে কোনদিন আসে নাই।
কয়েক দিবস পর কাঁপিতে কাঁপিতে হাতে একখানি শ্বেত বস্ত্রখণ্ড লইয়া দূত মহাশয় লোটস্‌ শিবিরে গিয়া তব্রপোতের আমন্ত্রনপত্র প্রদান করলেন। লোটস্‌রাও দেখা গেল, এই প্রস্তাবে একবাক্যে রাজী হইয়া গেল। বয়স্ক ব্যাক্তিগণ তাঁদের নেতার সঙ্গে কথা বলিয়া দূতকে জানাইলেন যে, সাড়ে ছয় সপ্তাহ পরে লোটস্‌ দলাধিপতি মাচস্‌ দলাধিপতির সহিত যশহোর নদীর তীরে সাক্ষাতে সম্মত হইয়াছেন।
দূতের নিকট এই বার্তা শুনিয়া তব্রপোত তাহার পরিকল্পনাকে বাস্তবে পরিণত করতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। ঐদিন ছড়াইলে চলিবে না! প্রায়শই তাহাকে কষেভির গৃহের উদ্দেশ্যে যাইতে দেখা গেল। বুঝা যাইল, ইহারা দুজনে মিলিয়া একটি বিশেষ ফন্দি আঁটিতেছে!
দেখিতে দেখিতে শীর্ষ সম্মেলনের দিন উপস্থিত হইল। সকাল হইতে সাজো সাজো রব। তব্রপোত তাহার শ্রেষ্ঠ ভল্লুক চর্মের পোশাক পরিধান করিয়া সঙ্গী সারমেয়টিকে লইয়া তাহার উপজাতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে যশহোরের তীরে উপস্থিত হইল। যদিও কষেভিকে সেখানে দেখা যাইতেছিল না, কিন্তু সেদিকে দেখিবার সময় কাহারও ছিল না।
অল্পক্ষণের মধ্যেই নদীর বুকে বেশ কিছু সংখ্যক ভেলক দেখা দিল। তাহাদের মধ্যভাগের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল, সুসজ্জিত ভেলকটিতেই যে লোটস্‌দের অধিনায়ক আছেন তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। ভেলকবৃন্দ নিকটে আসিতেই লোটস্‌দের অভাগ্যতদের আকার মাচস্‌দের দৃষ্টিগোচর হইল। তাহাদিগের সেনাপতিবৃন্দ সৈন্যসমাগমে সম্মুখের ভেলকগুলিতে আসীন ছিলেন, সম্ভবত কোন আকস্মিক আক্রমণের আশঙ্কায়। এই ভয় মাচস্‌দেরও ছিল এবং সেইমত সুকৌশলে বিভিন্ন স্থানে সৈন্য প্রস্তুত হইয়া ছিল। তবে কোন প্রকার গোলযোগ ঘটিল না।
তবে লোটস্‌দের অধিনায়ককে দেখিয়া মাচস্‌বৃন্দ সবিষ্ময়ে মুখব্যাদান করিল। ইহার কারণ আর কিছুই নহে, লোটস্‌দের অধিনায়ক এক সুন্দরী তরুণী, যদিও দৈর্ঘ্যে কিঞ্চিৎ খর্বরানীসুলভ গাম্ভীর্যের সহিত সে তীরে অবতরণ করিলে তব্রপোত এগিয়ে গেল তাহাকে অভ্যর্থনার জন্য। তাহার সারমেয়টি পেছনেই ছিল। লোটস্‌দের রানী তাহাদের প্রতি গম্ভীর হইয়া বলিলেন, "একটা গর্দভকে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছ?"
তব্রপোত খুবই বিস্মিত হইয়া বলিল, "ইহা গর্দভ নয় দেবী, ইহা একটি সারমেয়।"
লোটস্‌দের রানী ঠোঁট উল্টাইয়া জবাব দিলেন, "তোমাকে নয়, তোমার সারমেয়টিকেই বলিয়াছি!"
(ভবিষ্যতে এই বাক্যালাপটি অনেকেই ব্যবহার করিয়াছেন। এই কারণেই বলা হয় 'History repeats itself')
রাগে চিড়বিড়িয়া জ্বলিয়া উঠিতে গিয়ে সামলে লইল তব্রপোত। হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "আমার সহিত বাক্যালাপে যাহাতে মহারানীর গ্রীবায় ক্লেশ না হয় তজ্জন্য কি একটি বৃক্ষকাণ্ড অথবা প্রস্তরখণ্ড আনয়ন করিব?"
এবার মহারানীর গম্ভীর হইবার পালা। ব্যাজার মুখে বলিলেন, "আমার নাম উপি। তোমাদের এখানে কি বসিবার ব্যবস্থা নাই?"
"অবশ্যই আছে।" তব্রপোত উপির সহিত সুসজ্জিত আলোচনাস্থলের দিকে অগ্রসর হইলেন অবশিষ্ট মাচস্‌বৃন্দ লোটস্‌ অতিথিদের নিয়ে উহারই আশেপাশে বসাইলেন।
উপি বসিয়াই বলিল, "যাহা বলিবার তাহা কোনরূপ গৌরচন্দ্রিকা না করিয়া পট্‌ করিয়া বলিয়া ফেল। তুমি আমার ক্রোধ সম্বন্ধে অবগত নও। চূর্ণ হইতে তাম্বুলপত্র... মানে ইয়ে তাম্বুলপত্র হইতে চূর্ণ খসিলেই আমার রাগ হয়।"
কোনক্রমে হাসি চাপিয়া তব্রপোত বলিল, "আমাদের এই দুই উপজাতির মধ্যে কলহের অন্ত নাই। আর সেই কলহ, হিংসা এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য আমার একটি প্রস্তাব আছে উপি। আশা রাখিতেছি তুমি আমার সহিত একমত হইবে।"
"কী প্রস্তাব শুনি।"
"আমরা এই দুই উপজাতি, লোটস্‌ এবং মাচস্‌ যদি যুদ্ধবিগ্রহের পরিবর্তে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি তাহা হইলে কেমন হয়? ইহাতে দুদলেরই ক্ষয়ক্ষতি কমিবে কিন্তু কে শ্রেষ্ঠ তাহা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল দেখিয়া সহজেই বুঝিতে পারা যাইবে।"
"ক্রীড়া প্রতিযোগিতা? কি ধরনের ক্রীড়া একটু শুনি।"
"একটি ভাবিয়াছি। তোমার এবং আমার দলের সমসংখ্যক মনুষ্য ইহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারিবে। আমরা প্রত্যেকেই প্রস্তর-নিক্ষেপে পারদর্শী, কিন্তু এই খেলায় একটিই প্রস্তর থাকিবে। কেহ তাহাদের হস্ত ব্যবহার করিতে পারিবে না, পদাঘাতে প্রস্তরটিকে ক্রীড়াক্ষেত্রের একপ্রান্ত হইতে অন্যপ্রান্তে নিক্ষেপ করিতে হইবেদুই প্রান্তে দুইটি স্থান নির্দিষ্ট হইবে, যাহারা ঐস্থানে অধিক সংখ্যক বার প্রস্তর প্রেরণ করিতে পারিবে তাহারা বিজয়ী ঘোষিত হইবে।"
উপি শুনিয়া বলিল, "চমৎকার খেলা। কিন্তু খেলার সময় কে কোন পক্ষের হইয়া খেলিতেছে তাহা কী প্রকারে নির্ণয় করা যাইবে?"
উপির প্রশ্ন শুনিয়া তব্রপোত একটু ভাবিয়া বলিল, "তাহারও পদ্ধতি আছে। তোমাদের বনভূমি অতিশয় সুন্দর, বিভিন্ন পুষ্পের নানাবিধ রঙে তাহা উজ্জ্বল হইয়া থাকে। তোমাদিগের প্রতিযোগীরা ওই রক্ত এবং পীত বর্ণের পুষ্প দিয়ে গাঁথা মালা পরিয়া উপনীত হউকএই অঞ্চলের অরণ্য অপেক্ষাকৃত ঊষর, তাই মাচস্‌ প্রতিযোগীরা গাছের শ্যামলপত্র ও বল্কল দিয়া প্রস্তুত মালা পড়িয়া যোগদান করিবে।
উপি বলিল, "উত্তম প্রস্তাব! আমি নিশ্চিত লোটস্‌ জাতি এই খেলায় সুনৈপুন্যের পরিচয় দিবে। কিন্তু আমারও একটি প্রস্তাব আছে।"
"বল।"
"সবাই এই খেলায় উৎসাহী নাই হইতে পারে। বিশেষত কিঞ্চিৎ স্থূলকায় যারা। তাই তাহাদের জন্য আরো একটি খেলার প্রস্তাব দিতেছি। উভয়পক্ষের কিছু সৈন্য একপ্রকার কাষ্ঠদণ্ড হস্তে লইয়া ঘুরে বেড়ায়। এই খেলায়, একটি দল অন্য দলের দিকে প্রস্তর নিক্ষেপ করিবেবিপক্ষ দল ঐ দণ্ড কর্তৃক প্রহারপূর্বক প্রস্তরগুলিকে দূরে নিক্ষেপ করিবেযাহারা অধিক দূরত্বে প্রেরণ করিবে তাহারাই বিজয়ী হইবে।" উপি হাসিয়া বলিল, "কেমন?"
"অর্থাৎ যাহারা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রহার করিবে তাহারাই সর্বাপেক্ষা কুশলী বলিয়া চিহ্নিত হইবে?"
"তাহা কেন? কেহ যদি বিপক্ষের নিক্ষিপ্ত প্রস্তরখণ্ডের সম্মুখে প্রাচীরের ন্যায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে তাহাও কম কৃতিত্বের নহে।"
"সাধু!" তব্রপোতের পছন্দই হইয়াছিল। প্রস্তাব এবং প্রস্তাবকারিণী, উভয়কেইমাচস্‌ এবং লোটস্‌দের অন্যান্যরাও সম্মত হইয়াছিলেন। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে দুই উপজাতির মধ্যে বাক্যালাপ হইতেছিল।
সহসা এক অপূর্ব সুবাসে তাহাদের মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। সবাই দেখিল, কষেভি এবং তার কিছু সঙ্গী বেশ কিছু পাত্র লইয়া আসিতেছে। পাত্রগুলি থেকে ধূম নির্গত হইতেছে, সুগন্ধও তদ্রুপসর্বাপেক্ষা বৃহৎ পাত্রটি কষেভি তব্রপোত এবং উপির সামনে গিয়া রাখিল। উপি অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, "ইহা কী?"
তব্রপোত বলিল, "ইনি আমার সুহৃদ, বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কষেভি অবুবা। এই বস্তুটি উহারই এক অসাধারণ আবিষ্কার। মশলামিশ্রিত তণ্ডুলের মধ্যে সুপক্ক কুক্কুটমাংস, ডিম্ব ও কন্দ দিয়া প্রস্তুত এইরূপ খাদ্য তুমি যে পূর্বে কখনো খাওনি তাহা আমি পণ রাখিয়া বলিতে পারি। ভয় নাই, ইহাতে বিষ নাই, আমি তোমার সঙ্গে এক পাত্রেই আহার করিব।"
অতঃপর সেই স্থানে উপস্থিত সমস্ত নারী-পুরুষ, মাচস্‌-লোটস্‌ একত্রে সেই অনন্য খাদ্য সেবনে উদ্যত হইল। এমনকি বৃহত্তর মাংসখণ্ড কার ভাগ্যে জুটিবে সে বিষয়ে তব্রপোত এবং উপির মধ্যে ঈষৎ বিদ্বেষ দেখা দিয়াছিল, যদিও শেষ অবধি দুজনেই নিজ নিজ অংশটি অন্যের জন্য রাখিয়া দিয়েছিল। তাহা নিছক ভদ্রতা কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নাই।
আহার সম্পন্ন হয়তে হইতে দেখা গেল লোটস্‌ এবং মাচস্‌দের মধ্যে বন্ধুত্বের সূচনা হইয়াছে। পরবর্তী কবে খেলিবার জন্য সবাই একত্র হইবে তাহা নির্ধারণ করিয়া এবং মাচস্‌গনকে নিজ অঞ্চলে আমন্ত্রণ জানাইয়া লোটস্‌রা বিদায় লইল। উপি যাইবার সময় হাসিমুখে বলিল, "বড়ই ভালো লাগিল। এই খাদ্য অসাধারণ। মধ্যে মধ্যে আসিয়া ইহা খাইতে চাহি।"
"যথা আজ্ঞা মহারানী।", বলিল কষেভি।
লোটস্‌রা চলিয়া যাওয়ার পর তব্রপোত তাহাকে পাকড়াও করিল, "কী ব্যাপার? লোটস্‌দের দলে ভিড়িবে নাকি? উহাকে মহারানী সম্বোধন করিলে যে!"
"তার কারণ খুবই সহজ। তুমি এই রাজ্যের রাজা আর আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা!" মুচকি হাসিয়া প্রস্থান করিতে লাগিল কষেভি।
তব্রপোত চিৎকার করিয়া বলিল, "পলাণ্ডু-পক্কবটিকা না মারিয়া এই দেবভোগ্য খাদ্যের নাম বলিয়া যাও?"
উত্তর আসিল, "আপাতত কোন নাম ঠিক করি নাই, তবে ইহা অবগত আছি যে, ভবিষ্যতে ইহা বিরিয়ানি নামে খ্যাত হইবে!"
****************
কালের সঙ্গে সঙ্গে কত কী না ইতিহাসই মহাকালের গহ্বরে চলে যায়! হয়তো কষেভির মৃত্যুর পর এই ঐশ্বরিক খাদ্যের কথাও সবাই বিস্মৃত হইয়াছিল। কিন্তু ইতিহাস সদা পরিবর্তনশীল
পূর্বেই লিখিয়াছি, "History Repeats itself"কয়েক সহস্র বৎসর পরে এই দেবভোগ্য খাদ্য এই বিশ্বে প্রত্যাবর্তন করে, তবে পারস্য দেশে। ক্রমশঃ ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্বে ইহা খ্যাতি লাভ করে!

Monday, January 30, 2017

বইমেলার বন্ধু

বইমেলায় 'কষে কষা'র লাইনে দাঁড়িয়ে শ্যামলবাবুর সঙ্গে ঈশ্বরের দেখা হল!

পাঠক, ঈশ্বর বলতেই যদি আপনার মনে হয় যে, তাঁর চেহারায় ক্যালন্ডারের ছবির মত জটাজুট, পরণে বাঘছাল বা হাতে শঙ্খ-পদ্ম-গদা-চক্র থাকবে তা হলে আপনি ভুল করছেন। শ্যামলবাবু যাকে দেখলেন তার মোটাসোটা মাখন-মার্কা চেহারা, মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা হয়ে এসেছে, সরু গোঁফ। পরণে ঢোলা স্ট্রাইপ শার্ট আর কালো প্যান্ট। একটা বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে তাঁকেই দেখছিল লোকটা। চোখাচুখি হতেই রহস্যজনকভাবে ফিক করে হাসলো। তারপর সোজা শ্যামলবাবুর সামনে এসে বলল, "বাড়িতে তো সকাল থেকে চার-চারবার কমোড দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার পর বউয়ের কাছ থেকে চেয়ে নরফ্লক্স খেলেন! আর এখানে ছেলে-বউকে আনন্দের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজে পোলাও-মাংস খাওয়ার ধান্দা করছেন?"
শ্যামলবাবু প্রথমেই চমকালেন। এই দুটো খবরের কোনটাই কারো জানার কথা নয় যদি না ওঁর বউ সঙ্গীতা বা ছেলে নন্টে কাউকে বলে থাকে! পরেরটা তো ছেলে-বউও জানে না! ওনার ভ্যাবাচাকা মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, "ও কিছু নয়। আপনাদের সব খবরই রাখি। দুটো ফিশফ্রাই কিনে আনুন আমি দুটো চেয়ারের ব্যবস্থা করি। আর হ্যাঁ, আমার প্লেটে একটু বেশী করে কাসুন্দি নেবেন তো!"
শ্যামলবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মত দুটো ফিশফ্রাই কিনে এদিকওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন লোকটা দুটো লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে যোগাড় করে তাঁকে হাত নেড়ে ডাকছে। চেয়ারে বসে ওনার হাত থেকে ফিশফ্রাইয়ের প্লেটটা নিয়ে লোকটা বলল, "তারপর?"
"আপনি কে?"
"ওহ্‌ বলা হয়নি।" লোকটা ফিশফ্রাইতে একটা কামড় বসিয়ে চিবোতে চিবোতে নিজের হাতটা এগিয়ে দিল, " আমার নাম ঈশ্বর। ভগবানও বলতে পারেন। দুর্গা-কালী-যিশু-মহম্মদ, ওসব দিকে না হয় নাই গেলেন..."
"আপনি ঈশ্বর! বাজে কথা বললেই হল!"
"বাজে কথা কেন বলব বলুন? দেখছেন তো আপনার হাঁড়ির খবর রাখি। ফোনে কোথায় কী অ্যাপ আছে, পার্সে কত খুচরো আছে, ব্যাঙ্কে কটা এফডি আছে, সব চাইলে বলে দেব। আরে মশাই, আপনাকে আপনার ছোটবেলা থেকে দেখছি। আগে নিজে বাপ-মার হাত ধরে আসতেন, এখন নিজের ছেলের হাত ধরে এসেছেন! তবে কী অধঃপতন! ছ্যা ছ্যা!"
শ্যামলবাবু বেকুবের মত বললেন, "আপনাকে তো আমার বয়সীই মনে হচ্ছে। আমার ছোটবেলাতে তো আপনিও ছোট ছিলেন নিশ্চয়ই!"
"দুর মশাই! বললাম না, আমি হলাম ঈশ্বর। বয়সের যাকে বলে ট্রি-স্টোন নেই! চোখের সামনে মিল্কি ওয়ে টোয়ে তৈরি করলাম! এইসব জলা জমিতে যখন গোদা গোদা ডাইনোসররা ঘুরে বেড়াতো তখন আমার যৌবন। যাকগে, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।"
শ্যামলবাবুকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে লোকটা মনের সুখে ফিশফ্রাই খেতে লাগল। ফিশফ্রাই শেষ করে হাতের কাগজের প্লেটটাকে গোল্লা বানিয়ে নিখুঁত নিশানায় সেটাকে একটা ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলে লোকটা বলল, "ভালোই বানিয়েছে। স্বর্গীয় স্বাদ!"
তারপর শ্যামলবাবুর দিকে ঘুরে লোকটা বলল, "ডারউইনের বিবর্তনের থিওরিতে তো বাঁদর থেকে মানুষ হয়েছিল। তা আপনি এরকম উলটো বিবর্তনে মানুষ থেকে বাঁদর হলেন কী করে?"
"মানে?" শ্যামলবাবু এবার একটু রেগেই গেলেন।
"মানে? কিছু বুঝছেন না, তাই না? দাঁড়ান, একে একে বলি।" লোকটা একটা মিচকে হেসে শুরু করল, "সেই ছোটবেলায় আসতেন, তখন বইটই কিনতেন সেটা দেখেছি। গোটা পাঁচেক টিনটিন, তিনটে অ্যাস্টেরিক্স, কাকাবাবু সমগ্রের ফার্স্ট পার্ট এগুলো তো সব বইমেলা থেকেই কেনা। আপনার বাবাও বই ভালোবাসেন। আপনাকে ঘুরে ঘুরে 'লাল-কালো', পরশুরাম সব কিনে দিতেন। তারপর..."
লোকটা একটু থামল, তারপর শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি পেকে গেলেন। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এসে আঁতলামি শুরু করলেন। বইয়ের দোকানে যাওয়া নেই। বই হাতে নিয়ে দেখা তো ছেড়েই দিলাম। শুধু মাঠে বসে শুধু গুলতানি আর গাঁজা-সিগ্রেট খাওয়া! একবার তো বোধহয় কোন একটা স্টলে গিয়ে একগাদা যৌন উত্তেজক বই নিয়ে নিজেদের মধ্যে খ্যাক খ্যাক করে হেসেছিলেন! সব নোট করে রেখেছি মশাই!"
শ্যামলবাবুর মুখটা ক্রমেই বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। লোকটার কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। আবার শুরু করল, "আর এখনকার কথা আর কী বলব! আপনি তো এখন মস্ত বিজ্ঞ লোক! সারা বছর কাজের চাপে নাকি কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা মাড়ানোর সময় পাননা, এদিকে বইমেলায় বাতেলা ঝাড়েন যে, কলেজ স্ট্রিটে বেশী ডিসকাউন্ট পাবেন তাই এখানে কিনবেন না! আর এইসব ছোট-মাঝারি প্রকাশনাগুলো লস্‌ করে বন্ধ হয়ে গেলে আবার বাংলা সংস্কৃতি মৃতপ্রায় বলে নাকি কান্না গাইবেন!"
"বইমেলায় এসে বই কেনেন না, কিন্তু গেলা চাই। যেন সাতদিন খেতে পাননি। গত বছর দেখলাম বইমেলায় বসে বিরিয়ানি খাচ্ছেন! আরে মশাই বিরিয়ানি খাবেন তো আর্সালান যান, রয়্যাল যান, তেমন হলে খিদিরপুরের ইন্ডিয়া রেস্টুরেন্টে গিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়ে আসুন! বইমেলায় কেন? এদিকে বিরিয়ানির দোকানের পাশে লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলোয় যাওয়া তো দুরের কথা, তাকিয়ে অবধি দেখলেন না!"
"মানে, এতক্ষণ ঘুরলে খিদে তো একটু পাবেই..." মিনমিন করে বলার চেষ্টা করলেন শ্যামলবাবু।
"ওহ্‌, তাই বুঝি? তা অনেকক্ষণ টিভি মিস করেন বলেই কি গতবছর ওই টিভি চ্যানেলের স্টলে দাঁড়িয়ে ওদের সিরিয়ালের হিরোইনের গয়নাগুলো আসল না সিটি গোল্ড সেই নিয়ে দশ মিনিট তর্ক করছিলেন? আর শুধু তো গয়না নয়, আপনার মনের ভেতরে আর কী কী জিনিস আসল না নকল নিয়ে তর্ক করছিলেন, সেটা বলে দিলে তো আপনার গিন্নি আপনাকে বঁটি নিয়ে তাড়া করবে মশাই!"
"এটা আপনার অন্যায়, ভগবান হয়েছেন বলে এত খুঁতখুঁতানি ভালো নয়।" শ্যামলবাবু শেষ চেষ্টা করলেন।
লোকটাও হেসে বলল, "দেখুন একটা কথাই বলছি। বইমেলায় এসে সব দেখুন। টিভি চ্যানেলের স্টল, কফিমাগ, টিশার্ট, ছবি, মূর্তি সব দেখুন। গান শুনুন, যা ইচ্ছে খান। কিন্তু বইটাও কিনুন। আপনি তো বই ভালোবাসতেন মশাই। আপনার সব নন্টে-ফন্টেগুলো বন্ধুরা নিয়ে ফেরত দেয়নি বলে যেদিন বিকেলবেলা আপনি মন খারাপ করে ছাদে বসেছিলেন আমিও ধারেকাছেই ছিলাম।"
"এটা তো বইমেলা, এখানে বইয়ের জন্য আসুন। আরো তো হাজারটা মেলা হয় শহরে। তার কোথাও একটা বইয়ের দোকান তো চোখে পড়ে না আমার। এই মেলাটা আলাদা। এই মেলাটা সবার, কিন্তু বইকে ভুলে যাবেন না।" লোকটা উঠে পড়ল। হতবাক শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "নাহ্‌ কাটলাম। আপনার বউ আর ছেলে আপাতত আনন্দের টাকা দেওয়ার লাইনে। আপনি যেতে যেতে ওদের বই কেনা হয় যাবে!"
তারপর শ্যামলবাবুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন ঈশ্বর।

শ্যামলবাবু নিজের হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে হাঁটা লাগালেন আনন্দের স্টলের দিকে। শেষ দশ মিনিটে যে কী হল সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না তিনি। হঠাৎ কী মনে হল, একটা স্টলে ঢুকে পড়লেন। ছোট স্টল, সব রকম বইই বিক্রি হচ্ছে। সেখান থেকে নন্টের জন্য শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র' কিনবেন বলে ঠিক করে ফেললেন তিনি। তখনই শুনতে পেলেন একটা কথোপকথন,
"দাদা, আর টাকা নেই না?"
"কী করে থাকবে? তোকে পই পই করে বললাম, 'কমিক্স সমগ্র'টা এ বছর কিনতে হবে না।"
"খুব লোভ হল তো! দ্যাখ না দাদা, কিছু ম্যানেজ করে। যদি পরে একদিন এসে কেনা যায়।"
"না রে, মা অনেক কষ্ট করে এই টাকাটা দিয়েছে। জানিসই তো সব... আর চাওয়া যাবে না।"
শ্যামলবাবু তাকিয়ে দেখলেন দুই কিশোর। একজনের বয়স পনেরো-ষোল, অন্যজন আরো কম। ছোটজনের হাতে একটা শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র', ঠিক যে খন্ডটা শ্যামলবাবুও দেখছেন। কাঁচুমাচু মুখে বইটা নামিয়ে রাখল সে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বেরনোর দরজার দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে শ্যামলবাবু ঠিক করে ফেললেন, কী করবেন। দু মিনিটের মধ্যে দোকান থেকে বেরিয়ে একটু পা চালিয়েই সামনে ছেলে দুটিকে দেখতে পেলেন। দৌড়ে গিয়ে তাদের ধরে ফেললেন শ্যামলবাবু। বললেন, "আরে তোমাদেরই তো খুঁজছি!"
"কী ব্যাপার?" বড় ছেলেটি ভয় ভয় বলল।
"আরে ওই যে লাস্ট দোকানটায় ঢুকেছিলে, আমি ওদের স্টাফ। আজকে স্পেশাল কনটেস্ট চলছে তো। কিছু কিছু লাকি পাঠকদের আমরা বই গিফট করছি। তোমরা আজকে আমাদের স্টলের পাঁচশতম পাঠক। এই নাও তোমাদের গিফট।" বলে ছোট ছেলেটির হাতে একখানা শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র' ধরিয়ে দিয়ে হাঁটা লাগালেন শ্যামলবাবু। ছেলেদুটোর হতভম্বভাব দেখে ভালোই লাগছিল তাঁর। আজকে তিনিও হতভম্ব কম হননি! এবার ওটার অন্য কপিটা নন্টেকে দিতে হবে!

শ্যামলবাবু খেয়াল করলেন না, তাঁদের ঠিক পাশেই ল্যাম্পপোস্টের তলায় বসে ছবি আঁকতে আঁকতে ঈশ্বর মুচকি হাসলেন!

Saturday, December 24, 2016

Dangal - Quick Thoughts

Dangal is one of those intense sports dramas which keeps you on the edge for most of the time during the film. I think for general public this movie will have more impact regarding the intensity of wrestling than the medals we won because sadly not many follow wrestling despite the multiple medals in last three Olympics. This one is probably the best movie of this year and a must watch.
But don't go to theater thinking this is Aamir Khan's movie. More than Aamir Khan this movie belongs to Zaira Wasim, Sanya Malhotra, Fatima Sana Shaikh and Suhani Bhatnagar. Way to go girls! I will look forward to more such portrayal  from you (As a matter of fact, I am already looking forward to 'Secret Superstar' starring Zaira, the trailer was shown before Dangal in the theater).
P.S. Once this movie becomes a hit which I think it will be, I can foresee a group of Facebook naysayers will come out to bash the movie because it shows how a father forced (at times reaching almost a stage of torture) his daughters to realize his dreams, which is actually a complete opposite storyline of another Aamir Khan movie 'Tare Zamin Par'.
But I guess this is life with all its good, bad and ugly faces and we should just move on. Ohh by the way, watch this movie while you are moving on!
(Source: Internet)