Showing posts with label North Bengal Trip. Show all posts
Showing posts with label North Bengal Trip. Show all posts

Monday, February 9, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৭

পর্ব - ১           পর্ব - ২           পর্ব - ৩          পর্ব - ৪            পর্ব - ৫            পর্ব - ৬            

(আগে যা ঘটেছে)


জলদাপাড়া
সেই লড়ুকে গন্ডার

লোলেগাঁও থেকে গরুমারা অবধি সেই গা ছমছম করা জঙ্গুলে পথের পর গরুমারা থেকে জলদাপাড়ার রাস্তা নেহাতই নিরামিষ। মূর্তি নদীর ব্রিজ টপকে, বিভিন্ন চা বাগান দুপাশে রেখে হাইওয়ে ধরে রাস্তা চলল জলদাপাড়ার দিকে। মোটামুটি ঘন্টা দুয়েকের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম জলদাপাড়া টুরিস্ট লজ।
অনেকটা বড় জায়গার মধ্যে বানানো চমৎকার টুরিস্ট লজ। মেন বিল্ডিঙয়ের সামনে কাঠের বারান্দায় উঠে চারদিক দেখে মন ভালো হয় গেল। শুধু তাই নয়, এরপর যা ঘটল তাতে প্রসন্নতার পরিমাণ এতটাই বেড়ে গেল যে বলার নয়।
ঘর আগেই বুক করা ছিল তাই সেটা নিয়ে চিন্তা ছিল না, আসল চিন্তা ছিল হাতির পিঠে চেপে জঙ্গল দর্শন হবে কিনা সেই নিয়ে। প্রথমে জিজ্ঞেস করতেই রিশেপসানের লোকজন বলে উঠলেন, “না না হবে না, এখন প্রচুর রাশ!” তারপর একজন হঠাৎ বললেন, “আপনারা কতজন?”
“দুজন” বলতেই তাঁদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিল। বললেন, “ওহ্‌ দুজন! হ্যাঁ, তাহলে হয়ে যাবে। দুজনের মতই জায়গা আছে। তবে অন্য একটা কাপলের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, চলবে তো?”
আলবাত চলবে। জলদাপাড়ায় এসে হাতিতে সাফারি করার জন্য যে কোন কিছুর সঙ্গেই মানিয়ে নেওয়া যায়। সুতরাং আপত্তি নেই বলার সঙ্গে সঙ্গেই একটা সরকারী ফর্ম পেয়ে গেলাম আমাদের ডিটেলস্‌ দেওয়ার জন্য। রিশেপসানের লোকজন তখন বলাবলি করছেন আমাদের সৌভাগ্যের কথা। একজন জানালেন, “আপনারা মোর দ্যান লাকি। অনেক পার্টিই তিনদিন ধরে বসে আছেন, আমরা হাতির বুকিং করে দিতে পারছি না।” আর একজন বললেন, “আপনাদের ২০১৫ দারুণ শুরু হতে যাচ্ছে।”
দ্বিমত হওয়ার জায়গাই নেই, তাই ওনাদের ধন্যবাদ জানানো ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। সেইসঙ্গে সেদিন রাতের ইয়ার-এন্ড পার্টির কথাও জানলাম। ৭০০ টাকার বিনিময়ে লাইট-এন-সাউন্ড শো, বন ফায়ার, সাঁওতালি নাচ আর স্পেশাল ডিনার। সেটাতেও নাম লিখিয়ে ফেললাম আমরা।
এই প্রসঙ্গে জলদাপাড়া টুরিস্ট লজের কর্মচারীদের কথা একটু বলে রাখি। একটা সরকারী হোটেলে যে এত হেল্পফুল এবং ফ্রেন্ডলি লোকেদের সঙ্গে আলাপ হতে পারে ভাবাই যায় না। মোটামুটি সব হোটেলেই আমরা ভালো ব্যবহারই পেয়েছি কিন্তু জলদাপাড়া টুরিস্ট লজে এসে যে ব্যবহারের সাক্ষী রইলাম সেটা সত্যিই মনে রাখার মত। প্রত্যেকেই মিশুকে, হাসিখুশি, দেখা হলেই জমিয়ে গল্প করেন, নিজেদের মত করে খোঁজ নেন প্রত্যেক টুরিস্টের। ঘোরাঘুরি, খাওয়া-দাওয়া সব দিকে তাঁদের নজর। টুরিস্ট লজ থেকে আশেপাশের বেশ কিছু জঙ্গলে যেমন জয়ন্তী, বক্সার, রাজা-ভাত-খাওয়া ডে-ট্রিপের ব্যবস্থা করা হয়, সেগুলোতেও তাঁরা পুরো দস্তুর সহযোগিতা করেন, টিপস্‌ দেন। সব মিলিয়ে দারুণ কিছু মনে রাখার মত মানুষ।
তবে পৃথিবীর নিয়মই হল ভালো আর খারাপের পাশাপাশি সহাবস্থান। সুতরাং খারাপের গল্পটাও সময় মত করা যাবে। কিন্তু তার আগে আমরা একতলার ১০৭ নম্বর ঘরে গিয়ে চেক-ইন করলাম। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর, বড় বাথরুম, পেছন দিকে ঘরের লাগোয়া বারান্দা। খুবই ভালো ব্যবস্থা।

আমরা ঘরে আমাদের ব্যাগ-স্যুটকেস সব গুছিয়ে রেখে একটু হাঁটতে বেরোলাম সামনে থেকে। এদিক-ওদিক ঘুরে যখন হোটেলে ফিরছি দেখলাম যে, হোটেলের কর্মচারীরা আমাদেরই খোঁজাখুঁজি করছেন। আমাদের দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আর একটি বয়স্ক পরিবার এসেছেন, তাঁদের একতলার ঘরটি ছেড়ে দিয়ে দোতলায় ঠিক ওপরের ঘরটা নিতে আমাদের আপত্তি আছে কিনা। আপত্তির প্রশ্নই ওঠে না। আমরা মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আমাদের জিনিস-পত্র গুছিয়ে নিয়ে ১০৭-এর বদলে ২০৭ নম্বর ঘরে চলে গেলাম। লজের ছেলেগুলোও সাহায্য করল জিনিস বয়ে নিয়ে যেতে। তারপর স্নান-টান করেছি। দুপুরে ভাত-ডাল-আলুভাজা-আলুপোস্ত- ডিমের ডালনা খেয়ে ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেদের ছায়াছবি, টুরিস্ট লজের ভিতরেই সামনের পার্কের ছবি এইসব তুলে টাইম-পাস করেছি। তারপর বিকেলে আবার বেরোতে গিয়ে দেখি আমার জ্যাকেটটা নেই! নেই তো নেইই। আমার সখের কালো রঙের জ্যাকেট, যদিও সস্তার, ওয়ালমার্টের ডিসকাউন্টে কেনা, তবু পছন্দের জিনিস। অনেক খুঁজেও যখন পাওয়া গেল না, তখন মনে হল, জ্যাকেটটা হয়তো ১০৭ নম্বর ঘরে ফেলে এসেছি।
নিজেরা গিয়ে নক করতে কেমন-কেমন লাগছিল তাই টুরিস্ট লজেরই একটি ছেলেকে জ্যাকেটটার কথা বললাম। সে এক কথাতেই বলল, “চলুন আমি গিয়ে দেখছি।”
১০৭-এর সামনে গিয়ে দেখলাম, দরজাটা ভেজানো, ভেতরে আলো জ্বলছে। আমাদের সঙ্গের ছেলেটি কলিং বেল বাজাতেই ভেতর থেকে বয়স্ক মহিলা কন্ঠে আওয়াজ এল, “কী চাই? ডিস্টার্ব করবেন না!”
ছেলেটি বলল, “আপনারা কি ঘরে কোন জ্যাকেট পেয়েছেন?”
“না না। বললাম তো ডিস্টার্ব করবেন না। জ্যাকেট-ফ্যাকেট পাইনি। যত্তসব!”
ছেলেটি আমাদের দিকে করুণ মুখে তাকালো। তো আমরা বললাম, “চলুন, কাটি। কী আর করা যাবে!”
পিউ বলল, “বাব্বাহ্‌! মহিলা কী রুড!”
ছেলেটি বলল, “কী আর করব বলুন, সবাইকে নিয়েই চলতে হয়। সরি আপনাদের জ্যাকেটটা পাওয়া গেল না।”
বললাম, “কী আর করা যাবে। সাহায্যের জন্য ধন্যবাদ। আমি রিশেপসানে গিয়ে দেখি।”
ছেলেটিও বলল যে, রিশেপসানে বলে রাখলে পরে কোথাও পাওয়া গেলেও ওনারা দিয়ে যাবেন।
আমি আর পিউ রিশেপসানে গিয়ে ওনাদের বললাম জ্যাকেটের কথা। তখন ওখানে আমাদের বয়সী একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে কিছু একটা ফর্ম ফিলাপ করছিল। আমাদের কথোপকথন শুনে হঠাৎ বলল, “কালো জ্যাকেট হারিয়েছেন কি? আমাদের ঘরে একটা কালো জ্যাকেট ছিল!”
সম্ভবত সেটার কথাই হচ্ছে এটা বলায় মেয়েটি একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে ডেকে বলল, “বাবা, ঐ জ্যাকেটটা এনার। ওনাকে ঘরে নিয়ে গিয়ে দিয়ে দাও না।”
আমি আর পিউ সেই ভদ্রলোকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ওনার ঘরের দিকে গেলাম। রাস্তায় ভদ্রলোক বললেন, “হ্যাঁ, ওটা আমি যত্ন করে পাট করে রেখেছি। আমার মনেই হয়েছিল, আগে যাঁরা ছিলেন তাঁদেরই হবে।” কথা বলতে বলতে আমরা ওনার ঘরের সামনে পৌঁছলাম। ১০৭ নম্বর ঘরই সেটা! ভদ্রলোক আমাদের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ঘরে গিয়ে আমার কালো জ্যাকেটটা নিয়ে এলেন।
মানবচরিত্র কত বিচিত্র সেটা বিশ্লেষণ করতে করতে আমি আর পিউ ওখান থেকে কেটে পড়লাম। প্রথমে অবশ্য ঐ কর্মচারী ছেলেটিকে পাকড়াও করে তাকে ঘটনাটা বললাম, হাসাহাসি করলাম।
আগেই বলেছি টুরিস্ট লজটা অনেকটা জায়গা নিয়ে বানানো। সামনে অফিস, রিশেপসান, ডাইনিং রুম ইত্যাদি। তার সঙ্গে লাগোয়া উড ব্লক এবং ব্রিক ব্লক। পেছনে আট-নটা আলাদা আলাদা কটেজ। আর ঐ উড ব্লক আর ব্রিক ব্লকের সামনে অনেকটা খোলা জায়গা বানানো একটা বাগান। সেখানে বিভিন্ন গাছপালা ছাড়াও নানা রকমের জন্তু-জানোয়ার, পাখী, সাপ ইত্যাদির মাটির মডেল বানানো। সেই জায়গাটাই রাত্তিরের ইয়ার-এন্ড পার্টির জন্য সাজানো হচ্ছিল। রংবেরঙের আলো, স্টেজ, চেয়ার-টেবিল লাগানো হচ্ছিল। এক জায়গায় দেখলাম, বড়-বড় গাছের ডাল দিয়ে মস্ত বড় একটা বন-ফায়ার সাজানো হচ্ছে। বুঝলাম সন্ধ্যেবেলা ভালোই হইচই হবে।
আমাদের খুব একটা উৎসাহ যদিও ছিল না। বুঝতেই পারছেন বন্ধু-বান্ধব ছাড়া শুধু দুজনে কি আর পার্টি হয়। অনেকে দেখলাম বিশাল বড় গ্রুপ বানিয়ে ছটা থেকে নিচে বসে গেছে আড্ডা মারতে। আমরা মোটামুটি সেজেগুজে সাড়ে সাতটার পর নিচে গেলাম। আমাদের চারদিকে অনেককে দেখেই তখন মনে হচ্ছে যেন তাদের মাথার মধ্যে “রুনুঝুনু নূপুর বাজছে।” হাসিগুলো কিঞ্চিৎ বেহিসেবী, পদযুগল টলছে। এইরকমই এক মহিলার সঙ্গে পিউয়ের পরে চেয়ার নিয়ে ঝামেলা লাগে। ফেসবুকের সূত্রে সে গল্প অনেকেই জানে। তবে মূল ব্যাপারটা হল, পার্টির মাঝামাঝি সময় যখন লোকের সংখ্যা চেয়ারের চেয়ে অনেক বেশী তখন আমি আর পিউ অনেক কষ্টে একটা চেয়ার যোগাড় করেছিলাম। এরপর আমি আরও একটা চেয়ার খুঁজছি এমন সময় এক মহিলা পিউর কাছে এসে পিউয়ের হাতের চেয়ার ধরে টান লাগান, এর পরের কথোপকথনঃ
পিউ – কী ব্যাপার?
মহিলা – চেয়ারটা আমি নিই...
পিউ – মানে?
মহিলা – হ্যাঁ... নিই না...
পিউ - এটা তো আমি আর আমার হাজব্যান্ড খুঁজে আনলাম।
মহিলা – তো কী হয়েছে... আরও একটা খুঁজে আনো!
পিউ – এক্সকিউজ মি...
মহিলা – ওহ্‌ দেবে না! দিলে পারতে!
বলে মহিলা নিজেদের দলবলের কাছে ফিরে গেলাম। পরে শুনলাম নিজেদের মধ্যে খুব ‘সো রুড’, ‘হাউ ডেয়ার শি’ এসব চলছে।
আধা ঘন্টা পর আবার সেই মহিলার আবির্ভাব। ততক্ষণে লোক একটু কমেছে। অনেক চেয়ারই ফাঁকা। মহিলা নিজে একটা চেয়ার নিয়েছেন, তারপর আমাদের কাছে এসে বললেন, “তখন দিতেই পারতে... এখন অনেক চেয়ার...”
আমি “হ্যাঁ... হ্যাঁ” করে কাটিয়ে দিচ্ছিলাম হঠাৎ সেই মহিলার মেয়ে, ঐ ক্লাস নাইন-টাইনে পড়ে বোধহয়, এসে ভয়ানক বাওয়াল দিতে শুরু করল। পিউকে উদ্দেশ্য করে, “ ইউ ওয়ার রুড, ডিসরেসপেক্টফুল” ইত্যাদি বলা শুরু করল। পিউও জবাব দিচ্ছিল। সেই যাকে বলে “উনকা এক এক সওয়াল, হামারা দো দো জবাব...”
আমি চুপচাপ দেখছিলাম কদ্দুর গড়ায় ব্যাপারটা। এমন সময়ে ভদ্রমহিলার স্বামী টলতে টলতে এসে হাজির হলেন, এসেই, “ওকে ওকে... চিল... আমার মেয়ে আপনাদের বোনের মত (প্রথমে বলেছিলেন মেয়ের মত, তারপর বোধহয় বুঝেছিলেন যে আমরা অতটাও বয়স্ক নই)... ছেড়ে দিন। এনজয় করুন” বলে আমার আর পিউয়ের হাত ধরে খুব করে “হ্যাপি নিউ ইয়ার উইশ” করে বউ-মেয়েকে নিয়ে সেখান থেকে কেটে পড়ল।
এসব বাজে ঝামেলা বাদ দিলে সন্ধ্যেটা ভালোই কাটল। লাইট-সাউন্ডের শো বেশ ভালো ছিল। বিশেষ করে বাচ্চাদের খুব ভালো লাগবে। সামনের মাঠের ঐ মাটির মডেলগুলোতে আলো ফেলে দেখানো হল, আর তার সঙ্গে ধারাভাষ্যের কন্ঠস্বরটা ছিল সব্যসাচী চক্রবর্তীর। বেশ যত্ন নিয়ে বানানো শো। যদিও সাঁওতালী নাচটাও বেশ ক্যাওড়ামি হল। কিছু মাতাল জনতা নাচতে শুরু করে দেওয়ায় ঠিকঠাক সাঁওতালী নাচটাই হল না।
এসব দেখে আমরাও আর রাত না বাড়িয়ে মোটামুটি তাড়াতাড়িই খেয়ে নিয়ে ঘরে চলে এলাম। পরদিন সকালে ওঠার ব্যাপারও ছিল।
পয়লা জানুয়ারী সকালবেলা লজ থেকে গাড়ী নিয়ে রওয়ানা হলাম পাশের জঙ্গলে হলং বাংলোর উদ্দেশ্যে। সেখান থেকেই পাওয়া যাবে হাতি। হলং যাওয়ার পথে চোখে পড়ল সদ্য ধরা পড়া একটা বাচ্চা হাতি। আমাদের সঙ্গে আলাপ করতে প্রায় গাড়ীর মধ্যে শুঁড় ঢুকিয়ে দিয়েছিল সে।
হলং গিয়ে জানা গেল যে আগের ট্রিপ শেষ করে হাতিদের ফিরতে দেরী হবে। চারদিকে অনেকগুলো বাচ্চা, তাদের বোঝানো হল যে, হাতিরা আগের রাত্তিরে নিউ ইয়ার পার্টি করেছে তাই তাদের সকালে উঠতে দেরী হয়ে গেছে!
শেষ অবধি প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ দেরীতে আমাদের যাত্রা শুরু হল। আমাদের হাতির নাম চম্পাকলি আর আমাদের সঙ্গী তিনজন। মানে একটি দম্পতি এবং তাঁদের বছর তিনেকের পুত্র। সে তো হাতিতে চড়ে খুবই উত্তেজিত। আরও জানা গেল যে, তার একটা খেলনা হাতি আছে, যাকে সে বাবাই হাতি বলে ডাকে, তাই সে যে হাতিই দেখছে সেটাই তার বাবাই হাতি!
হাতির পিঠে চেপে অরণ্য ভ্রমণ সত্যিই এক মনে রাখার মত জিনিস। এমনিতেই জিপের তুলনায় হাতির পিঠে চেপে ঘোরার সুবিধা অনেক বেশী। কারণ জিপ যেখানে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ঘোরে হাতি সেখানে বেশ অনেকটাই ঘন জঙ্গলে চলে যেতে পারে। গাছের ডালপালা ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে, উঁচু নীচু রাস্তার মধ্যে দিয়ে, ছোট ছোট ঝোরা পার হয়ে হাতি এগিয়ে চলে। সে এক দারুন ব্যাপার।
আমরাও এগিয়ে চললাম গাছপালার মধ্যে দিয়ে। প্রথম কিছুক্ষণ ময়ূর আর অন্যান্য পাখী ছাড়া কিছু চোখে পড়েনি। এরপর আমরা পৌঁছলাম লম্বা লম্বা ঘাসের বনে। জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা ফাঁকা জায়গা জুড়ে সেই লম্বা ঘাসের বন আর সেখানেই কিছুটা এগোতে দেখতে পেলাম সেই গন্ডারটাকে। এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম, তার শরীরে জায়গায় জায়গায় রক্তের দাগ। আমাদের মাহুত জানালো যে, সম্ভবত ঐ গন্ডারটা অন্য কোন গন্ডারের সঙ্গে মারামারি করেছে একটু আগে। এগুলো তারই আঘাতের চিহ্ন। ততক্ষণে আরও দুটো হাতি তাদের সওয়ারীদের নিয়ে এসে পৌঁছে গেছিল। অত কাছ থেকে গন্ডার দেখা একটা বিরল অভিজ্ঞতা সুতরাং ছবি তোলা হল প্রচুর।
এর পর আমরা পর পর দুটো হরিণ দেখলাম। প্রথমটা চিতল হরিণ, পরেরটা সম্বর। দুটোই আমাদের দেখে ঐ ঘাসের ফাঁকে নানাভাবে লুকোচুরি খেলে শেষ অবধি বিদায় নিল। যদিও ছবি তোলার অনেক সুযোগই তারা দিয়েছিল। এইভাবেই আমাদের মিনিট পঁয়তাল্লিশের অরণ্য ভ্রমণ শেষ হল। আমরাও ফিরে গেলাম আমাদের টুরিস্ট লজে।
এরপর সারাদিন হোটেলেই ল্যাধ খেলাম। গত দশ দিন ধরে ঘোরার পর আমাদের খুব বেশী এনার্জি অবশিষ্ট ছিল না। আর বিট্টুকেও যে ঠিক পছন্দ হচ্ছিল না সে তো জানেনই। একটা দিন জলদাপাড়ায় নিজেদের মত কাটিয়ে পরদিন বেলার দিকে রওয়ানা হলাম নিউ জলপাইগুড়ির জন্য। সেদিন বিকেল-সন্ধ্যেটা ওখানেই কাটাতে হবে। আমাদের ফেরার ট্রেন পরদিন মানে তিন তারিখ সকাল সাড়ে পাঁচটায়।
আমাদের ঘোরার গল্প এখানেই প্রায় শেষ। তবে শেষ মজার গল্পটা লিখেনি। জলদাপাড়া টুরিস্ট লজের নিয়ম অনুযায়ী সকালে প্রাতরাশে এক প্লেট লুচি-তরকারি বা পাঁউরুটি-মাখন-জ্যাম খেলে অতিরিক্ত পয়সা লাগে না। কিন্তু অন্য কিছু খেলে সেটার দাম আলাদা করে দিতে হয়। ফেরার দিন আমি আলাদা করে এক প্লেট ফ্রেঞ্চ টোস্ট খেয়েছিলাম। আলাদা করে তার দাম ষাট টাকা ধরাও হয়েছিল। এরপর আমরা চেক আউট করে সব পয়সা মিটিয়ে বেরিয়ে গেছি। টুরিস্ট লজ থেকে আমাদের সব খরচের লিস্ট করে বিলও দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখন আর ভালো করে দেখিনি।
নিউ জলপাইগুড়ির হোটেলে বসে সন্ধ্যেবেলা কী মনে হল, বিলটা নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম যে, সকালের ঐ ফ্রেঞ্চ টোস্টের ষাট টাকা বিলে যোগ করা হয়নি। ফোন করলাম জলদাপাড়া টুরিস্ট লজে। যিনি ফোন ধরেছিলেন তাকে বললাম যে, আমি আজ সকালেই চেক আউট করেছি, এখন বিলে দেখলাম ষাট টাকা কম ধরা হয়েছে। উনিও শুনে বললেন যে, এটা ওনাদেরও চোখে পড়েছে, বিল করার সময় কোনভাবে বাদ পড়ে গেছিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কোনভাবে কি অনলাইন টাকা ট্রান্সফার করে দেওয়া যায়?”
উত্তর পেলাম, “আপনি যে ফোন করে ঐ টাকাটা দিতে চেয়েছেন ওটাই আমাদের প্রাপ্তি। আবার আসবেন।”
এর পর কি আর কিছু বলা যায়। ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন নামিয়ে রাখতে হল। তার আগেই আমি আর পিউ ঠিক করেছিলাম যে, ভবিষ্যতে আবার যাব জলদাপাড়ার টুরিস্ট লজে। এই ঘটনার পর সেটা নিশ্চিত করে ফেললাম। ইচ্ছে আছে ২০১৬-এ আর একবার জলদাপাড়া গিয়ে ওর আশেপাশের সমস্ত অভয়ারণ্যগুলো দেখে ফেলার।
আমাদের উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের গল্প এখানেই শেষ। প্রায় দু সপ্তাহ লম্বা এই ট্রিপে অনেক নতুন নতুন জায়গায় গেছি, নতুন মানুষের সঙ্গে মিশেছি, আলাপ করেছি, আড্ডা মেরেছি। প্রকৃতির অনির্বচনীয় শোভা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। আর মুগ্ধ হয়েছি ওখানকার পাহাড়ী মানুষগুলোর সারল্যে আর হৃদয়ের উষ্ণতায়। মনে রাখব আমাদের দার্জিলিঙয়ের ড্রাইভার বিকাশকে, পাহাড়ী সোলের বারান্দার জানলার কাঁচে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রতিবিম্বকে, কালিম্পঙের ডেলো পাহাড়ের ঠান্ডা হাওয়াকে, লোলেগাঁওয়ের সেই কাঠের ফুটব্রিজকে এবং অবশ্যই গরুমারা আর জলদাপাড়ার জাতীয় উদ্যানকে। এতদিন লোক মুখে শুনেছি, এখন নিজেরাও উপলব্ধি করলাম... জঙ্গলের নেশা বড় সাংঘাতিক নেশা, একবার গিয়ে থামা কঠিন। তাই আবার হয়তো কখনো বেরিয়ে পড়ব উত্তরবঙ্গের জঙ্গল-পাহাড়ে উদ্দেশ্যে আর ততদিন ২০১৪র এই শেষ কয়েকটা দিনের স্মৃতিই থাকবে আমার জীবনের এক মূল্যবান সম্পদ হয়ে।

Saturday, January 31, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৬

(আগে যা ঘটেছে)

গরুমারা
কাকুর বাড়ির সাঁওতালি নাচ, যাত্রাপ্রসাদের গন্ডার

গরুমারার গল্প বলার আগে বলতে হবে গরুমারা পৌঁছনোর গল্প। ততদিনে বিট্টু মানে আমাদের ড্রাইভারের ওপর আমাদের বিরক্তি চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। ব্যাটা অর্দ্ধেক জায়গায় যায় না। যেখানে যায়, সেখানে রাস্তা চেনে না। রাস্তার লোককে জিজ্ঞেস করে করে রাস্তা চিনে গাড়ী চালায়। গত দুদিন ধরে লোলেগাঁওতে বসে বসে শুধু ছুটি কাটিয়েছেএমনকি আগের দিন সন্ধ্যেবেলা লোকটাকে দেখেছিলাম ওখানকার স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে একটা ছোট্ট রেস্তোঁরায় সামনে বোতল-গেলাস নিয়ে বসে থাকতে।
তাই গরুমারা যাওয়ার সময় যখন ও বলল যে, লাভা হয়ে লোলেগাঁও যাওয়ার রাস্তায় অনেক ঘুরতে হয়। তাই সেটার বদলে ও একটা নতুন রাস্তা জেনেছে, যেটার প্রথম ছ-সাত কিলোমিটার রাস্তা খারাপ কিন্তু তারপর পিচের রাস্তা এবং সময় কম লাগবে তাই ও সেটা দিয়ে যাবে তখন আমরা খুব একটা ভরসা করিনি।
যাত্রা শুরু করার পনেরো মিনিটের মধ্যে আমাদের সন্দেহ আরও বাড়ল যখন আমরা একটা জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে পড়লাম। রাস্তা খারাপ বলেছিল, কিন্তু আসলে বলা উচিত ছিল যে রাস্তা বলে কিছু নেই। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে লাফাতে লাফাতে গাড়ি চলল। দুদিকে মাঝারি ঘন জঙ্গল, মোবাইল নেটওয়ার্কের নামগন্ধ নেই। এইভাবে চলেই যাচ্ছি, ঘন্টা খানেক হয়ে গেল, রাস্তার কোন উন্নতি নেই। বিট্টুর মতলবটাও কিছু বোঝা যাচ্ছে না। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে। সে সত্যিই রাস্তা চেনে না নাকি কোন নাটক করছে তা বোঝারও কোন উপায় নেই।
মাঝখানে তিনটে কাঠুরেকে দেখে সে গাড়ী থামিয়ে রাস্তা জিজ্ঞেস করছিল, শ্রেয়াসী দেখি আমার হাত আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ফিসফিস করে আবার বলল, “গাড়ী লক করে রাখো!”
যাই হোক, খারাপ কিছুই হয়নি, ঐ লোকগুলোর দেখানো পথেই এগিয়ে গিয়ে শেষ অবধি ভালো রাস্তা পাওয়া গেল, তারপরেও আরও ঘন্টা খানেক ভালো-খারাপ রাস্তা মিলিয়ে চলার পর শেষ অবধি লাটাগুড়ির কাছে গিয়ে শহরের রাস্তায় পড়লাম।
শেষ কয়েকদিন লাভা-লোলেগাঁওয়ের মত ছোট্ট জায়গায় কাটানোর পর ঐ লাটাগুড়ির শহরতলি দেখেও কী ভালোই না লাগলো। দোকান-পাট, বাজারের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ী চলল চালসার দিকে। আমাদের রিসর্টের নাম ছিল কা-কুর-বাড়ি। যদিও সেটা কার কাকার বাড়ী সে নিয়ে আমাদের কোন ধারণা নেই।

আমরা যখন রিসর্টে ঢুকলাম তখন বারোটা বেজে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন বিকেলের অরণ্যভ্রমনের ব্যবস্থা করা গেল না। কিন্তু পরের দিন ভোর চারটের জন্য জিপের ব্যবস্থা করে রাখলাম। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টেরই জিপ, সেটা নিয়েই জঙ্গলের মধ্যে ওয়াচ টাওয়ারে চলে যাওয়া যাবে।
এরপর সারাদিন রিসর্টেই ল্যাধ খেয়ে কাটালাম। কিছুই বিশেষ করার ছিল না, এমনকি কা-কুর-বাড়ির কাছের মূর্তি নদীর জলও শীতকালে শুকিয়ে যাওয়ায় সেটা দেখতেও যাওয়া হয়নি।
সন্ধ্যেবেলা রিসর্টের ম্যানেজারের উদ্যোগে আরও একটি বাঙালী পরিবারের সঙ্গে বসে সাঁওতালি নাচ দেখার সুযোগ হল। রিসর্টের মধ্যেই মাঠের মাঝখানে আগুন জ্বালিয়ে সেই আগুনকে ঘিরে পনেরো জন সাঁওতালি মেয়ের নাচ। সঙ্গে তাদের আদিম সঙ্গীত। এই জিনিস সামনে থেকে দেখার মজাই আলাদা। শেষের দিকে আমাদের তথাকথিত শহুরে মহিলারাও নাচে যোগদান করলেন। পুরুষদের যোগ দেওয়ারও প্রস্তাব ছিল কিন্তু আমি নাচার বদলে ঐ নাচকে ক্যামেরাবন্দী করায় মন দিলাম।

৩১শে ডিসেম্বরের সকাল শুরু হল ভোর সাড়ে তিনটের সময়। তখন কী জানি যে পরের কুড়ি-একুশ ঘন্টায় কত কী হতে চলেছে। যাক গে, শুরু থেকেই শুরু করি।
চারটে বাজার একটু পরেই আমাদের জিপ এসে আমাদের নিয়ে চলল গরুমারা জাতীয় উদ্যানের টিকিটঘরের উদ্দেশ্যে। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঠান্ডা, হাড়ে হাড়ে কাঁপুনি ধরে গেছিল আমাদের। পাঁচটার আগে কাউন্টারে পৌঁছেও দেখলাম আমার সামনে নজন ততক্ষণে লাইনে দাঁড়িয়ে পরেছেন। টিকিটঘর যদিও খোলার কথা ছটায়।
ঠিক ছটায় টিকিটঘর খুলল। তার আগে টুরিস্টদের বদলে স্থানীয় লোকেদের লাইনে জায়গা রাখা নিয়ে সামান্য ঝামেলা হয়ে গেল ছোট করে। টিকিট নিয়ে, গাইড ঠিক করে তাকে তুলে নিয়ে আমাদের জিপ ছুটল যাত্রাপ্রসাদ ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। লোকে বলে ঐ যাত্রাপ্রসাদ ও রাইনো অবসার্ভেশান পয়েন্ট থেকেই গন্ডার দেখার সুযোগ সবচেয়ে বেশী।

সাড়ে ছটা নাগাদ জঙ্গলে ঢুকতে পেলাম। আমাদের জিপই সেদিনকার প্রথম জিপ। দূরে দেখতে পাচ্ছি কাঞ্চনজঙ্ঘা। জঙ্গলের মধ্যে যাত্রাপ্রসাদ যাওয়ার পথে একটা বাইসন আমাদের সামনে দিয়ে ছুটে রাস্তা পের হয়ে গেল। আর দেখলাম বার্কিং ডিয়ার।
নদীর ধারে একটা সল্ট লিকের ঠিক সামনে ওয়াচ টাওয়ার যাত্রাপ্রসাদ। সেখান দাঁড়িয়ে সামনের দৃশ্য দেখে মনে ভরে গেল। সামনেই মূর্তি নদী, তারপর অনেকটা খোলা জায়গা, তার পেছনে ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে কুয়াশার ঘন আস্তরণ। সবার পেছনে আবছা হয়ে আছে বিভিন্ন পাহাড়চূড়া, যদিও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাচ্ছিল না ওখান থেকে। এসবের মধ্যে দিয়ে আমাদের চোখের সামনে দিনের সূচনা হল। আকাশের ছাই ছাই আবছা রং পরিবর্তিত হল সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে।


আমাদের পর আরও বেশ কিছু টুরিস্ট গ্রুপ সেখানে এসে জায়গা নিল, প্রত্যেক গ্রুপের সঙ্গেই একজন করে গাইড নেওয়া আবশ্যক। বাচ্চারা থাকায় কিচিরমিচির বাড়ল একটু। সেখানে প্রথম দেখতে পেলাম একটা ময়ূর। যদিও কানপুরে থাকার দরুন এবং রাজস্থান ঘুরে আসার পর ময়ূর দেখে আর নতুন লাগে না। ময়ূরের সঙ্গে সঙ্গেই অন্যান্য পাখী দেখতে পেলাম, মাছরাঙা দেখলাম, ধনেশ পাখীও দেখলাম, যদিও এদের ছবি তুলেছি পরে।
কিছুক্ষণ পর গাইডরা দেখালো বহু দূরে একটা হরিণ নদী পার হচ্ছে। সে প্রায় আবছা এতটাই দূর। আরও কিছুক্ষণ পর গাইডদের মধ্যে আবার চাঞ্চল্য দেখা দিল। জিজ্ঞেস করায় আঙুল তুলে দেখাল দূরে বন দফতরের হাতি বেরিয়েছে, সম্ভবত গন্ডার খোঁজার জন্য, যাতে গন্ডাররা তাদের বাসস্থান থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের দর্শন দেয়। তাদের কথামতই একটু পরে হাতির তাড়া খেয়ে একটা গন্ডার বেরিয়ে এল। যদিও সেও অনেকটাই দূরে। দূরবিন বা ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে জুম না করে দেখলে সেই গন্ডার পরিষ্কার দেখা সম্ভব নয়।















পঁয়তাল্লিশ মিনিট যাত্রাপ্রসাদে কাটিয়ে আমাদের গাইডের কথামত আমরা চলে এলাম রাইনো পয়েন্টে। এটার সামনে দিয়েও মূর্তি নদীর একটা শাখা বয়ে চলেছে। এখানে পাখীর সংখ্যা আরো বেশী... নদীর বুকে বক জাতীয় নানা রকমের পাখী ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আসছিল, আবার একটু বসে উড়ে চলে যাচ্ছিল। ওখানেই এক ধনেশ দম্পতির ছবি তুলতে পেরেছিলাম।




একটু পরে, দূরে গন্ডার দেখা গেল। প্রথমে একটা একা, তারপর একটা বড় গন্ডারের সঙ্গে একটা বাচ্চাও। সেগুলো মোটামুটি পরিষ্কারই দেখা গেল। তারপর গাইডরা জানালেন যে, দূরে নাকি একটা বাইসনের পাল বেরিয়েছে, “কিন্তু আপনাদের চোখে সেটা ধরা পড়বে না।”
অনেক কষ্ট করে জঙ্গলের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকার পর দূরবিন আর ক্যামেরার জুম দিয়ে জঙ্গলের ধারে সত্যিই একপাল বাইসন দেখতে পাওয়া গেল। কিন্তু ছবিগুলো দেখলেই বুঝতে পারবেন যে বাইসনগুলো সত্যিই কতটা দূরে ছিল।
সাড়ে ছটা থেকে আটটা অবধি সময় ছিল। তারপর আমরা গুটি গুটি ফেরার পথ ধরলাম। সেখানেই দেখলাম, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বাংলো, রাইনো পয়েন্টের ঠিক পাশেই। জঙ্গলে থাকার পক্ষে এরকম আদর্শ জায়গা আর হয় না। পরের বার গরুমারা এলে এখানেই থাকার চেষ্টা করব এইসব ভাবতে ভাবতেই বেরিয়ে এলাম গরুমারা ন্যাশানাল পার্ক থেকে। আমাদের জিপ ছুটল কা-কুর-বাড়ি রিসর্টের দিকে।

সুনীল লিখেছিলেন, ‘কেউ কথা রাখেনি’... আমিও কথা রাখতে পারলাম না। এই সপ্তাহে অফিসের চাপে সময় করে এইটুকুই লিখতে পেরেছি। রবিবার আবার ব্যাঙ্গালোর যাচ্ছি দিন চারেকের জন্য। সুতরাং শেষ পর্ব লিখতে পারব সেখান থেকে ফেরার পরেই।

সুতরাং এই লেখার আরো এক পর্ব বাকি। জলদাপাড়ার টুরিস্ট লজের গল্প বাকি আছে এখনো। জে কে রাওলিং সাত পর্বে হ্যারি পটারের গল্প লিখেছিলেন আর আমি নাহয় সাত পর্বে উত্তরবঙ্গ ভ্রমণের গল্প লিখছি, মন্দ কী!

                                                                                                                         (চলবে)

Saturday, January 24, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৫

(আগে যা ঘটেছে)


লাভা-লোলেগাঁও
নট আ গুড ‘চয়েস’

কালিম্পঙে আমাদের এক রাত্তিরই থাকার কথা। পরদিন সকালে উঠেই ব্যাগ-ট্যাগ গুছনোর ব্যাপার ছিল। তাছাড়া আমি রোজ সকালে বেরোবার আগে সারাদিনের প্ল্যান করে নিতাম বা কোথায় কখন কি কাগজ-পত্র লাগবে সেগুলো দেখে নিতাম। সেদিন সকালে উঠে লাভার হোটেলের বুকিঙের কাগজ দেখতে গিয়ে ঘাবড়ে গেলাম। আমরা হলিডেহোমইন্ডিয়া বলে একটা ওয়েবসাইট থেকে লাভার হোটেল চয়েসে বুকিং করেছিলাম। ওরা পোস্টেই বুকিং স্লিপ পাঠিয়ে দিয়েছিল। তখন কীভাবে জানি না নজর এড়িয়ে গেছে, এখন দেখলাম আমাদের হোটেল বুকিং ঠিক এক মাস আগের। মানে ২৭শে ডিসেম্বরের বদলে ২৭শে নভেম্বর। কেলেঙ্কারী ব্যাপার! এদের দিয়েই লোলেগাঁওর বুকিংও করানো হয়েছিল। সুতরাং সবার আগে সেটার তারিখ চেক করলাম। কিন্তু মজার ব্যাপার যে সেটার বুকিং ঠিক তারিখেই হয়েছে। ভুল শুধু হয়েছে লাভার কেসটায়।
কী আর করি। স্লিপে যেসব নম্বর দেওয়া ছিল, তার কয়েকটায় ফোন করলাম, বেশীরভাগ সুইচ অফ, নাহলে বেজে যাচ্ছে। অতঃপর গুগল থেকে খুঁজে পেতে একটা নম্বরে ফোন করায় ফোন লাগল। ভদ্রলোক ঐ হোটেলের কলকাতা অফিসে বসেন। ওনাকে বুঝিয়ে বললাম প্রবলেমটা। উনি ব্যাপারটা বুঝলেন, তারপর বললেন যে, ঘর পাওয়া যাবে। চাপ হওয়া উচিত নয়। তবে দশটার পর ফোন করলে উনি সেটা কনফার্ম করবেন।
টেনশান কমিয়ে আবার প্যাকিং-এ মন দিলাম। এর মধ্যে পিউ উঠল, তাকে এইসব জানানো হল। সেও খুব একটা চাপ না নিয়ে ব্রেকফাস্টে মন দিল।
সব গুছিয়ে নিয়ে দশটা নাগাদ বেরনো হল। এর মধ্যে আমাদের নতুন ড্রাইভার বিট্টু তার অল্টো নিয়ে হাজির হয়ে গেছিল। কালিম্পং থেকে ঘন্টা তিনেক জার্নি করে এসে পৌঁছলাম লাভা। এর মধ্যে হোটেলে ফোন করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। হোটেল চয়েসে ঘর ফাঁকা আছে যেখানে থাকা যাবে।
লাভা একটা খুবই ছোট্ট জায়গা। তার মধ্যে রাস্তার দুদিকে একের পর এক হোটেল। সেগুলোর মধ্যেই এক গলির মধ্যে আমাদের হোটেল চয়েস খুঁজে বের করলাম। প্রথম দর্শনেই মনটা বেশ দমে গেল। ছোট্ট হোটেল, সামনে একটা লাউঞ্জ মত জায়গা, এক পাশে রান্নাঘর। লাউঞ্জের পাশেই আমাদের ঘরটাও খুবই ছোট, বিছানার চাদরটাও খুব পরিষ্কার নয়, রুম-হিটার নেই। একেবারেই সাধারণ ব্যবস্থা আর তার সঙ্গে কনকনে ঠান্ডা! কালিম্পঙের চেয়ে লাভায় অনেকটাই ঠাণ্ডা বেশী ছিল। ঘরে গিয়েই লেপের তলায় ঢুকতে হল।
যাই হোক একটু ধাতস্থ হয়ে আমি আর পিউ দুপুরের খাওয়া খুঁজতে বেরোলাম। গলি থেকে বেরিয়ে কয়েক পা হেঁটেই দেখি, একটা বাঙ্গালী হোটেল এবং খাবার জায়গা যেখানে অনেক লোক একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছে। সেখান কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বসার জায়গা পাওয়া গেল। খাওয়া হল ভাত, ঘি, ডাল, পাঁপড়, বাঁধাকপি আর ডিমের ডালনা। শেষ কদিনের থুকপা আর স্যান্ডউইচের পর ডাল-ভাত দারুণই লেগেছিল। কিন্তু রাত্তিরে ঠান্ডার মধ্যে আবার ওখানে আস্তে ইচ্ছে করবে কিনা সেই ভেবে রাতের খাবার অর্ডার করলাম না। আসলে লাভা এতটাই ছোট জায়গা যে সব হোটেলই রাতের জন্য বিকেলের মধ্যে অর্ডার নিয়ে সেই মত মাথাগোনা খাবারের ব্যবস্থা করে।

লাঞ্চ করে সামান্য মিনিট পনেরো ঘোরাঘুরি করতেই লাভার প্রধান রাস্তাটা আমাদের দেখা হয়ে গেল। তখন বুঝলাম যে জায়গাটা কত ছোট। হোটেলগুলোও বেশীরভাগই যে খুব ভালো লাগলো তা নয়, মনে হল আমাদের হোটেলটার মতই হবে। আর কিছু ছোটখাট দোকান, ঘর সাজানোর জিনিস, মুর্তি, খেলনা, পুতুল, শাল... এইসব সামগ্রী নিয়ে বসে আছে। সঙ্গে অতি অবশ্যই ল্যেজ, কোল্ড ড্রিঙ্কস, বিস্কুটের মত দরকারী জিনিসগুলোও আছে।
আমাদের গাইডবই অনুযায়ী লাভায় প্রধান দুটো দেখার জায়গা নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্ক আর ছ্যাঙ্গে ফলস্‌। সেদিনকার মত কাটিয়ে দিয়ে আমরা হোটেলের ঘরে লেপ মুড়ি দিয়ে সেট ম্যাক্সে ‘মোহব্বতে’ দেখতে বসলাম। প্ল্যান করলাম পর দিন সকালে লোলেগাঁও যাওয়ার আগে এ দুটো দেখে নেওয়া যাবে।
সারা বিকেল-সন্ধ্যে আধা ঘুম-আধা আড্ডা মেরে কাটল। সঙ্গে মাঝে মাঝে কফি, ম্যাগি এইসব উপাচার তো ছিলই। মাঝখানে একবার হোটেলের মালিক মিঃ রোবেনের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা মারলাম। জানতে পারলাম যে, হোটেলের পেছনে পাহাড়ের ঢালে ওদের বাড়ী। ও  আর ওর বউ মিলে হোটেলটা চালায়, এছাড়া সাইট সিইং-এর গাড়ীর ব্যবসাও আছে। আরো জানতে পারলাম যে, নেওড়া ভ্যালি বা ছ্যাঙ্গে ফলস্‌ যাওয়ার রাস্তা এতটাই দুর্গম যে আমাদের ছোট অল্টো গাড়ী কোনমতেই যাবে না। তার জন্য আলাদা বড়, ভারী গাড়ী ভাড়া করতে হবে।
শুনে প্রথমে মনে হয়েছিল যে, হয়তো নিজের গাড়ী গচানোর জন্য এইসব বলছে, তাই অতটা পাত্তা দিইনি। পরের কথায় একটু পরে আসছি।
রাত্তিরে মুর্গির মাংস-ভাত অর্ডার দেওয়া ছিল। খাওয়া-দাওয়া হয়ে যাওয়ার পর রোবেন এসে জিজ্ঞেস করল, “অর কুছ চাহিয়ে সাব?” কিছু লাগবে না বলায়, “তো হাম আতা হ্যাঁয় সাব” বলে সে চলে গেল। তখন কিছু সন্দেহ হয়নি। কিন্তু মিনিট দশেক পর মনে হল, বাইরে থেকে একেবারেই কোন আওয়াজ আসছে না। দরজাটা খুলতেই দেখি বাইরেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। লাউঞ্জের সব আলো নেভানো, জনপ্রাণী নেই। প্রথমে দেখে দুজনে ঘাবড়েই গেছিলাম। মনে হল হিন্দি-ইংরেজি ভূতের সিনেমার মতই কোন ভূতুড়ে হোটেলে এসে পৌঁছেছি। মোবাইলের টর্চের আলোয় হাতড়ে হাতড়ে সুইচ বোর্ডটা পাওয়া গেল। লাউঞ্জের আলোটা জ্বলে উঠতেই পরিবেশটা একটু উন্নত হল। কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে যা দেখলাম সেটা মোটেই আশাব্যঞ্জক নয়। লাউঞ্জে কেউ নেই, ঐ ফ্লোরের অন্য ঘরটায় লোক নেই, সেটা আমি জানতাম। আরো দুটো দরজা, একটা খুলে দেখলাম ওটা একটা বাথরুম, অন্যটা পেছনদিকে একটা বারান্দা। বুঝতে পারলাম যে দোতলায় যাওয়ার সিঁড়িটাও বাইরে দিয়ে। হোটেলের কাঁচের দরজাটা টেনে দেওয়া, বাইরে থেকে সহজেই খুলে ফেলা যায়। সামনের ধাতব শাটারটা তিন-চতুর্থাংশ নামানো।
এসবের মধ্যে আরো খেয়াল হল সারাদিনে রোবেনের ফোন নম্বরটাও নেওয়া হয়নি। কী আর করি, ঐ বারান্দায় গিয়ে “রোবেন, রোবেন” বলে হাঁক পাড়তে লাগলাম। একটা আবছা “আয়া”ও শুনতে পেলাম বলে মনে হল। আবার লাউঞ্জে ফিরে হোটেলের রেজিস্টারটা ঘাঁটব ভাবছি এমন সময়ে হন্তদন্ত হয়ে রোবেন এসে হাজির। আমার প্রশ্নের উত্তরে সে জানালো যে, এটাই তার হোটেলের সিস্টেম। তারা সকলেই রাত্তিরে নিজেদের বাড়ী চলে যায়। লাউঞ্জটা ফাঁকাই থাকে। চিন্তার কিছু নেই, ওপরে দোতলায় অন্য গেস্টরা আছে। এইসব বলে-টলে নিজের ফোন নম্বরটা দিয়ে রোবেন কেটে পড়ল। আমরা আর কী করি। ঘরে ঢুকে দরজার ছিটকিনিটা শক্ত করে লাগিয়ে দিয়ে দরজার গায়ে আমাদের ভারী সুটকেস, ব্যাগ, চেয়ার ঠেকিয়ে রেখে দিলাম। পিউ দাবী জানিয়েছিল যে আলো জ্বেলে ঘুমনোর জন্য, কিন্তু ঘরের নাইট ল্যাম্পটার আলোর রং লাল! তাতে ভয় যত না কমল তার চেয়ে বেশী ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হল। সুতরাং শেষ অবধি টিভিটা চালিয়ে রেখে ঘুমোতে যাওয়া সব্যস্ত হল। ঠান্ডাটা ততক্ষণে অস্বাভাবিক রকমের বেড়ে গেছে।
সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম আগের রাতের বিভীষিকা(!) তখন আর নেই। বাইরে উজ্জ্বল আকাশ। ঘরের বাইরে থেকে রোবেন আর হোটেলের বাকি লোকেদের গলার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে, ঠান্ডা যদিও কমেনি।
রেডি হয়ে, কফি খেয়ে বেশী দেরি না করেই বেরিয়ে পড়া গেল। বিট্টু মানে আমাদের ড্রাইভারকে যখন নেওড়া ভ্যালি আর ছ্যাঙ্গে যাওয়ার কথা বললাম, তখন সে আমতা আমতা করে যা বলল তা হল, তার গাড়ী ওইসব জায়গায় যাবে না। গেলেও রাস্তাতেই আটকে যাবে। ঐসব জায়গার জন্য বড় গাড়ীর প্রয়োজন, ঠিক যা রোবেন বলেছিল। সে আরো যা বলল, তাকে বলা হয়েছে যে, তার গাড়ী নিয়ে আমাদের শুধু কালিম্পং থেকে লাভা, লাভা থেকে লোলেগাঁও... এই জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। এইসব সাইট সিইং সে করাবে না। তার চেয়েও বড় কথা এই ছোট অল্টো গাড়ী অধিকাংশ জায়গায় যাবেই না।
যার কাছ থেকে গাড়ী নিয়েছি তার এটা বোধহয় জানানো উচিত ছিল। তাকে ফোন করেও বিশেষ লাভ হয়নি। নানা রকম বাহানা করে সে কাটিয়ে দিল। সুতরাং এই ফাঁকে এখানে একটা উপদেশ দিয়ে রাখি, উত্তর বাংলায় ঘুরতে গেলে দুজনই যান বা দশজনই যান সবসময় বোলেরো-সুমো বা ঐ জাতীয় বড় গাড়ী ভাড়া করবেন। দরকার হবে না ভেবে বা পয়সা বাঁচানোর চক্করে ছোট গাড়ী ভাড়া করলে সেই গাড়ী অর্দ্ধেক জায়গাতেই যাবে না! আপনার ঘোরার বারোটা বেজে যাবে!
এইসব ঝামেলায় মুড একেবারেই খিঁচরে গেল। আর অন্য গাড়ী নিতেও ইচ্ছে করছিল না। নেওড়া ভ্যালি ন্যাশানাল পার্কের শুরুতে কিছুটা জায়গা নিয়ে গোটা পার্কের একটা ছোট রেপ্লিকা আছে। সেটা আমরা দেখে নিলাম। বিভিন্ন গাছপালা আর পাখীর মডেল ছাড়াও একটা স্টাফড্‌ ভাল্লুকও ছিল। পুরোটা দেখতে দশ মিনিটও লাগলো না। পিউ যদিও তার মধ্যেও ভয় পাওয়ার চেষ্টা করেছিল!
তারপর সেখান থেকে সোজা লোলেগাঁও। একই রকমের পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাওয়া। যদিও রাস্তার হাল বেশ খারাপ। ঘন্টা দুয়েক পর লোলেগাঁও পৌঁছে দেখলাম সেটা লাভার চেয়েও ছোট একটা জায়গা। তবে এখানকার হোটেলটা বাইরে থেকে দেখে বেশ ভালোই লাগল। আর হোটেলের ঠিক সামনে থেকে দেখা যাচ্ছে আমাদের পুরনো বন্ধু কাঞ্চনজঙ্ঘা। যদিও হোটেল কাফালের মালকিন জানালো যে আমাদের ঘর এখনো রেডি নেই। সুতরাং রিশেপসানের এক পাশে আমাদের ব্যাগ-পত্তর রেখে দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ‘হ্যাঙ্গিং ব্রিজ’ দেখতে।


কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া জঙ্গলের মধ্যে ঐ কাঠের ব্রিজটাই লোলেগাঁওয়ের প্রধান দ্রষ্টব্য। জঙ্গলের মধ্যে ভালোই লাগল সেই ব্রিজ। তবে আরো অন্যান্য টুরিস্ট এবং বাচ্চাদের ক্যাঁই-ম্যাই এর জন্য জঙ্গলের শান্তি অনেকটাই বিঘ্নিত হয়েছিল। সেখানেই রাস্তার ধারে একটা নীচু গাছের ডালে চড়ে ছবি তোলা হল। পিউয়ের সেই ‘শাখামৃগ’ নামের ছবিটা ফেসবুকে এত বিখ্যাত হয়ে গেছিল যে দেখলাম আমার ব্রাজিলিয়ান সহকর্মী পর্যন্ত এসে সেটা লাইক করে গেছে!
হোটেলে ফিরে ঘর দেখে মন ভরে গেল। বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘর। কাঠের দেওয়াল, দুদিকে বড় বড় জানলা, সেই ঘরের আবার একটা নামও আছে, ‘কস্তুরি’। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, ঘরের বারান্দা থেকে বটেই এমনকি জানলার পর্দা সরালে বিছানায় শুয়ে শুয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
জিজ্ঞাসাবাদ করে জানলাম যে, এই লোলেগাঁওতে দেখার মত আরো দুটো জায়গা হল একটা সানসেট পয়েন্ট আর একটা সানরাইজ পয়েন্ট। বিশেষ করে সেই সানরাইজ পয়েন্টের সূর্যোদয় নাকি টাইগার হিলের সূর্যোদয়ের মতই সুন্দর! এবার আপনারাই বলুন একবার ঠান্ডায় জমে বরফ হতে হতে সানরাইজ দেখার পর আবার কেউ সেই জিনিস দেখার জন্য ভোর চারটের সময় ওঠে! সুতরাং সানরাইজ আর সানসেট, দুটোই কাটিয়ে দিয়ে আমরা পরের দিনের রিষপ যাওয়ার প্ল্যান বানালাম। বলাই বাহুল্য সেই রাস্তাতেও আমাদের বিট্টুর গাড়ী চলবে না। তাই লোলেগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে পরের দিনের জন্য বোলেরো গাড়ী ভাড়া করে ফেলা হল। তারপর বাকি দিনটা নির্ভেজাল বিশ্রাম, আড্ডা, কফি-পাকোড়া খাওয়া, টিভি দেখা আর ঘুম!
পরদিন সকালে নিজেরা সূর্যোদয় দেখতে না গেলেও হোটেল সুদ্ধু লোকের উৎসাহের চোটে ভোর চারটের সময় ঘুম ভেঙ্গে গেল। কী করব? চারদিকে যা হইচই হচ্ছিল সে কহতব্য নয়, আর ঐ কাঠের পাতলা দেওয়াল ভেদ করে সেইসব আওয়াজ আমাদের ঘুমেরও সাড়ে বারোটা বাজিয়ে দিল। যাই হোক, সবাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চারদিক শান্ত হলে আমরা আবার একটু ঘুমিয়ে নিলাম। তারপর হঠাৎ ছটা নাগাদ ঘুম ভাঙ্গল। কী মনে হল, জানলার পর্দা সরিয়ে দেখলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে লাল রং ছড়িয়ে গেছে। পুরো গোলাপী রং ধরেছে  চূড়ায়। সে এক অসাধারণ অনুভূতি। জানি না, যারা সানরাইজ পয়েন্টে গেছিল তারা বিশেষ কী দেখেছে কিন্তু আমার ঘরে বসে সেদিন যে অভিজ্ঞতা হল তার তুলনাও সহজে মেলা ভার।

দশটা বাজার আগেই আমরা দুজন রিষপের জন্য বেরিয়ে পড়লাম। লোলেগাঁও থেকে রিষপের রাস্তা সত্যিই খুব খারাপ। জায়গায় জায়গায় রাস্তা বলে কিছুই নেই। কোথাও বড় বড় গর্ত, কোথাও হয়তো শুধু পাথর। জায়গায় জায়গায় খাড়াইটাও বেশ চোখে পড়ার মত। ঐ রাস্তা দিয়ে ঘন্টা দুয়েক যাওয়ার পর আমাদের ড্রাইভার (নাম ভুলে গেছি) গাড়ী থামিয়ে বলল, “এবার ঘুরে আসুন।”
গাড়ী থেকে নেমে দেখি রাস্তার ধারে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের গায়ে ঢালু পথ উঠে গেছে। একটা গাছের ডালে আটকানো বোর্ডে লেখা ‘টিফিন ডেরা’। ঠিক জানতাম না ওখানে কী আছে। ড্রাইভার ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করায় যা বলল তাতে মনে হল যে, ওপরে মাইল খানেক গেলেই একটা ভিউ পয়েন্ট আছে। ভাবলাম, ওপরে গেলে নিশ্চয়ই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে। যাই হোক, দুজনে মিলে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। জঙ্গল খুব একটা ঘন না হলেও খাড়াই। সেই খাড়াই পথ দিয়ে মিনিট পনের হাঁটার পরেও জঙ্গল ছাড়া যখন কিছুই দেখতে পেলাম না তখন সন্দেহ হল যা ভেবে হাঁটছি সেটা ঠিক নাও হতে পারে। আরো পাঁচ মিনিট হাঁটার পরও যখন জঙ্গল আরো গভীর হতে লাগল, তখন আমরা ফিরে যাওয়াই উচিত বলে মনে করলাম।
গাড়ীর কাছে গিয়ে আমাদের ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভিউ পয়েন্ট কাঁহা হ্যাঁয়?”
তাতে সে খুব অবাক হয়ে রাস্তার উল্টোদিকে একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে বলল, “ইঁহা!”

ভগবান জানতে পারে কিন্তু আমি আজও জানি না ও আগেরবার ঠিক কী বুঝেছিল!
এবারের দেখানো জায়গাটায় গিয়ে দেখতে পেলাম উজ্জ্বল নীল আকাশের বুকে ঝলমল করছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। এটা ভিউ পয়েন্টই বটে, কোন ভুল নেই। সেখানে বেশ কিছুক্ষণ সময়ে কাটিয়ে এবং নানাবিধ চিত্রকর্মের পর আমরা লোলেগাঁও ফেরার পথ ধরলাম। অনেক বুঝিয়েও আমাদের ড্রাইভারকে রাজী করানো গেলনা রিষপ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য। যতই বলি চলো, সে মাথা নেড়ে বলে, “ও ছোটা বস্তি হ্যাঁয়, দেখনে লায়েক কুছ নেহি হ্যাঁয়!”
আমাদের লাভা-লোলেগাঁওয়ের গল্প মোটামুটি এখানেই শেষ। সত্যি বলতে কী বোরই হয়েছিলাম ঐ কদিন। হয়তো এই লেখাতেও সেটা বেরিয়ে এসেছে। পড়তে গিয়ে আপনিও বোর হয়েছেন হয়তো।

পরের পর্বে আসছে গরুমারা-জলদাপাড়ার গপ্প। আর সেটাই এই লেখার শেষ পর্ব। দয়া করে আর কদিন ধৈর্য ধরুন।
(চলবে)

Saturday, January 17, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - 8


কালিম্পং
ভূত বাংলো

দার্জিলিং থেকে কালিম্পঙের রাস্তাটা বেশ অন্যরকম। প্রথমে কিছুটা শহরের মধ্যে দিয়ে, তারপর পাহাড়, আবার লামাহাট্টার পর কিছুটা গেলেই তিস্তা দেখতে পাওয়া যায়। এরপর তিস্তা বাজারের কাছে অনেকটা রাস্তা তিস্তার সঙ্গে সঙ্গে চলা, তারপর তিস্তার ব্রিজের ওপর দিয়ে এসে ফের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে ওপরে ওঠা। প্রায় তিন ঘন্টার রাস্তা, তাতে আবার আমরা দুবার ব্রেক নিলাম।
দার্জিলিং থেকে হোটেলের সব হিসেব মিটিয়ে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে আমার বেরিয়েছিলাম নটা নাগাদ। পর পর দুদিন বেশ পরিষ্কার আকাশের পর সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকাশও বলল যে, “আজ গড়বড় হ্যায়।” আজও আগের দিনের মতই ঘুম স্টেশন অবধি এসে তারপর ডানদিক না নিয়ে সোজা এগিয়ে গেলাম। তার পরেই একটা বাঁদিকের রাস্তায় গাড়ী ঘুরল। একটু পর থেকেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু। টুকটাক গল্প করতে করতে এগোচ্ছি, আমি মাঝখানে আমার টিনটিন মার্কা নোটবুক খুলে একটু হিসেব করতে বসলাম, কিন্তু ঐ এবড়োখেবড়ো পাহাড়ির রাস্তায় চলন্ত গাড়ীতে হিসেব লেখার চেষ্টা যে খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় সেটা বুঝে রণে ভঙ্গ দিতে হল খুব তাড়াতাড়িই।
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়ী থামল একটা বেশ সুন্দর দেখতে পার্কের সামনে। বিকাশ জানালো যে, এই জায়গার নাম লামাহাট্টা। লামাহাট্টাও একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম তবে এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল পাহাড়ের ঢালে বানানো চমৎকার ঐ পার্ক। বেশ যত্ন করে বানানো এবং সেই একই যত্ন নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়। পুরো পার্ক জুড়ে রংবেরঙয়ের ফুল গাছগাছালির সারি। ততক্ষণে সকালের মুখ ভার কেটে গিয়ে রোদ উঠে গেছে। পার্কের একদিকে উঁচু উঁচু পাইন আর বার্চ গাছের বন, তার সামনে লাইন দিয়ে লাল-হলুদ-সবুজ-নীল রঙের পতাকা সকালের হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে।
আকাশের অন্যদিকের উজ্জ্বল নীল রঙের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের চেনা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পার্কের মধ্যে জায়গায় ছোট ছোট ছাউনির মত বানানো আছে। শুধু তাই নয়, এই সবের মধ্যেই আছে একটা ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে উঠলেই একসঙ্গে লামাহাট্টার পুরো গ্রামটা দেখা যায়। আর কাঞ্চনজঙ্ঘা তো আছেই। মনের আনন্দের প্রকৃতি এবং পিউয়ের প্রচুর ছবি তুলে ফেলা গেল।
পিউ সকালে ব্রেকফাস্টে বেশী কিছু খায়নি। তাই ওখানে একটা দোকানে গরম গরম ম্যাগি খেয়ে নিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আধ ঘন্টা পরেই পরবর্তী বিরতি নিতে হল। পাহাড়ের রাস্তার বাঁকে এক জায়গায় বেশ কিছু গাড়ী দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে আমাদের গাড়ীটাও থামিয়ে দিয়ে বিকাশ বলল, “চলুন, তিস্তা নদী দেখবেন।”
দেখলাম, পাহাড়ের গায়ে বাঁধানো উঠোনের মত জায়গা, লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে নানা রকমের। কিন্তু ওখানকার প্রধান আকর্ষণ হল দূরে পাহাড়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর সঙ্গম। বিকাশ বলল, ওখানটাকে বলে ত্রিধারা, কিন্তু অন্য নদীগুলোর নাম বলতে পারল না। অবশ্য তাতে কী বা আসে যায়? নদীর সৌন্দর্য কি আর তার নামের ওপর নির্ভর করে? তিস্তা নদী ভীষণ সুন্দর। আর এই নদীর জলের রঙ সবুজ। না পান্নার মত উজ্জ্বল সবুজও নয়, কচি কলাপাতার মত চোখ ঝলছে দেওয়া সবুজও নয়। এই সবুজ হালকা, পেস্তা রঙের, সামান্য নীল রঙ ঘেঁষা। এই যাত্রায় সেই প্রথম তিস্তা দর্শন। নদী দেখে, তার ছবি তুলে, তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা আবার এগিয়ে গেলাম আমাদের পথে।

তিস্তা নদী তখনকার মত বিদায় নিলেও একটু পর আবার আমাদের পথের সঙ্গী হল। জায়গাটার নাম তিস্তা বাজার। বুঝতেই পারছেন এখানে এসে দেখলাম আমাদের রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। সেই নদীর সঙ্গে খানিকটা পথ চলার পর তিস্তা নদীর ওপরের ব্রিজ টপকে ওপাশে গিয়ে আমরা আবার পাহাড়-জঙ্গলের পথে ফিরে গেলাম। বিকাশ জানাল, কালিম্পং পৌঁছতে আর ঘন্টা খানেকের বেশী লাগবে না।

এই ফাঁকে কালিম্পঙে আমাদের থাকার ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলে নি। আমি যখন হোটেল বুক করছিলাম তখন সব জায়গাতেই আগে দেখছিলাম যে সরকারী থাকার জায়গাগুলোতে জায়গা আছে কিনা এবং সেগুলো অনলাইন বুক করা যাচ্ছে কিনা। দুটি ক্ষেত্রে দুটো প্রশ্নের উত্তরই হ্যাঁ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টুরিস্ট লজে থাকার ব্যবস্থা করি। সত্যি বলতে কি WBTDC-এর ওয়েবসাইটটা বেশ ভালোই। সেখানেই দেখেছিলাম যে, কালিম্পঙে তিনটি সরকারী অতিথিশালা রয়েছে যেগুলোর মধ্যে আমি পছন্দ করেছিলাম মর্গান হাউস। বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে জেনেছিলাম যে, ওটা একটা ব্রিটিশ আমলের বাংলো, যেটা এখন সরকার অধিগ্রহন করে টুরিস্ট লজ বানিয়েছে। মর্গান হাউসের ছবি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই পছন্দ হয়ে গেছিল আর যতই হোক সত্যজিৎ রায়ের গল্পের চরিত্রদের মত পুরনো বাংলোতে থাকার লোভ সামলানোও সহজ কাজ নয়। যেটা পরে জানলাম তা হল, মর্গান হাউসের নাকি ভূতের বাড়ী বলে কিঞ্চিৎ নাম আছে... (“নাম বলছেন কেন? বদনাম বোলেন...”) বাড়ীর প্রাক্তন মালকিন মিসেস মর্গানকে নাকি মাঝেমধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। আমার সঙ্গিনী সেটা শুনে আসার আগেই আমাকে বলে রেখেছিলেন যে ওখানে গিয়ে ভূতের সামান্য নামগন্ধ পেলেই তিনি ঘর ছেড়ে রিসেপশনে গিয়ে থাকবেন। যদিও ওনাকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করা হয়নি যে, ভূতেদের রিসেপশন এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে!

যাই হোক, কালিম্পং শহরে ঢুকে রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে আমরা মর্গান হাউসের দিকে এগিয়ে চললাম। যাকেই জিজ্ঞেস করি, সে বলে আরো সামনে যেতে হবে। সে এক মজার ব্যাপার। আমরা পাহাড়ের ওপরে উঠেই চলেছি কিন্তু মর্গান হাউস আর আসে না। যাকেই জিজ্ঞেস করি সে মাথা নেড়ে বলে, “আগে”। এইভাবে দোনামোনা করতে করতে এগোতে এগোতে দেখি আমাদের গাড়ী প্রায় একটা মিলিটারি ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে। ততক্ষণে আমি ধরেই নিয়েছি যে, কোন অজ্ঞাত কারণে কালিম্পঙের জনগণ আমাদের সঙ্গে খিল্লি করে আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় পাঠিয়ে দিয়েছে! কিন্তু ঐ মিলিটারি ক্যাম্পের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোককে আমতা আমতা করে যেই বলেছি, “ইয়ে... মর্গান হাউস যানা থা...” ভদ্রলোক মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বাঁদিকে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন, “উধার চলে যাইয়ে!”
বোঝো কান্ড! সেই রাস্তা দিয়ে আরো মিনিট দুয়েক ওপরে ওঠার পর অবশেষে মর্গান হাউস খুঁজে পাওয়া গেল। ছবি দেখা ছিল তাই দূর থেকে দেখেই চিনে ফেললাম। বিকাশও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার আগে অবধি ও ভাবছিল, আমরা ভুল রাস্তায় এসেছি, আর ওকে এখন আমাদের ওর গাড়ী করে নিয়ে ঠিক হোটেল খুঁজে বের করতে হবে!
অত কষ্ট করে খুঁজে পেতে হলেও মর্গান হাউসের সামনে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। চমৎকার দেখতে, পুরনো ধাঁচের বাড়ী, তার চারদিকে বাগান, শুধু তাই নয় সামনের বারান্দার নীচেই সারি দিয়ে রাখা টবে ফুলগাছ। এমনকি বাড়ীটার বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারও বাইরের দেওয়াল বেয়ে গাছের শিকড় নেমেছে। কিন্তু সেটা পুরোটাই বাড়ীটার সৌন্দর্যের একটা অংশ, বাড়ীটা ভাঙ্গাচোরা মোটেই নয়।
বিকাশ আমাদের মালপত্র নামিয়ে দিয়ে, টাকা-পয়সা নিয়ে ‘টা টা’ বলে ফিরে গেল দার্জিলিং। আমরা চেক ইন করেই হোটেলে কথা বলে কালিম্পং ঘোরার জন্য একটা গাড়ীর ব্যবস্থা করে ফেললাম। কথা হল গাড়ী আসবে ঠিক পনেরো মিনিট পর। আমরা ততক্ষণে ঘরে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নেব। আর ঠিক এই সময়ে, মাঝ দুপুরে আমরা ভূতের খপ্পরে পড়লাম!!

গাড়ী আসার তাড়া ছিল। পিউ যথারীতি তার মধ্যেও ল্যাধ্‌ খাচ্ছিল, সুতরাং আমিই আগে বাথরুমে গেলাম ফ্রেস হওয়ার জন্য। হাত-মুখ ধুয়ে-টুয়ে বেরিয়ে দেখি, পিউ ঘরের মধ্যে এক জায়গায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ গম্ভীর, কপালে ভ্রূকুটি, আমাকে দেখে বলল, “এই, একটা খট্‌ খট্‌ করে আওয়াজ হচ্ছে মাঝে মাঝে!”
বুঝলাম পিউয়ের কল্পনায় মিসেস মর্গানের ভূত হাই হিল জুতো পরে হাঁটতে বেরিয়ে আওয়াজ করছেন। পিউয়ের আরো নাকি মনে হয়েছিল যে, ও যখন ঘরের পুরনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিল তখনই আওয়াজটা প্রথম হয়। মানে মিসেস মর্গানের ভূতের বোধহয় পছন্দ নয় পিউ ওনার ড্রেসিং টেবিল ব্যবহার করে। মনে মনে একমত হতেই হল, হাজার হোক, ভূত বা পেত্নি যাই হোন না কেন মিসেস মর্গান তো মহিলাই বটে! এইসবের মাঝেখানেই আমি শুনতে পেলাম ‘খট্‌’ আওয়াজটা। পিউ চোখ বড় বড় করে বলল, “শুনলে?”
নিজের কানে শোনা শব্দকে অস্বীকার করি কী করে? বলতেই হল যে, শুনেছি। তারপর সেই শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়েই পেয়ে গেলাম... কী আবার? রুম হিটার!!
আরে হয়েছে কী, পুরনো দিনের বাংলোর রুম হিটারও পুরনো দিনের, সেটা আমাদের বেয়ারা, আমাদের ঘরে রেখে চালিয়ে দিয়ে গেছিল। সেই হিটার যখন মাঝে মাঝে গরম হয়ে যাচ্ছে, তখন সেটা নিজে থেকেই আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং আবার একটু পরে চালু হয়ে যাচ্ছে। আর ওই চালু-বন্ধের চক্করেই ঐ ‘খট্‌ খট্‌’ শব্দের উৎপত্তি! ভূতের রহস্য সেই যে সমাধান হয়ে গেল তারপর রাতের দিকে হোটেলের বাইরে ঘোরাঘুরি করেও ভূতের নামগন্ধ পর্যন্ত দেখা গেল না। পিউ পরে বলেছিল যে, ঐ খট্‌ শব্দটা যদি শুধু ও শুনত আর আমি শুনতে পেতাম না, তাহলে নাকি ঐ ঘর তো বটেই এমনকি ঐ হোটেল ছেড়েই নাকি ও চলে যেত।

তার আগে তো আমরা সাঙ্গের গাড়ী করে কালিম্পং ঘুরতে বেরোলাম। হ্যাঁ, আমাদের গাড়ীর চালক ভদ্রলোক তাঁর নাম ‘সাঙ্গে’ ই বলেছিলেন, অন্তত আমি সেটাই শুনতে পেয়েছিলাম। কালিম্পঙে মোটামুটি নটা দেখার জায়গা আছে। তার মধ্যে মন্দির, মনস্ট্রি, স্ট্যাচু, নার্সারি, কলোনিয়াল বাড়িঘর, প্রকৃতি... কোন কিছুই বাদ নেই!

সাঙ্গের সঙ্গী হয়ে আমরা প্রথমে গেলাম দুরপিন ডেরা মনস্ট্রি। পাহাড়ের আরো ওপরে সুসজ্জিত একটা বৌদ্ধ মঠ। যখন গেলাম, তখন প্রধান মন্দির বন্ধ থাকলেও চারপাশ ঘুরে দেখায় কোন বাধা নিষেধ নেই। এমনকি মঠের তিনতলাতেও উঠে গেলেও কেউ কিছু বলছে। অন্য যেকোন বৌদ্ধ মঠের মত এই মঠের রঙও উজ্জ্বল। আর ওপর থেকেই দেখা যায় পাশের মিলিটারি স্কুলের মাঠ, চারপাশের পাহাড় এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। খুব ভালো লেগেছিল ঐ দুরপিন ডেরা। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম পাইন ভিউ নার্সারি। কালিম্পঙে এরকম নার্সারি অনেকগুলোই আছে কিন্তু পাইন ভিউয়ের বৈশিষ্ট্য হল এখানকার ক্যাকটাস। এত বিভিন্ন রকমের ক্যাকটাস আর অন্য কোন নার্সারিতে নাকি নেই। অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের মত আমরাও দশ টাকার টিকিট কেটে ঘুরে এলাম, ভালোই লাগলো।
সেখানে থেকে বেরিয়ে একটা মন্দিরে ছোট্ট করে দর্শন সেরে আমরা চলে এলাম ডেলো পাহাড়ে। এখন ব্যাপারটা হল, ডেলো পাহাড়ের ডাকবাংলো যে গত কয়েক মাস ধরে সব খবরের কাগজের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে সেটা আমাদের ঠিক মনে ছিল না। নাহলে সেটাও নাহয় দর্শন করা যেত। আপাতত আমাদের গাড়ী ডেলো পাহাড়ের ওপরের একটা পার্কের সামনে আমাদের নামিয়ে দিল। ততক্ষণে প্রায় চারটে বেজে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছিল। সেই কনকনে ঠাণ্ডায় পিউ তো হাত-পা-দাঁত কেঁপে অস্থির। আমিও সেরকম জুত পাচ্ছিলাম না। সুতরাং মিনিট দশেক ঘুরে, ছবি-টবি তুলে, ফুচকা আর বাদাম ভাজা খেয়ে আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম।
সেখান থেকে বেরিয়ে সাঙ্গে আমাদের পরপর তিনটে বিশাল মূর্তি দেখাতে নিয়ে গেল। দুটো বুদ্ধ মূর্তি, আর একটা হনুমানের। আর সঙ্গে একটা দুর্গা মন্দিরেও নিয়ে গেছিল, কিন্তু সেটা ছিল বন্ধ। সব দেখে যখন মর্গান হাউসে ফিরলাম তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ঠাণ্ডাও সেরকমই জমাটি।

গরম গরম কফি, ভেজ পাকোড়া আর এগ পাকোড়া খেতে খেতে সান্ধ্য আড্ডা চলল আমার আর পিউয়ের। মধ্যে অবশ্য সামান্য টেনশন হয়েছিল। কারণটা ছিল আমাদের বাকি ট্রিপের গাড়ী। আসলে, পরদিন সকালে কালিম্পং থেকে বাকি ট্রিপ মানে লাভা, লোলেগাঁও, গরুমারা আর জলদাপাড়ার জন্য আমাদের একটা গাড়ী ঠিক করা ছিল। কিন্তু সারা সন্ধ্যে চেষ্টা করেও তার মালিকের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনি। মনে মনে ঠিক করেই ফেলেছিলাম যে, গাড়ি থেকে ফোন না এলে কাল সকালে আবার রিসেপশনে কথা বলে এই সাঙ্গের গাড়ী নিয়েই লাভা চলে যাবো। যাই হোক, রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ গাড়ীর মালিকের ফোন এসে গেল। জানিয়ে দিলেন কাল সকাল নটার মধ্যে ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে মর্গান হাউসে উপস্থিত থাকবে।
রাত্তিরে চাঞ্চল্যকর কিছুই ঘটল না। মিসেস মর্গানও এলেন না আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। বরং টিভিতে ‘বিগ বস’ আর ম্যান ইউনাইটেডের খেলার মধ্যে কোনটা দেখা হবে সেই নিয়ে তর্ক করতে করতেই পিউ ঘুমিয়ে পড়ল। তার আগে অবশ্যই পেট পুরে ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন আর ক্যারামেল কাস্টার্ড দিয়ে নৈশাহার হয়ে গেছিল।

পরের গন্তব্য লাভা, ভুটানি ভাষায় যার মানে, ‘Heavenly abode of the Gods’, মানে আমার সঙ্গী গাইডবুকটি অন্তত তাই বলছিল!
(চলবে)

                                                                                                                                                   
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”