Saturday, June 17, 2017

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৩


ফরজি ততক্ষণে একটা ঘুম-টুম দিয়ে চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। আমাদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ল ঝটপট। বলে দিলাম যে, খিদে পেয়েছে। ব্রেকফাস্ট করা দরকার। পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে গাড়ী নিচে নামল। তারপর সমতলে আরো কিছুটা এগিয়ে একটা স্থানীয় ছোট খাওয়ার জায়গায় গিয়ে আমরা থামলাম। সকলেই তখন বেশ ক্লান্ত, বিশেষ করে সারা রাত জেগে থাকার ক্লান্তিটা চোখে মুখে ধরা পড়ছিল। গিয়ে চাউমিন, অমলেট ইত্যাদি অর্ডার করে আমরা বাইরে এসে বসলাম। আরো একটি কাপলও ছিল। তারাও তাদের খাবার অর্ডার দিয়ে আমাদের মতই বাইরে বসল। শ্রেয়সী ততক্ষণে খিদের জ্বালায় অস্থির।
মিনিট পাঁচেক পর ভেতর থেকে একটি মেয়ে দু প্লেট নুডলস্‌ সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে এল। স্থানীয় খাবার, তার নাম নিয়ে সকলেই কনফিউজড। নাম শুনে ওই কাপলের মেয়েটি একটি প্লেট নিল। অন্য প্লেটটা শ্রেয়সী নিয়ে খাওয়া শুরু করল। দু চামচ খাওয়ার পর বোঝা গেল, ওটাও ঐ অন্য গ্রুপটার জন্যই ছিল। শ্রেয়সী তারপরেও ওটা অফার করেছিল কিন্তু রেস্তোরার লোকজন আরো এক প্লেট বানিয়ে নিয়ে এল চটপট!
পরে দেবাদ্রি ওদের সঙ্গে কোথায় কোথায় ঘুরেছে সেই নিয়ে দিব্যি গল্প জুড়েছিল। খেয়েদেয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম, এবার গন্তব্য জঙ্গলের মধ্যে মাদেকারিপুরা জলপ্রপাত।

ফরজি প্রায় ঘন্টা খানেক পর আমাদের নিয়ে এসে নামালো জঙ্গলের ঠিক বাইরের পার্কিং লটে। এরপর বোঝা গেল যে, বাকি রাস্তা আর গাড়ী যায় না। তার বদলে স্থানীয় ছেলেরা বাইক নিয়ে ঘুরছে, সেই বাইক ভাড়া করে জঙ্গলের মধ্যে আর দুই কিলোমিটার যেতে হয় আর তারপর বাকিটা হেঁটে। আরো জানা গেল যে, জলপ্রপাতটা বেশ বড় এবং সেখানে গেলে জামা-কাপড় ভেজার সম্ভাবনা আছে। সেসব শুনে এবং যেহেতু চেঞ্জ করার জায়গা ছিল আমরা ঝটপট জলে নামার মত পোশাকে রেডি হয়ে গেলাম। সময়ের ব্যাপারটাও মাথায় রাখতে হচ্ছিল। তখন প্রায় বারোটা বাজে। জলপ্রপাত দেখে মোটামুটি দুটো-আড়াইটের মধ্যে বেরোতেই হবে কারণ ফরজির মতে ওখান থেকে এয়ারপোর্ট যেতে তিন-সাড়ে তিন ঘন্টা লাগবে। এছাড়া খাওয়ার জন্যেও থামতে হতে পারে। এদিকে আমাদের ফ্লাইট সাতটায়।
যাই হোক, তখনকার মত ছটা বাইক ঠিক করে ছয় মূর্তিমান যাত্রা শুরু করলাম। আমাদের চালক যারা তার সব অল্পবয়স্ক ছেলেপুলে কিন্তু পাকা হাত, ওই জঙ্গলের মধ্যেও চমৎকার চালিয়ে এবং ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে গল্প করতে করতে আমাদের পৌঁছে দিল টিকিট কাউন্টারের সামনে। আমার বাইকটা সবচেয়ে পেছনে ছিল। নেমেছি সবে, হঠাৎ দেখি শ্রেয়সীর বাইকটা ঘিরে বেশ হইচই হচ্ছে। গিয়ে দেখি, ভদ্রমহিলা বাইক থেকে নামার সময় কোন অজ্ঞাত (!) কারণে উল্টোদিক দিয়ে নামতে গেছেন এবং বাইকের সাইলেন্সারে লেগে ডান পায়ের গোছের কাছে প্রায় দুই-আড়াই ইঞ্চি মত জায়গা পুড়িয়ে ফেলেছেন!

ব্যাপারটা নিয়ে বেশ সাড়া পড়ে গেল। আমাদের বাইকের ছেলেগুলোই নানাভাবে পিউয়ের যত্ন নিতে লাগল। জলের বদলে একরকম তেল এনে ওর পায়ে দিতে লাগল। আমদের কয়েক জন, যেমন ঈশিতা উত্তেজিত হলেও বাকিরা বিশেষ করে শ্রেয়সী তেমন পাত্তা দেয়নি। সে এরকম কান্ড করেই থাকে! এইসব তালেগোলে আবিষ্কার হল যে, আমরা নাচতে নাচতে এসে গেছি বটে, কিন্তু জলপ্রপাতের কাছে যেতে যে টিকিট লাগে সেই টিকিটের ২১,০০০ করে এক লাখ ছাব্বিশ হাজার রুপিয়া আনা হয়নি। দেবা আবার গেল বাইকে করে টাকা আনতে। আমরা ওখানেই বসলাম। শ্রেয়সী পায়ের পরিচর্যার নামে কঙ্কনার সঙ্গে 'পা পোড়া সেলফি' তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল!
ইন্দোনেশিয়ার লোকজন বেশ ফ্রেন্ডলি, ওখানেও একটা ছেলে এসে আমাদের সঙ্গে গল্প করতে শুরু করল। এই প্রসঙ্গে একজন গ্লোবাল ইন্ডিয়ান সুপারস্টারের কথা লিখে ফেলি। এই ইন্দোনেশিয়া ট্রিপ না করলে কোনদিন জানতে পারতাম না শাহরুখ খান আমাদের দেশের বাইরে কতটা জনপ্রিয়। গাড়ীর চালক, দোকানদার বা রেস্টুরেন্টের রাঁধুনি, যেই হোক ভারতীয় শুনলেই তাঁদের একটাই পয়েন্ট অফ রেফারেন্স, 'শারুক খান'... এমনকি দোকানদাররা রীতিমত 'কুছ কুছ হোতা হ্যায়'' আর 'দিল তো পাগল হ্যায়'র গান গেয়ে শুনিয়েছে। এছাড়া দেবার গানের গল্পেও পরে আসব। যাই হোক সেই ছেলেটির সঙ্গে শাহরুখকে নিয়ে আড্ডা মারতে মারতে দেবা টাকা নিয়ে এসে হাজির হল এবং আমরা এগিয়ে পড়লাম মাদেকারিপুরা জলপ্রপাতের উদ্দেশ্যে।
জঙ্গলের মধ্যে হলেও কংক্রিটের বাঁধানো রাস্তা, যদিও কিছুটা এগোনোর পর লোহার ব্রিজ এমনকি বাঁশের ছোট ব্রিজের ওপর দিয়েও যেতে হয়েছে। তবে সে অনেকটা ভেতরে। পা চালিয়ে আমি আর ড্যুড সামনে যাচ্ছিলাম, বাকিরা পেছনে। মাঝে সকালের সেই ভদ্রমহিলা, শ্রেয়সী যাঁদের খাবার খেয়ে নিয়েছিল তাঁদের সঙ্গে দেখা হল। তাঁরাও বললেন যে জলপ্রপাত এখনো ভেতরে কিন্তু দৃশ্য নাকি দুর্দান্ত! সেই শুনে আরো কিছুটা পা চালিয়ে শেষ অবধি পৌঁছলাম। জলপ্রপাতের সামনে গিয়ে বুঝলাম কেন এটা এত বিখ্যাত। কারণ জলপ্রপাত একটা নয়। উঁচু পাহাড় একটা লম্বা দেওয়ালের মত বানিয়েছে আর সেই দেওয়াল থেকে পাঁচ-ছটা ধারায় জল ঠিক আমাদের সামনে নেমে আসছে বিভিন্ন গতিবেগে। সেটা একটা দেখা মত জিনিস!শুধু তাই নয়, জলটা যেখানে এসে পড়ছে পাথর-টাথর টপকে সেখানে যাওয়া যায়। অতঃপর সবাই মিলে নানাভাবে ভিজে মাদেকারিপুরা জলপ্রপাত এনজয় করা হল। ওই জলের মধ্যেও প্রচুর ছবি তুলে ভিজে জবজবে হয়ে আবার আধ ঘন্টা পর রওয়ানা দিলাম ফেরার পথে।

তারপর আবার সেই বাইকে করে গেটে। সেখানে ভিজে জামা-কাপড় চেঞ্জ করে চললাম এয়ারপোর্টের পথে। খুব একটা দেরি হয়নি, সঙ্গে স্ন্যাক্স ছিল, তাই খাওয়াটাও কাটিয়ে দিয়ে চললাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। খাওয়া-দাওয়া হল এয়ারপোর্টে। পরের গন্তব্য বালি!

Saturday, May 27, 2017

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ২

প্লেনযাত্রা ঘটনাবিহীন ছিল। নতুন দেশ ইন্দোনেশিয়ার সুরাবায়ার সময় রাত সাড়ে দশটায় নেমে দেখা হল আমাদের ড্রাইভার এবং গাইড ফরজির সঙ্গে!
প্রথমেই ফরজির সঙ্গে আমাদের প্ল্যানটা একবার ফাইনাল করে নিলাম। প্রথমে আমরা ডিনার করব, তারপর প্রায় ঘন্টা তিনেক ড্রাইভ করে পৌঁছব মাউন্ট ব্রোমোর কাছে। সেখানে একটা স্পটে আমাদের গাড়ি ছেড়ে একটা জিপ নিয়ে যেতে হবে আর এক ঘন্টা। জিপ পৌঁছে দেবে পেনানজাকান হিলের তলায়। সেখান থেকে একজন গাইড নিলে সে আমাদের রাস্তা দেখিয়ে সুবিধামত ভিউপয়েন্টে নিয়ে যাবে, যেখান থেকে ব্রোমো পাহাড়ের উপর সূর্যোদয়ের সময় আলোর খেলা দেখা যাবে! ব্রোমো নামটা কিন্তু এসেছে ব্রহ্মা থেকেই। ব্রোমোর সঙ্গে সেখানে আছে বাতুর এবং সুমেরু পর্বত, যে সুমেরু পর্বতে নাকি ভগবানদের ঘরবাড়ী। সূর্যোদয়ের পর সেই জীপে করেই আরো একটা-দুটো জায়গা দেখার পর আমরা গাড়ীতে ফিরে আসব। তারপর গাড়ী নিয়ে চলে যাবো মাদিকারিপুরা জলপ্রপাত। তবে শেষ অবধি গাড়ী যাবে না, সেখানে জঙ্গলের মধ্যে বাইকে চড়ে যেতে হবে জলপ্রপাতের কাছে। সেসব দেখে ফাইনালি ও আমাদের নামিয়ে দেবে এয়ার পোর্টে।

পরিকল্পনা মত মোটামুটি ঠিকঠাক একটা খাবার জায়গায় নিয়ে যেতে বলে আমরা রওনা দিলাম। রাতে ভালোই ডিনার হল। নাসি গোরেং, ওখানকার স্থানীয় বিফ কারি এবং ভাত ইত্যাদি। এখানে একটা মজার অভিজ্ঞতা হল। লম্বা যাত্রার আগে আমরা সকলেই একবার বাথরুমটা ঘুরে যাবো ভাবছিলাম। ওখানকার বাথরুমটা ছিল পেয়িং টয়লেট। তা সেখানে ঘুরে আসার দক্ষিণা ২০০০ রুপিয়া! ব্যাপারটা কিছুই নয়, বর্তমানে ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়ার ক্রয়মূল্য খুবই কম। ভারতীয় এক টাকা ওখানকার ২০০ টাকা। দেশের সবচেয়ে ছোট নোট ১০০০ রুপিয়ার, সেখান থেকে ১ লাখ রুপিয়া অবধি আছে। সঙ্গে ৫০০ আর ১০০০ রুপিয়ার কয়েন!
অতঃপর রাতের অন্ধকারে গাড়ীর ফ্রি ওয়াইফাইতে গান চালিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম ব্রোমো পাহাড়ের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শহরের রাস্তা ছেড়ে গাড়ী ফাঁকা রাস্তা ধরল। দুদিকে গাছপালা, ছোট ছোট বাড়ীঘর। কথামত তিনটে নাগাদ ভিড়ে-ভিড়াক্কার একটা জায়গায় পৌঁছলাম। জানা গেল, এখান থেকেই জিপ নিতে হবে। গাড়ী থেকে বেরিয়ে বুঝলাম ঠাণ্ডা ভালোই। সেটা মাথায় রেখে গরম কাপড় যথেষ্ট আনা হয়েছিল। সেগুলো ভালো করে চড়িয়ে আমরা উঠে বসলাম আমাদের লাল রঙের জীপে।
দেবাদ্রির ক্যামেরা থেকে 
ঘুটঘুটে অন্ধকারে হালকা কুয়াশার মধ্যে দিয়ে গাড়ী চলল। আমি তখন প্রায় ঘুমন্ত। ওই জিপেই চট করে একটা পাওয়ার ন্যাপ মেরে নিলাম। জিপ এসে  থামল এক পাহাড়ের নিচে। ঐ রাত তিনটেও সেখানে কী ব্যস্ততা! একের পর এক জীপ থেকে আমাদের মত অন্য দলবল এসে নামছিল। সঙ্গে টর্চ হাতে গাইডের দল, চা-কফি-সিগারেট বিক্রেতার দল। সেরকম এক গাইড ঠিক করে মিনিট পাঁচসাত অন্ধকারের মধ্যে পেনানজাকান পাহাড়ে উঠে একটা সুবিধামত জায়গায় ঘাসের ওপর মাদুর পেতে বসিয়ে দিয়ে গাইড বাবাজি কেটে পড়ল। যাওয়ার আগে চা-কফিওয়ালা ডেকে আনবে বলেছিল, কিন্তু সেটা শেষ অবধি আসেনি।
চারদিক তখনও অন্ধকার, সামনে পাহাড়ের ঢাল নেমে গেছে। তার সামনে অনেকটা ধোঁয়া ধোঁয়া জায়গা আর আরো সামনে জমাট অন্ধকার। বুঝলাম ঐ ধোঁয়াগুলো কুয়াশা আর জমাট অন্ধকারগুলো পাহাড়। কোনটা ব্রোমো সেটাও দেখিয়ে দিয়ে গেল আমাদের গাইড।
তারপর বসেই আছি। আশেপাশে বিভিন্ন দেশের আরো মানুষ আসছেন। কেউ আমাদের পাশেই বসছেন। কেউ আরো এগিয়ে যাচ্ছেন। দেবা আর ড্যুডও ঘুরে দেখে এল সামনে বেটার ভিউপয়েন্ট আছে কিনা। বসে ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে গুলতানি চলছে। আস্তে আস্তে অন্ধকার হালকা হচ্ছিল। দূরে ব্রোমো পাহাড় আর তার ওপরে একটা মেঘের স্তর মনে হচ্ছিল। তারপর আস্তে আস্তে বুঝলাম ঐ মেঘ/ধোঁয়ার গঠনটা খুব ধীরে ধীরে চেঞ্জ হচ্ছে। যাইহোক আস্তে আস্তে ভোরের আলো ফুটলেও কুয়াশার জন্য সূর্যের দেখা পাওয়া গেল না। কুয়াশার মধ্যে ব্রোমো পাহাড়ের ধোঁয়া দারুণ লাগছিল কিন্তু সূর্যোদয় দেখার মজাটা পাওয়া গেল না। যাই হোক শ খানেক ছবি এবং দুশ-আড়াইশো সেলফি তোলার পর পাহাড় থেকে নামা হল।
দেবাদ্রির ক্যামেরা থেকে
পরবর্তী গন্তব্য কোথায় জানতাম না। একটু পরে দেখি একটা বিশাল বড় মাঠের ধারে গাড়ী এসে নামিয়ে দিয়েছে। গাড়ী থেকে নেমে দেখি পুরো মাঠটার রঙ কালো এবং সেটা গিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পর থেকে ব্রোমো পাহাড় উঠে গেছে যার মাথা থেকে একটানা ধোঁয়া বেরিয়ে চলেছে এবং সেটা সেখান থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম ঐ আগ্নেয়গিরির লাভা আর ছাইয়ের কারণেই মাঠটা পুরো কালো। নেমে, মেয়ের দল টুক করে ফ্রেশ হয়ে এলো। আমরা এলোমেলো ঘুরছিলাম তারপর বুঝলাম ঐ মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গিয়ে পাহাড়ের গায়ে বানানো সিঁড়ি দিয়ে উঠলে একবারে আগ্নেয়গিরির মুখ অবধি পৌঁছনো যাবে। কিন্তু সেই পাহাড়ের সিঁড়ি অবধি হেঁটেও যাওয়া যায় বা ঘোড়ায় করে যাওয়া যায়। সবাই মিলে শেষ অবধি ঘোড়াই নেওয়া হল। ছটি ঘোড়া এবং ঘোড়ার মালিকদের সঙ্গে আমরা চললাম ঘোড়ায় চলে।
আমার প্রথম অশ্বারোহণ। ভাগ্য ভালো, আমার ঘোড়া পাঞ্জের বেশ শান্তশিষ্ট ছিল। দুলকি চালে নিয়ে গেল তবে বেশ এবড়োখেবড়ো সরু রাস্তার মধ্যে দিয়ে মানুষ ও ঘোড়া একসঙ্গে যাচ্ছে বলে ব্যাপারটা বেশ চাপের। আমার সামনেই দুটো মেয়ে একটু অন্যমনস্ক হয়ে হাঁটছিল। হঠাৎ ঘুরে দেখে পাঞ্জের প্রায় ওদের ঘাড়ের ওপরে, তাড়াতাড়ি সরতে গিয়ে একজন পরেই গেল। তাদের কাটিয়ে আমরা এগোলাম। দলবলের মধ্যে সবার আগে ওই সিঁড়ির কাছে আমিই পৌঁছলাম। ঘোড়া থেকে নামার পর ঘোড়ার মালিকই বলল, "ফোন দাও, ছবি তুলে দিচ্ছি।"
দস্যু সর্দারনী
একে একে বাকিরাও এল, শ্রেয়সীর কাছ থেকে জানা গেল যে, শ্রেয়সীর ঘোড়া খুবই দুষ্টু এবং মাঝে মাঝেই নাকি বেগরবাঁই করেছে তবে সেটা আরোহীর সঙ্গদোষে কিনা জানা গেল না!

আগ্নেয়গিরির মুখ অবধি যাওয়ার সিঁড়িটা বেশ সরু। তাতে করে একজন একজন করে ওঠা আর উল্টোদিক থেকে একজন করে নামা। তার মধ্যে কেউ একজন উঠতে উঠতে ছবি তুলতে দাঁড়িয়ে পড়লেই পেছনে ট্রাফিক জ্যাম। যাই হোক, ওপরে ওঠার পরের দৃশ্যটা অবিস্মরণীয়। ওপরে যে খুব বেশী জায়গা তা নয়। সেই তুলনায় লোক প্রচুরই। কিন্তু আক্ষরিক অর্থেই আগ্নেয়গিরির পেটের মধ্যে কী হচ্ছে দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে একটা অবিশ্রান্ত গুম-গুম আওয়াজ। কিছুটা সময় ওখানে কাটানো হল, ছবি-টবিও তোলা হল। একটা ভাঙাচোরা রেলিং মত আছে, সেটাতেই হেলান দিয়ে বসা হল। সেখানে আবার একটা ছোট গনেশ মূর্তি খুঁজে বের করলাম। বুঝলাম এখানে পুজোও হয়। মিনিট পনেরো পরে আস্তে আস্তে নেমে এলাম সিঁড়ি দিয়ে। ততক্ষণে খুব খিদে এবং জল তেষ্টা পেয়ে গেছে। খাবার ভালো কিছু পাওয়া গেল না। বাকি রাস্তাটাও পায়ে হেঁটেই নামলাম। নিচে এসে সামান্য বিস্কুট জাতীয় খাবার আর জল কিনে খাওয়া হল। তারপর আবার জীপ পৌঁছে দিল আমাদের গাড়ীর কাছে। তখন বাজে প্রায় নটা।
দেবাদ্রির ক্যামেরা থেকে। অগ্নুৎপাতের ফলে তৈরি খাঁজ!

Sunday, May 21, 2017

ইন্দোনেশিয়া ডায়েরি - ১

আমি মালয়শিয়ায় আসার পর থেকেই দলবলের সঙ্গে মালয়শিয়া এবং তার আশেপাশের জায়গাগুলো ঘোরার প্ল্যান বানানো চলছিল। তর্ক-বিতর্কের বহু বিষয় ছিল। যেমন কবে যাওয়া হবে, কোথায় যাওয়া হবে, কী কী দেখা হবে ইত্যাদি। প্রায় মাসখানেক বহু হোয়াটস্যাপ চ্যাট, কনফারেন্স কল এবং ইন্টারনেট সার্চের পর ফাইনালি একটা প্ল্যান দাঁড় করানো গেল।
কিন্তু প্ল্যানের আগে কারা কারা এই ঘোরার প্ল্যানের পার্ট ছিল সেটা লিখে ফেলি।
আমি আর দেবাদ্রি তো ছিলামই মালয়শিয়া থেকে।
কলকাতা থেকে আসছিল আমার অর্ধাঙ্গিনি শ্রেয়াসী, যাকে নিয়ে আমার ব্লগেও আগেও লেখা হয়েছে। সঙ্গে ছিল পাঠভবনের পাঁঠা ওরফে ঈশিতা ওরফে ভাইটু যাকে দার্জিলিং ঘুরতে গিয়ে আমাদের সঙ্গী বিকাশ বলত 'বাইটু'!
দিল্লী থেকে আসছিল দলের সবচেয়ে হাল্কা-ফুল্কা সদস্য দেবনাথ ওরফে ড্যুড!
হায়দ্রাবাদ থেকে আসছিল কঙ্কনা। যার বয়স আঠেরোর বেশী বাড়ে না এবং যে সুস্থভাবে ফিরে যাওয়ায় ওর অফিস আহ্লাদিত হয়ে ওকে এমন একটা পুরষ্কার দিয়েছে যে ঘোরার পুরো খরচাই নাকি উঠে গেছে!
ঘোরার প্ল্যানে কেএল ছাড়াও ছিল সুরাবায়া এবং বালি। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথমে যাওয়া হবে সুরাবায়া। সুরাবায়া ইস্ট জাভার অন্তর্গত এবং ইন্দোনেশিয়ার ম্যাপে বালির সামান্য ওপরে অবস্থিত। সেখানে যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল মাউন্ট ব্রোমো আগ্নেয়গিরি এবং মাদিকারিপুরা জলপ্রপাত দর্শন। সেখানে থেকে পরের গন্তব্য বালি, সেখানে স্কুবা ডাইভিং করা হবে এবং বালির বিভিন্ন অসাধারণ সুন্দর  ঐতিহাসিক মন্দিরগুলো দেখে কেএল ফেরা হবে।
ফ্লাইট এবং হোটেল বুকিং পুরোটাই অনলাইন করা হয়েছে এয়ার এশিয়া এবং বুকিং ডট কমের সাইট থেকে। এছাড়া শ্রেয়াসী 'ডিসকভার ইন্দোনেশিয়া' বলে একটি গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করে একদিনের ব্রোমো-মাদিকারিপুরা ঘোরার প্ল্যান-গাড়ী ফাইনাল করে ফেলেছিল। আর দেবা ঠিক করে ফেলেছিল স্কুবার গ্রুপ। সেও অনলাইন!
দেবাদ্রির ফ্ল্যাটের বারান্দা থেকে শ্রেয়সীর তোলা ছবি
যাই হোক, এপ্রিল মাসের ২৭ তারিখ কলকাতা-দিল্লী-হায়দ্রাবাদ থেকে দলবল চলে এল কুয়ালালামপুরে। পরের দিন সন্ধ্যেবেলার ফ্লাইট সুরাবায়ার উদ্দেশ্যে আর তারপরেই শুরু অ্যাডভেঞ্চার!
ভুল! অ্যাডভেঞ্চার শুরু হল প্লেনে ওঠার আগেই! ব্যাপারটা হল, আমি আমার অফিসে বলে ২৮ তারিখের একটা হাফ-ডে যোগার করেছিলাম, শুক্রবার ছিল তাই খুব বেশী চাপ হয়নি। কিন্তু দেবার বিকেল পাঁচটার সময় একটা স্ট্যাটাস আপডেট কল ছিল যেটা অনেক চেষ্টা করেও ও কাটাতে পারেনি। এদিকে প্লেনের সময় সাতটা পঁয়ত্রিশ, এবং ইন্টারন্যাশানাল ফ্লাইট তাই তার এক ঘন্টা আগে চেক-ইন বন্ধ হয়ে যাবে! সুতরাং ব্যাপারটা দাড়িয়েছিল যে, ছটা নাগাদ অফিস থেকে বেরিয়ে কোনভাবে ওকে ছটা পঁয়ত্রিশের মধ্যে এয়ারপোর্ট এসে পৌঁছতে হবে! আর ওর অফিস থেকে এয়ারপোর্ট যাওয়ার সবচেয়ে তাড়াতাড়ি উপায় হল কেএল সেন্ট্রাল এসে এয়ারপোর্ট শাটল্‌ ট্রেন নেওয়া যেটা করলেও ৪৫ মিনিট লেগেই যাবে। তার মধ্যে আবার দুপুরে এক প্রস্থ ঝোড়ো বৃষ্টি হয়ে গেল। প্রচণ্ড টেনশান মাথায় নিয়ে আমি, শ্রেয়াসী, ভাইটু আর কঙ্কনা এবং অধিকাংশ ব্যাগ নিয়ে চারটে নাগাদ এয়ারপোর্টের দিকে যাত্রা শুরু করলাম। ড্যুড গেল দেবার অফিস, ওর মিটিং হয়ে গেলে ওকে নিয়ে একসঙ্গে চলে আসবে।
রাস্তার জ্যাম কাটিয়ে মোটামুটি সাড়ে পাঁচটা নাগাদ এয়ারপোর্টে ঢুকে গেলাম। কিন্তু সেখানে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হল যে, শুধু যে কজন এসেছে তাদের পাসপোর্ট দেখে সেই বোর্ডিং পাসগুলো দেওয়া হবে। বাকিরা যখন এসে পৌঁছবে তখন বোর্ডিং পাস পাবে। কী আর করা, আমরা আমাদের বোর্ডিং পাস নিয়ে, ইমিগ্রেশান, সিকিউরিটি চেক করে গেটের সামনে পৌঁছলাম, তখন প্রায় ছটা বাজে। দেবারা তখনো কেএল সেন্ট্রালের পথে। আমরা চারজন গম্ভীর মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছি। এর মধ্যে এক জায়গায় সিকিউরিটি চেকিং হওয়ার পর একটা গোদা ব্যাগ ফেলে এসেছিলাম, সেটা আবার দৌড়ে গিয়ে নিয়ে এলাম। কিন্তু দেবাদের পৌঁছনোর টেনশানে ওটার চাপ মাথায় রেজিস্টারই হল না। ছটা দশ নাগাদ শুনলাম দেবারা ট্রেনে উঠেছে। যে ট্রেন এয়ারপোর্ট পৌঁছতে ৩৩ মিনিট সময় নেবে। আমাদের গোটা আষ্টেক ব্যাগের দায়িত্ব কঙ্কনাকে দিয়ে তখন আমি, শ্রেয়সী আর ভাইটু এদিকওদিক র‍্যান্ডম অ্যাটেন্ডেন্টকে ধরে ম্যানেজ করার চেষ্টা করছি। সাড়ে ছটা বাজল, দেবারা আপডেট দিচ্ছে যে আর একটু পরেই এয়ারপোর্ট। ছটা তেতাল্লিশ, দেবা আর ড্যুড এয়ারপোর্টে নেমে চেক-ইন লবির দিকে ছুটছে। এর মধ্যে এক দাত-ক্যালানে সিকিউরিটি অ্যাটেন্ডেন্ট আমাদের বুঝিয়েছে, "সি, ইওর ফ্রেন্ডস আর লেট, রাইট? সো ইটস দেয়ার ফল্ট, রাইট?" আর দশবার করে খালি বলে, "আর দে ইন এয়ারপোর্ট?" লাস্টে আমি "একে দিয়ে হবে না, কাটা!" বলে মেয়েগুলোকে অন্যদিকে নিয়ে গেলাম।
ছটা পঞ্চাশ... দেবারা আর ফোন ধরছে না, আমরাও ওদের ছুটোছুটির মধ্যে আর ফোন করছি না।
এর মধ্যে শ্রেয়সী এবং ভাইটু এয়ার এশিয়ার একটি ছেলেকে দাঁড় করিয়ে সমস্যার কথা বলল, সে শুনে 'দেখছি' বলে কেটে পড়ল। আমি তখন মনে মনে ভাবছি যে, ওদের পরের ফ্লাইটে আসতে বলে আমরা এগিয়ে পড়ব কিনা!
পাঁচ মিনিট পর আবার এয়ার এশিয়ার ছেলেটি এসে আমাদের ডেকে নিয়ে গেল। আমরা তিনজন গেলাম একজিট গেটের কাছে। সেখানে একটা কম্পুটারের ব্ল্যাক স্ক্রিনে কয়েকটা নাম দেখিয়ে বলল, "এখানে তোমার বন্ধুদের নাম আছে?"
আমরা দেখে বললাম, না। ছোকরা ম্যাটার অফ ফ্যাক্টলি বলল, "ওহ্‌ তাহলে তোমাদের বন্ধুদের চেক ইন হয়ে গেছে!"
সেই শুনে আমাদের আর দেখে কে! শ্রেয়সী ওই একজিট গেটের সামনে যে জয়োল্লাস ও নাচটা শুরু করল সেটা সাধারণতঃ বিরাট কোহলি টেস্ট সিরিজে স্টিভ স্মিথকে আউট করার পর করে থাকে! লোকজন বেশ ঘাবড়ে গেছিল, আমি 'সরি-টরি' বলে ম্যানেজ করলাম। কঙ্কনাকে গিয়ে সুখবর দিতে দিতে দেখি লম্বা প্যাসেজের শেষপ্রান্ত থেকে বিশ্বজয়ীর হাসি দিতে দিতে দুই মক্কেল আসছে!!

জানা গেল, 'জানে তু ইয়া জানে না' স্টাইলে অনেক দৌড়দৌড়ি করে এবং ঝামেলার পর তারা তাদের বোর্ডিং পাস পেয়েছে। যাই হোক, সব ভালো যার শেষ ভালো! আমাদের ভ্রমনের যদিও সবে শুরু!

... চলবে

Sunday, April 2, 2017

কেএলে কয়েক মাস - ৩

কয়েক হপ্তা পরে ফিরে এলাম ব্লগে। কাজের চাপ চলছে ভালোই আর উইকেন্ডেও ঘুরে বেরাচ্ছি তাই ব্লগ নিয়ে আর বসা হয়নি। এর মধ্যে বাতু কেভস আর কিনারা ওভাল ঘুরে এলাম।

বাতু কেভস হল চূনাপাথর বা লাইমস্টোনের অনেকগুলো গুহা। কুয়ালালামপুর সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে ট্রেনে ৪৫ মিনিট লাগল পৌঁছতে। বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ যখন ট্রেন থেকে নামলাম তখন পুরোদমে বৃষ্টি হচ্ছে। মিনিট দশেক দাঁড়ানোর পর বৃষ্টি একটু কমলে স্টেশন থেকে বেরোলাম। স্টেশনের গায়েই বাতু কেভসের গুহা। বড়জোড় ২০০-৩০০ মিটার হবে।
সামনে একটা উঠোন মত জায়গা, সেখানে দোকানপাট বেশ কিছু ছোট মন্দির আর মুরুগনের ১৪০ ফুট লম্বা স্ট্যাচু, বিশ্বের উচ্চতম মুরুগন মূর্তি। মুরুগন দক্ষিণ ভারতীয় দেবতা, যদ্দুর জানি কার্তিকেরই আর এক নাম। মূর্তির পাশ দিয়ে উঠে গেছে ২০০টা সিঁড়ি, তার ওপরে মন্দির। কেউ যদি মন্দিরে যাওয়ার প্ল্যান বানিয়ে আসেন তাহলে ফুল প্যান্ট বা গোড়ালি অবধি ঢাকা পোষাক পড়ে আসাটা জরুরি। না এলেও চাপ নেই, সিঁড়ির নিচে রংবেরঙ্গের কাপড় পাওয়া যায় কোমরে বাঁধার জন্য।
বাতু কেভসের প্রধান তিনটে গুহা হল, মন্দির কেভ, ডার্ক কেভ আর রামায়ণ কেভ।
এগুলোর মধ্যে ডার্ক কেভই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং। গুহার মধ্যে প্রায় হাফ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে ট্যুর হয় (দক্ষিণা ৩৫ রিঙ্গিট) গ্রুপে, সঙ্গে গাইডও থাকে। আমাদের সঙ্গে ছিল জাফ। ভালোই গল্প করতে করতে নিয়ে গেল। গুহা ভর্তি বাদুর, এছাড়া একটা বেশ বিষাক্ত সাপ দেখলাম দেওয়ালের ধারে, এছাড়া অনেকগুলো পাওয়ালা বিছের মত একটা প্রানী আর মাকড়সাও দেখলাম। তার সঙ্গে বহু ধরণের ভৌগলিক গঠন দেখলাম নিজের চোখে বিশেষ করে ৪০ কোটি বছরের স্ট্যালাক্টাইটস আর স্ট্যালাগ্মাইটস চোখে পড়ল অনেক জায়গায়, সেগুলো বেশ ইউনিক।
মন্দির কেভ পুরোটাই বাঁধানো, বেশ বড় মন্দির, দানের পাত্র, পুজোর সামগ্রীর দোকান সবই আছে। মন্দিরের চারদিকে পাহাড় উঠে গেছে। ওপরটা খোলা, বেশ সুন্দর।
রামায়ন কেভটা আর কিছুই নয় একটা গুহার ভেতরে রামায়নের বিভিন্ন ঘটনা মূর্তি দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে। সেরকম আহামরি কিছু নয় যদিও টিকিট মাত্র ৫ রিঙ্গিট।


মোটামুটি দু ঘন্টায় বাতু কেভসের আশপাশ দেখে ফিরে গেলাম কে এলে। পরের পোস্টে লিখছি কিনারা ওভালের গল্প।

Sunday, March 12, 2017

কেএলে কয়েক মাস - ২

দু সপ্তাহ ধরে এখানে থাকার পর আস্তে আস্তে এখানকার মানুষ, তাঁদের পছন্দ-অপছন্দের দিকটা পরিষ্কার হয়ে আসছে। এমনিতে কুয়ালালামপুরে বিভিন্ন জনজাতির লোক দেখা যায়। দেশের প্রধান তিনটি জনজাতি হল মালয় (৪৬%), চাইনিজ (৪৩%) এবং ভারতীয় (১০%)। এই ভারতীয়দের অধিকাংশই দক্ষিণ ভারত থেকে কয়েকশো বছর আগে এখানে এসে স্থায়ীভাবে থেকে গেছেন। তাই এখানে ভারতীয় সংস্কৃতি বা খাদ্য বলতে মূলত দক্ষিণ ভারতীয় সংস্কৃতি বা খাদ্যকেই বোঝায়। 
আমার সঙ্গে প্রথম আলাপচারিতায় এখানকার স্থানীয় ভারতীয়রা আমার তামিল না জানায় খুবই আশ্চর্য হয়েছেন। এখানকার লোকেদের বোধহয় ধারণা ছিল যে, তামিল ভারতের প্রধান ভাষা। সেই ভুল ভেঙে দিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভাষা হিসেবে হিন্দির উল্লেখ করায় এঁরা বললেন, "ওহ, ইউ আর পাঞ্জাবি!" তখন তাঁদের ভারতের অন্যান্য ভাষা সম্বন্ধে জ্ঞান দিয়ে বাংলাদেশের লোকেরা এবং আমরা এক ভাষায় কথা বলি ইত্যাদি বলে কিছুটা বোঝানো গেল।
এই প্রসঙ্গে বলে রাখি, কলকাতা থেকে কে এলে ঘুরতে এলে ভাষা এবং খাওয়া নিয়ে খুব একটা সমস্যা হবে না এবং তার প্রধান কারণ হল শহরের অন্যতম বড় বাংলাদেশী জনজাতি। এই শহরের রাস্তায় আমি হিন্দির চেয়ে বাংলা বেশী শুনেছি এখন অবধি। ছাত্র, চাকুরিরত, দোকানের বা রেস্তোরার কর্মচারী, এই শহরে বাঙ্গালদেশীর অভাব নেই। সত্যি কথা বলতে, দোকানে-টোকানে আমাদের মত চেহারার লোকজন দেখলে, "বাংলা জানেন?" দিয়ে শুরু করাই ভালো। এবং এঁরা দেশের লোকেদের ভালোই বাসেন। দ্বিতীয়বার গেলে চিনতে পারলে কুশল সংবাদ নেন।
দেশের কোন ডিস্ট্রিক্টের লোক জিজ্ঞেস করেন এবং "ডিস্ট্রিক্ট কলকাতা" শুনলেও এদের ব্যবহারের উষ্ণতা হ্রাস পায় না!
আমার সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টের ঠিক উল্টোদিকের 'মিনি পাশার' (মানে ছোট বাজার) নামক মুদির দোকানটা একদল বাংলাদেশী ছেলেই চালায়। সকালেই তাদের সাহায্য নিয়ে চাল, আলু, ডিম, নুন ইত্যাদি নিয়ে এলাম। দু সপ্তাহ বাইরের খাবার খেয়েছি। এবার নিজের হাতের রান্নার জন্য মন কেমন করছে!
এখানকার লোকেরা খেলা ভালোবাসে, অফিসে রোজ সকালে আলোচনাও হয় এবং সেটা প্রধানত ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে। এবং শুধু বাচ্চারা নয় বয়স্ক কাকু এবং মাসিমাদেরও দেখলাম খেলা নিয়ে দিব্যি ইন্টারেস্ট এবং বেশ মন দিয়ে ফলো করেন। যদিও এখানকার সময় ভারত থেকেও আড়াই ঘন্টা এগিয়ে তাই অধিকাংশ খেলাই হয় গভীর রাতে কিন্তু তাও অনেকেই দেখেন এবং আলোচনা করেন।
আর গত দু সপ্তাহে ফুটবলে বেশ কিছু ইন্টারেস্টিং ঘটনা ঘটেছে। প্রথমে লেস্টারের কাছে লিভারপুলের হার, তারপর লিভারপুলের আর্সেনালকে হারানো, জ্‌লাটানের সাস্‌পেন্সান, বার্সার ৬-১ কামব্যাক... এর সবগুলো নিয়েই অফিসে আলোচনা হয়েছে। ফুটবল ছাড়াও এখানকার লোকেরা ব্যাডমিন্টন আর হকি ফলো করেন। আমি কিছু পাবে লাইভ হকি ম্যাচ হতেও দেখেছি। ক্রিকেট সম্বন্ধে যা বুঝলাম, ব্যাপারটা অনেকেই জানেন, কোন দেশ খেলে সেগুলো জানেন, ভারতের জনপ্রিয়তাও জানেন তবে ডিটেল সেরকম কেউ জানেন না। কেউ বললেন, "ইন্ডিয়া এখন ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান তো!" বুঝলাম যে, ২০১৫ সালের ওয়ার্ল্ড কাপের খবর পাননি। কেউ হয়তো ভিরাট কোহলির নাম জানেন কিন্তু সে কী করেছে খবর রাখেন না। ঐ ভারতে লোকে যেভাবে টেনিস বা রাগবি ফলো করে সেরকম আরকি।
যদিও এদেশে ক্রিকেটের ইতিহাস আছে এবং তার কারণ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক থেকে ১৯৫৭ সালের স্বাধীনতা অবধি এখানে বসবাসকারী ব্রিটিশ জনসংখ্যা। আমার মনে আছে এখানে কিনারা ওভাল বলে একটা মাঠে একটা সময় খেলা হত। ২০০৬ সালে একটা ত্রিদেশীয় সিরিজও হয়েছিল ভারত, অস্ট্রেলিয়া আর ওয়েস্ট ইন্ডিজ নিয়ে। জায়গাটা ম্যাপে দেখে রেখেছি, কোন একটা উইকেন্ডে হয়তো দেখে আসব গিয়ে।
এখানে ইপিএল বা চ্যাম্পিয়ান্স লিগ প্রচার হওয়ার একটা বড় কারণ এখানকার খবরের কাগজগুলো। ইউরোপিয়ান ফুটবল নিয়ে ম্যাচ রিপোর্ট তো বটেই রীতিমত আলোচনাভিত্তিক প্রবন্ধ বেরোয় খেলোয়াড় এবং কোচেদের নিয়ে। ক্রিকেট নিয়ে রিপোর্টিং খুবই অদ্ভুত। এই কদিনে শুধু ভারত-অস্ট্রেলিয়া টেস্ট নিয়ে সামান্য রিপোর্টিং দেখলাম। অনেকটা আমাদের দেশের ডোমেস্টিক ম্যাচ রিপোর্টগুলোর মত। কিন্তু শ্রীলঙ্কা-বাংলাদেশ বা নিউজিল্যান্ড-সাউথ আফ্রিকা টেস্ট ম্যাচগুলো নিয়ে একটা লাইনও চোখে পড়েনি।

সারা সপ্তাহে অফিসে ভালোই চাপ ছিল তাই কাল খুঁজে খুঁজে একটা হট এয়ার বেলুন শোয়ে গেছিলাম বিকেলের দিকে। প্রায় ৮-১০ কিলোমিটার দূরে। একটা বেশ বড় খোলা জায়গায় বেশ মেলার মত বসেছিল। প্রায় হাজার পাঁচেক লোক হয়েছিল মনে হল। বেশ নাচ-গান, কনটেস্ট, ছোট ছোট খাবার দোকান ভালোই ছিল। কিন্তু চার খানা গোদা বেলুন দাঁড় করিয়ে সেগুলো ওড়ালো না কেন বুঝলাম না। হয়তো যখন তখন বৃষ্টি হতে পারে ভেবে ওড়ায়নি কিন্তু ব্যাপারটা বেশ অ্যান্টিক্লাইম্যাটিক!


আর সকালে বেরিয়েছিলাম মিউজিয়াম দেখতে। টেলিকন মিউজিয়াম, ন্যাশানাল টেক্সটাইল মিউজিয়াম, কুয়ালালামপুর সিটি গ্যালারি আর থ্রিডি আর্ট মিউজিয়াম দেখে এলাম। সিটি গ্যালারিতে পুরো শহরের মিনিচেয়ার ভিউয়ের সঙ্গে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শোটা বেশ ভালো লেগেছে। তবে ৫০ রিঙ্গিট (৭৫০ টাকা) দিয়ে ঐ থ্রিডি আর্ট গ্যালারি মোটেই সুবিধার নয়।







সঙ্গের ছবিগুলো কালকে তোলা।

Saturday, March 4, 2017

কেএলে কয়েক মাস - ১

সপ্তাহখানেক হল কুয়ালালামপুরে এসে আস্তানা গেড়েছি। অফিসের চক্করেই। আপাতত মাস তিনেক থাকার কথা। এক-দেড় মাস বাড়তেও পারে। পার্ক রয়্যাল কোম্পানির সার্ভিস অ্যাপার্টমেন্টে একটা সুইটে বেশ গুছিয়ে বসেছি।

বেশ ভালো জায়গা এই কেএল। অনেক রকমের মানুষ। আসলে মালয়শিয়া দেশটাই বিভিন্ন জনজাতির সম্বনয়ে তৈরি। ধরুন তিনটি মানুষের নাম যথাক্রমে চে চুন লিম, মহম্মদ বিন আসলাম, নাগাশেখরন জালাকাট্টি। এরা তিনজনেই কিন্তু মালয়শিয়ার আদি বাসিন্দা হতে পারেন। এর সঙ্গে কর্মসূত্রে এবং ভ্রমণের কারণে একপাল ভারতীয়, পাকিস্তানি, বাংলাদেশী, মধ্য এশিয়ার লোক, আমেরিকান এবং ইউরোপীয়রা এই শহরে ঘুরে বেরাচ্ছেন। একেবারেই কসমোপলিটন এবং সেইজন্যেই রেস্তোরা, কারেন্সি কনভার্টার আর স্যুভেনির স্টোরের প্রাচুর্য্য।
এশিয়ার অন্যতম চকচকে শহর হওয়ায় এখানে সময় কাটানোর ব্যবস্থার অভাব নেই। যদিও সকালে কিছু করার সময় থাকে না। আটটায় ঘর থেকে নেমে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যাই। রাজা চুলান স্টেশন থেকে মনোরেলে করে যাই হাংটুয়া। সেখানে লাইন চেঞ্জ করে কেএলআরে চেপে যাই মসজেদ জামেক। সেখানে স্টেশন থেকেই বেরিয়েই আমার অফিস। সব মিলিয়ে গোটা পাঁচেক স্টেশন। ঠিকঠাক ট্রেন পেয়ে গেলে বারো-তের মিনিট লাগে। এখানকার এই মনোরেল এবং এলআরটির কভারেজ ভালোই। যেকোন জায়গায় যেতে গেলে শুধু বুঝে নিতে হয় যে কোন স্টেশনে গিয়ে লাইন চেঞ্জ করতে হবে। বাকিটা খুব সহজেই হয় যায়।

সাড়ে আটটা নাগাদ অফিসে ঢুকি। বেরোই সাতটা নাগাদ। তখন আমার ঘোরার সময়। কখনো হেঁটে ফিরি। আসলে আমার অফিস থেকে পার্ক রয়্যাল সোজা রাস্তা। মিনিট কুড়ি লাগে হেঁটে। আর ট্রেন লাইনটা ঘুরে যায়।
কিন্তু দিনের বেলা অত সময় থাকে না হাঁটার। জায়গাটা বেশ গরম, সেটাও একটা কারণ, সকালে না হাঁটার। যদিও গত সপ্তাহে প্রায় রোজই সন্ধ্যের দিকে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। তবে আমি যেখানে থাকি তার চারদিকে এত শপিং মল যে বৃষ্টি পড়লেই টুক করে কোথাও একটা ঢুকে পড়া যায়। আর এখানকার মলগুলো বিশাল জায়গা জুড়ে বানানো তাই কিছুক্ষণ টাইম-পাস হয়েই যায়।

আমি যে রাস্তায় থাকি তার নাম জালান নাগাসারি। জালান মানে রাস্তা তাই এখানকার ঠিকানায় জালানের ছড়াছড়ি। আর জালান নাগাসারি থেকে দু মিনিট হাঁটলেই বুকেত বিনতাং। বুকেত বিনতাং হল পাতি কথায় কুয়ালালামপুরের পার্ক স্ট্রিট যদিও অনেক বেশী ঝাঁ-চকচকে। সেখানে গাদা খানেক শপিং মল, গুচ্ছ গুচ্ছ খাবার জায়গা, দোকান-পাট, ফুড স্ট্রিট সব আছে! ফুড স্ট্রিটের নাম হল জালান আলোর। গত শনিবার সন্ধ্যেবেলা গেছিলাম। রাস্তার ওপর সারি সারি চেয়ার-টেবিল পেতে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তাতে ভ্যারাইটির অভাব নেই।

খাবারের প্রসঙ্গে বলে রাখি, আপাতত দোকানে-রেস্টুরেন্টেই খেয়ে বেরাচ্ছি এবং যেটা বুঝেছি যে, এখানকার ভারতীয় খাওয়ার জায়গার তুলনায় পাকিস্তানি (দেশদ্রোহী বলবেন না প্লিজ) এবং অন্যান্য মধ্য এশিয়ার (যেমন লেবানিজ, ইরানিয়ান) দোকানগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে। কারণ এখানকার অধিকাংশ ভারতীয় হোটেলই দক্ষিণ ভারতীয় স্টাইলে রান্না করে এবং কারিপাতাযুক্ত খাবারের প্রতি আমার বিতৃষ্ণার কথা সর্বজনবিদিত। বাংলাদেশী রেস্তোরাই দেখেছি, যার নাম 'ESO KHAI', এখনও খেতে যাওয়া হয়নি।

গত রবিবার গিয়ে সামনে থেকে বড়বাড়ি এবং জোড়াবাড়ি (বন্ধু দেবাদ্রির ভাষায়) দেখে এসেছি। এগুলো আর কিছুই নয়, যথাক্রমে কুয়ালালামপুর টাওয়ার আর পেট্রোনাস টাওয়ার। পেট্রোনাস টাওয়ারের নীচের সুরিয়া মল এখানকার সবচেয়ে বিখ্যাত মলগুলোর একটা। গত রবিবার সেখানে ঘুরে নান্দোজে দিব্যি পর্তুগিজ চিকেন খেয়ে এসেছি!এছাড়া প্রায় ১৩০ বছরের পুরনো সেন্ট্রাল মার্কেটও একটা বেশ দেখার মত জায়গা এবং সেটা আবার আমার অফিসের ঠিক পেছনেই।

আপাতত এই অবধিই। আগামী তিনমাসে আরো বেশ কিছু জায়গা ঘোরা হয়ে যাবে আশা করছি। সেগুলোর ছবিও ঠিক সময় মত ব্লগে চলে আসবে!



Tuesday, February 14, 2017

একটি সুপ্রাচীন কাহিনী

আমার এই কাহিনীর সময়কাল অতি প্রাচীন। কত প্রাচীন সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে সঠিকভাবে নাইএই মানব সভ্যতা তখন সবে হামাগুড়ি দিতেছিল। তবে এসব ক্ষেত্রে গুরুজনদের সাহায্য গ্রহণ অবশ্যম্ভাবী। সুতরাং শরদিন্দুর হইতে ঋণ লইয়া বলি,
'সন-তারিখ দিয়া বলিতে পারিব না। সন-তারিখ তখনও তৈয়ার হয় নাই। তখন আমরা কাঁচা মাংস খাইতাম।'
এই পৃথিবীতে সেই সময় দেশ বলিয়া কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। পর্বতময় অরণ্যসংকুল সেই স্থানে দুটি উপজাতি পাশাপাশি বসবাস করিত। অরণ্যের ঠিক মধ্যভাগ দিয়া একটি নদী বহিয়া গিয়াছিল। স্থানীয় ভাষায় সেটির নাম ছিল যশহোর। এই যশহোরের পূর্ব দিকে যে উপজাতিরা থাকিত তাহারা নিজের মাচস্‌ এবং পশ্চিমতীরের উপজাতিরা নিজেদের লোটস্‌ বলিয়া উল্লেখ করিত। নদীর নিকটবর্তী অরণ্যে পশু এবং নদীতে মৎস্য শিকার করিয়াই তাহারা দিন অতিবাহিত করিত
পশুপক্ষী শিকার ব্যতীত উহাদের কাজ ছিল পরস্পরকে উত্যক্ত করা লোটস্‌ এবং মাচস্‌ এই দুই উপজাতির মধ্যে দীর্ঘদিনের এক বিবাদ উপস্থিত ছিল। তাহারা একে অপরকে মনুষ্য পদবাচ্য বলেই মনে করিত না। একে অপরকে দেখিলেই মর্কট, অকালকুষ্মাণ্ড, বরাহনন্দন ইত্যাদি গালি পাড়িতশুধু তাহাই নহে, এক অপরের পৃষ্ঠের চর্মাবরণ তুলে দিবার সাবধানবাণী ঘোষণা করিত এবং সময়বিশেষে করিয়াও দেখাইতলোটস্‌ এবং মাচস্‌দের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ লাগিয়াই থাকিত। তাহাতে দুই পক্ষেরই যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হইলেও কেহই ইহার অবসান ঘটাইতে প্রস্তুত ছিল না। এবং সময়ের সঙ্গে তাল রাখিয়া তাহাদের যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র ছিল প্রস্তর খণ্ড যাহা দূর-দূরান্ত হইতে ইহারা পরস্পরের উপর নিক্ষেপ করিত। বর্তমানকালের ন্যায় ছুরি, পাইপগান বা পেটো সম্বন্ধে ইহাদের জ্ঞানের বিকাশ ঘটে নাই।
এই সময় মাচস্‌ উপজাতির তরুণ নেতা তব্রপোত ঠিক করিল এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাইতে হইবে। তন্মধ্যে ইহারা একে অপরের শিকার হরণ করিতে শুরু করিয়াছেন। এমনকি বেকায়দায় পাইলেই নানাবিধ অপমানেরও খামতি হইতেছিল না। কিছুদিন পূর্বেই একদল লোটস্‌ দুটি মাচস্‌ বালককে একাকী পাইয়া তাহাদের একে অপরে কর্ণ আকর্ষণ করিয়া তিন ঘটিকা দণ্ডায়মান রাখিয়াছিল। প্রত্যুত্তরে কল্য কিছু মাচস্‌ দুই স্নানরত লোটস্‌কে ধরিয়া ধারালো প্রস্তর দিয়ে মস্তকের অর্দ্ধেক কেশ কর্তন করিয়া একটি গর্দভের পৃষ্ঠে বসাইয়া তাহাদের নদীর পরপারে পলায়ন করিতে বাধ্য করিয়াছে। ফলস্বরূপ প্রভাত হইতেই লোটস্‌ ভূমি হইতে একের পর এক প্রস্তর খণ্ড উড়িয়া আসিতেছে এবং নদী কূলবর্তী গৃহগুলিতে বিস্তর ক্ষয়ক্ষতির সৃষ্টি করিতেছে।
এহেন পরিস্থিতিতে তব্রপোত তার পোষ্য সারমেয়টিকে বগলদাবা করিয়া তাহার প্রধান পরামর্শদাতা কষেভি অবুবার উদ্দেশ্যে গমন করিল। কষেভি একাধারে জাদুকর, বৈজ্ঞানিক, রন্ধন-বিশারদ এবং অতিশয় জ্ঞানী ব্যক্তিকেহ কেহ ইহাও বলিয়া থাকে যে কষেভি ভবিষ্যৎ দর্শনেরও ক্ষমতা প্রাপ্ত হইয়াছে যদিও সে বিষয়ে তব্রপোত সম্যক ধারণা ছিল না। সে গিয়া দেখিল, কষেভি তাহার গৃহের পিছন দিকে এক বৃহৎ গর্ত খনন করিয়া তাহার ভিতর বিবিধ শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ড একত্র করিয়াছে। তব্রপোতকে দেখিয়া সে বলিল,
"এসো হে শাল-বৃক্ষ! কী সংবাদ?" অন্য মাচস্‌দের তুলনায় তব্রপোত উচ্চতায় অনেকটাই বেশি ছিল।
"তোমার কী সংবাদ? এই আয়োজন কীসের?"
"ইহা এক নতুন জাদু! কৃত্রিম পদ্ধতিতে অগ্নি জ্বালাইয়া এই শাখাপ্রশাখায় আমি তাহা ধরিয়া রাখিয়াছিসেই আগুনে ছাগ-মাংস, গো-মাংস, বন্য বরাহ-মাংস, কুক্কুট-মাংস ইত্যাদি সিদ্ধ করিয়া খাইতেছি। শুধু তাহাই নহে, তাহার সঙ্গে বিভিন্ন উদ্ভিদও সিদ্ধ অবস্থায় খাইয়া দেখিতেছি।"
"উদ্ভিদ খাইতেছ? বাণপ্রস্থে যাওয়ার সময় কি আগতপ্রায়?" তব্রপোত চক্ষু টিপিয়া জিজ্ঞাসা করিল।
"মুর্খ! শুধু উদ্ভহিদ ভক্ষণ যে সুখকর নহে তাহা আমিও জানি। কিন্তু এ সবই আমার বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিষয়। এহেন অগ্নি পৃথিবীর আর কোথাও এখনও আবিষ্কৃত হয় নাই। তাই ইহার ব্যবহার সম্বন্ধেও লোকের বিশেষ ধারণা নাই। আমি তাহাই বিভিন্ন পরীক্ষা করিয়া দেখিতেছি। শুধু তাহাই নহে, তণ্ডুল-জাতীয় দানাশস্যকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায় কিনা তাহাও আমার গবেষণার বিষয়। যাহা হউক তোমার এই দগ্ধস্থূলকন্দক পূর্ণ মস্তকে এসব প্রবেশ করিবে না? কী কারণে আসিয়াছ বল?"
"বলতেছি যে, লোটস্‌দের সঙ্গে যুদ্ধ করে তো আর পারিয়া উঠিতেছি না। এই যুদ্ধের তো কোনরূপ শেষ নাই! একটা কিছু সমাধান বের করিয়া দাও না!"
"যাও তো বাপু, বিরক্ত করিও না। ইহা তো তোমাদের শিশুদের মত যুদ্ধক্রীড়াপরস্পরের কেশাকর্ষণ তথবা কর্ণাকর্ষণ করিয়া মজা দেখিতেছে। বরং বাপু ওই দলের অধিনায়কের সঙ্গে দেখা করিয়া কথা বলিলেই হয়। বাক্যালাপে সর্ব সমস্যারই সমাধান হয়।"
কষেভির দ্বারা বিতাড়িত হইলেও তাহার কয়েকটি কথা তব্রপোতের মনে বিশেষ রেখাপাত করিল। সে মনে মনে এক পরিকল্পনা করিয়া দূতকে তাহার সহিত দেখা করিবার জন্য খবর পাঠাইল।
লোটস্‌দের কাছে যেতে হবে শুনিয়াই দূতবাবাজী বাঁকিয়া বাসিয়াছিল। অনেক কষ্টে বিভিন্ন পুরস্কারের লোভ দেখাইয়া তব্রপোত তাহাকে সম্মত করাইতে সক্ষম হইল। বাক্যালাপ যে প্রয়োজন সে বিষয়ে তব্রপোত কষেভির সহিত একমত হইয়াছিল। তাহা ব্যাতীত আরো কিছু প্রস্তাব তাহার মস্তিষ্কে ছিল, যাহা লইয়া চিন্তা ভাবনার জন্য কতিপয় দিবস হাতে রাখিয়া তব্রপোত চিঠি লিখিল লোটস্‌ দলপতির প্রতি। লিখিতে গিয়া সে উপলব্ধি করিল যে এত যুদ্ধ সত্ত্বেও লোটস্‌দের দলপতির পরিচয় সম্বন্ধে সে অবগত নহে। সাধারণ যুদ্ধ সেনাপতিরাই পরিচালনা করিয়া থাকেন,  সেই কারণে তব্রপোত লোটস্‌দের দলপতির সম্মুখে কোনদিন আসে নাই।
কয়েক দিবস পর কাঁপিতে কাঁপিতে হাতে একখানি শ্বেত বস্ত্রখণ্ড লইয়া দূত মহাশয় লোটস্‌ শিবিরে গিয়া তব্রপোতের আমন্ত্রনপত্র প্রদান করলেন। লোটস্‌রাও দেখা গেল, এই প্রস্তাবে একবাক্যে রাজী হইয়া গেল। বয়স্ক ব্যাক্তিগণ তাঁদের নেতার সঙ্গে কথা বলিয়া দূতকে জানাইলেন যে, সাড়ে ছয় সপ্তাহ পরে লোটস্‌ দলাধিপতি মাচস্‌ দলাধিপতির সহিত যশহোর নদীর তীরে সাক্ষাতে সম্মত হইয়াছেন।
দূতের নিকট এই বার্তা শুনিয়া তব্রপোত তাহার পরিকল্পনাকে বাস্তবে পরিণত করতে উঠিয়া পড়িয়া লাগিলেন। ঐদিন ছড়াইলে চলিবে না! প্রায়শই তাহাকে কষেভির গৃহের উদ্দেশ্যে যাইতে দেখা গেল। বুঝা যাইল, ইহারা দুজনে মিলিয়া একটি বিশেষ ফন্দি আঁটিতেছে!
দেখিতে দেখিতে শীর্ষ সম্মেলনের দিন উপস্থিত হইল। সকাল হইতে সাজো সাজো রব। তব্রপোত তাহার শ্রেষ্ঠ ভল্লুক চর্মের পোশাক পরিধান করিয়া সঙ্গী সারমেয়টিকে লইয়া তাহার উপজাতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে যশহোরের তীরে উপস্থিত হইল। যদিও কষেভিকে সেখানে দেখা যাইতেছিল না, কিন্তু সেদিকে দেখিবার সময় কাহারও ছিল না।
অল্পক্ষণের মধ্যেই নদীর বুকে বেশ কিছু সংখ্যক ভেলক দেখা দিল। তাহাদের মধ্যভাগের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল, সুসজ্জিত ভেলকটিতেই যে লোটস্‌দের অধিনায়ক আছেন তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই। ভেলকবৃন্দ নিকটে আসিতেই লোটস্‌দের অভাগ্যতদের আকার মাচস্‌দের দৃষ্টিগোচর হইল। তাহাদিগের সেনাপতিবৃন্দ সৈন্যসমাগমে সম্মুখের ভেলকগুলিতে আসীন ছিলেন, সম্ভবত কোন আকস্মিক আক্রমণের আশঙ্কায়। এই ভয় মাচস্‌দেরও ছিল এবং সেইমত সুকৌশলে বিভিন্ন স্থানে সৈন্য প্রস্তুত হইয়া ছিল। তবে কোন প্রকার গোলযোগ ঘটিল না।
তবে লোটস্‌দের অধিনায়ককে দেখিয়া মাচস্‌বৃন্দ সবিষ্ময়ে মুখব্যাদান করিল। ইহার কারণ আর কিছুই নহে, লোটস্‌দের অধিনায়ক এক সুন্দরী তরুণী, যদিও দৈর্ঘ্যে কিঞ্চিৎ খর্বরানীসুলভ গাম্ভীর্যের সহিত সে তীরে অবতরণ করিলে তব্রপোত এগিয়ে গেল তাহাকে অভ্যর্থনার জন্য। তাহার সারমেয়টি পেছনেই ছিল। লোটস্‌দের রানী তাহাদের প্রতি গম্ভীর হইয়া বলিলেন, "একটা গর্দভকে সঙ্গে লইয়া আসিয়াছ?"
তব্রপোত খুবই বিস্মিত হইয়া বলিল, "ইহা গর্দভ নয় দেবী, ইহা একটি সারমেয়।"
লোটস্‌দের রানী ঠোঁট উল্টাইয়া জবাব দিলেন, "তোমাকে নয়, তোমার সারমেয়টিকেই বলিয়াছি!"
(ভবিষ্যতে এই বাক্যালাপটি অনেকেই ব্যবহার করিয়াছেন। এই কারণেই বলা হয় 'History repeats itself')
রাগে চিড়বিড়িয়া জ্বলিয়া উঠিতে গিয়ে সামলে লইল তব্রপোত। হাসিয়া জিজ্ঞাসা করিল, "আমার সহিত বাক্যালাপে যাহাতে মহারানীর গ্রীবায় ক্লেশ না হয় তজ্জন্য কি একটি বৃক্ষকাণ্ড অথবা প্রস্তরখণ্ড আনয়ন করিব?"
এবার মহারানীর গম্ভীর হইবার পালা। ব্যাজার মুখে বলিলেন, "আমার নাম উপি। তোমাদের এখানে কি বসিবার ব্যবস্থা নাই?"
"অবশ্যই আছে।" তব্রপোত উপির সহিত সুসজ্জিত আলোচনাস্থলের দিকে অগ্রসর হইলেন অবশিষ্ট মাচস্‌বৃন্দ লোটস্‌ অতিথিদের নিয়ে উহারই আশেপাশে বসাইলেন।
উপি বসিয়াই বলিল, "যাহা বলিবার তাহা কোনরূপ গৌরচন্দ্রিকা না করিয়া পট্‌ করিয়া বলিয়া ফেল। তুমি আমার ক্রোধ সম্বন্ধে অবগত নও। চূর্ণ হইতে তাম্বুলপত্র... মানে ইয়ে তাম্বুলপত্র হইতে চূর্ণ খসিলেই আমার রাগ হয়।"
কোনক্রমে হাসি চাপিয়া তব্রপোত বলিল, "আমাদের এই দুই উপজাতির মধ্যে কলহের অন্ত নাই। আর সেই কলহ, হিংসা এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটানোর জন্য আমার একটি প্রস্তাব আছে উপি। আশা রাখিতেছি তুমি আমার সহিত একমত হইবে।"
"কী প্রস্তাব শুনি।"
"আমরা এই দুই উপজাতি, লোটস্‌ এবং মাচস্‌ যদি যুদ্ধবিগ্রহের পরিবর্তে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করি তাহা হইলে কেমন হয়? ইহাতে দুদলেরই ক্ষয়ক্ষতি কমিবে কিন্তু কে শ্রেষ্ঠ তাহা ক্রীড়া প্রতিযোগিতার ফলাফল দেখিয়া সহজেই বুঝিতে পারা যাইবে।"
"ক্রীড়া প্রতিযোগিতা? কি ধরনের ক্রীড়া একটু শুনি।"
"একটি ভাবিয়াছি। তোমার এবং আমার দলের সমসংখ্যক মনুষ্য ইহাতে অংশগ্রহণ করিতে পারিবে। আমরা প্রত্যেকেই প্রস্তর-নিক্ষেপে পারদর্শী, কিন্তু এই খেলায় একটিই প্রস্তর থাকিবে। কেহ তাহাদের হস্ত ব্যবহার করিতে পারিবে না, পদাঘাতে প্রস্তরটিকে ক্রীড়াক্ষেত্রের একপ্রান্ত হইতে অন্যপ্রান্তে নিক্ষেপ করিতে হইবেদুই প্রান্তে দুইটি স্থান নির্দিষ্ট হইবে, যাহারা ঐস্থানে অধিক সংখ্যক বার প্রস্তর প্রেরণ করিতে পারিবে তাহারা বিজয়ী ঘোষিত হইবে।"
উপি শুনিয়া বলিল, "চমৎকার খেলা। কিন্তু খেলার সময় কে কোন পক্ষের হইয়া খেলিতেছে তাহা কী প্রকারে নির্ণয় করা যাইবে?"
উপির প্রশ্ন শুনিয়া তব্রপোত একটু ভাবিয়া বলিল, "তাহারও পদ্ধতি আছে। তোমাদের বনভূমি অতিশয় সুন্দর, বিভিন্ন পুষ্পের নানাবিধ রঙে তাহা উজ্জ্বল হইয়া থাকে। তোমাদিগের প্রতিযোগীরা ওই রক্ত এবং পীত বর্ণের পুষ্প দিয়ে গাঁথা মালা পরিয়া উপনীত হউকএই অঞ্চলের অরণ্য অপেক্ষাকৃত ঊষর, তাই মাচস্‌ প্রতিযোগীরা গাছের শ্যামলপত্র ও বল্কল দিয়া প্রস্তুত মালা পড়িয়া যোগদান করিবে।
উপি বলিল, "উত্তম প্রস্তাব! আমি নিশ্চিত লোটস্‌ জাতি এই খেলায় সুনৈপুন্যের পরিচয় দিবে। কিন্তু আমারও একটি প্রস্তাব আছে।"
"বল।"
"সবাই এই খেলায় উৎসাহী নাই হইতে পারে। বিশেষত কিঞ্চিৎ স্থূলকায় যারা। তাই তাহাদের জন্য আরো একটি খেলার প্রস্তাব দিতেছি। উভয়পক্ষের কিছু সৈন্য একপ্রকার কাষ্ঠদণ্ড হস্তে লইয়া ঘুরে বেড়ায়। এই খেলায়, একটি দল অন্য দলের দিকে প্রস্তর নিক্ষেপ করিবেবিপক্ষ দল ঐ দণ্ড কর্তৃক প্রহারপূর্বক প্রস্তরগুলিকে দূরে নিক্ষেপ করিবেযাহারা অধিক দূরত্বে প্রেরণ করিবে তাহারাই বিজয়ী হইবে।" উপি হাসিয়া বলিল, "কেমন?"
"অর্থাৎ যাহারা সর্বাপেক্ষা অধিক প্রহার করিবে তাহারাই সর্বাপেক্ষা কুশলী বলিয়া চিহ্নিত হইবে?"
"তাহা কেন? কেহ যদি বিপক্ষের নিক্ষিপ্ত প্রস্তরখণ্ডের সম্মুখে প্রাচীরের ন্যায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করিতে পারে তাহাও কম কৃতিত্বের নহে।"
"সাধু!" তব্রপোতের পছন্দই হইয়াছিল। প্রস্তাব এবং প্রস্তাবকারিণী, উভয়কেইমাচস্‌ এবং লোটস্‌দের অন্যান্যরাও সম্মত হইয়াছিলেন। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে দুই উপজাতির মধ্যে বাক্যালাপ হইতেছিল।
সহসা এক অপূর্ব সুবাসে তাহাদের মন চঞ্চল হইয়া উঠিল। সবাই দেখিল, কষেভি এবং তার কিছু সঙ্গী বেশ কিছু পাত্র লইয়া আসিতেছে। পাত্রগুলি থেকে ধূম নির্গত হইতেছে, সুগন্ধও তদ্রুপসর্বাপেক্ষা বৃহৎ পাত্রটি কষেভি তব্রপোত এবং উপির সামনে গিয়া রাখিল। উপি অবাক হইয়া জিজ্ঞাসা করিল, "ইহা কী?"
তব্রপোত বলিল, "ইনি আমার সুহৃদ, বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক কষেভি অবুবা। এই বস্তুটি উহারই এক অসাধারণ আবিষ্কার। মশলামিশ্রিত তণ্ডুলের মধ্যে সুপক্ক কুক্কুটমাংস, ডিম্ব ও কন্দ দিয়া প্রস্তুত এইরূপ খাদ্য তুমি যে পূর্বে কখনো খাওনি তাহা আমি পণ রাখিয়া বলিতে পারি। ভয় নাই, ইহাতে বিষ নাই, আমি তোমার সঙ্গে এক পাত্রেই আহার করিব।"
অতঃপর সেই স্থানে উপস্থিত সমস্ত নারী-পুরুষ, মাচস্‌-লোটস্‌ একত্রে সেই অনন্য খাদ্য সেবনে উদ্যত হইল। এমনকি বৃহত্তর মাংসখণ্ড কার ভাগ্যে জুটিবে সে বিষয়ে তব্রপোত এবং উপির মধ্যে ঈষৎ বিদ্বেষ দেখা দিয়াছিল, যদিও শেষ অবধি দুজনেই নিজ নিজ অংশটি অন্যের জন্য রাখিয়া দিয়েছিল। তাহা নিছক ভদ্রতা কিনা সেই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নাই।
আহার সম্পন্ন হয়তে হইতে দেখা গেল লোটস্‌ এবং মাচস্‌দের মধ্যে বন্ধুত্বের সূচনা হইয়াছে। পরবর্তী কবে খেলিবার জন্য সবাই একত্র হইবে তাহা নির্ধারণ করিয়া এবং মাচস্‌গনকে নিজ অঞ্চলে আমন্ত্রণ জানাইয়া লোটস্‌রা বিদায় লইল। উপি যাইবার সময় হাসিমুখে বলিল, "বড়ই ভালো লাগিল। এই খাদ্য অসাধারণ। মধ্যে মধ্যে আসিয়া ইহা খাইতে চাহি।"
"যথা আজ্ঞা মহারানী।", বলিল কষেভি।
লোটস্‌রা চলিয়া যাওয়ার পর তব্রপোত তাহাকে পাকড়াও করিল, "কী ব্যাপার? লোটস্‌দের দলে ভিড়িবে নাকি? উহাকে মহারানী সম্বোধন করিলে যে!"
"তার কারণ খুবই সহজ। তুমি এই রাজ্যের রাজা আর আমি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা!" মুচকি হাসিয়া প্রস্থান করিতে লাগিল কষেভি।
তব্রপোত চিৎকার করিয়া বলিল, "পলাণ্ডু-পক্কবটিকা না মারিয়া এই দেবভোগ্য খাদ্যের নাম বলিয়া যাও?"
উত্তর আসিল, "আপাতত কোন নাম ঠিক করি নাই, তবে ইহা অবগত আছি যে, ভবিষ্যতে ইহা বিরিয়ানি নামে খ্যাত হইবে!"
****************
কালের সঙ্গে সঙ্গে কত কী না ইতিহাসই মহাকালের গহ্বরে চলে যায়! হয়তো কষেভির মৃত্যুর পর এই ঐশ্বরিক খাদ্যের কথাও সবাই বিস্মৃত হইয়াছিল। কিন্তু ইতিহাস সদা পরিবর্তনশীল
পূর্বেই লিখিয়াছি, "History Repeats itself"কয়েক সহস্র বৎসর পরে এই দেবভোগ্য খাদ্য এই বিশ্বে প্রত্যাবর্তন করে, তবে পারস্য দেশে। ক্রমশঃ ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্বে ইহা খ্যাতি লাভ করে!