Showing posts with label বইমেলা. Show all posts
Showing posts with label বইমেলা. Show all posts

Monday, January 30, 2017

বইমেলার বন্ধু

বইমেলায় 'কষে কষা'র লাইনে দাঁড়িয়ে শ্যামলবাবুর সঙ্গে ঈশ্বরের দেখা হল!

পাঠক, ঈশ্বর বলতেই যদি আপনার মনে হয় যে, তাঁর চেহারায় ক্যালন্ডারের ছবির মত জটাজুট, পরণে বাঘছাল বা হাতে শঙ্খ-পদ্ম-গদা-চক্র থাকবে তা হলে আপনি ভুল করছেন। শ্যামলবাবু যাকে দেখলেন তার মোটাসোটা মাখন-মার্কা চেহারা, মাথার সামনের দিকের চুল পাতলা হয়ে এসেছে, সরু গোঁফ। পরণে ঢোলা স্ট্রাইপ শার্ট আর কালো প্যান্ট। একটা বইয়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে জুলজুল করে তাঁকেই দেখছিল লোকটা। চোখাচুখি হতেই রহস্যজনকভাবে ফিক করে হাসলো। তারপর সোজা শ্যামলবাবুর সামনে এসে বলল, "বাড়িতে তো সকাল থেকে চার-চারবার কমোড দিয়ে জল বয়ে যাওয়ার পর বউয়ের কাছ থেকে চেয়ে নরফ্লক্স খেলেন! আর এখানে ছেলে-বউকে আনন্দের লাইনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে নিজে পোলাও-মাংস খাওয়ার ধান্দা করছেন?"
শ্যামলবাবু প্রথমেই চমকালেন। এই দুটো খবরের কোনটাই কারো জানার কথা নয় যদি না ওঁর বউ সঙ্গীতা বা ছেলে নন্টে কাউকে বলে থাকে! পরেরটা তো ছেলে-বউও জানে না! ওনার ভ্যাবাচাকা মুখের দিকে তাকিয়ে লোকটা বলল, "ও কিছু নয়। আপনাদের সব খবরই রাখি। দুটো ফিশফ্রাই কিনে আনুন আমি দুটো চেয়ারের ব্যবস্থা করি। আর হ্যাঁ, আমার প্লেটে একটু বেশী করে কাসুন্দি নেবেন তো!"
শ্যামলবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মত দুটো ফিশফ্রাই কিনে এদিকওদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন লোকটা দুটো লাল প্লাস্টিকের চেয়ারে যোগাড় করে তাঁকে হাত নেড়ে ডাকছে। চেয়ারে বসে ওনার হাত থেকে ফিশফ্রাইয়ের প্লেটটা নিয়ে লোকটা বলল, "তারপর?"
"আপনি কে?"
"ওহ্‌ বলা হয়নি।" লোকটা ফিশফ্রাইতে একটা কামড় বসিয়ে চিবোতে চিবোতে নিজের হাতটা এগিয়ে দিল, " আমার নাম ঈশ্বর। ভগবানও বলতে পারেন। দুর্গা-কালী-যিশু-মহম্মদ, ওসব দিকে না হয় নাই গেলেন..."
"আপনি ঈশ্বর! বাজে কথা বললেই হল!"
"বাজে কথা কেন বলব বলুন? দেখছেন তো আপনার হাঁড়ির খবর রাখি। ফোনে কোথায় কী অ্যাপ আছে, পার্সে কত খুচরো আছে, ব্যাঙ্কে কটা এফডি আছে, সব চাইলে বলে দেব। আরে মশাই, আপনাকে আপনার ছোটবেলা থেকে দেখছি। আগে নিজে বাপ-মার হাত ধরে আসতেন, এখন নিজের ছেলের হাত ধরে এসেছেন! তবে কী অধঃপতন! ছ্যা ছ্যা!"
শ্যামলবাবু বেকুবের মত বললেন, "আপনাকে তো আমার বয়সীই মনে হচ্ছে। আমার ছোটবেলাতে তো আপনিও ছোট ছিলেন নিশ্চয়ই!"
"দুর মশাই! বললাম না, আমি হলাম ঈশ্বর। বয়সের যাকে বলে ট্রি-স্টোন নেই! চোখের সামনে মিল্কি ওয়ে টোয়ে তৈরি করলাম! এইসব জলা জমিতে যখন গোদা গোদা ডাইনোসররা ঘুরে বেড়াতো তখন আমার যৌবন। যাকগে, আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে।"
শ্যামলবাবুকে বিধ্বস্ত করে দিয়ে লোকটা মনের সুখে ফিশফ্রাই খেতে লাগল। ফিশফ্রাই শেষ করে হাতের কাগজের প্লেটটাকে গোল্লা বানিয়ে নিখুঁত নিশানায় সেটাকে একটা ডাস্টবিনের মধ্যে ফেলে লোকটা বলল, "ভালোই বানিয়েছে। স্বর্গীয় স্বাদ!"
তারপর শ্যামলবাবুর দিকে ঘুরে লোকটা বলল, "ডারউইনের বিবর্তনের থিওরিতে তো বাঁদর থেকে মানুষ হয়েছিল। তা আপনি এরকম উলটো বিবর্তনে মানুষ থেকে বাঁদর হলেন কী করে?"
"মানে?" শ্যামলবাবু এবার একটু রেগেই গেলেন।
"মানে? কিছু বুঝছেন না, তাই না? দাঁড়ান, একে একে বলি।" লোকটা একটা মিচকে হেসে শুরু করল, "সেই ছোটবেলায় আসতেন, তখন বইটই কিনতেন সেটা দেখেছি। গোটা পাঁচেক টিনটিন, তিনটে অ্যাস্টেরিক্স, কাকাবাবু সমগ্রের ফার্স্ট পার্ট এগুলো তো সব বইমেলা থেকেই কেনা। আপনার বাবাও বই ভালোবাসেন। আপনাকে ঘুরে ঘুরে 'লাল-কালো', পরশুরাম সব কিনে দিতেন। তারপর..."
লোকটা একটু থামল, তারপর শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "আপনি পেকে গেলেন। কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে এসে আঁতলামি শুরু করলেন। বইয়ের দোকানে যাওয়া নেই। বই হাতে নিয়ে দেখা তো ছেড়েই দিলাম। শুধু মাঠে বসে শুধু গুলতানি আর গাঁজা-সিগ্রেট খাওয়া! একবার তো বোধহয় কোন একটা স্টলে গিয়ে একগাদা যৌন উত্তেজক বই নিয়ে নিজেদের মধ্যে খ্যাক খ্যাক করে হেসেছিলেন! সব নোট করে রেখেছি মশাই!"
শ্যামলবাবুর মুখটা ক্রমেই বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছিল। লোকটার কিন্তু তখনও শেষ হয়নি। আবার শুরু করল, "আর এখনকার কথা আর কী বলব! আপনি তো এখন মস্ত বিজ্ঞ লোক! সারা বছর কাজের চাপে নাকি কলেজ স্ট্রিটের রাস্তা মাড়ানোর সময় পাননা, এদিকে বইমেলায় বাতেলা ঝাড়েন যে, কলেজ স্ট্রিটে বেশী ডিসকাউন্ট পাবেন তাই এখানে কিনবেন না! আর এইসব ছোট-মাঝারি প্রকাশনাগুলো লস্‌ করে বন্ধ হয়ে গেলে আবার বাংলা সংস্কৃতি মৃতপ্রায় বলে নাকি কান্না গাইবেন!"
"বইমেলায় এসে বই কেনেন না, কিন্তু গেলা চাই। যেন সাতদিন খেতে পাননি। গত বছর দেখলাম বইমেলায় বসে বিরিয়ানি খাচ্ছেন! আরে মশাই বিরিয়ানি খাবেন তো আর্সালান যান, রয়্যাল যান, তেমন হলে খিদিরপুরের ইন্ডিয়া রেস্টুরেন্টে গিয়ে কাচ্চি বিরিয়ানি খেয়ে আসুন! বইমেলায় কেন? এদিকে বিরিয়ানির দোকানের পাশে লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলোয় যাওয়া তো দুরের কথা, তাকিয়ে অবধি দেখলেন না!"
"মানে, এতক্ষণ ঘুরলে খিদে তো একটু পাবেই..." মিনমিন করে বলার চেষ্টা করলেন শ্যামলবাবু।
"ওহ্‌, তাই বুঝি? তা অনেকক্ষণ টিভি মিস করেন বলেই কি গতবছর ওই টিভি চ্যানেলের স্টলে দাঁড়িয়ে ওদের সিরিয়ালের হিরোইনের গয়নাগুলো আসল না সিটি গোল্ড সেই নিয়ে দশ মিনিট তর্ক করছিলেন? আর শুধু তো গয়না নয়, আপনার মনের ভেতরে আর কী কী জিনিস আসল না নকল নিয়ে তর্ক করছিলেন, সেটা বলে দিলে তো আপনার গিন্নি আপনাকে বঁটি নিয়ে তাড়া করবে মশাই!"
"এটা আপনার অন্যায়, ভগবান হয়েছেন বলে এত খুঁতখুঁতানি ভালো নয়।" শ্যামলবাবু শেষ চেষ্টা করলেন।
লোকটাও হেসে বলল, "দেখুন একটা কথাই বলছি। বইমেলায় এসে সব দেখুন। টিভি চ্যানেলের স্টল, কফিমাগ, টিশার্ট, ছবি, মূর্তি সব দেখুন। গান শুনুন, যা ইচ্ছে খান। কিন্তু বইটাও কিনুন। আপনি তো বই ভালোবাসতেন মশাই। আপনার সব নন্টে-ফন্টেগুলো বন্ধুরা নিয়ে ফেরত দেয়নি বলে যেদিন বিকেলবেলা আপনি মন খারাপ করে ছাদে বসেছিলেন আমিও ধারেকাছেই ছিলাম।"
"এটা তো বইমেলা, এখানে বইয়ের জন্য আসুন। আরো তো হাজারটা মেলা হয় শহরে। তার কোথাও একটা বইয়ের দোকান তো চোখে পড়ে না আমার। এই মেলাটা আলাদা। এই মেলাটা সবার, কিন্তু বইকে ভুলে যাবেন না।" লোকটা উঠে পড়ল। হতবাক শ্যামলবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, "নাহ্‌ কাটলাম। আপনার বউ আর ছেলে আপাতত আনন্দের টাকা দেওয়ার লাইনে। আপনি যেতে যেতে ওদের বই কেনা হয় যাবে!"
তারপর শ্যামলবাবুকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেলেন ঈশ্বর।

শ্যামলবাবু নিজের হতভম্ব ভাবটা কাটিয়ে হাঁটা লাগালেন আনন্দের স্টলের দিকে। শেষ দশ মিনিটে যে কী হল সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না তিনি। হঠাৎ কী মনে হল, একটা স্টলে ঢুকে পড়লেন। ছোট স্টল, সব রকম বইই বিক্রি হচ্ছে। সেখান থেকে নন্টের জন্য শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র' কিনবেন বলে ঠিক করে ফেললেন তিনি। তখনই শুনতে পেলেন একটা কথোপকথন,
"দাদা, আর টাকা নেই না?"
"কী করে থাকবে? তোকে পই পই করে বললাম, 'কমিক্স সমগ্র'টা এ বছর কিনতে হবে না।"
"খুব লোভ হল তো! দ্যাখ না দাদা, কিছু ম্যানেজ করে। যদি পরে একদিন এসে কেনা যায়।"
"না রে, মা অনেক কষ্ট করে এই টাকাটা দিয়েছে। জানিসই তো সব... আর চাওয়া যাবে না।"
শ্যামলবাবু তাকিয়ে দেখলেন দুই কিশোর। একজনের বয়স পনেরো-ষোল, অন্যজন আরো কম। ছোটজনের হাতে একটা শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র', ঠিক যে খন্ডটা শ্যামলবাবুও দেখছেন। কাঁচুমাচু মুখে বইটা নামিয়ে রাখল সে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল বেরনোর দরজার দিকে।
মুহূর্তের মধ্যে শ্যামলবাবু ঠিক করে ফেললেন, কী করবেন। দু মিনিটের মধ্যে দোকান থেকে বেরিয়ে একটু পা চালিয়েই সামনে ছেলে দুটিকে দেখতে পেলেন। দৌড়ে গিয়ে তাদের ধরে ফেললেন শ্যামলবাবু। বললেন, "আরে তোমাদেরই তো খুঁজছি!"
"কী ব্যাপার?" বড় ছেলেটি ভয় ভয় বলল।
"আরে ওই যে লাস্ট দোকানটায় ঢুকেছিলে, আমি ওদের স্টাফ। আজকে স্পেশাল কনটেস্ট চলছে তো। কিছু কিছু লাকি পাঠকদের আমরা বই গিফট করছি। তোমরা আজকে আমাদের স্টলের পাঁচশতম পাঠক। এই নাও তোমাদের গিফট।" বলে ছোট ছেলেটির হাতে একখানা শীর্ষেন্দুর 'কিশোর উপন্যাস সমগ্র' ধরিয়ে দিয়ে হাঁটা লাগালেন শ্যামলবাবু। ছেলেদুটোর হতভম্বভাব দেখে ভালোই লাগছিল তাঁর। আজকে তিনিও হতভম্ব কম হননি! এবার ওটার অন্য কপিটা নন্টেকে দিতে হবে!

শ্যামলবাবু খেয়াল করলেন না, তাঁদের ঠিক পাশেই ল্যাম্পপোস্টের তলায় বসে ছবি আঁকতে আঁকতে ঈশ্বর মুচকি হাসলেন!

Tuesday, February 9, 2016

বইমেলার গপ্পো

দেখতে দেখতে হুস করে আরো একটা বইমেলা শেষ হয়ে গেল।

লাখ লাখ লোকের ভিড়ে, গল্প-কথায়, মুক্তমঞ্চের কবিতা পাঠের আসরে, আনন্দের সামনের লাইনে, বেনফিশের ফিশরোলের গন্ধে, কেসি পালের সামনের জটলাতে, নামী-অনামী লেখকদের সঙ্গে আলাপচারিতায়, গীটারের মূর্ছনায় আর নতুন-পুরনো বই নিয়ে কেটে গেল আরো একটা বইমেলা।

হ্যাঁ, আজকালকার ক্রিকেট খেলায় চিয়ার লিডারদের মত এখানেও বেশ কিছু নামীদামী রংবেরঙের টিভি চ্যানেল স্টল খুলেছিল বটে। সেখানেও ভিড় কম ছিল না। আর হবে নাই বা কেন? কুইজে পুন্যিপুকুর সিরিয়ালের মেজবউয়ের বড় ভাসুরের নামটা টুক করে বলে দিয়ে ঐ মেজবউয়ের সঙ্গেই সেলফি তোলার চান্স কি ছাড়া যায়?
(ভাববেন না যে ঐ সিরিয়ালের বিজ্ঞাপন করছি। আসলে ঐ লেভেলের নামের প্যারোডি করতে গিয়ে বুন্যিকুকুর ছাড়া কিছু মাথায় এল না!)
তার সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মীয় স্টল, রাজনৈতিক স্টল বা স্টেট ব্যাঙ্কের স্টল... সে তো আগেও থাকতযদিও কেমন যেন মনে হল ধর্মীয় স্টলগুলোতে ভিড় একটু বেশী এবার। বকধার্মিকতা বেড়েছে আর কি! আর ‘হ্যাংলা হেঁশেল-এর স্টলে বেশ ভীড় ছিল। এমনকি লোকজন খুঁজে খুঁজে ঐ স্টলে যাচ্ছিল। সেরকম এক জোড়া যুবক-যুবতীকে আমরাও সাহায্য করেছি পথ দেখিয়েবুঝতেই পারছি পেটের ডাক্তারদের পোয়াবারো কেন আজকাল!


আমি নিজে মেলায় গেছিলুম তিনবার। তাও সব উইকেন্ডে। সোম থেকে শুক্রের মধ্যে কোনদিন ঢুঁ মারলে হয়তো একটু ফাঁকা পেতাম। প্রথম দিন ম্যাপটা লেগেছিল। তারপর চেনা দোকানগুলো মোটামুটি বুঝে নিয়েছিলাম। রোজ গেলেই একবার করে ‘সৃষ্টিসুখ’, ‘ভাষাবন্ধনী’ আর ‘গুরুচন্ডালী’টা ঘুরে আসতাম।
সৃষ্টিসুখে বিশাল ভীড় ছিলসেরকমই ইন্টারেস্টিং বইয়ের কালেকশান। বিশেষ করে বাঁধাই-প্রচ্ছদ মিলে এরকম চকচকে ব্যাপার বেশী দেখা যায় নানেক্সট বার এর চেয়ে বড় স্টল না হলে সত্যিই বেশ অসুবিধা হবে। সেখানে যতবার গেছি দেখেছি কত কত লোক ‘মীর এই পর্যন্ত’ খোঁজ করে যাচ্ছে। তার মধ্যেই রোহণের সঙ্গে হালকা আড্ডা, সৌরাংশুদার সঙ্গে টুকটাক গল্প প্রবীরেন্দ্রদার সঙ্গেও দেখা হয়ে গেল একদিনবড় নিজের মনে হয় ওদের এই স্টলটা। বেশ বন্ধুদের একসঙ্গে ক্যান্টিনে বসে আড্ডার মত।
ভাষাবন্ধনীতে গিয়ে গল্প করেছি বাউদার সঙ্গে। বই দেখেছি, বই নিয়ে কথা বলেছি, গল্প করেছি। এই লোকটাও ভালো লোক। কত সহজেই আড্ডা মারছিল আমাদের মত নতুন চেনা বন্ধুদের সঙ্গে!
গুরুচন্ডালীতে গিয়ে আলাপ হয়েছে ইপ্সিতাদির সঙ্গে। ফেসবুকে যাদের পোস্ট দেখে চিনি তাঁদের অনেককেই দেখেছি ওই স্টলের আশেপাশে।
বইমেলায় গিয়ে এক একদিন দেখা হল তন্ময়, অভীকদা, সুমন, সৌম্যজিতদা-মধুমিতাদি আর শুদ্ধর সঙ্গে। দল বেঁধে ঘোরা হল কৌশিক, নচিকেতা, পৃথা, ঈশিতা, সুচেতা, ঋতব্রত, অনিরুদ্ধ, সর্বজিৎ, সায়ন্তনী, সদলবলে চয়নদা আর আকাশদীপদার সঙ্গে। পৃথার ব্যাগ হারানো এবং তারপর এক সি আই ডি অফিসারের হাত ঘুরে সেই ব্যাগ ফেরত পাওয়ার মত অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল এবারের বইমেলাতে।
আর সেই পাগলী মহিলাটি তো ছিলেনই। ‘জাগো বাংলা’র স্টলে গিয়ে সেই পৃথিবী-বিখ্যাত ছড়ার বইটাও এক পিস কিনেছেন তিনিতাঁর বাকি গল্পগুলো শেষে লিখব। প্রমিস!

কমলিনীর স্টলে দেখেছি সাহিত্যিক শংকরকে। প্রতি বছরের মতই ওনার নতুন বইতে সই নিয়েছি আবার। শ্রীজাত ঘুরে বেড়িয়েছেন গোটা মেলা জুড়ে। মিত্র ও ঘোষের স্টলে গিয়ে দেখেছি “বাংলা সাহিত্যের গুণ্ডা” অর্থাৎ ‘গিরিগুহার গুপ্তধন’ বইয়ের লেখক ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়কে।
আনন্দর স্টলে পা দিইনি। দয়া করে একে আঁতলামি ভেবে নাক সিঁটকবেন না। সত্যি বলতে, হাতে অত সময় ছিল না যে লাইনে দাঁড়িয়ে সেটা নষ্ট করব। তাই আনন্দ এ বছর নাহয় একটু কমই হল।
ভালো লেগেছে শিশু সাহিত্য সংসদের স্টল। প্রতি বছরের মত এ বছরও ঐ দোকানে গিয়ে সেই ছোটবেলার ছবিতে রামায়ণ-মহাভারত আর ছড়ার বই দেখে শৈশবকে কয়েক মুহূর্তের জন্য ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেছি। কোন এক বছর ঐ বইগুলো হয়তো কিনেই ফেলব আর একবার।
লালমাটির বিভিন্ন কমিকস সমগ্রগুলোও বড্ড লোভনীয়। কিন্তু দামের দিকে তাকালে পকেটে বড্ড টান পড়ে। তবে শুনে এলাম নারায়ণ দেবনাথ সমগ্রের পঞ্চম খণ্ডের কাজ চলছে। দেখা যাক কবে বেরোয় সেটা। সপ্তর্ষি প্রকাশনার বেশ কিছু নতুন বই দেখলাম। এদের অধিকাংশ বই-ই জীবনী বা আত্মজীবনীমূলক। বিশেষ করে বাংলা সিনেমার বিভিন্ন শিল্পীর লেখা বা তাঁদের নিয়ে লেখা বইয়ের বেশ ভালো সংগ্রহ ছিল এখানে। অভিযানের বইগুলোও বেশ ভালো লেগেছে, নজর রাখব পরের বইমেলা গুলোতেও।
লিটল ম্যাগের স্টলগুলোতে ঘোরাঘুরি করতে গিয়ে যেটা সবচেয়ে বেশী চোখে পড়ে সেটা হল লেখক-প্রকাশকদের উৎসাহ। বয়স কম হোক বা বেশী, তাঁদের উৎসাহে ঘাটতি থাকেনা কোনদিনই। কিছু বই কিনেওছিআশা করছি ভালো লাগবে।

খাওয়াদাওয়ার গুচ্ছ স্টল। কী আর বলব। বিশেষ করে ইন্ডাকশান কুকারের দৌলতে বেশ কিছু লাইভ পাটি-সাপটা কাউন্টার চোখে পড়ল বইমেলাতেই। আর সেগুলোতে ভীড় কিছু কম নয়।
এইভাবে ঘুরে ঘুরে, বই ঘেঁটে, বই কিনে, আড্ডা মেরে, ছবি তুলে কেটে গেল আমার এবারের বইমেলা। আবার এক বছরের অপেক্ষা আর তার মধ্যে দেদার বই পড়া আর মাঝেমধ্যেই অ্যামাজন এবং কলেজ স্ট্রিটের দৌলতে কিছু নতুন বইয়ের আগমন। ভালো খবর হল এপ্রিল মাসের মধ্যে নতুন একটা দেওয়াল জোড়া বইয়ের আলমারি তৈরী হয়ে যাবে। কত আর বইয়ের ঘাড়ে বই চাপিয়ে রাখা যায়!

শেষ করার আগে শ্রেয়সীর গল্প, যেটার সহজেই নাম দেওয়া যায়, “বইমেলা, ছেঁড়া চটি এবং স্বপ্ন”!

প্রথমদিন, আমি সকাল সকাল বইমেলা পৌঁছে গেছি। শ্রেয়সী বেলগাছিয়া থেকে দীর্ঘক্ষণ ধরে ফোনে উৎসাহ দেখিয়ে যাচ্ছেন... “এই আসছি!”... “এবার উঠে রেডি হব”... “আধ ঘন্টার মধ্যে বেরোচ্ছি!”... এই করতে করতে শেষ অবধি ল্যাদের জয় হল। ফোন এল, “আমি আজকে আর যাচ্ছি না। কাল সকাল সকাল চলে আসব।”
দ্বিতীয়দিন, যাথারীতি আমি আগে পৌঁছে গিয়ে ঘুরছি। আমাদের বন্ধু পৃথাও চলে এল। এরপর শ্রেয়সী আসবে। সাজুগুজু চলছে। তার আপডেট পাচ্ছি। ফুলটুসি সেজে ট্যাক্সিতে উঠে সেলফি তুলে সেটা আমাদের বন্ধুদের হোয়াটস্যাপ গ্রুপে পোস্টও হয়ে গেল। ফাইনালি ফোনটা এল, “শুনছো... আমি বইমেলায় এসে গেছি। শিশু সাহিত্য সংসদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। ঝটপট এস!”
গেলাম। গিয়ে দেখি মুখে একরাশ বিরক্তি! কী ব্যাপার! জানা গেল, ভদ্রমহিলা কেত মেরে নতুন স্টাইলিশ চটি পরে এসেছেন এবং বইমেলায় ঢুকেই সেটার একটা অংশ গেছে খুলে। ভালো করে মালটা উলটে পালটে দেখে মনে হল একটা সেফটিপিন পেলে লাগিয়ে নেওয়া যায়। ওদিকে ব্যাকগ্রাউন্ডে চলছে শ্রেয়সীর বিলাপ, মানে যে ছোকরা ওকে এটা গছিয়েছিল তার গুষ্টির ষষ্ঠীপুজো!
চণ্ডীপাঠ জানি না বলে দুঃখ নেই বিশেষ, তবে জুতো সেলাই যে শিখে রাখা উচিত ছিল সেটা তখন মনে হল! আমার কাছে সেফটিপিন নেই, সুতরাং বকুনি খেলাম। ওনার কাছেও সেফটিপিন নেই! আবার বকুনি খেলাম!

(দ্বিতীয়বার কেন খেলাম এটা যাঁরা বুঝতে পারছেন না আমি নিশ্চিত তাঁরা বিবাহিত পুরুষ নন। )

যাই হোক, এবার আমরা বেরোলাম সেফটিপিন অভিযানে! এসব কেসে আমি খুবই প্র্যাক্টিকাল। সুতরাং প্রস্তাব দিলাম যে, কিছু কিছু দোকান বা পুলিশের কাছে খোঁজ নিয়ে দেখা যাক। কিন্তু শুধু সেফটিপিন চাইতে শ্রেয়সীর লজ্জা করবে। অতএব সে নিজের প্রতিভা লাগালো। এক ভদ্রমহিলা মেলায় ঘুরে ঘুরে লোকজন পাকড়াও করে নিজেদের মেডিকাল ক্লিনিকের প্রচার করছিলেন। শ্রেয়সী নিজেই তাঁকে খুঁজে বের করল। ভদ্রমহিলা চরম উৎসাহে নিজেদের ক্লিনিক নিয়ে বলে চললেন। কোথায় কোথায় শাখা আছে, কুকুরে কামড়ালে প্রায়োরিটি দেওয়া হবে নাকি মাথা খারাপ হলে, বইমেলায় কোথায় স্টল দিয়েছেন... শ্রেয়সী সব শুনে বলল, “বাহ্‌... খুব ভালো। ইয়ে... আপনার কাছে একটা সেফটিপিন পাওয়া যাবে?”
ভদ্রমহিলা গোমড়া মুখে কাটিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। এরপর শ্রেয়সী গেল ব্যাগের দোকানে। সেখানে বিজ্ঞের মত নেড়েচেড়ে অনেকগুলো ব্যাগ দেখে পছন্দ করে একটা ব্যাগ কিনে ফেলল একশো পঁচাত্তর টাকা দিয়ে। কিন্তু ব্যাগ কেনার পরেও সেফটিপিন পাওয়া গেল না উল্টে আমার খুচরো গুলো বেরিয়ে গেল।
এবার কোথায় যাই ভাবতে ভাবতে চলে গেলাম মেলার পেছন দিকে। সেদিকে রাস্তার ধারে বেশ কিছু দোকানে টি-শার্ট, ওড়না, ছবি ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছিল। সেখানে সেফটিপিন পাওয়া গেল শেষ পর্যন্ত। তা দিয়ে জুতো লাগানোর কাজটা এই অধমকেই করতে হল। তারপর জুতো সারাইয়ের আনন্দে সেখানেও একটা টি-শার্ট পছন্দ করে কিনে ফেললাম।
তাহলে কী দাঁড়াল? শ্রেয়সীর জুতোয় সেফটিপিন লাগাতে গিয়ে খরচা পড়ল চারশো পঁচাত্তর টাকা!
সাধে কী আর বলে? দেখলে হবে... খরচা আছে!
যাই হোক, সেফটিপিন লাগানো জুতো পড়ে নতুন উদ্যমে শ্রেয়সী মেলায় এগিয়ে চলল। সৃষ্টিসুখের স্টলের সামনে খুঁজে বের করল তন্ময় অর্থাৎ বংপেনকে। যাই হোক, আড্ডার মাঝখানে আমি শ্রেয়সীকে মনে করিয়ে দিলাম যে, আমাদের কিছু বন্ধুর ম্যাগাজিনের জন্য শ্রেয়সী তন্ময়ের কাছে স্বপ্ন নিয়ে লেখা চেয়েছিল। তার পরে শ্রেয়সী এবং তন্ময়ের মধ্যে কথোপকথন,

-      তোমার লেটেস্ট স্বপ্ন নিয়ে গল্পটা খুব ভালো হয়েছে।
-      থ্যাঙ্ক ইউ!
-      এবার আমাদের ম্যাগাজিনের জন্য স্বপ্ন নিয়ে গল্পটা দাও!
-      ওহ্‌... তুই (তুই এর ওপর জোর দিয়ে) চেয়েছিলি না স্বপ্ন নিয়ে গল্প!
-      কেন? ভুলে গেছ?
-      আরে সেই জন্যই কদিন ধরে ভেবে চলছি যে স্বপ্ন নিয়ে একটা লেখা ডেস্কটপে সেভ করে রেখেছি কেন!
-      যাহ্‌... লেখাটার কী করলে?
-      আরে ওটাই তো ব্লগে পোস্ট করে দিলাম। এক্ষুনি যেটা বললি তোর ভালো লেগেছে!
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”