Saturday, June 27, 2020

ক্রিকেট ইতিহাসের মহারথীরা - ২

দ্বিতীয় পর্বের লেখায় থাকুক কিছু অস্ট্রেলিয়ান মহারথীদের কথা। ক্রিকেটের আদিযুগের অনেকটাই ছিল শুধু অ্যাংলো-অস্ট্রেলিয় ক্রিকেটযুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধের অস্ট্রেলিয় পঞ্চপাণ্ডব আজকের লেখায়।
বিশ্ব-ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়ার ফাস্টবোলারদের সুনাম আজকের নয়। আমি নিজে টিভিতে প্রথম দেখেছিলাম ক্রেগ ম্যাকডরমট, মার্ভ হিউজ, ব্রুস রিড আর মাইক হুইটনিকে। সেটা ভারতের ১৯৯১ ট্যুর। তার পর থেকে গ্লেন ম্যাকগ্রাথ, পল রাইফেল, জেসন গিলেসপি, ব্রেট লি হয়ে হালের মিচেল স্টার্ক অবধি কম ফাস্ট বোলার দেখিনি। আর তাছাড়া ষাটের দশকের ম্যাকেঞ্জি-কনোলি বা তার পরের লিলি-থমসনদের ব্যাপারটা তো আছেই। কিন্তু আজকের লেখার প্রথম ব্যাক্তিত্ব হলেন ‘দ্যা ডেমন বোলার’। ফ্রেড্রিক স্পফোর্থ, ক্রিকেটের একেবারে প্রথম যুগের সুপারস্টার।
১৮৭৭ সাল থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে খেলেছেন ১৮টি টেস্ট। তাতে ১৮.৪১ গড়ে ৯৪টি উইকেট। আর ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটে ৮৫০ এর বেশী উইকেট। ১৮৭৭ সালের জেমস লিলিহোয়াইটের দলের বিরুদ্ধে ভিক্টোরিয়া এবং নিউ সাউথ ওয়েলসের মিলিত দলের প্রথম খেলা, যা পরবর্তীতে ক্রিকেটের প্রথম টেস্ট ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হবে তাতে স্পফোর্থের জায়গা ছিল নিশ্চিত। কিন্তু উইকেট কিপার হিসেবে নিজের বন্ধু বিলি মিডউইন্টারের বদলে জ্যাক ব্ল্যাকহ্যাম জায়গা পাওয়ার প্রতিবাদ হিসেবে ছেড়ে দিয়েছিলেন সেই সুযোগ।
বোর্ডের সঙ্গে ঝামেলা মিটে যাওয়ার ফলে দ্বিতীয় খেলাতেই ফিরে আসেন স্পফোর্থ, যদিও অস্ট্রেলিয়া সেই খেলায় জেতেনি কিন্তু এর পরে স্পফোর্থের খেলায় সাফল্যের ভাগই বেশী। প্রথম বোলার হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে ৫০ উইকেট এবং টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম হ্যাট-ট্রিকের গৌরব তাঁরই। এছাড়া আছে ১৮৮২ সালের সেই বিখ্যাত টেস্ট ম্যাচ। যাকে বলা হয় ‘Spofforth’s match’। তাঁর ৯০ রানে নেওয়া ১৪ উইকেটের জোরেই দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৮৪ রান ডিফেন্ড করতে পেরেছিল অস্ট্রেলিয়া। জন্ম হয়েছিল অ্যাসেজের।
স্পফোর্থকে যদি যুধিষ্ঠির ধরেনি তাহলে ভীম নিশ্চই ট্রাম্পার। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যখন ইংল্যান্ডের মাঠের রাজার সন্মান হাতবদল হয়েছে গ্রেস থেকে রঞ্জীর কাছে, অস্ট্রেলিয়ায় তখন ব্যাটিং শিল্পে রাজত্ব করছেন ভিক্টর ট্রাম্পার। ডন ব্র্যাডম্যানের আগে অস্ট্রেলিয়ার শ্রেষ্ঠ ব্যাটসম্যান। ট্রাম্পারের ব্যাটিংয়ের সৌন্দর্য নিয়ে বহু লেখা আছে, যার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্ভবত অস্ট্রেলিয় লেগ-স্পিনার আর্থার মেইলির ট্রাম্পারকে প্রথম বল করার অভিজ্ঞতা। যেখানে এক অসামান্য বলে ট্রাম্পারকে আউট করে মেইলির মনে হয়েছিল ‘I felt like a boy who had killed a dove.’
এর সঙ্গেই ট্রাম্পারের কিছু আসামান্য ইনিংস যেমন লর্ডসের ১৩৫, ১৯০২ সালে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসবে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে টেস্টের প্রথম সেশনেই শতরান, এগুলো তো আছেই। তাঁর এই দৃষ্টিনন্দন ব্যাটিংয়ের কিছু নমুনা পেলে মন্দ লাগত না।
অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটের অর্জুন কে সেই প্রশ্নের একটাই উত্তর? ৯৯.৯৪। আর কিছু না, ডনকে শুধু হেডিংলিতে ব্যাট করতে দেখলেই আমার চলত।
চার নম্বরে আসবেন ‘The Golden boy’ কিথ মিলার। ব্যাটিংশৈলীর দিক দিয়ে যাকে ব্র্যাডম্যানের চেয়েও এগিয়ে রেখেছিলেন লালা অমরনাথ। অল-রাউন্ড পারফর্মেন্স, বড় শট খেলার ক্ষমতা এবং নিজের সুঠাম চেহারার জন্য মিলার সব সময়ই ছিলেন দর্শকদের ফেভারিট। আর এর সঙ্গেই তাঁর বিদ্রোহী মনোভাব এবং স্পষ্টবক্তা হওয়ার কারণেই সুদর্শন এই খেলোয়াড় নিজের একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন।
কিথ মিলারের অসাধারণ ড্রাইভের বেশ কিছু ভিডিও আছে বাজারে, এবং খেলা ছাড়াও আছে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারের ভিডিও। কিন্তু আজকের দিনেও এই বিগ ব্যাশ, আইপিএলের যুগেও মিলারের জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ত বলে মনে হয় না।
অস্ট্রেলিয়ার সর্বকালের সেরা অল-রাউন্ডারের লড়াইয়ে রিচি বেনো বা কিথ মিলার এগিয়ে থাকলেও আমার এই তালিকায় বেনোর বদলে আসবে অ্যালান ডেভিডসন। বাঁহাতি লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান এবং বাঁহাতি ওপেনিং বোলার ডেভিডসন বেনোর সঙ্গে একই সময় অস্ট্রেলিয়ায়র হয়ে নিয়মিৎ খেলেছেন। ৪৪টি টেস্ট খেলে ১৮৬ উইকেটের সঙ্গে সঙ্গে ১৩২৮ রানও করেছিলেন। কিন্তু ডেভিডসন আমার মনে জায়গা করে নিয়েছেন যেদিন থেকে ১৯৬১ সালের ব্রিসবেন টাই টেস্টের বিস্তৃত বর্ণনা পড়েছিলাম শঙ্করীপ্রসাদের লেখায়। বল হাতে ১১ উইকেট এবং ব্যাট হাতে ১২৪ রান করেছিলেন ডেভিডসন। তার মধ্যে ম্যাচের চতুর্থ ইনিংসে করেছিলেন টেস্টে তাঁর সর্বোচ্চ ৮০ রান। ২৩৩ তাড়া করতে গিয়ে নিজে ব্যাট করতে এসেছিলেন যখন অস্ট্রেলিয়া ৫৭ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে। প্রথমে কেন ম্যাকে আর তার পর রিচি বেনোর সঙ্গে পার্টনারশিপে দলকে নিয়ে গেছিলেন জয়ের দোরগোড়ায়। ডেভিডসনের ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ৬/৬৪ এর চমৎকার ভিডিও আছে ইউটিউবে কিন্তু ওয়াসিম আক্রমের আগের বাঁহাতে শ্রেষ্ঠ বোলারকে এইটুকু দেখে মন ভরে না।

Sunday, April 26, 2020

ক্রিকেট ইতিহাসের মহারথীরা - ১

আমার জীবনে ক্রিকেটসাহিত্যের যখন সূচনা হয় তখন আমার বয়স ছয়-সাত। আমার পিসির বাড়ীতে দীপঙ্কর ঘোষের লেখা ‘টেস্ট ক্রিকেট ও বিশ্বকাপে ভারত’ বইটা আমার হাতে আসে এবং কিছুদিনের মধ্যেই সেটিকে আমি নিজের সম্পত্তির মধ্যে ঢুকিয়ে নিই। প্রধানত ভারতীয়দের নিয়ে লেখা এই বইতে ছিল ১৯৩২ থেকে ১৯৮৭ অবধি ভারতের সব টেস্টের সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড, জনার্দন নাভলে থেকে ভারত অরুণ অবধি ভারতের সব টেস্ট খেলোয়াড়ের পরিচিতি, বেশ কিছু প্রয়োজনীয় স্ট্যাটিস্টিক্স এবং প্রথম চারটে বিশ্বকাপের সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ, সব মিলিয়ে বইটা ওই সময়ে আমার প্রিয় বইয়ের তালিকায় উপরের দিকেই ছিল। এর সঙ্গে এখানে ওখানে টুকটাক লেখা যেমন ১৯৮৩ সালের পুজোবার্ষিকীতে রাজু মুখার্জির লেখা মুস্তাক আলি আর মহম্মদ নিসারের প্রোফাইল (‘ঝড়ের নাম নিসার’), এবং সাপ্তাহিক বর্তমান আর খেলার পাতার লেখা সেই সময়ই অনেকের চেয়েই বেশি আপ-টু-ডেট করে দিয়েছিল।
ভারতীয় ক্রিকেট থেকে বিশ্ব ক্রিকেটের যাত্রা সম্পূর্ণ হয় যখন আর দু-এক বছরের মধ্যেই যখন বাবা আমাদের মুঙ্গেরের বাড়ির পুরনো সংগ্রহ থেকে বেশ কিছু বইয়ের মধ্যে শঙ্করীপ্রসাদ বসুর ‘ক্রিকেট অমনিবাস’ বইয়ের প্রথম এবং দ্বিতীয় খন্ড এনে আমার হাতে তুলে দেয়। আমার জীবনে এই ঘটনাটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং নন্টে-ফন্টে, টিনটিন, কাকাবাবুদের সঙ্গে সঙ্গে হ্যারল্ড লারউড, ওয়েস হল, সেলিম দুরানী এবং চান্দু বোরদেরাও আমার জীবনে ঢুকে পড়েন।
সেই সময় হাতে সময় থাকলেও বই ছিল নিতান্তই কম। তাই এইসব বই এবং বইয়ের বিভিন্ন লেখা যে কতবার পড়েছি তার হিসেব নেই। আর তাই আজ যতই আমি ‘Bodyline Autopsy’ পড়ে মুগ্ধ হই, ‘লাল বল লারউড’ সেই বয়সে আমার ওপর যে প্রভাব ফেলেছিল সেটা আজও কমেনি। এবং সেই কারণেই কোন ক্রিকেটিয় টাইম মেশিন যদি আমাকে ইতিহাসে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয় তাহলে হয়তো ১৯৭১ সালের ইংল্যান্ড বা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বদলে ১৯৩২ সালের অ্যাডিলেডে যাওয়াই পছন্দ করব।
যাই হোক নিজেকে নিয়েই ২৫০ শব্দ লিখে ফেললাম। কিন্তু এই লেখার আসল উদ্দেশ্য অন্য। এই লেখা আমার পছন্দের কিছু খেলোয়াড়কে নিয়ে লেখা যাদের খেলার গল্প শুধু বইয়ের পাতায় আর পুরনো সাদা-কালো ছবিতেই আটকে আছে। হয়তো বিবিসির কিছু পুরনো ভিডিও খুঁজলেই পাওয়া যাবে কিন্তু সেগুলো সামান্য কিছু মুহূর্ত। আর তাই আমার লেখাও মোটামুটি ১৯৭০ সালেই এসে শেষ। অবশ্য শঙ্করীবাবুর বইয়ের লেখারগুলোর সময়কালও মোটামুটি ঐ পর্যন্তই। যখন বিষেণ সিং বেদীকে উল্লেখ করা হয়েছে ‘তরুণ খেলোয়াড়টি’ বলে। আজকের পর্বে থাকবে সেযুগের পাঁচ ইংলিশ ক্রিকেটারের গল্প।
প্রথমে জার্ডিনের কথা লেখা যেত কিন্তু তার বদলে ডাক্তারবাবুকেই বেছে নিলাম। আধুনিক ক্রিকেটের জনক ১৭ স্টোনের ডাক্তার উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেসকে নিয়ে অনেক জায়গাতেই পড়েছি। তাঁর কাঁচা-পাকা দাড়ি-গোঁফ আর লাল-হলুদ টুপির ছবি দেখেছি অনেক জায়গায়। সেযুগের ব্রিটিশ সমাজ এবং সংস্কৃতিতে ক্রিকেটার ডব্লু জি গ্রেস ছিলেন এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। মার্থা গ্রেসের চার ছেলে ইংল্যান্ডের হয়ে ক্রিকেট খেলেছিলেন (পঞ্চমটি অল্প বয়সে মারা যান) এবং তাঁদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন ডব্লু জি। ১৮৬১ সাল নাগাদ, গ্রেসের যখন মাত্র ১২ বছর বয়স, মার্থা একটি বিখ্যাত চিঠি লেখেন অল ইংল্যান্ড দলের
সাতষট্টি বছরের জীবনে সিনিয়ার লেভেল ক্রিকেট খেলেছেন প্রায় পঞ্চাশ বছর। তাঁর হাজার হাজার রান এবং প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে একশোর বেশী শতরানের রেকর্ড ছাড়াও তাঁকে নিয়ে তৈরি লিজেন্ডগুলো সেই প্রথম যুগ থেকে ক্রিকেটের সম্পদ। ইউটিউবে তাঁর ব্যাটিং কয়েক সেকেন্ডের জন্য দেখা গেলেও ক্রিকেটভক্তদের মন ভরাতে তা যথেষ্ট নয়।
সেক্রেটারিকে। বিখ্যাত সেই চিঠির প্রধান বক্তব্য ছিল মেজো ছেলে এডওয়ার্ডসকে অল ইংল্যান্ড দলে সুযোগ দেওয়ার আবেদন কিন্তু সেখানেও মার্থা উল্লেখ করেছিলেন যে, তাঁর আরো একটি ছেলে আছে যার মাত্র বারো বছর বয়স, যে ভবিষ্যতে তার দাদাদের থেকে বড় খেলোয়াড় হবে কারণ সে ব্যাক স্ট্রোকে অনেক বেশী সক্ষম এবং সে সর্বদা সোজা ব্যাটে খেলে।
গ্রেসের পরেই আমার কাছে ব্রিটিশ ক্রিকেটের দ্বিতীয় প্রতিনিধি হলেন ডগলাস রবার্ট জার্ডিন। বোম্বাইতে জন্ম, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ব্লু জার্ডিন ইংল্যান্ডের হয়ে বাইশটা টেস্ট খেলেছেন যার মধ্যে পনেরোটায় তিনি অধিনায়ক ছিলেন। আমার কাছে ব্রিটিশ অহংকার, তাঁদের হার-না-মানা, একগুঁয়ে, নিয়মের মধ্যে থেকে জেতার সর্বাগ্রাসী ইচ্ছের প্রতীক হলেন জার্ডিন। বডিলাইনের শরীর লারউড হলেও মাথা সম্পূর্ণভাবেই জার্ডিনেই এবং এই বডিলাইন বোলিং খেলোয়াড়ি মনভাবাপন্ন কিনা সেই নিয়ে যত তর্কই হোক না কেন এর কার্যকারিতা নিয়ে বিশেষ তর্কের জায়গা নেই। মনে রাখতে হবে যে, বডিলাইন সিরিজে ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড় ছিল ‘মাত্র’ ৫৬.৫৭ যা তাঁর ক্যারিয়ার গড়ের প্রায় অর্ধেক।
শঙ্করীপ্রসাদের বই হোক বা বডিলাইন নিয়ে অন্য যেকোন বই বা ভিডিওই হোক, জার্ডিনকে চিরকালই খুব নাটকীয়ভাবে প্রেজেন্ট করা হয়েছে। তাঁর শুকনো ব্রিটিশ হিউমার, ছোট ছোট মন্তব্য, তাঁর হারকিউলান টুপি সেই সময়ে যেমন তাঁকে একটা অন্য জায়গা করে দিয়েছিল সেরকম আমারও চিরকালই জার্ডিনকে খুবই ইন্টারেস্টিং চরিত্র মনে হয়েছে। যদিও তাঁর মাঠের ব্যাটিং চরম রক্ষণাত্মক ঘরানার তাই সেযুগে থাকলে জার্ডিনের মাঠের চেয়ে মাঠের বাইরের আপডেটের দিকেই আমি বেশী নজর রাখতাম। জার্ডিনের ভারতের প্রথম টেস্টে বিপক্ষ দলের অধিনায়ক সেটাও মনে রাখতে হবে।
এর পরের খেলোয়াড়টিকে নিয়ে উৎসাহের পেছনে বই পড়ার পাশাপাশি ২০১৮ সালের একটি দুপুরও দায়ী। স্যার জ্যাক হবসের অসামান্য রেকর্ড, ফার্স্টক্লাস ক্রিকেটে তাঁর ৬১,৭৬০ রান এবং ১৯৯ টি শতরান তাঁকে এক অন্য জায়গা করে দিয়েছে। তাঁকে নিয়ে খুব বেশি গল্প না থাকলেও তাঁর কাউন্টি সারের ইতিহাসে জ্যাক হবস একটা অন্য জায়গা করে নিয়েছেন। আর সেটাই বুঝতে পেরেছিলাম ২০১৮ সালের ওভাল ট্যুরের সময়। আমরা ঢুকেছিলাম হবস গেট দিয়ে এবং পুরো ট্যুরেই এবং শেষ পনেরো-কুড়ি মিনিটের আমাদের পার্সোনাল ট্যুরের সময়ে দেখেছিলাম হবসের জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবের কিছু নিদর্শন। তাঁকে নিয়ে লেখা, তাঁর ছবি, তাঁর একশোতম শতরান উপলক্ষে বানানো বিশেষ প্লেক সব মিলিয়ে জ্যাক হবসকেই ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে মেনে নেওয়াই যায়।
হবস যদি হন ক্লাসিকাল ঘরানার ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সম্রাট তাহলে রোমান্টিক রাজপুত্রের জায়গাটা কিন্তু থাকবে সুদর্শন ডেনিস কম্পটনের জন্য। অসামান্য ব্যাটসম্যান, বিল্ক্রিমের মডেল, অন্যমনস্কতার জন্য নিয়মিত নিজে বা পার্টনারকে রান আউট করেছেন আবার আর্সেনালের হয়ে ফুটবলও খেলেছেন। সব মিলিয়ে, কম্পটনকে নিয়ে যতই পড়েছি বা ভিডিও দেখেছি ততই ওনাকে আরো আকর্ষনীয় চরিত্র বলে মনে হয়েছে। ওনার নিজের আত্মজীবনী না পড়লেও শঙ্করীপ্রসাদের লেখায় ওনার প্রথম টেস্টের অভিজ্ঞতার দূর্দান্ত বর্ণনা মনে দাগ কেটে গেছিল। বিশেষ করে টেস্টের আগের রাতে বিলি ও’রিলি এবং ফ্লিটউড স্মিথের সঙ্গে আলাপের ঘটনা। এছাড়াও কম্পটন বেশ কিছুদিন ভারতে ছিলেন, রঞ্জি ট্রফি খেলেছেন এবং কলকাতায় অস্ট্রেলিয়ান সার্ভিসেস বনাম ইস্ট জোনের খেলার মধ্যেই ছিল এক ভক্তের সেই বিখ্যাত উক্তি, “Mr Compton, you very good player, but the match must stop now.”
কম্পটনের ভারতের বিরুদ্ধে কোন শতরান নেই, তবে সুযোগ পেলে কম্পটনের অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বিখ্যাত ইনিংসগুলো মাঠে বসে দেখার সুযোগ পেতে চাইব।
আজকের লেখার শেষ চরিত্র অবশ্যই আমার সর্বকালের সবচেয়ে পছন্দের ব্রিটিশ ক্রিকেটার, ক্রিকেটের ট্র্যাজিক হিরো হ্যারল্ড লারউড। নটিংহ্যামশায়ারের কয়লাখনির শ্রমিক থেকে ক্রিকেটের বৃহত্তম বিতর্কের প্রধান মুখ হয়ে ওঠা… লারউডের এই যাত্রায় ওঠাপড়ার অভাব নেই। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বোলার লারউড ছিলেন বডিলাইনে জার্ডিনের প্রধান অস্ত্র এবং তাঁর বলের অভ্রান্ত লাইন এবং গতি অস্ট্রেলিয়ার সমস্ত উপরের সারির ব্যাটসম্যানের জীবনকেই দূর্বিষহ করে তুলেছিল। উডফুল এবং ওল্ডফিল্ডের আঘাতের ঘটনা তো প্রবাদপ্রতিম, কিন্তু মনে রাখতে এর কোনটাই কিন্তু লারউড কোন ব্যক্তিগত শত্রুতা থেকে নয়, এর পুরোটাই নিজের দেশকে মাঠে জেতানোর অদম্য ইচ্ছে আর নিজের অধিনায়কের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তাঁর নির্দেশের প্রতি নিঃশর্ত সমর্পন। আর তাই অ্যাসেজ জেতার পর ইংল্যান্ডের ক্রিকেট বোর্ড যখন নিজেদের দায় ঝেড়ে ফেলার জন্য লারউডকে ১৯৩৪ সালের সিরিজের আগে অস্ট্রেলিয়ানদের কাছে ক্ষমা চাইতে বলে তখন সেটা পড়তে পড়তে রাগ হয় আর লারউডকে আরো কাছের মানুষ বলে মনে হয়।
এই সময়ে ক্রিকেট থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছিলেন। এরপর নাটকীয়ভাবে জ্যাক ফিঙ্গলটনের কথায় নিজের পুরো পরিবার নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান লারউড। তাও আবার ‘এস এস ওরন্টেস’ জাহাজেই, যে জাহাজ ১৮ বছর আগে তাঁকে নিয়ে গেছিল বডিলাইন সিরিজের জন্য। আবার বলতে হবে শঙ্করীপ্রসাদের ‘লাল বল লারউড’ বইয়ের কথা। জায়গায় জায়গায় অতিনাটকীয়তা বা কল্পনা থাকলেও ক্রিকেটের এক রক্তাক্ত অধ্যায়কে খুব মায়াময় করে তুলে ধরেছিলেন তিনি। আর তাই সঙ্গে রইল, সেই লেখারই শেষের পাতাটি।
[সব ছবিই আমার নিজের সংগ্রহ থেকে]

Saturday, July 20, 2019

লন্ডনে লণ্ডভন্ড - ৮ (এডিনবার্গ পর্ব)

~~ পটারময় এডিনবার্গ ~~

ম্যানচেস্টার থেকে মাঝরাতের বাস ধরে আমরা যখন এডিনবার্গ ওয়েভারলিতে এসে নামলাম তখন আটটাও বাজেনি। বাস থেকে নেমেই একটু হেঁটেই বুঝলাম যে এখানে আমাদের প্রথম কাজ হবে দুজনের দুটো সোয়েটার কেনা। তাপমাত্রা তখন দশেরও কম আর আমাদের সঙ্গে গরম পোষাক বলতে শ্রেয়সীর ঐ সারাহ টেলরের সই করা সোয়েটার। আমি ঠাণ্ডা চাপতে গোটা দুয়েক শার্ট পরে বসেছিলাম কিন্তু রোদ ওঠা অবধি তাতে খুব একটা কাজ হয়নি।
আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ওল্ড টাউনের কাউগেট হোস্টেল। সেখানে গিয়ে জানা গেল যে কোন পরিস্থিতিতেই দুটোর আগে আমাদের ঘর পাওয়া যাবে না। অনেক বলেকয়েও কিছু করা গেল না। কী আর করা, ওদের রিসেপসানের পাশের একটা ছোট্ট বাথরুমে মুখটুখ ধুয়ে বেরিয়ে পড়া গেল। প্রথমে ব্রেকফাস্ট তারপর কেল্লার দিকে হন্টন। লন্ডনের আধুনিক রাস্তাঘাটের পর এডিনবার্গের পাথরে বাঁধানো রাস্তা, সিঁড়ি, রাস্তার ধারে শ-খানেক বছরের পুরনো রেস্টুরেন্ট... মন্দ লাগছিল না।

আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল এডিনবার্গ কেল্লা। কেল্লার সবচেয়ে পুরনো অংশ, সেন্ট মার্গারেট চ্যাপেল তৈরি হয়েছিল সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে। এছাড়া গ্রেট হল, হাফ মুন ব্যাটারি, রাজকীয় রত্ন, বিখ্যাত মন্স মেগ কামান... দেখার জিনিসের অভাব নেই। শুধু তাই নয়, কেল্লার ওপর থেকে পুরো এডিনবার্গের একটা প্যানারোমিক ভিউ পাওয়া যায় সেটাও চমৎকার। ভেতরে স্কচ টেস্টিং হচ্ছিল এক জায়গায়। সেসবও করা হল।
কেল্লা থেকে বেরিয়ে আমরা হাঁটা লাগালাম রয়্যাল মাইল ধরে। কেল্লা থেকে ওল্ড টাউনের মধ্যে দিয়ে এক মাইল রাস্তা এডিনবার্গের সবচেয়ে জমজমাট অঞ্চল, তার সঙ্গে আবার সেই সময় এডিনবার্গ ফেস্টিভাল চলছিল বলে বিভিন্ন স্ট্রিট আর্টিস্টদের কেরামতি! কেউ বাচ্চাদের ম্যাজিক দেখাচ্ছেন, কেউ আবার তাঁদের সন্ধ্যার শোয়ের টিকিট বিলি করছেন। সেই জনস্রোতের মধ্যে দিয়ে আমরা হেঁটে চললাম। চারদিকের বাড়ীঘর সবই প্রায় প্রাসাদের মত। সেসব দেখার সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের জন্য সোয়েটার কেনারও একটা ব্যাপার ছিল। আমার একটা সস্তায় পেয়ে গেলেও শ্রেয়সীর জন্য সোয়েটার বা জ্যাকেট আর পাওয়ায় যায় না। যাই দেখি তার প্রচন্ড দাম। এর মধ্যে আবার এক পশলা বৃষ্টিও হয়ে গেল। এইসবের মধ্যেই কাঁপতে কাঁপতে আমরা পৌঁছে গেলাম ‘মিউজিয়াম অফ চাইল্ডহুডে’। সেখানে ব্রিটিশ ছেলেপুলেদের ছোটবেলার বিভিন্ন নিদর্শন দেখে নিজেদের ছোটবেলাটা মনে করতে করতে দেখি প্রায় চারটে বেজে গেছে। অতঃপর হোটেলের দিকে রওয়ানা হলাম। বাইরে তখন রোদ উঠেছে, ফেরার পথে একটা দোকানে ফাইনালি শ্রেয়সীর একটা সাদা কার্ডিগানও পাওয়া গেল। ফুরফুরে মনে হোস্টেলে ফিরে নিজেদের ঘরের চাবি নিয়ে ঘরে গিয়ে পৌছনো গেল। আমাদের ঘরের বাকি চারজন অবশ্য তখন কেউই ঘরে নেই। তাদের জিনিসপত্র চোখে পড়ল। স্নান-টান করে ভালো করে ফ্রেশ হয়ে আরো ঘন্টা খানেক ল্যাধ খেয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম তীর্থ করতে। আমাদের পরের গন্তব্য ‘দি এলিফ্যান্ট হাউস’, হ্যারি পটারের জন্মস্থান। এই ক্যাফেরই কোন এক টেবিলে বসে আস্তে আস্তে হ্যারি পটারের দুনিয়ে গড়ে তুলেছিলেম জোয়ান রাউলিং আর তাই এডিনবার্গের এই ক্যাফের নাম আমাদের বাকেটলিস্টের বেশ ওপর দিকেই ছিল। সেখানে ঘন্টা খানেক কাটিয়ে ল্যাম্ব পাই উইথ গ্রেভি অ্যান্ড ম্যাস খেয়ে বেরিয়ে ছবি-টবি তুলে আরো কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে সেদিনের মত বিশ্রাম।
দ্বিতীয়দিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল ডিন ভিলেজ। এডিনবার্গের থেকে দেড়-দু কিলোমিটারের মধ্যেই এই ছোট্ট গ্রাম যা অনেকের মতে রাউলিং’য়ের লেখার গডরিক’স হলোর অনুপ্রেরণা। গল্পে গডরিক’স হলো পশ্চিম ইংল্যান্ডের এক ছোট্ট গ্রাম যেখানে থাকতেন লিলি এবং জেমস পটার তাঁদের ছোট্ট ছেলে হ্যারিকে নিয়ে। ডিন ভিলেজের ঢালু রাস্তা বেয়ে এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে সত্যি মনে হচ্ছিল যেন হ্যারি পটারের দুনিয়েতেই ফিরে গেছি। ইংল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডের এই ধরণের ছোট লোকালিটিগুলো এমনিতেই খুব সুন্দর আর ডিন ভিলেজের অন্য চার্মটা অবশ্যই হ্যারি পটার সম্পর্কিত। এমনকি গ্রামের মধ্যের কবরখানায় ঢুকে সামনেই হারবার্ট জেমস লিডল আর মেরি লিলিয়াস রবির কবর দেখাটা একটা অন্য রকমের অভিজ্ঞতা।
ডিন ভিলেজে সকালটা কাটিয়ে সেখান থেকে বাস নিয়ে চলে গেলাম হলিরুড প্যালেস। প্যালেসের বাইরে থেকে ঘুরেই চলে এলাম কারণ বিকেলে ফোর্ট উইলিয়ামের ট্রেন ধরার ব্যাপার ছিল। আর তারপরেই শুরু হল অ্যাডভেঞ্চার!
আমাদের এডিনবার্গ থেকে ট্রেন ছিল গ্লাসগোর। আর গ্লাসগোয় মিনিট দশেকের মধ্যেই অন্য ট্রেন নিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম। পৌঁছতে প্রায় রাত দশটা বেজে যাওয়ার কথা এদিকে ফোর্ট উইলিয়ামের ‘চেজ দ্যা ওয়াইল্ড গুজ হোস্টেল’ তাদের ওয়েবসাইটে লিখে রেখেছে সাড়ে নটা অবধি তাদের চেকইন। কাউগেট হোস্টেলের এক্সপেরিয়েন্সের পর অনেক চেষ্টা করে তাঁদের ফোনে ধরে কনফার্ম করা গেল যে রাত দশটা বাজলেও তাদের লোক রিসেপশানে থাকবে।
কিন্তু দশটাতেও কি পৌছব! এডিনবার্গ ওয়েভারলিতে দাঁড়িয়ে আছি আর দেখছি ট্রেনের দেখা নেই। টাইম টেবিল নড়ছে না, ভিড় বাড়ছে কিন্তু ট্রেন নেই। খোঁজখবর নিয়ে জানা গেল যে আমাদের ট্রেন বাতিল, পরের ট্রেন আসবে মিনিট কুড়ি পর। তার মানে গ্লাসগো থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের ট্রেন লেট না করলে সেই ট্রেন বেরিয়ে যাবে এবং ফোর্ট উইলিয়ামের জন্য সেটাই শেষ ট্রেন দিনের। কিছু করার নেই। কুড়ি মিনিট পরের ট্রেনেই ভিড়ের মধ্যে ওঠা হল। ট্রেনের ঘোষণা থেকে জানা গেল যে, আগের কোন  ট্রেনে এক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর জন্য বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করতে গিয়ে আগের ট্রেনটি বাতিল হয়েছিল। এখন আমাদের পরের ট্রেনের চিন্তায় আমাদের শরীর খারাপের যোগার। যাই হোক যথারীতি গ্লাসগো গিয়ে জানা গেল যে গ্লাসগো থেকে ফোর্ট উইলিয়ামের ট্রেন বেরিয়ে গেছে! এবার কী করার! স্কটরেলের দুজন কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলা হল। তাঁদের যা ইংরেজি উচ্চারণ তার প্রায় কিছুই আমরা বুঝিনা। অনেক কষ্টে বুঝলাম বাঁদিক দিয়ে বেরিয়ে ওপরে উঠে যেতে হবে। মনে হল সেখানে হয়তো অন্য লাইনের ট্রেন আছে। লাগেজ ঘাড়ে করে সেদিকে গিয়ে দেখি স্টেশান থেকে বেরিয়ে মেন রাস্তায় চলে এসেছি, আর কোন রেল লাইন নেই। আবার ফিরে গেলাম, আবার একদফা স্কটিশ উচ্চারণের চ্যালেঞ্জ সামলে বুঝলাম যে ওই রাস্তাতেই গিয়ে আর একজন স্কটরেলের কর্মচারীকে খুঁজতে হবে। এবার গিয়ে তাঁকে পাওয়া গেল। যেটা জানা গেল তা হচ্ছে স্কটরেলের গন্ডগোলে আমাদের ট্রেন মিস হয়ে যাওয়ায় তারা একটা ট্যাক্সি করে আমাদের এবং আর একজন যাত্রীকে তাদের শেষ গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেবে। আমরা যাবো ফোর্ট উইলিয়াম এবং আমাদের সঙ্গী সোজা যাবেন ম্যালাইগ।

তাহলে আর কী! ট্রেনের বদলে স্কটরেলের বদান্যতায় গাড়ী চড়ে গ্লাসগো থেকে বিভিন্ন স্কটিশ লকের আর সবুজ গাছপালার মধ্যে দিয়ে আমরা চললাম ফোর্ট উইলিয়ামের উদ্দেশ্যে। শুধু তাই নয়, আমাদের ট্যাক্সি যখন ম্যাপ দেখে ‘চেজ দ্যা ওয়াইল্ড গুজ হোস্টেলের’ সামনে আমাদের নামিয়ে দিল তখন বাজে রাত নটা। বাইরে তখন অন্ধকার নামছে আস্তে আস্তে। রিসেপশানের মহিলা আমাদের দেখে বললেন, “কী ব্যাপার? তোমাদের তো দশটার পর আসার কথা ছিল!” যাইহোক তাঁকে গল্প-টল্প বলে প্রথমে এডিনবার্গে কেনা স্যান্ডউইচ ইত্যাদি খেয়ে নেওয়া হল। তারপর ঘরে গিয়ে একদফা স্নান করে ঘুম। কাল সকাল সকাল জ্যাকোবাইট ট্রেন ধরার ব্যাপার আছে!

আগের পর্বের লিঙ্ক -

Saturday, December 1, 2018

লন্ডনে লণ্ডভণ্ড - ৭

~~সারাহর সঙ্গে কিছুক্ষণ~~

সারাহর সঙ্গে সারাদিন হলে ভালোই হত তাও যেটুকু সময় দেখা হয়েছিল সেটাই বা মন্দ কী! যাকগে, পরের কথা পরে পরে হবে। সকালে ব্রেকফাস্টের পর প্রথম গন্তব্য ছিল ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাব, আরেক তীর্থক্ষেত্র! শ্রেয়সীর পরনে ইস্ট বেঙ্গলের জার্সি, আমার পরনে ইউনাইটেডের জার্সি, ব্যাগে মোহন বাগানের! হোটেল থেকে বেরিয়ে মিনিট দশেক হেঁটেই পৌঁছে গেলাম ক্লাবের সামনে। পথে চোখে পড়ল ট্র্যাফোর্ড পার্ক আর তার সামনের ভাস্কর্য্য। ক্লাবে পৌঁছে বুকিং স্লিপ দেখিয়ে একটা ট্যুর দলের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম। যদিও সামান্য দেরী হয়েছিল। ট্রফি রুম থেকে শুরু করে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন স্ট্যান্ডে গিয়ে বসা হল। সেই প্রথম দেখলাম থিয়েটার অফ ড্রিমসকে। 

দেখলাম বিখ্যাত স্ট্র্যাটফোর্ড এন্ড, উল্টোদিকের স্যার ববি চার্লটন স্ট্যান্ড। তারপর একে একে যাওয়া হল মাঠের বিভিন্ন প্রান্তে, প্রেস কনফারেন্স রুমে, খেলোয়াড়দের বেরিয়ে আসার টানেলে, এমনকি ডাগ আউটের সামনেও। শুধু সিজন শুরুর ঠিক আগেই গেছিলাম বলে খেলোয়াড়দের ড্রেসিং রুমে কিছু শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছিল, তাই ড্রেসিং রুমে এবার আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি। এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম গণশক্তির পাতায়। তার লিঙ্ক দিয়ে রাখলাম আর উদ্ধৃত করলাম শেষ অংশটা, কারণ বিদেশের বিভিন্ন মাঠে গিয়ে এটাই আমার বারবার মনে হয়েছে,
কিন্তু একটা প্রশ্ন মনে থেকেই গেল। আমাদের কলকাতার দুই বড় ক্লাব কবে এইভাবে সুন্দর করে সাজিয়ে তুলবে নিজেদের? কবে দেশবিদেশের সমর্থকরা এসে এইভাবে ঘুরে দেখতে পারবেন নিজেদের প্রিয় ক্লাব? অনুভব করবেন ক্লাবের ইতিহাস, তার ঐতিহ্য! ঘরে নিয়ে যেতে পারবেন তাঁদের প্রিয় ক্লাবের ছবি দেওয়া টি-শার্ট বা অন্য কোন স্মৃতিচিহ্ন? ক্লাবের রেস্তোরায় বসে খাবেন ক্লাবের স্পেশাল ইলিশ ভাপা বা চিংড়ির মালাইকারি?
কর্মকর্তারা শুনছেন কি?”

ক্লাব থেকে বেরিয়ে তাড়াহুড়ো করেই ছুট লাগালাম ম্যানচেস্টারের ন্যাশানাল ফুটবল মিউজিয়ামের উদ্দেশ্যে। যাত্রার উপায় ট্রামে। ভেতরটা ট্রেনের মত হলেও ঠিক শহরের মধ্যে দিয়ে যায় বলে ট্রামে বসেই শহরের পালস্‌টা বেশ ভালো বোঝা যায়। এক নজরেই বেশ ভালো লেগে গেছে ম্যানচেস্টারকে। বিশেষ করে শহরের যেটাকে সিটি সেন্টার বলে সেটা অনেকটাই কলকাতার মত। প্রচুর লোকজন চোখে পড়ল। মিউজিয়ামটা কাছেই। অসাধারণ মিউজিয়াম। টিকিটের ব্যবস্থা নেই, কেউ চাইলে নিজেদের ইচ্ছে মত ডোনেশান দিতে পারেন। ভেতরে কী নেই। শুরুতেই চোখে পড়ল ফুটবল নিয়ে বিভিন্ন বই এবং কমিক্স। রোভার্সের রয় এবং বিলির বুট দুটোই ছিল সেখানে, সঙ্গে টিনটিন বা টাইগার পত্রিকায় ছাপা ফুটবল কমিক্স বা ১৯০৬ সালের মেয়েদের ফুটবল নিয়ে পোস্টকার্ড।
এরপর খেলার জিনিসে ঢুকে পড়লে তো মাথা ঘুরে যাবে। কী নেই সেখানে! ফুটবলের বিবর্তনের স্যাম্পেল। ঊনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন ফুটবলে ক্লাবের খেলোয়াড়দের ছবি, ১৮৭২ সালের এফএ কাপের মেডেল, বিভিন্ন বিশ্বকাপের পোস্টার, পেলের জার্সি এবং পাসপোর্ট, বিভিন্ন ট্রফি তার মধ্যে জুলে রিমে কাপের রেপ্লিকাটাও আছে, ওই ১৯৬৬ সালেরটা। এমনকি ইএ স্পোর্টসের ফিফার বিবর্তনও বাদ পড়েনি। এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন ইন্টার‍্যাক্টিভ অপশন। টিভি স্ক্রিন, যার সামনের বোর্ডে বিভিন্ন ক্লাব বা বিখ্যাত খেলোয়াড়ের নাম লেখা আছে, নিজের পছন্দের প্লেয়ার বা খেলায়াড়ের নামে হাত দিলেই স্ক্রিনে চালু হয়ে যাবে, সেই ক্লাবের ইতিহাস বা ঐ খেলোয়াড়কে নিয়ে দু-তিন মিনিটের ছোট্ট ক্যাপসুল। বাচ্চাদের জন্য নানারকম গেমস। এমনকি ঐ সুযোগে ভার্চুয়াল গোলকিপারের সামনে পেনাল্টি মারার সুযোগও পেয়েছিলাম।
সব মিলিয়ে অসাধারণ, সবার শেষে স্যুভেনিরের দোকানটাও অসাধারণ, ছবি, বই, চাবির রিং, ম্যাগনেট থেকে শুরু করে ছোট ছোট বিশ্বকাপ বা এফএ কাপের রেপ্লিকা, কী নেই। তবে ঐ, সব জিনিসেরই গলাকাটা দাম বলে সাধ আর সাধ্যের মধ্যে লড়াই চলতেই থাকে।
ফুটবল মিউজিয়াম থেকে বেরিয়েই আবার ছুট লাগালাম ট্রাম ধরতে। আবার ফিরতে হবে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। তবে এবার ফুটবল মাঠের এক কিলোমিটার পাশের ক্রিকেট মাঠে। সেখানে তখন কিয়া সুপার লিগের সারে স্টারস আর ল্যাঙ্কাশায়ার ঠান্ডারদের মধ্যে টি২০ ম্যাচ চলছে। সেখানে খেলছে সারাহ টেলর, ন্যাট সিভার, মেরিজুয়ান কাপ আর ডেন ভ্যান নিকার্ক সারের হয়ে। আর ঠান্ডারদের দলে আছে ঘরের মেয়ে হরমনপ্রিত, এমি জোনস্‌, নিক বল্টনরা। যাইহোক খেলাটা যদিও একপেশেই হল। সহজেই জিতল সারাহর দল। ওর ব্যাটিং দেখতে না পেলেও দেখার সুযোগ হল চোখ ধাঁধানো কিপিং। এখানে বলে রাখি, সারাহ টেলর আমার সবচেয়ে প্রিয় মহিলা ক্রিকেটার! মানে সবচেয়ে প্রিয়দের মধ্যে একজন-ট্যাকজন নয়। সবচেয়ে প্রিয় মানে সবচেয়ে প্রিয়। ওদিকে দাদা, এদিকে সারাহ!

খেলা শেষ হয়ে গেল বেশ তাড়াতাড়িই। টিকিট কাটার সময় আমাদের বলা হয়েছিল যে পুরো মাঠের টিকিটই দশ পাউন্ড, যেখানে ইচ্ছে। আমি বুদ্ধি লাগিয়ে ক্লাব হাউসের পাশের ব্লকের টিকিট নিয়েছিলাম। কারণ ইডেনে প্লেয়ারদের ডাগ আউটটা ওখানেই হয়ে। মাঠে ঢুকে দেখলাম, এখানে ডাগ আউট ঠিক সোজাসুজি উল্টোদিকে। কী আর করি, ক্যামেরার জুম দিয়ে হরমনদের দেখলাম। খেলা শেষ হওয়ার পর শ্রেয়সীকে বললাম, “চল দেখে আসি কতটা যেতে দেয়!”
ও হরি, গ্যালারীর নিচ দিয়ে হাঁটতে গিয়ে দেখি, সেরকম কিছু সিকিউরিটি নেই, দিব্যি মাঠটাকে ঘিরে গোল হয়ে ঘোরা যায়। আমরা টুকটুক করে হাঁটতে হাঁটতে উল্টোদিকে চলে এলাম। বাইরে থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম যে খেলোয়াড়রা দর্শকদের সঙ্গে ছবি তুলছে, সই দিচ্ছে। আমরাও আবার গ্যালারিতে ঢুকে একদম সামনে গিয়ে পাকড়াও করলাম হরমনপ্রিতকে, ইন্ডিয়া থেকে এসেছি ইত্যাদি বলে-টলে ওর সঙ্গে ছবিও তোলা হল। অ্যালেক্স হার্টলিরও অটোগ্রাফ নেওয়া হল। কিন্তু তারপরেই আমরা ছুটলাম অন্যদিকে, যেখানে সারের খেলোয়াড়রা ছবি তুলছে। সারাহ চলে না যায়। লোকজনকে কাটিয়ে একটু সামনে যেতেই দেখতে পেলাম ভদ্রমহিলাকে, একজন বয়স্ক ভারতীয় লোকের সঙ্গে কথা বলছিল। সুযোগ বুঝে, “হাই আই অ্যাম আ বিগ ফ্যান” বলে কথা শুরু করলাম। তারপর টুকটাক কথা হল। এমনকি মেয়েদের আইপিএল চালু হলে কেকেআরে খেলার জন্য অনুরোধও করে ফেললাম। সঙ্গে সেলফি। সব মিলিয়ে দারুণ ফ্যানবয় মোমেন্ট। শ্রেয়সী একটু ঘেঁটেই গেছিল। এক তো ওকে বাদ দিয়ে চলে গেছি, তারপর আবার ওর সঙ্গে ছবিটা পছন্দ হয়েনি।
একে ছবি নিয়ে মুড অফ, তার সঙ্গে ঠাণ্ডা লাগছে, সব মিলিয়ে গোমড়ামুখো শ্রেয়সীর মুড ভালো করতে আমি ওকে নিয়ে ঢুকলাম ক্লাবের ক্রিকেট শপে। সেখান থেকে কেনা হল ইংল্যান্ড উইমেন ওয়ান্ ডে দলের রেপ্লিকা সোয়েটার। সেটা পড়ে একটু ধাতস্থ হল সে। তারপর দোকান থেকে বেরিয়ে এসে আরেক চমক। দেখলাম গ্যালারি আর দোকানের মধ্যের খালি জায়গাটায় অনেক অনেক ফ্যানের সঙ্গে খেলোয়াড়রাও দাঁড়িয়ে আছে, ঘুরে বেরাচ্ছে, ছবি তুলছে। সেখানে গিয়ে শ্রেয়সী আর একপ্রস্থ হরমনের সঙ্গে কথা বলে এল এবং তারপর খুঁজে বের করল সারাহকে! গিয়ে পাতি বলল, আগের ছবিটা পছন্দ হয়নি, আরো ছবি তুলতে চায়, তার সঙ্গে আবদার ওই নতুন সোয়েটারে সই করে দিতে হবে। এর পরের কথোপকথন,
-      You want me to sign on that sweater?
-      Yes.
-      You are crazy.
-      I know!
-      Oops... Ready? Where to sign?
-      Wherever you want. I am not going to wash it.
-      Ya ya… Dare you wash it!
এই পুরো ব্যাপারটারই ছবি তুলে রাখা হয়েছিল, যেটার কোলাজটা হয়তো কোন একদিন প্রিন্ট হয়ে আমাদের বসার ঘরে জায়গা নেবে। আপাতত এখানে দিয়ে রাখলাম। কিন্তু এখানেই শেষ নয়!

এইসব উত্তেজনায় ভুলেই গেছিলাম যে, ছেলেদের খেলাটা শুরু হওয়ার সময় হয়ে গেছে। আমাদের রাতের বাস একটায়। সুতরাং ওটা দেখতেও ঢুকে পড়লাম। আমাদের পুরনো গ্যালারিতে না ফিয়ে গিয়ে যেখানে সারাহদের সঙ্গে সঙ্গে দেখা সেখানেই ঢুকে দুটো সিট জোগাড় করে বসে পড়লাম। ল্যাঙ্কাশায়ার লাইটনিং বনাম ডারহাম জেটসের খেলা। ডারহামের হয়ে পল কলিংউড ওপেন করেছিল। ভদ্রলোক এতদিন খেলছেন সেটাই খেয়াল ছিল না। যাই হোক, তিন-চার ওভার খেলা হয়েছে। হঠাৎ দেখি দুই ভদ্রমহিলা সিঁড়ি দিয়ে উঠে গ্যালারিতে এসে এদিক ওদিক সিট খুঁজছে। একজন ন্যাট সিভার, অন্যজন... সারাহ টেলর! শ্রেয়সীকে বললাম, “ওই দ্যাখ সারাহ!” যদিও আমাদের পাশে খালি সিট ছিল না। সারাহর সঙ্গে চোখাচুখিতে হওয়ায় ভদ্রমহিলা আবার একটা “তোমরা এখানেও” টাইপ হাসি দিয়ে একবার চোখ মেরে নিচের দিকে সিট খুঁজতে চলে গেলেন। আমার বিশ্বাস, আমাদের পাশে আর দুটো সিট ফাঁকা থাকলে আমাদের পাশে এসেই বসতেন!
এত কিছুর পর আর ম্যাচে মন বসানো গেল না। আর ঠাণ্ডাও লাগছিল খুব। আমরা ফিরে গেলাম হোটেলে। সেখান থেকে ব্যাগ নিয়ে দশটা নাগাদ রওয়ানা দিলাম বাস স্টেশানের দিকে। বাইরে তখন টেম্পারেচার দশ-বারোর কাছে এবং আমরা দুজনেই ওজন কমাতে আমাদের জ্যাকেটগুলো লন্ডনে রেখে এসেছিলাম। আসলে লন্ডনের ঐ গরমের পর এখানে এত ঠাণ্ডা হবে ভাবতে পারিনি! যাইহোক, পরদিন সকালে পৌঁছে যাব নতুন দেশ স্কটল্যান্ডে। সেখানকার অ্যাডভেঞ্চারের গল্প পরের পর্বে!

আগের পর্বের লিঙ্ক -


Thursday, November 1, 2018

লন্ডনে লণ্ডভণ্ড - ৬

~~ তীর্থস্থান ~~

সব ধর্মের মানুষই এক এক সময়ে তীর্থ করতে বিভিন্ন চেনা-অচেনা জায়গায় পৌঁছে যান। আমার আর শ্রেয়সীর ধর্ম হল ক্রিকেট। সুতরাং লর্ডস আর ওভালের মত ক্রিকেটীয় তীর্থক্ষেত্র দেখে নেওয়ার পর সময় হল একটু দূরের এক তীর্থস্থানে যাওয়ার। এবং এটার কথা দেশে থাকতে শ্রেয়সীই মনে করিয়েছিল!
সুতরাং দিন তিনেক লন্ডনে কাটিয়ে পরের দিন আমরা বেরিয়ে পড়লাম আমাদের পরবর্তী গন্তব্য টনটনের উদ্দেশ্যে। ভিক্টোরিয়া কোচ স্টেশান থেকেই ঠিক সময় মত বাস ছেড়ে ঘন্টা চারেকের মধ্যে দিল টনটন। সামারসেট কাউন্টির ভেতরে এই টনটনে আসার কারণ শুধু ক্রিকেট মাঠটা একবার দেখা। কেন টনটনের ক্রিকেট মাঠ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান সেটা বোঝার জন্য নিচের লিংকটা রইল। http://www.espncricinfo.com/series/8039/scorecard/65213/india-vs-sri-lanka-21st-match-icc-world-cup-1999 এছাড়াও সামারসেটের হয়ে ঐ মাঠে ভিভ রিচার্ডস এবং ইয়ান বথামের কিছু স্মরনীয় পারফর্মেন্স আছে। গাভাস্কারও একটা মরশুম খেলেছিলেন সামারসেটের হয়ে।
বাসস্ট্যান্ড থেকে মাঠটা কাছেই। সুতরাং গুগল ম্যাপের ভরসায় হাঁটা লাগালাম টন নদীর পাশের পার্কের মধ্যে দিয়ে। কাঁধে রুকস্যাক, পাশে শ্রেয়সী, টনটন আসার প্ল্যানটা যার মস্তিষ্কপ্রসুত। অন্য স্যুটকেসটা পাবলাভেরই নিচের বেসমেন্টে রেখে এসেছিলাম। পার্কের মধ্যে দিয়ে হেঁটে এসে একটা বড় মোড় পেরিয়েই প্রথমে পড়ল মাঠের ধারের বিখ্যাত গির্জাটা। সেটাকে বাঁয়ে রেখে আর ২-৩ মিনিট হাঁটতেই এসে পড়লাম সামারসেট ক্রিকেট ক্লাবের ক্যুপার আসোসিয়েটস কাউন্টি গ্রাউন্ডের মেন গেটের সামনে। চারদিকে বিশেষ লোকজন নেই। কয়েকটা গাড়ী পার্ক করা ছিল। আমি আর শ্রেয়সী একটু পাশ দিয়ে হেঁটে মাঠের নামার জায়গা পেয়ে গেলাম। মাঠের ভেতরে দুজন গ্রাউন্ডসম্যান পিচ দেখভাল করছিলেন। আমাদের মাঠে নামতে দেখেও তাঁরা কিছু বলেননি। আমিই ভদ্রতা করে কাছের জনকে জিজ্ঞেস করলাম যে পিচের কাছে যাওয়া যাবে কিনা, তাতে বলল, "please stay off the pitch" সুতরাং আমরা ঐ মাঠের ওখানেই ছবি তোলা শুরু করলাম। মাঠ এবং মাঠের পাশের গির্জাটারই বেশী ছবি তোলা হল, তার সঙ্গে আমাদের ছবিও। দুজনেই আবার ঐ ৯৯ সালের দুই নায়কের এক-একজনের ছবি দেওয়া টিশার্ট পড়ে এসেছিলাম। টনটনের মাঠে দাঁড়িয়ে তোলা সেই ছবিগুলো পরে একজনকে দেখানোরও সুযোগ পেয়েছিলাম। আশা করি ভবিষ্যতে অন্যজনকেও দেখানোর সুযোগ পাব।
এইভাবে মিনিট দশেক ছবি-টবি তুলে মাঠের বাইরে বেরিয়ে খুঁজতে গেলাম মাঠের লাগোয়া ক্রিকেট মিউজিয়ামটা। কিন্তু সোমবার বলে সেটা বন্ধ। তার বদলে লাগোয়া ছোট্ট দোকানটায় ঘুরে টুকটাক জিনিসপত্তর দেখছি, দোকানের ভদ্রলোক শ্রেয়সীর টিশার্ট থেকে রাহুল দ্রাভিডকে বুঝতে পেরে জানালেন সম্প্রতি নাকি রাহুল ভারতের আন্ডার-১৯ টিম নিয়ে সামারসেট ঘুরে গেছে। তখন নাকি এই দোকান থেকে নিজের ছেলেদের জন্য গ্লাভস ইত্যাদি কিনেও নিয়ে গেছে। 
মাঠ থেকে বেরিয়ে ফেরার পথে পড়ল 'রিং অফ বেলস' রেস্তোরা। সেখানে টুক করে ব্রিটিশ স্টাইলের স্টেক, বার্গার এবং বিয়ার দিয়ে লাঞ্চ করে আমরা আবার হাঁটা লাগালাম বাসস্ট্যান্ডের দিকে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ম্যানচেস্টার। কিন্তু বাসে টনটন থেকে ম্যানচেস্টার যাওয়াটা সহজ নয়। তাই আমরা যে বাসে টিকিট কেটেছিলাম সেটা যাচ্ছিল প্রথমে টনটন থেকে ব্রিস্টল, তারপর ব্রিস্টল থেকে বার্মিংহাম, সবশেষে বার্মিংহাম থেকে ম্যানচেস্টার।
ব্রিস্টল আর বার্মিংহামে মাত্র ঘন্টা খানেক ব্রেক ছিল বলে কোথাও যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ব্রিস্টলে রাজা রামমোহন রায়ের সমাধিটা দেখার খুব ইচ্ছে ছিল কিন্তু সেটা আর হল না। তার বদলে বাস স্ট্যান্ডের বাইরে কিছুটা ঘুরে এসেছিলাম। বার্মিংহামে সেই চেষ্টাও করিনি। যাই হোক, এই ধরণের ঘোরার ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যেই গণ্ডগোল হওয়ার চান্স থাকে। আমাদেরও সেটাই হল বার্মিংহাম থেকে ম্যানচেস্টার যাওয়ার রাস্তায়। হাইওয়েতে কিছু একটা মেরামতি চলছে বলে প্রচণ্ড জ্যাম। সেটা বাসে অ্যানাউন্স করে আমাদের জানিয়েও দেওয়া হল এবং বাস চলল শামুকের গতিতে। শেষ অবধি রাত নটার বদলে আমরা ম্যানচেস্টারের বাসস্টেশানে গিয়ে নামলাম প্রায় রাত এগারোটার সময়।
আর ম্যানচস্টারে যেহেতু ক্লাবে যাওয়াটাই উদ্দেশ্য ছিল তাই হোটেলটা বুক করা হয়েছিল বাসস্ট্যান্ড থেকে বেশ খানিকটা দূরে ক্লাবের কাছে।  উবেরও পাওয়া গেল না। এখানে আমাদের বাঁচিয়ে দিল সিটিম্যাপার। প্রথমে দেখে নিলাম কোথা থেকে বাস পাচ্ছি হোটেলের জন্য। পিকাডেলি গার্ডেন্সের বাসের ড্রাইভার জানালো যে কীসব কাজ চলছে বলে বাস পুরোটা যাবে না, শেষে প্রায় আধ ঘন্টা হাঁটতে হবে। সারাদিন ঘুরে তখন শরীর আর চলছে না। কপালজোরে সিটিম্যাপার দেখিয়ে দিল যে মাঝের একটা স্টপে নামলে একটা অন্য রাস্তা দিয়ে পনেরো মিনিট হাঁটলেই পৌঁছে যাবো। সুতরাং সেটাই করা হল। যদিও সেটুকু হাঁটতেও শ্রেয়সী ঝামেলা করছিল। অত রাত্তিরে টেম্পারেচারও কমে গেছিল অনেকটা।
 যাইহোক রাস্তাতেই একটা সুপার মার্কেট থেকে প্যাকড ইন্ডিয়ান স্টাইল চিকেন কারি আর রাইস কিনে নিলাম। ওটা না পেলে রাত্তিরে বিস্কুট খেয়েই কাটাতে হত। হোটেলে ঢুকে চটপট এন্ট্রি করে ঘরে চলে গেলাম। শুয়েও পড়লাম তাড়াতাড়ি। 

Saturday, October 27, 2018

লন্ডনে লণ্ডভণ্ড - ৫


~~ইতিহাসের বুকে~~

তৃতীয়দিন আমাদের প্ল্যান ছিল সারাদিনের স্টোনহেঞ্জ এবং বাথ ট্যুর স্টোনহেঞ্জ সম্বন্ধে মোটামুটি সবাই জানেন প্রায় সাড়ে চার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে ঐ অঞ্চলে জনবসতি ছিল এবং সেটার চিহ্ন হিসেবেই সেখানে বেশ কিছু পাথরের স্তম্ভ আজও দাঁড়িয়ে আছে। সেগুলোউচ্চতা প্রায় ১৩ ফুট এবং এক একটার ওজন প্রায় ২৫ টন। এখনও অবধি ঐতিহাসিকরা ঠিক ধরে উঠতে পারেননি যে ঐ জনবসতিতে এই পাথরগুলোর ভূমিকা কী ছিল। তবে অনেকেই মনে করেন ওটা ছিল সে সময়কার অধিবাসীদের উপাসনাস্থান।
বাথ শহরটা অতটা পুরনো না হলেও এই শহরে যখন রোমানরা এসে বিভিন্ন স্নানাগার তৈরি করেন সেই সময়টা হল মোটামুটি ৬০-১০০ খ্রীষ্টাব্দ। সারাদিনও ঘোরা যায় তবে মোটামুটি প্রধান জায়গাগুলো দেখার জন্য কয়েক ঘন্টাই যথেষ্ট।
আমরা কলকাতায় বসেই অনলাইন অ্যান্ডারসন ট্যুরসের (https://andersontours.co.uk/index.php) সাইটে গিয়ে আমাদের দুজনের ট্যুর বুক করে ফেলেছিলাম। এক একজনের ৬৯ পাউন্ড। সেই সময়েই আমাদের পছন্দ মত ভিক্টোরিয়া স্টেশানের কাছের পিক আপ পয়েন্ট বেছে নিয়েছিলাম। 

সকাল সাতটায় বাস আসার কথা ছিল। আমরা মিনিট দশেক আগে গিয়ে দাঁড়িয়েছি বাসস্ট্যান্ডে, আর দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই বাস এসে হাজির। আমরা টপাটপ নাম বলে আর টিকিটের প্রিন্ট আউট দেখিয়ে উঠে পড়লাম। ঠিক সাতটাতেই বাস ছাড়ল পরের পিকআপ পয়েন্টের জন্য। লন্ডন থেকে পৌঁছতে মোটামুটি ঘন্টা তিনেক লেগেছিল। যদিও মাঝে একটা ব্রেক ছিল। বাসে তেমন কিছু হয়নি, আমাদের গাইড দিদিমণি প্রত্যেককে একটা ব্রোসিয়ার দিয়েছিলেন যাতে স্টোনহেঞ্জের কোথায় কী আছে সেটার একটা আইডিয়া দেওয়া ছিল। দিদিমণি নিজে মাঝে মধ্যে কোথা দিয়ে যাচ্ছি বা কতক্ষণ বাকি সেইসব বলছিলেন কিন্তু গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে যাওয়ার সময় যেরকম আমাদের গাইড অনর্গল বকে গেছিল ইনি অত কথা বলার দিকে যাননি। শেষের দিকে গিয়ে দেখি দুদিকেই পুরো সবুজ মাঠ। তা শেষ অবধি বাস এক জায়গায় গিয়ে থামল। সেখানে স্টোনহেঞ্জের টিকিটিও দেখা যাচ্ছে না।
দিদিমণির কথা শুনে বুঝলাম, এরপর দিদিমণি আমাদের সবার টিকিট আর অডিও গাইড নিয়ে আসবেন। তারপর সেই টিকিট দেখিয়ে আরো একটা বাসে করে দুই কিলোমিটার মত গেলে তবে দেখা যাবে স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলো। হেঁটে যাওয়ারও সুযোগ ছিল কিন্তু ওই চড়া রোদে আর হাঁটতে ইচ্ছে করল না। বরং মিনিট পনেরো লাইন দিয়ে তিন নম্বর বাসে চড়ে চলে এলাম স্টোনহেঞ্জের সামনে। শেষে ২০০-৩০০ মিটার হাঁটা। বাস থেকে নেমে পদব্রজে চললাম স্টোনহেঞ্জের দিকে।
যথারীতি দেশ বিদেশের বিভিন্ন লোক উপস্থিত। পাথরগুলোকে চারদিকে কিছুটা জায়গা ঘিরে রাখা হয়েছে কারণ দর্শকরা স্টোনহেঞ্জে চড়ে ছবি তুলতে শুরু করলে সেটা পাথরগুলোর স্বাস্থ্যের জন্য ঠিক সুবিধার হবে না। ঘিরে রাখা বলতে ঐ ফুট খানেক উঁচু লোহার রডে লোহারি শিকল মত দেওয়া। সেটা টপকানো কোন বড় ব্যাপার নয়। কিন্তু কেউই সেগুলো টপকে স্টোনহেঞ্জের দিকে ছুটে যাচ্ছে না, বা পুলিশ ধরলে “একটু গেছি তো কী হয়েছে!” জাতীয় এঁড়ে তর্ক করছে না (অক্টোবারে হ্যাপি ভ্যালি চা বাগানে গিয়ে এটা দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল) দেখে বেশ হতাশ হলাম।
পাথরগুলো দেখে অবশ্য ব্যাপারটার প্রাচীনত্বর দিকটা ভেবে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল। আর পাথরগুলোর অবস্থান দেখেও পুজো করার জায়গাই মনে হল। কিন্তু ঐ ধূধূ মাঠের মধ্যে ঐ গোদা পাথরগুলো কী করে নিয়ে এসেছিল সেটা সত্যিই ভাবার বিষয়! গ্রহান্তর ইত্যাদি সম্ভাবনাগুলো উড়িয়ে দেওয়া যায় না!
স্টোনহেঞ্জের পর আমাদের গন্তব্য ছিল রোমান শহর বাথ। সেটাও ঐ ঘন্টা খানেকের রাস্তা সবুজ ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে। বাথের সিটি সেন্টারে ‘দ্য হান্টসম্যান’ রেস্তোরার সামনে আমাদের বাস নামিয়ে দিল। সেখানে আবার ঘন্টা দুয়েক ফ্রি টাইম। বাথের কিছু কিছু বাড়ির স্থাপত্য দেখার মত। রোমান বাথের ভেতরের কাজ, বিভিন্ন মূর্তি আর মিউজিয়ামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আধুনিক অডিও ভিশুয়াল প্রেসেন্টেশান। পুরনো স্নানের জায়গাকে সাজিয়ে গুছিয়ে প্রোজেক্টারের সাহায্যে কিছু অভিনেতাকে ব্যবহার করে সেই সময়ের ছবি ফুটিয়ে তুলছে দর্শকদের জন্য। এই ব্যাপারটা সত্যিই ভালো লেগেছে। আরো কয়েক জায়গায় এগুলো দেখেছিলাম, সেগুলো যথাস্থানে বলব।
বাথ শহরের একটা বড় আকর্ষণ হল স্যালি লুনের বান বা মিষ্টি পাঁউরুটি। স্যালি লুনের ইটিং হাউসের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৬৮০ সালে! ব্যাপারটা বুঝছেন? ইংল্যান্ডের রাজা তখন দ্বিতীয় চার্লস!  ইংল্যান্ডের বিভিন্ন জাহাজ তখন সমুদ্রে ঘুরে ঘুরে জলদস্যু শিকার করে বেরাচ্ছে! জব চার্নকের জাহাজ সুতানুটির ঘাটে ভিড়তে তখনো দশ বছর বাকি!
বাড়িটার গায়ে আবার লেখা সেটা বাথের প্রাচীনতম বাড়ি। এই সেদিনই মানে ১৪৮২ সালে তৈরি। যাইহোক আমাদের শেষ আধ ঘন্টা স্যালি লুনের চমৎকার বান আর কফি খেয়েই কাটল। দোকানটা প্রাচীন হতে পারে, বানগুলো কিন্তু একদম টাটকা ছিল!

Saturday, October 6, 2018

লন্ডনে লণ্ডভণ্ড - ৪


~~ হঠাৎ রাণীর বাড়ি ~~

দিনের শুরুতেই একটু ঝামেলা হয়ে গেল। যাওয়ার কথা ছিল লন্ডনের দক্ষিণ দিকে ঐতিহাসিক কেন্সিংটন ওভাল মাঠে। সেইমত সিটিম্যাপার দেখে বুঝলাম যে, বাসে করে একটা বিশেষ স্টপ অবধি গিয়ে তারপর কিছুটা হাঁটতে হবে। সেইমত বাসেও উঠেছি তারপর ট্র্যাভেল কার্ড টাচ করাতে গিয়ে দেখি আমার কার্ড চললেও শ্রেয়সীর কার্ডে পয়সা নেই। তখন বোঝা গেল যে, আগেরদিন শেষবার মেট্রো থেকে বেরোবার সময় ঠিক করে সোয়াইপ না করায় কার্ডের পুরো টাকাটাই চলে গেছে। ড্রাইভারকে পয়সা দিতে গেলাম, সে গম্ভীর হয়ে না বলে বাস চালিয়ে দিল। আমরা আর কী করি বোকার মত পেছনে গিয়ে বসলাম। তার মধ্যে আমার চোখে পড়ল যে, বিনা পয়সায় যাত্রা করে ধরা পড়লে তার জরিমানা মাত্র ৮০ পাউন্ড! সেইসব দেখে শ্রেয়সীর দোষারোপ শুনতে শুনতে হঠাৎ বুঝতে পারলাম আমরা আমাদের গন্তব্য স্টপ ছাড়িয়ে চলে গেছি। টুক করে পরের স্টপে নেমে মুশকিলে পড়লাম। চারদিকে কোথাও ঐ ট্রাভেল কার্ড টপ-আপ করার কিছু ছিল না। সুতরাং ম্যাপ দেখে হাঁটা শুরু হল। এইভাবে প্রায় আধ ঘন্টা হেঁটে, কখোন ভুল দিকে গিয়ে, টেমসের ওপরে ব্রিজ টপকে যতক্ষণে হবস গেট দিয়ে ঢুকে রিসেপশানে পৌঁছলাম তার পনেরো মিনিট আগেই ট্যুর শুরু হয়ে গেছে।
যাই হোক, রিসেপশানের লোকটি ভালোই ছিলেন। তিনি নিজেই আমাদের নিয়ে গেলেন ট্যুরগ্রুপের কাছে। তাঁদের ততক্ষণে ওভালের লাইব্রেরি দেখা হয়ে গেছে। আমরা গিয়ে তাঁদের দলে ভিড়ে গেলাম। রিসেপশানের ভদ্রলোক বলে রাখলেন যে, পুরো ট্যুর হয়ে যাওয়ার পর আমাদের ইচ্ছে থাকলে উনি আমাদের লাইব্রেরিটা দেখিয়ে দেবেন।
অতঃপর, ওভালের স্টেডিয়ামের বিভিন্ন আনাচেকানাচে ঘোরা হল। ঐতিহাসিক ব্র্যাডম্যান গেট, ১৫০ বছর উপলক্ষে বিশেষ ঘড়ী, মাঠের পাশের সেই গ্যাসহোল্ডার দেখলাম সবই। তার সঙ্গে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার গল্প, সব মিলিয়ে লর্ডস ট্যুরের চেয়ে ওভাল ট্যুর বেশী ভালো লেগেছিল আমাদের। আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়ে বিবিসি এবং স্কাইয়ের রেকর্ডিং বক্সে। সেখানে যে চেয়ারে বসে ম্যাচের শুরুতে বা ব্রেকের সময় আলোচনা করেন নাসের হুসেন বা ডেভিড গাওয়াররা সে চেয়ারে বসার সুযোগও জুটে গেছিল।  অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমের একটা মজার জিনিস হল দেওয়ালের গায়ে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের সাক্ষর। সেখানে খুঁজে খুঁজে রাহুল, কোহলি, পুজারাদের খুঁজে পাওয়া গেল।

ঐ রিসেপশানের ভদ্রলোকও আমাদের সঙ্গেই ঘুরছিলেন। ট্যুর শেষে তাঁকে মনে করিয়ে দিলাম আমাদের লাইব্রেরি ট্যুরের কথা। ভদ্রলোক মিনিট দশেক টাইম চেয়ে নিলেন। কিছুই না, ওভালের স্যুভেনির স্টোরটা খুলেছেন। যদি কেউ কিছু কেনে। সেখানে একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল।
আমি আর শ্রেয়সী দোকানের মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আরো দু-একজন কেনাকাটা করছে। এমন সময় একটি লোক এসে হাজির। তিনি আমাদের ট্যুরগ্রুপে ছিলেন না। বাইরে থেকে এসেছিলেন, এসে মোজা খোঁজ করলেন। তাঁকে জানানো হল যে মোজা নেই। যখন চলে যাচ্ছেন তখন আমার কী মনে হল, গিয়ে বললাম, “Excuse me, are you Mohammad Ashraful?”
“Ji…”
“ওহ দাদা, আপনি এখানে!”
“আপনে কি বাংলাদেশ থেকে?”
“না না, আমরা ইন্ডিয়া থেকে। তবে আপনাকে চিনি।”
আরো টুকটাক কথা হল। বলল, লন্ডনে নাকি ছুটি কাটাচ্ছে। আশরাফুলের সঙ্গী ভদ্রলোক ছবি তুলে দিলেন। অটোগ্রাফ নেওয়াও হল। পরে শ্রেয়সীর কাছে শুনলাম যে, ও যখন পেন নিতে গেছিল ঐ রিসেপশানের লোকটি নাকি জিজ্ঞেস করেন, “Who is he?” আশরাফুল শোনার পর তাঁর বক্তব্য, “What a fool I am” পরে উনি নিজে গিয়েও কথা বলেছিলেন।
এইসব করে আমরা গেলাম ওভালের লাইব্রেরিতে। ভেতরে একটা ঘরে প্রায় চার দেওয়াল জোড়া ছাদ সমান আলমারি ভর্তি ক্রিকেটের বই, একটা আলমারিতে শুধুই উইজডেন অ্যালামন্যাক। এরকম লোভ খুব কম হয়েছিল। যাই হোক সেটার লাগোয়া ঘরটি আরো ভালো। বিভিন্ন মেমেন্টোতে ভর্তি, দেওয়ালে দ্রুষ্পাপ্য ছবি, খবরের কাগজের কার্টুন, আলমারিতে বিভিন্ন ম্যাচের স্মৃতিতে রাখা ব্যাট, বল, সরঞ্জাম। একটি বহু পুরনো লোহার ২২ গজ মাপার দড়ি। তার সঙ্গে সঙ্গে ঐ ভদ্রলোকের সঙ্গে ক্রিকেট আর সারের পুরনো খেলোয়াড়দের নিয়ে আলোচনা। এসবে খুশি হয়েই বিশেষ করে কেন ব্যারিংটনের প্রসঙ্গে ওনার টেস্ট ব্যাটিং গড় ৫৮ বলে দেওয়ায় ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে নিয়ে গিয়ে আরো কিছু বিশেষ জায়গা ঘুরিয়ে দেখালেন। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের লাঞ্চ করার জায়গা। সেখানে আবার জ্যাক হবসের শততম ফার্স্ট ক্লাস শতরান উপলক্ষে বিশেষ একটি প্লেক রাখা আছে। তার সঙ্গে শ্রেয়সীকে দিলেন নিজের ফোনে সেভ করে রাখা রাহুল দ্রাভিডের একটি বিশেষ ছবি, ওনার নিজের সংগ্রহ থেকে।
ওভালের এই অসাধারণ অভিজ্ঞতার পুরো কৃতিত্বই অবশ্য শ্রেয়সী নিয়ে গেল। বলল, “দেখলে! আমার জন্য দেরি হল বলেই তো এরকম স্পেশাল প্রাইভেট ট্যুর পেয়ে গেলে!”
বিধিসম্মত সতর্কীকরণঃ ভবিষ্যতে আপনারাও এই ধরনের বিশেষ অভিজ্ঞতার জন্য দেরি করতে হলে নিজ দায়িত্বে করবেন।

ওভালের ঘোরাঘুরির পর খিদে পেয়েছিল। ভক্সহল ব্রিজের কাছে একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ঢুকে ব্রিটিশ স্টাইলে চিকেন আলা কিভ আর ফিস অ্যান্ড চিপ্স খাওয়া হল। তারপর সাবওয়েতে ঢুকে কার্ডে টাকা ভরিয়ে আমরা চলে গেলাম সাউথ কেন্সিংটন স্টেশানে। উদ্দেশ্য ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম এবং ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে যাওয়া। দুটোই বেশ ভালো লেগেছিল।
দুটোই বেশ বড় মিউজিয়াম, সুতরাং আমরা সময়ের অভাবে পুরোটা দেখে উঠতে পারিনি। ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের প্রাণীতত্ত্ব আর ডাইনোসর বিভাগটা দেখেছিলাম ভালো করে। প্রচুর ফসিল তো আছেই তার সঙ্গে আছে প্রচুর নোটস এবং অডিও-ভিসুয়াল মাধ্যমে দেওয়া প্রচুর তথ্য। বাচ্চাদের মনের মত জিনিস। সঙ্গে একটা বিশাল বড় টাইর‍্যানোসরাস রেক্সের মুভিং মডেল।

ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড অ্যালবার্ট মিউজিয়ামে আরো একটু বেশী সময় ছিলাম। দেখেছি বিভিন্ন দেশের বহু ঐতিহাসিক জিনিস। মূর্তি, ছবি, গ্লাস পেন্টিং, ফ্রেস্কো। সব জিনিসের লিস্ট দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু বলে রাখি এই মিউজিয়ামের মোট গ্যালারীর সংখ্যা ১৪৫ এবং মোট দ্রষ্টব্যের সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ! তার মধ্যেও ব্রিটিশ এবং রোমান গ্যালারিগুলো মনে আছে। আর মনে আছে মিউজিয়ামের পেছনের বাগানটা। যাই হোক সেসব দেখে এবং ছবি তুলে আবার সাবওয়েতে ঢুকে টিউব নিয়ে আমরা এলাম পিকাডিলি সার্কাস বা ফেলুদার ভাষায় পিকলি সার্কাসে।
সেখানে রাস্তার মধ্যিখানে আন্টেরসের মূর্তি আর ফোয়ারার নিচের ধাপে বসা হল। চারদিকে বিভিন্ন দেশের মানুষ! কেউ আড্ডা মারছে, কেউ নিজের মোবাইলে ব্যস্ত, কেউ ছবি তুলছে ঘুরে ঘুরে, কেউ আবার অনেক ঘোরার পরে শুধুই বসে আছে। হঠাৎ দুটো বাচ্চা ছুটে চলে এল, তাদের হাসি আর চিৎকারে জমে উঠল জায়গাটা। অনেকদিন পর দেখা হল দুই বন্ধুর! তাদের হাসি আর টুকরো টুকরো কথা! আবার কয়েকজন বসেছে তাদের গিটার নিয়ে। গান শুনিয়ে যেটুকু পাওয়া যায়! সব মিলিয়ে আদর্শ ল্যাদের পরিবেশ। সামনে একটি মহিলা স্ট্যাচু সেজে দাঁড়িয়েছিল। সেটা বেশ মজার জিনিস। লন্ডনের অনেক জায়গাতেই এটা দেখলাম। 
দোকানপাটের বিবরণ আর কী দেব। কতরকমের যেসব দোকান! আবার পাশেই ১৮৭৪ সালে তৈরি হওয়া ক্রাইটেরিয়ান থিয়েটার। কিছুক্ষণ সেখানে বসে এবং জনসমুদ্র দেখে, একটা ক্যাফেতে রাতের খাবার খেয়ে ম্যাপ দেখে আমরা গ্রীন পার্কের মধ্যে দিয়ে শর্টকাট খুঁজে হাঁটা লাগালাম পাবলাভের দিকে। এখানেই একটা মজা হয়েছিল।
সন্ধ্যেবেলা গ্রীন পার্ক, ভালোই লোকজন ছিল। তার মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমি আর শ্রেয়সী ঠিক করলাম আমাদের বন্ধু কৌশিক আর ওর বউ অপরূপাকে ফোন করে একটূ গল্প করব। সেই মত ভিডিওকল করা হল। দেশে তখন রাত সাড়ে বারোটা মত বাজে। দিব্যি আড্ডা হচ্ছে। আমরা কৌশিকদের এখানকার সুন্দর সুন্দর প্যালেসের মত বাড়ীগুলোর কথা বলছি। মাঝে মাঝে ক্যামেরা ঘুরিয়ে পার্কটা দেখাচ্ছি। এসব করতে করতে পার্কের প্রায় অন্যপ্রান্তে পৌঁছে দেখি সামনেই একটা বেশ বড় দারুণ দেখতে বাড়ী। আমি কৌশিককে বললাম, “দাঁড়া, সামনে আরো একটা বেশ বড় বাড়ী দেখতে পাচ্ছি, কী জানি না, তোদের দেখাই!” এই বলে ক্যামেরা ঘুরিয়ে বাড়ীর সামনে এসে দেখলাম শুধু বাড়ী নয়, সেটা ঘিরে পাঁচিল, তার সামনে একটা বেশ উঠোনের মত জায়গা, সেটার সামনে আরো একটা বেশ বড় ফোয়ারা আর মূর্তি এবং পুরো জায়গাটায় প্রচুর লোক, প্রধানত ট্যুরিস্ট। তখন ভালো করে দেখে ওদের বললাম, “ওরে এটা যেকোন বাড়ী নয়। এটাই হল বাকিংহাম প্যালেস! মানে যাকে বলে রাণীর বাড়ী!

ভিডিওকলে ওদের ভালো করে বাকিংহাম প্যালেস দেখিয়ে আমরা আরো কিছুক্ষণ ওখানে ঘোরাঘুরি করলাম। এটা যে পাবলাভের খুব কাছেই সেটা জানতাম কিন্তু প্ল্যান ছিল পরে একদিন আসার। শেষ অবধি বোধহয় বার চারেক আসা হয়েছিল বাকিংহাম প্যালেসের সামনে। প্যালেসের চেয়েও সামনের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মূর্তিগুলো বেশী ভালো লেগেছিল। হ্যাঁ লন্ডনেও একটা ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল আছে! পুরো মনুমেন্টের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে একটা সোনালী পরী আর ভিক্টোরিয়ার মূর্তিটা তো পুরো কলকাতায় যেটা আছে সেটারই কপি!

"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”