Showing posts with label Darjeeling. Show all posts
Showing posts with label Darjeeling. Show all posts

Wednesday, January 7, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ২


দার্জিলিং-২
দার্জিলিং জমজমাট

রক গার্ডেনের পর আমাদের গন্তব্য ছিল পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিকাল পার্ক এবং হিমালয়ান মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউট। একই ক্যাম্পাসের মধ্যে পাশাপাশি এই চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম এবং সেই সঙ্গে পর্বতারোহণ শেখার স্কুল। চিড়িয়াখানাটা সত্যিই ভাল, বিভিন্ন পাহাড়ি ছাগল, হরিণ, ইয়াক, ভাল্লুক, বিভিন্ন ধরনের লেপার্ড, বাঘ এবং অবশ্যই বিরল প্রজাতির লাল পান্ডা এবং নানা ধরনের পাখী এই চিড়িয়াখানার বাসিন্দা। তাদের এবং তাদের সঙ্গে আমাদেরও প্রচুর ছবি তোলা হল।
এভারেস্ট মিউজিয়ামটাও বেশ ভাল, যত্নের ছাপ সর্বত্র। তেনজিং নোরগে ও অন্যান্য পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত পোশাক, সরঞ্জাম, গাঁইতি, তাঁবু এসব দেখার মধ্যে সত্যিই একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে আছে হিমালয়ের বিভিন্ন মডেল ছাড়াও পাহাড়ের বুকে পাওয়া বিভিন্ন পাখী, সাপ ও অন্যান্য মৃত জন্তুদের স্টাফড দেহ।
তবে শুধু জন্তু জানোয়ার নয় ওখানে গিয়েই আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মানুষটির সঙ্গে। তাঁর নাম রূপেন। পাহাড়ি লোকটি ছিলেন চিড়িয়াখানা এবং মিউজিয়ামে আমাদের গাইড। বেশ জ্ঞানী এবং মিশুকে লোক এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই ফটো তলায় তাঁর খুব উৎসাহ। মাঝে মাঝে তিনি আমার ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে আমার এবং পিউয়ের বেশ কিছু ন্যাচারাল ছবি এবং পশুপাখীদের ছবি তুলে ফেলেছিলেন। এরপর মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউটের কাছে এসে তিনি একটু বেশীই উৎসাহিত হয়ে পড়েন। দেওয়ালে করা পর্বতারোহণের একটি মুরালের সামনে তিনি আমার আর পিউয়ের নীচের ছবিটি তোলেন এবং তারপর মন্তব্য করেন, “এই দেখুন, তেনজিং নোরগে ছন্দা গায়েনকে পাহাড়ে উঠতে হেল্প করছেন!”

এর কিছুটা পর হঠাৎ একটা গাছের সামনে এসে ভদ্রলোক দাবী করলেন যে, আমাকে ঐ গাছটায় উঠতে হবে এবং তিনি সেটার ছবি তুলবেন। অনেক বুঝিয়েও যখন তাঁকে নিরস্ত করা গেল না তখন বাধ্য হয়েই দুরু দুরু বক্ষে আমাকে সেই শ্যাওলাধরা গাছে উঠতে হল এবং সেই প্রচণ্ড নার্ভাসনেসকে ঢেকে দেওয়ার জন্য মুখে একটা বীরের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হল আর ভদ্রলোক পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললেন।
মিউজিয়াম দেখে আমরা যখন আবার চিড়িয়াখানা ফিরে এলাম ততক্ষণে আমি আমার ক্যামেরার ওপর থেকে আমার সমস্ত দাবী প্রত্যাহার করে নিয়েছি। সেটা রূপেনের কাছেই আছে এবং সেই দিয়ে তিনি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, লেপার্ডের খাঁচায় প্রায় ঢুকে পড়ে আমাকে ছবি তুলে এনে দিচ্ছেন।
তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রানিং কমেন্ট্রি চলছে অবশ্য, যেমন বাঘের খাঁচায় দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রারত বাঘটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, “ইসকা নাম হ্যায় সৌরভ গাঙ্গুলী, বেঙ্গল টাইগার!”
ভদ্রলোক বোধহয় ‘গুণ্ডা’ দেখেননি নাহলে জানতেন যে পৃথিবীতে বেঙ্গল টাইগার বলতে মিঠুনদাকেও ডাকা হয়!
ভাল্লুকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে ছবিও হল রূপেনের খেয়ালে। তবে রূপেন সবচেয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল লাল পান্ডার ছবি তুলতে গিয়ে। লাল পান্ডা বিরল প্রাজাতির অত্যন্ত অলস একটি প্রানী। আমরা যেটিকে দেখেছিলাম সেটি একটি গাছের ডালে বসে ছিল। আমরা যখন তার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম তখন সে মুখ তুলে আমাদের দেখছিল কিন্তু তারপর বোধহয় সে বোর হয়ে গিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়েই পড়ল। মাঝে আমাদের দেখে একবার মাথা তুলেছিল কিন্তু ওইটুকুই। তাও পরে হোটেলে ফিরে দেখলাম রূপেন ঐ লাল পান্ডাটির পনেরো খানা ছবি তুলেছে যার অন্তত বারোটা ছবির ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই!

কিন্তু এসব সত্ত্বেও বলতেই হবে যে রূপেন দেখিয়েছিল খুব ভালো করে, আর আপনারা ওখানে গেলে ওকে গাইড নিলে খুব একটা ঠকবেন না।
চিড়িয়াখানা থেকে আমরা গেলাম একটা চা-বাগানে যেটার নাম আমার মনে নেই। তবে সেখানে থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম, তার সঙ্গে লেবং রেসকোর্সেরও ছবি তোলা হল। চা বাগানের লাগোয়া দোকানে চা খাওয়া হল সঙ্গে ঐ বাগানের চা-পাতা কেনাও হল। ভালোই!
সেখান থেকে আমরা গেলাম শহরের আর-এক চত্বরে জাপানী মন্দির আর পিস্‌ প্যাগোডা দেখতে। রাস্তায় আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার বিকাশ সেন্ট পলস্‌ স্কুল দেখিয়ে দিল যেখানে ‘ম্যায় হুঁ না’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল! শান্তি স্তুপ দেখে ভালই লাগলো যদিও ঐ ধরণের স্তুপ আমি আগে রাজগীরেও দেখেছি। তবে স্তুপের দেওয়ালের কিছু কিছু কাজ সত্যিই বেশ ভালো এবং যথারীতি ঐ স্তুপের ওপরে উঠলেও দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
শান্তি স্তুপ ছিল সেদিনকার মত শেষ ঘোরার জায়গা। তারপর বিকাশ আমাদের দার্জিলিং চৌরাস্তায় ঠিক কেভেনটার্সের সামনে নামিয়ে দিয়ে, “কাল আবার দেখা হবে বলে” কেটে পড়ল। বিকাশকে আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেছিল তাই পরের দিন ওর গাড়ীতেই মিরিক যাওয়া হবে বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম।
সারাদিন ঘুরে খিদে তো পেয়েইছিল তাছাড়াও আমাদের দুজনের জন্যেই কেভেনটার্স ছিল অবশ্য দ্রাষ্টব্য। একদিকে আমি ভাবছি ওখানে ফেলুদা সেই কোন ছোট্টবেলায় তোপসেকে নিয়ে গেছিল আর অন্যদিকে পিউ ভাবছে ওখানেই রণবীর কাপুর থুড়ি বরফি শ্রুতিকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। পিউ এটাও আশা করেছিল যে ওর জন্যও কেউ ক্লক টাওয়ারে চড়ে হাত-পা নাড়বে তবে আমি অবশ্যই সে রিস্ক নিইনি। অত পুরনো ক্লক টাওয়ার, ধসে গেলে দেখবে কে!
কেভেন্টার্সে গিয়ে আমার ক্যামেরা হারাল। মানে হঠাৎ দেখলাম আমার সঙ্গের ব্যাগে আমার ক্যামেরা নেই। খাওয়া মাথায় উঠল! ব্যাগের সব জিনিস বের করে বার দুয়েক ঘেঁটেও যখন পাওয়া গেল না তখন বিকাশকে ফোন করা হল, তার গাড়ীতে পড়ে আছে কিনা জানার জন্য। সেও ‘দেখে দু মিনিট পর ফোন করছি’ বলে ফোনটা দিল কেটে। সে এক অসহ্য দু মিনিট! যাই হোক দ্বিতীয়বার তাকে ফোন করে জানা গেল যে ক্যামেরা তার গাড়ীতেই আছে এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে নিজে কেভেনটার্সের দোতলায় এসে ক্যামেরা দিয়ে গেল।
ক্যামেরা পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেল আমাদের। সকালের সেই ব্রেকফাস্টের পর থেকে কিছু না খেয়েই ঘুরছি। সুতরাং দু প্লেট চিকেন স্যান্ডুইচার সঙ্গে দু প্লেট অমলেট এবং বেকন অর্ডার হয়ে গেল প্রথমেই। সঙ্গে কফি। তারপর আরো দু প্লেট হ্যাম স্যান্ডউইচ খাওয়ার পর আমাদের আত্মা সন্তুষ্ট হল। খাওয়ার আসার ফাঁকে মনের সুখে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম। পিউ একগাদা সেলফি তুলল, পাশের টেবিলের একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে গল্প করল আর ওখানকার কর্মচারীদের মধ্যে কাকে কাকে বরফি সিনেমায় দেখিয়েছে সেই নিয়ে গবেষণা করল।
আধ ঘন্টা পরে যখন আমরা কেভেন্টার্স থেকে মৌরি চিবোতে চিবোতে বেরোলাম তখন আমাদের পেট ভর্তি, মন প্রসন্ন! অতঃপর শুরু হল দার্জিলিং-এর শেষ বিকেলের মিঠে রোদে আমাদের উদ্দেশ্যহীন পদচারণা।
এই দোকান, সেই দোকান... কোনটা কিউরিও শপ তো কোনটা কেকের দোকান, আর গরম কাপড়ের দোকান তো আছেই। ঘোরাই আসল, তার সঙ্গে যদি কোন জ্যাকেট পছন্দ হয় এবং পছন্দমত সস্তা দামে পাওয়া যায় তাহলে কেনেকাটাও হবে। জ্যাকেট যদিও হল না কিন্তু বেশ কয়েকটা কিউরিও শপ ঘুরে শেষ অবধি ‘নেপাল কিউরিও শপ’ (হুঁ হুঁ বাওয়া! ফেলুদা ওখানেই গেছিল) থেকে আমি আমার জন্য একটা ইয়াকের হার দিয়ে বানানো তিব্বতী ধাঁচের গনেশ, বন্ধু মৃন্ময়ের জন্য জপযন্ত্র (যার ভেতরে মন্ত্র লেখা কাগজ আছে কিনা দেখে নিয়েছিলাম), বাবার জন্য ছোট্ট ভোজালীর মত দেখতে পেপার নাইফ... এইসব কিনে ফেললাম। জিনিসপত্র কিনতে কিনতে এবং আরো অনেক রকমের ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ম্যালে।
দার্জিলিং-এর ম্যাল আমার খুব পছন্দ হয়েছে। সুন্দর ছড়ানো একটা জায়গা। একদিকে ক্রিসমাস উপলক্ষে বানানো একটা স্টেজের ওপর বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে, অন্যদিকে পরপর পুরনো পুরনো চায়ের দোকান। জায়গায় জায়গায় বেঞ্চ পাতা আছে যেখানে বসে আড্ডা মারা যায়। আবার চাইলে কোন চায়ের দোকানে ঢুকে পৃথিবীবিখ্যাত কোন চায়ের কাপে চুমুক মারাও যায়। ফেলুদা মকাইবাড়ির চা ফ্রি-তে পেত। আমরা না হয় পাই না কিন্তু তাই বলে খাব না তা কি হতে পারে! সুতরাং আমরা দুজনে গোল্ডেনটিপসে ঢুকে পড়ে দু কাপ মকাইবাড়ির চা অর্ডার দিয়ে দিলাম। একটু পরেই দুটো বেশ বড় কাপে প্রায় কমলা রঙের সেই মহার্ঘ্য পানীয় এল। আমরা দুজনে খেলাম এবং দুঃখের বিষয় তেমন কিছুই আলাদা করে বুঝলাম না! বেরসিক আর কাকে বলে!
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকেই ঠাণ্ডাটা বেশ তাড়াতাড়িই বাড়ছিল। সেই শীত উপেক্ষা করেই ঘুরছিলাম তবে সাড়ে ছটা নাগাদ রণে ভঙ্গ দিলাম। চৌরাস্তায় এসে একটা গাড়ি নিয়ে নিলাম আমাদের হোটেলে পৌঁছনোর জন্য। আমাদের হোটেল মানে পাহাড়ী সোলের ঘরোয়া ব্যবহার এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ ভিউয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান যে সমস্যাটি আছে সেটা হল হোটেলটা ম্যাল থেকে প্রায় পাঁচ-ছ কিলোমিটার দূরে। তাই রীতিমত ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে হোটেলে ফিরতে হল। হোটেলে ফিরে সোজা লেপের তলায়। তার আগে ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম, দু বাটি চিকেন থুকপা, আমার এবং পিউয়ের জন্য। ঐ কনকনে ঠান্ডার মধ্যে এর থেকে ভালো খাবার আর হয় না।
শুয়েও পড়লাম তাড়াতাড়ি। কাল পঁচিশে ডিসেম্বর, বড়দিন। দার্জিলিং দেখা শেষ তাই আমাদের কালকের প্ল্যান মিরিক যাওয়া আর সঙ্গে সামান্য বিদেশ ভ্রমণ, যদিও বিনা পাসপোর্টে!
(চলবে)

Monday, January 5, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ১

সবাইকে ২০১৫ সালের শুভ নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। নতুন বছরের প্রথম পোস্ট, স্পেশাল তো বটেই। আর শুধু তাই নয়, এটা আমার ব্লগের শততম পোস্টও বটে। যাকে বলে শতবার্ষিকী পোস্ট বা পঁচিশ টাকার পোস্ট (শত বার সিকি = ২৫ টাকা)। পিজের জন্য দুঃখিত, তবে সব সময় তো আর লোভ সামলানো যায় না!
--------------------------------------------------------------------------------------

ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যানটা বানানো হয়েছিল সেই সেপ্টেম্বর মাসে। প্রথমে যেটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী বাগবিতণ্ডা হয়েছিল তা হল গন্তব্যস্থান! উত্তর ভারত না উত্তর বঙ্গ, সেটাই ছিল প্রশ্ন। একদিকে সিমলা, কুলু, মানালি এবং জিম করবেট ন্যাশানাল পার্ক আর অন্যদিকে দার্জিলিং, কালিম্পং আর গরুমারা, জলদাপাড়ার ন্যাশানাল পার্ক।
শেষ অবধি ডিসেম্বর মাসে উত্তর ভারতের কুখ্যাত কুয়াশার কথা ভেবে আমরা ঐ অপশনটা বাতিলই করে দিলাম। পরে যখন ঘুরতে ঘুরতে মোবাইলে উত্তর ভারতের ঘন কুয়াশায় ট্রেন লেট আর বাতিলের খবরগুলো দেখছিলাম তখন নিজেদের সুবিবেচনার প্রতি শ্রদ্ধা যারপনাই বেড়ে গেছিল।
সুতরাং উত্তর বঙ্গ। ক্যালন্ডার দেখে অফিসে ছুটির প্ল্যান কনফার্ম করার পর ঘোরার দিনগুলো ফাইনাল করলাম। সঙ্গীসাথি বেশী না পাওয়ায় শেষ অবধি গেলাম আমরা দুজনেই। আমি এবং পিউ। সেই ফেসবুক-খ্যাত ভদ্রমহিলা যিনি দয়া করে আমার সহধর্মিনী হয়েছেন গত বছর।
ঘোরার দিন ঠিক হল, অতঃপর ট্রেনের টিকিট কাটা, ইন্টারনেট ঘেঁটে ফেলে বিভিন্ন সাইট থেকে ফিডব্যাক দেখে হোটেল ঠিক করা, অনলাইন বুকিং করা... এসব করতে লেগে গেল দিন দশেক। এই সবের চক্করে ২রা জানুয়ারীর ফেরার টিকিট কাটতে ভুলেই গেছিলাম। যখন মনে পড়ল তখন দোসরার কোন ট্রেনেই টিকিট নেই। সুতরাং দুটো টিকিট কাটা হল। একটা দু তারিখের দার্জিলিং মেলের ওয়েটিং লিস্ট, অন্যটা তিন তারিখের শতাব্দীর কনফার্ম টিকিট, ট্রেনের সময় ভোর ৫:৩৫।
ফেরার ট্রেনের কথা বলে দিলাম বটে তবে আগে বলা উচিত ছিল যাওয়ার কথা লেখা। সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ পরিকল্পনা বলতে গেলে এইরকম...
ডিসেম্বর ২২ – শেয়ালদা স্টেশান থেকে রাত ১১টার পদাতিক এক্সপ্রেসে যাত্রা শুরু
ডিসেম্বর ২৩-২৫ – দার্জিলিং
ডিসেম্বর ২৬ – কালিম্পং
ডিসেম্বর ২৭ – লাভা
ডিসেম্বর ২৮-২৯ – লোলেগাঁও
ডিসেম্বর ৩০ – গরুমারা
ডিসেম্বর ৩১- জানুয়ারী ১ – জলদাপাড়া
জানুয়ারী ২/৩ – ফেরা

আর বেশী ধানাই-পানাই না করে ঘোরার গপ্পগুলোতে চলে যাই। একবারে হয়তো সবগুলো লেখা হবে না, কয়েক খন্ড লেগে যেতে পারে। শুধু দার্জিলিং-য়ের গল্প লিখতেই দুটো পর্ব লেগে যাবে। তাই প্রথম খণ্ড দার্জিলিং-১।


দার্জিলিং-১
শীতল শহরের উষ্ণ মানুষগুলি

নিউ জলপাইগুড়ি অবধি রাতের ট্রেন যাত্রায় সেরকম স্মরনীয় কিছু হয়নি। তবে আমাদের ক্যুপের অন্যান্য সহযাত্রীরা যখন লুচি-আলুরদম দিয়ে নৈশভোজ করছিলেন তখন সেটা দেখে পিউ ফিসফিস করে লুচি-আলরদমের জন্য বায়না ধরেছিল! সুতরাং ওনাদের যদি পরদিন সকালে পৈটিক গোলযোগ ঘটে থাকে তাহলে তার জন্য কে দায়ী ছিল তা আমরা এখন জানি!
এনজেপি স্টেশানে নেমে ‘নিউ সিকিম ট্র্যাভেল’র কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে দার্জিলিং-র জন্য রওনা হলাম। সে যাত্রা খুব একটা সুখপ্রদ হয়নি। আসলে গাড়ির ড্রাইভার লোকটি খুব একটা সুবিধার ছিল না। একটু যেতে না যেতেই গাড়ী গড়বড় করতে লাগল। সেটা ঠিক করতে লাগলো মিনিট চল্লিশেক। তারও কিছুটা পর ড্রাইভারটি আমাদের মিরিক ভ্রমনের প্রস্তাব দিল। অবশ্যই একটু বেশী টাকার বিনিময়ে। এই প্রস্তাব আমরা আগেই পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের প্ল্যান ছিল আগে দার্জিলিং পৌঁছে তারপর যেখানে যাওয়ার যাওয়া যাবে। সেটা মধুরভাবে তাকে জানিয়ে দেওয়ার পরেই তার গাড়ী আবার বিগড়লো। বেশী বর্ণনায় যাচ্ছি না তবে বেশ কিছুটা ঝামেলার পর অন্য একটা সুমোয় আরো কিছু লোকের সঙ্গে আমরা দার্জিলিং-এর পাহাড়ি সোল হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন পাঁচটা বেজে গেছে। অন্ধকার নামছে আস্তে আস্তে, কিন্তু তাতেও হোটেলের বারান্দা থেকে আকাশের গায়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রথম দর্শনে কিন্তু বাধা পড়েনি।
হোটেলে পৌঁছে একটু ধাতস্ত হওয়ার পরেই যেটা অনুভব করলাম তা হল হাড় কাঁপানো শীত। দার্জিলিং ঠান্ডা হবে জানতাম কিন্তু এতটা ঠান্ডা হতে পারে তার ধারনা ছিল না। পিউয়ের ঠান্ডার ধাত আমার চেয়েও বেশী আর তাই রুম হিটার, ইলেকট্রিক কম্বল, লেপ থাকা সত্ত্বেও বেশ ভালোই কাঁপুনি ধরেছিল ওর। প্রথম দিনের টুকটাক গন্ডগোলের পার্ট হিসেবেই হয়তো সন্ধ্যেবেলা বার দুয়েক লোডশেডিং হল, দ্বিতীয়বার প্রায় ঘন্টা খানেকের বেশী। হোটেলের অমৃত বলে একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এরকম লোডশেডিং দার্জিলিং-এ প্রায়ই হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ভ্রমণের বাকি দিনগুলোতে কিন্তু কোথাওই বিদ্যুৎ নিয়ে কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। প্রথম দিন আরো মজা হল রাতের খাবার নিয়ে। তখনও বুঝিনি যে ওসব জায়গায় লোকে কত তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। তাই আমরা যখন ডিনার টাইম বললাম ৯.৩০ তখন অমৃত মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “ইতনা দের তক্‌ ডিনার নেহি মিলেগা সাব”
জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, ঐ হোটেলে ডিনারের টাইম ৭.৩০ থেকে রাত ৯টা অবধি। সেদিন আর বাকি দিনগুলোতে আমরা ডিনার অর্ডার করতাম ৮.৩০ নাগাদ কিন্তু ৮টা বাজতে না বাজতেই ওরা ডিনারের জোগাড়যন্ত্র শুরু করে দিত। আমি প্রথম দিন খেয়েছিলাম চিকেন থালি, যেখানে পিউ নিল থুকপা। থুকপা আর কিছুই নয়, একটা মস্ত বড় বাটিতে স্যুপ, যার মধ্যে চিকেন, নুডলস আর অন্যান্য সবজি দেওয়া। খেতে খুবই ভালো এবং ঠান্ডা জায়গায় খাওয়ার পক্ষে আদর্শ। প্রথম রাত্তিরে বেশ  তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লাম কারণ ততক্ষণে পরের দিনের গাড়ী ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য টাইগার হিল। গাড়ীর সময় ভোর সাড়ে চারটে।
জীবনে প্রথম টাইগার হিলে সানরাইজ দেখার বর্ণনা পড়েছিলাম সেই ছোট্টবেলায় টেনিদার উপন্যাস ‘ঝাউ-বাংলোর রহস্য’ পড়ার সময়। তার পরে আজ অবধি ঐ উপন্যাসটি আরো বার দশেক পড়ার ফলে এখন সে বর্ণনা প্রায় মুখস্ত)

“পরদিন ভোর চারটায় টাইগার হিলে রওনা হলুম আমরা। বাপস্‌, কী ঠাণ্ডা! দার্জিলিঙ ঠাণ্ডায় জমে আছে। ঘুম স্টেশন রাশি রাশি লেপ কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুমে অচেতন। শীতের হাওয়ায় নাক-কান ছিঁড়ে যাওয়ার জোর। ল্যান্ড রোভার গাড়ি, ঢাকাঢাকি বিশেষ নেই, প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি করে উঠল।
টেনিদা চটে বললে- ধুত্তোর ঘোড়ার ডিমের টাইগার হিল। ক্যাবলার বুদ্ধিতে পড়ে যত ভোগান্তি। একেবারে জমিয়ে দিলে।
হাবুল বললে- হ, আমাগো আইসক্রিম বানাইয়া ছাড়ব।
...
তারপর সেই সূর্য উঠল। কেমন উঠল? কী রকম রঙের খেলা দেখা দিল মেঘ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপরে? সে আর আমি বলব না। তোমরা যারা টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখেছ, তারা তো জানোই; যারা দেখোনি, না দেখলে কোনওদিন তা জানতে পারবে না।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক! খালি ক্যামেরার শব্দ। আর চারদিকে শুনতে পাচ্ছি, ‘অপূর্ব! অদ্ভুত! ইউনিক!’
টেনিদা বললে- সত্যি ক্যাবলাকে মাপ করা যেতে পারে। এমন গ্রান্ড সিনারি কোনওদিন দেখিনি।”

প্রতিটা শব্দ মিলে না গেলেও আমাদের অভিজ্ঞতাও ঐ রকমই। গাড়ী এল ভোর সাড়ে চারটের আগেই। আমরাও তিন-চার স্তরে গেঞ্জি, সোয়েটার, জ্যাকেট পরে তৈরি ছিলাম, সঙ্গে টুপি, মাফলার, গ্লাভস... তারপরেও শীত হার মানাচ্ছিল না। কিন্তু অত আগে বেরিয়েও হিলের প্রায় দু কিলোমিটার আগেই গাড়ী থেকে নামতে হল। কারণ তার আগের রাস্তাইয় লাইন দিয়ে গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারলাম যে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখার জন্য লোকে বোধহয় রাত তিনটের সময়ও হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কী, বেশ ভালোই খাটাখাটনি করতে হয়েছে, ঐ পাহাড় বেয়ে ওঠা, কনকনে ঠান্ডার মধ্যে... পিউয়ের প্রায় জিভ বেরিয়ে গেছিল। অতঃপর প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ অপেক্ষার পালা। টাইগার হিলের ওপর তখন প্রায় হাজার দুয়েক লোক, সকলেই মাথা থেকে পা অবধি যতরকম সম্ভব গরম কাপড়ে ঢেকে হাতে স্টিল ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা বা নিদেনপক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে রেডি।

একদিকে সূর্য ওঠার আগের আকাশ আস্তে আস্তে লাল রঙ ধরছে অন্যদিকের আকাশের বুকে জেগে আছে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার আশে পাশের অন্যান্য শৃঙ্গগুলি। শেষ অবধি সূর্য ওঠার পর যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় লাল রঙের টোপর ফুটে উঠল তখন বাকি সবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুখ দিয়েও একটা বিস্ময়সূচক বাঃ বেরিয়ে এলো। ছবি যে কত উঠল সেটা আর গুনে দেখেনি। কিন্তু শুধু হাতের ক্যামেরাতেই নয় মনের ক্যামেরাতেও সেই ছবি রয়ে গেল চিরকাল। আর শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা তো নয় তার পাশের অন্য শৃঙ্গগুলোতেও রঙ ধরল একে একে।
টাইগার হিল থেকে যখন নেমে আসছি তখন ফোনে দেখলাম টেম্পারেচার ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যখন গেছিলাম তখন বোধহয় ২-৩ ডিগ্রী ছিল। ওখান থেকে নেমে হোটেল যাওয়ার আগে আমরা গেলাম বাতাসিয়া লুপ। ফুলের বাগান, স্মৃতিস্তম্ভ আর টয়ট্রেনের লাইন সব একসঙ্গে উপস্থিত বাতাসিয়া লুপে। সেখানেও ছবি তুলে ফেললাম কাঞ্চনজঙ্ঘার। সঙ্গে ভাড়া করা দূরবীনে দেখলাম নাথুলা পাস, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর অন্যান্য শৃঙ্গের ক্লোজআপ... তাও মন্দ লাগলো না। ওখানেই আমি আর কম্পনরতা পিউয়ের কিছু সেলফি নিয়েছিলাম, কিন্তু সেই ছবিগুলো শেয়ার করলে আমার হঠাৎ করে শারীরিক অসুস্থতার কারনে এই ব্লগ লেখা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই সেই ছবি দেওয়া থেকে বিরত রইলাম।
তবে ওখানেই এক পেঁয়াজী বিক্রেতার সঙ্গে পিউয়ের কথপোকথনটা এখানে তুলে দিচ্ছি,
পিউঃ ইঁহা কিতনা ঠান্ড হ্যায়!
বিক্রেতাঃ হাঁ, হাম ভি যাব আয়ে থে তো অ্যায়সা হি লাগতা থা।
পিউঃ আপ কা ঘর কাঁহা হ্যায়?
বিক্রেতাঃ বিহার, কভি কভি যাতে হ্যায় ঘর...
পিউঃ যাতে হ্যায় তো ফির সে আতে কিঁউ হ্যায়? ইতনা ঠান্ড মে ম্যায় একবার যাতি তো লোটকে নেহি আতি!

হোটেলে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে আমরা আবার বেরোলাম দশটা নাগাদ। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল রক গার্ডেন। পাহাড়ের গায়ে বানানো একটি বাগান, ছোট্ট, সুন্দর, রঙচঙে... সঙ্গে একটা জলপ্রপাতের ধারা নেমেছে। যদিও রক গার্ডেনের কাছের গঙ্গা মাইয়া জলপ্রপাতের রাস্তা বন্ধ কিন্তু শুধু রক গার্ডেনের জন্যই একবার যাওয়াই যায়। রক গার্ডেনের আর এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল নেমে আসার সময় পিউয়ের একবার হোঁচট খেয়ে পড়া। এমনিতে বিশেষ লাগেনি তবে বাঁ হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ার ফলে পরের কদিন বেশ ব্যাথা ছিল আর গোটা ট্রিপে সময় সময়ে আমাকে ওর হাতে ভোলিনি লাগিয়ে যেতে হয়েছে।


আজ এই পর্যন্তই... বাকিটা আবার কাল-পরশুর মধ্যেই আসবে!
(চলবে)

পর্ব - ২           পর্ব - ৩          পর্ব - ৪            পর্ব - ৫            পর্ব - ৬            পর্ব - ৭
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”