Sunday, August 26, 2018

লন্ডনে লণ্ডভণ্ড - ১

~~যাত্রা~~

এই ব্লগ পোস্ট শুরু করব আমার পুরনো একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে। মজার ব্যাপার, সেটাও আগস্ট মাসের পোস্ট তবে ২০১৬ সালের। সময়টা ছিল রিও অলিম্পিকের ঠিক পরপরেই। সাক্ষী, দীপা, সিন্ধু নামগুলো তখনো মানুষ ভুলতে শুরু করেনি। আর এই সময়ই একদিন নিচের লেখাটা পোস্ট করেছিলাম,

আমি নিজে বিশেষ কোন খেলা খেলতে পারি না। যদিও ছোটবেলা থেকে অনেক খেলাই খেলেছি। এখনও টুকটাক ফিফা খেলে থাকি, বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারি না। কিন্তু খেলাটাকে ভালোবাসি। এটা নিয়ে আমি যে কোন লোকের সঙ্গে লড়ে যেতে পারি। আর হ্যাঁ, সব খেলাই ভালোবাসি, যদিও ক্রিকেটটা একটু বেশী।আজকাল 'Sporting Event Tourism' বলে যে জিনিসটা আছে সেটা করতে খুব ইচ্ছে করে। শ্রেয়সীর সঙ্গেও প্ল্যান বানাই মাঝেমধ্যে। ইন্ডিয়ার টেস্ট ম্যাচ দেখতে দেখতে মনে হয় নেক্সট ইংল্যান্ড ট্যুরের সময়ে লর্ডস টেস্টটা বা অস্ট্রেলিয়া ্যুরের সময় সিডনি টেস্টটা দেখতে গেলে কেমন হয়, কখনো ভেবে দেখি, ২০১৯ এর ওয়ার্ল্ড কাপে যাওয়া যাবে কিনা, এমনকি ২০১৮ বা ২০২২ এর গুলোতে গেলেও মন্দ হয় না। ওলিম্পিক্স দেখতে দেখতে আবার মনে হচ্ছে ২০২০তে টোকিওটা টার্গেট করা উচিত কিনা। বাড়ির তো কাছেই সুতরাং কদিন গিয়ে দীপা, অতনু, পুসারলা, সাক্ষীদের জন্য গলা ফাটানোই যায়। তারপর কালকে সিজনের ফার্স্ট হোম ম্যাচ দেখে মনে পড়ল 'থিয়েটার অফ ড্রিমসে' তো যেতে হবে। মনে পড়ল, কেন উম্বলডনের সময় যাওয়া যাবে না, কারণ তখন লিগ শুরু হয় না।এত কিছু কবে হবে কে জানে! কিন্তু প্ল্যান বানিয়ে যাই... একদিন না একদিন সেটাকে একজিকিউট করবই। ততদিন মন দিয়ে খেলাগুলো ফলো করি। যতগুলো খেলা সম্ভব। সেগুলোর খবর ফেসবুকে আরো ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব। লোকে যাতে অলিম্পিকের সময় ছাড়াও প্রদুনোভা কী সেটা মনে রাখে!"

যেমন লিখেছিলাম, তখন থেকেই মাথার মধ্যে ২০১৮ সালের দুটো ইভেন্ট মাথার মধ্যে ঘুরছিল। রাশিয়ার ফুটবল বিশ্বকাপ আর ভারতীয় ক্রিকেট দলের ইংল্যান্ড সফর। শেষ অবধি অবশ্য দ্বিতীয়টাই জিতল। মস্কোর চেয়ে লন্ডনের চার্মটা অনেক বেশী আর ক্রিকেট বনাম ফুটবলেও পছন্দটা সহজ। যদিও অন্তত একটা ফুটবল বিশ্বকাপে যেতে চাই। সম্ভবত ২০২৬ সালের আমেরিকা-কানাডা-মেক্সিকোরটা। দেখা যাক!
এবার ইংল্যান্ডে খেলা দেখা নিয়েও একটা দোনামোনা ছিল। আঠেরোর টেস্ট সিরিজ না উনিশের বিশ্বকাপ। শেষ অবধি আমার এবং আমার সঙ্গিনীর ভোট আঠেরোতেই পড়ল। বিশ্বকাপের সময় হোটেলের ভাড়া ও অন্যান্য খরচা বাড়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া লর্ডস স্টেডিয়াম আর মিউজিয়াম ট্যুর লিস্টে ছিল। সেগুলোও হয়তো বিশ্বকাপের সময় বন্ধ থাকবে। আর ইংল্যান্ডে টেস্ট ম্যাচ দেখতে হলে প্রথম পছন্দ অবশ্যই লর্ডস, ‘হোম অফ ক্রিকেট’! সুতরাং অপেক্ষা ভারতের ইংল্যান্ড সফরের আর টেস্ট ম্যাচগুলোর তারিখ ঘোষণার। এর মধ্যে ২০১৭ সালের গোড়ার দিকে আমি চলে গেলাম কুয়ালালামপুর। সেখানে একদিন ঘুরে এলাম কিনরারা ওভালে। ভিরাটদের ২০০৮ এর বিশ্বকাপ জেতার মাঠ। পরে শ্রেয়সীও গেছিল।
যাই হোক, ওখানে থাকতে থাকতেই সিরিজের দিনক্ষণ  ঘোষণা হল। মোটামুটি সব দিক দিয়ে খরচ হিসেব করে লর্ডস টেস্ট টার্গেট করা হবে ঠিক হল। ৯-১৩ই আগস্ট টেস্ট ম্যাচ, সুতরাং ২-৩ তারিখ যাত্রার দিন ঠিক হল। টেস্ট ম্যাচের দু-একদিন আগেই লর্ডস ট্যুর বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই দিন হাতে রাখা।
আমি যথারীতি একটা এক্সেল ফাইল খুলে বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের লিস্ট করতে শুরু করে দিলাম। সঙ্গে একটা রাফ দিনের হিসেব। এদিক ওদিক থেকে লিংক যোগাড় করা ইত্যাদি। কিন্তু তখনো টিকিট ইত্যাদি অনেক দূরের কথা। এর মধ্যে ফিরে এলাম মালায়শিয়া থেকে। ফিরে অক্টোবারে গেলাম দিল্লী। সেখানে একদিন দেখা হল সত্রাজিৎ আর বিম্ববতীর সঙ্গে। ওরা ২০১৬তেই লন্ডন ঘুরে ফিরেছিল। ওদের কাছ থেকে টিপস নেওয়া হল। বিশেষ করে পাবলাভ হোস্টেলের কথা ওরাই বলেছিল। তাই একটা বড় চকোলেট ওদের পাওনা।
তক্কে তক্কে ছিলাম লর্ডস টেস্টের টিকিটের জন্য। তারপর যা হয়, মাঝখানে কদিন দেখিনি। হঠাৎ দেখি প্রথম তিনদিনের টিকিট ইন্টারনেটে হাওয়া। চতুর্থ দিনের মাত্র কয়েকটা টিকিট পড়ে আছে। সে ঝটপট বন্ধু সর্বজিতকে বলে কেটে ফেলা হল। সর্বজিৎ কিছুদিন লন্ডনে আছে। তাই ওকে দিয়েই টিকিট কাটিয়ে ওর ওখানকার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেওয়া হল। টিকিট পেলাম মিডিয়া সেন্টারের বাঁদিকের এড্রিচ স্ট্যান্ডে।
এরপর শুরু করলাম একে একে হোস্টেলের খোঁজ এবং বুকিং। তার আগে অবশ্য পুরো ভ্রমণটাই ছকে ফেলেছি। মাঝে কিছু বিতর্ক হয়েছিল স্কটল্যান্ডে না প্যারিস বা ব্রাসেলসে এক দিনের ট্রিপ ইত্যাদি নিয়ে। শেষ অবধি শুধু ইংল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডই ঠিক হল। তারপর আমার এবং শ্রেয়সীর রিসার্চের ফলে পুরো ট্যুরটা দাঁড়ালো এরকম,
২-৮-২০১৮ – কলকাতা ত্যাগ
৩-৪ – লন্ডন
৫ – স্টোনহেঞ্জ এবং বাথ
৬ – টনটন
৭ – ম্যাঞ্চেস্টার
৮-৯ – এডিনবার্গ
১০ – ফোর্ট উইলিয়াম
১১-১৪ – লন্ডন
১৫ – লন্ডন ত্যাগ
একে একে বুকিং শুরু হল। অনেকগুলো হোস্টেল এবং হোটেল। সেগুলোর কথায় যথাসময়ে আসা যাবে। তবে সব বুকিংগুলোই হয়েছে বুকিং.কম থেকে। সেই লাঙ্কাওয়ির সময় থেকেই এরা আমার ভরসা। ফ্লাইট বুক হল জেটের। এছাড়া জ্যাকোবাইট ট্রেন, লর্ডস ট্যুর, ওভাল ট্যুর, ম্যাঞ্চেস্টার স্টেডিয়াম ট্যুর, স্টোনহেঞ্জ ট্যুর একে একে সবই হল। এ বছর এপ্রিল-মে মাসের অধিকাংশ শনি-রবি আমার কেটেছে প্ল্যানিং করে। শেষ অবধি সবই হল। মাঝে মনে হয়েছিল সপ্তর্ষি আমাদের সঙ্গী হবে। কিন্তু সে ছোকরা এদিক-ওদিক নানারকম ঘুরে এটা আর ম্যানেজ করে উঠতে পারলো না। সুতরাং শেষ অবধি ১ তারিখ রাত্তিরে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম আমি এবং আমার সঙ্গিনী শ্রীমতি শ্রেয়সী দ্রাভিড। তাঁর বিভিন্ন কীর্তিকলাপের কথা এই লেখায় মাঝে মাঝেই আসবে।
তাহলে আর কী! ঊঠে বসলাম প্লেনে। প্রথম গন্তব্য মুম্বাই!




(চলবে... মানে ইয়ে সেটা না বললেও চলে তবু ছোটবেলায় আনন্দমেলায় এই ব্যাপারটা আর ‘আগে কী ঘটেছে’ বেশ মজার লাগত তাই...)

Sunday, July 30, 2017

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৫

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ১     ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ২          ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৩    ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - 


কুটার পাব স্ট্রিট খুবই জমজমাট। যদিও ২০০২ সালে ওই পাব স্ট্রিটেই বোমা বিস্ফোরণে ২০২ জন মারা গেছিলেন। এখন সেখানে একটা মেমোরিয়াল বানানো আছে। সেটার চারদিকে বিভিন্ন বড় বড় রেস্টুরেন্ট, পাব এবং একের পর এক রকমারি দোকান। সেগুলোর মধ্যে দিয়ে একটা সরু রাস্তা বিচের দিকে চলে গেছে। পাব স্ট্রিটের হৈ-হট্টগোলের তুলনায় বিচটা বেশ ফাঁকা। ভালোই লেগেছিল। তারপর আমরা টুকটাক কিছু খেয়ে নিলাম। পরের দিনের মন্দির ঘোরার জন্য একটা গাড়ীও ঠিক করে ফেললাম। কথা হল যে, আমাদের ড্রাইভার ইয়োমান পরের দিন নটার সময় চলে আসবে আমাদের হোটেলে। অতঃপর একটি পাবে প্রবেশ এবং লাইভ গান শুনতে শুনতে নানাবিধ পানীয়গ্রহণ। যার মধ্যে স্মারনফ্‌ আইসটি আমার বেশ পছন্দ হয়েছিল। দেশে ফিরে খুঁজতে হবে।
যখন হোটেলে ফিরলাম তখন রাত দুটো বেজে গেছে।
পরদিনের গল্প পুরোই বালির মন্দিরের সৌন্দর্যের কথা। তানহা লট, তামান আয়ুন, গজটেম্পল... কোনটা বাদ দিয়ে কোনটার কথা বলব! অনন্যসাধারণ কিছু জায়গা। তানহা লট যেমন সুমদ্রের মধ্যে। হ্যাঁ, ধারে নয় বরং সমুদ্রের মধ্যে প্রায় ১০০ মিটার দূরে এক পাথরের টিলার ওপর দাঁড়িয়ে আছে তানহা লটের মন্দির। বিকেলবেলা সূর্যাস্তের সময় যখন ভাঁটার জন্য জল নেমে যায় তখন পায়ে হেঁটেই সেই মন্দিরে যাওয়া যায়। কিন্তু আমরা গেছিলাম সকালবেলা। সুতরাং তীরে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি আর তানহা লটের ছবি তুলেই আমরা ফিরে এলাম।

এখানেই দেখলাম, বেড়াল প্রজাতির প্রাণী লুয়াক যাদের নাম থেকেই এসেছে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী এবং সুস্বাদু (শোনা কথা) লুয়াক কফি। কেন এই নাম? কারণ এই লুয়াক কফি বীজ খেতে ভালোবাসে, তারপর ওই কফি বীজ তাদের পেটের মধ্যে অর্ধ-পাচ্য হয়ে যখন তাদের বিষ্ঠার সঙ্গে বেরিয়ে আসে তখন সেই বীজ দিয়েই বানানো হয় এই অসমান্য লুয়াক কফি। যার এক পাউন্ডের দাম হতে পারে প্রায় ২০০-৩০০ আমেরিকা ডলার! 
তামান আয়ুন ছিল বালির রাজপরিবারের মন্দির। শহরের মধ্যিখানে অসাধারণ স্থাপত্যময় মন্দিরের সারি। শুধু তাই নয়, ওখানে গিয়ে মনে হয়েছিল যেন, ছোটবেলার ইতিহাস বইয়ে পড়া বালির মন্দিরের ছবিগুলো জীবন্ত হয়ে উঠেছে চোখের সামনে।
তামান আয়ুনে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আমরা গেলাম জঙ্গলের মধ্যে গজমন্দিরে। গুহার মধ্যে এই মন্দির আর চারদিক জঙ্গলে ঘেরা। যেতে যেতে সন্ধ্যে হয়ে গেছিল বলে বেশীক্ষণ থাকা হয়নি তবে এই মন্দিরও সুন্দর।

সমুদ্রের ধারের উলুয়াতু মন্দির রেখে দেওয়া হল পরের দিনের জন্য।
হোটেলে ফিরে ইয়োমানের কথা মত আমরা গেলাম জিম্বারান বিচে ডিনারের জন্য সেখানে সমুদ্রের ধারে উন্মুক্ত আকাশের নীচে অ্যাকোরিয়াম থেকে নিজেদের পছন্দ মত বেঁচে নেওয়া মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, ঝিনুক এবং বিয়ার সহযোগে রাতের খাওয়াটা ভালোই হল। যদিও বালির সব জিনিসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পকেট কাটলো ভালোই। ভারতীয় মূদ্রায় প্রায় ১৪,০০০। ভাগ্যিস ক্রেডিট কার্ড ছিল! এর মধ্যে কিছু স্থানীয় গায়করা এসে আমাদের 'কুছ কুছ হোতা হ্যায়'র গান শোনালেন। দেবাও গলা মেলালো তাঁদের সঙ্গে!
হোটেলে ফিরে ঘন্টাখানেকের সাঁতার ক্লাসও হয়েছিল আমার আর ঈশিতার জন্য। শিক্ষক দেবা এবং ড্যুড!
পরের দিন বালির শেষ দিন। প্ল্যান ছিল, সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট করে যাওয়া হবে বিকিকিনিতে। তারপর ফিরে সব মালপত্র নিয়ে বারোটা নাগাদ ইয়োমেনের গাড়ী করে উলুয়াতু, সেখান থেকে সোজা এয়ারপোর্ট।
সেইমত দশটা নাগাদ পাব স্ট্রিটে পৌঁছে প্রথমে টাকা তোলা হল। শুধু কঙ্কনার কার্ডেই টাকা তোলা যাচ্ছিল। টাকা তুলে সেটাকে মোটামুটি সমানভাবে ভাগ করে দিলাম আমি। তারপর সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম কেনাকাটার জন্য। কেউ নিজের জন্য কিনছে, কেউ বাড়ির লোকের জন্যে, কেউ আবার এই গ্রুপের কমন বন্ধুদের জন্য। সব মিলিয়ে বেশ ভজঘট অবস্থা। তার সঙ্গে বালির দোকানদারদের অবাস্তব দাম! একটু পরেই বুঝে গেলাম, যে টি-শার্টের দাম দোকানদার ২০০,০০০ রুপিয়া মানে ভারতীয় টাকায় ১০০০ টাকা চাইছে, সেগুলোর দরদাম করা উচিত, ২০,০০০ বা ৩০,০০০ রুপিয়া থেকে এবং মোটামুটি পাওয়া যাবে ৭০-৮০ হাজারের মধ্যে।
যাই হোক, এর মধ্যে একটি কাকিমার দোকানে বেশ সস্তায় জামাকাপড় পাওয়া যাচ্ছে বলে সবাই মিলে প্রায় তেইশ-চব্বিশটা আইটেম কিনে ফেলল। মহিলা বেশ হাসিখুশি আর মাঝে মাঝেই এসে ফিসফিস করে বলে যাচ্ছিলেন, "এতো সস্তায় হয়না, নেহাত মালিক স্টক ক্লিয়ার করতে বলেছে তাই দিয়ে দিচ্ছি।"
এছাড়া অন্যান্য মেমেন্টো ইত্যাদি যখন কেনা হল, তখন দেখা গেল টাকা-পয়সা সব শেষ। শেষ অবধি বিভিন্ন ক্রেডিট কার্ডে পেমেন্ট মিটিয়ে হোটেল ফেরা হল সাড়ে-বারোটায়।
ইয়োমেন আগেই চলে এসেছিল। সব গুছিয়ে-টুছিয়ে একটার পর বেরোনো হল। তারপর লাঞ্চ করে উলুয়াতুর জন্য যাত্রা শুরু হল দুটোর পর। উলুয়াতু যখন পৌঁছলাম তখন চারটে বেজে গেছে। অসাধারণ বললেও কম বলা হয় এই মন্দিরের সৌন্দর্য। সমুদ্রের ধার দিয়ে সোজা উঠে গেছে একটা খাড়াই পাহাড় আর সেখানেই উলুয়াতু মন্দির। বিভিন্ন মূর্তি, কারুকার্য আর পাহাড়ের ধার দিয়ে উঠে যাওয়া পাঁচিল। সেটা একটা অসাধারণ জায়গা।
সেখানেই হয় ইন্দোনেশিয়ার বিশেষ বৈশিষ্ট্য কেচাক নৃত্য। যদিও প্লেনের যা সময় তাতে পুরোটা দেখা হবে না, তাও ইন্দোনেশিয়ায় এসে এই জিনিস মিস্‌ করার কোন মানে হয় না। তাই সবাই মিলে বসলাম কেচাক নাচের আসরে।
এই নাচের বৈশিষ্ট্যই হল যে, প্রায় কুড়ি-পঁচিশ জন শিল্পী গোল হয়ে বসে মুখ দিয়ে 'কেচাক' ধ্বনি তুলছেন আর তার মধ্যে বাদ্য সহযোগে অভিনীত হচ্ছে সেই রামায়ণের গল্প 'সীতাহরণ"।
একটু আগে থেকেই ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। কেচাক নাচ শুরু হওয়ার পর একেবারে ঝমঝম করে নেমে পড়ল বৃষ্টি। সকলকে প্লাস্টিকের কভার দেওয়া হচ্ছিল বটে কিন্তু ওই বৃষ্টি রুখতে তা বড়ই অপ্রতুল। যাই হোক, ঐ বৃষ্টির মধ্যেও ঘড়ির দিকে নজর রেখে বেরোনো হল এবং ওই বিশাল পার্কিং লটের মধ্যে শেষ অবধি গাড়ী খুঁজে আমরা রওয়ানা দিলাম বালি এয়ারপোর্টের দিকে। আমাদের বালি-ট্রিপ এবারের মত শেষ।

বাকি আর বিশেষ কিছু হয়নি। এয়ারপোর্টে জিনিসপত্র আটকে দিয়ে কেবিন লাগেজের সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়াকে তখন আর পাত্তাই দিচ্ছি না। ফ্লাইটেই খাওয়া-দাওয়া হল। যখন কুয়ালালামপুরে নামলাম তখন ঘড়ির কাঁটা পরের দিনে চলে গেছে। আমাদের দুমাসের পরিকল্পনার বালিভ্রমণ এখানেই শেষ। আবার দেখতে হবে, পরের বছরের ঘোরার প্ল্যান কবে বানানো যায়!

Sunday, July 16, 2017

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৪

ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ১     ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ২          ইন্দোনেশিয়ার ডায়রি - ৩ 


ছবিঃ কঙ্কনা
বালিতে নেমে যখন এয়ারপোর্টের বাইরে এসে দাঁড়ালাম তখন প্রায় সাড়ে সাতটা। বালিতে আমাদের হোটেল ছিল মায়া ভিলেজ, কুটা বিচের কাছেই। এয়ারপোর্ট থেকে ১০ কিলোমিটারও হবে না, কিন্তু তার জন্য প্রিপেড ট্যাক্সি ভাড়া দেখাচ্ছিল দু লাখ ইন্দোনেশিয়ান টাকা মানে ভারতীয় টাকায় ১০০০ টাকা। তখনই বালির খরচার ব্যাপারটা বুঝলাম। শেষ অবধি এক লাখ সত্তর হাজার টাকায় একটা গাড়ী ধরে বেরোলাম। এয়ারপোর্টের বাইরেটা বেশ সুন্দর কিন্তু লং উইকেন্ডের শুরু বলে একের পর এক প্লেন ভর্তি ট্যুরিস্ট নামছে বলে ভালোই জ্যাম ছিল। যাই হোক জ্যাম কাটিয়ে আধ ঘন্টার মধ্যে হোটেল খুঁজে বের করা গেল। এখানে একটা ড্যুপ্লেক্স ঠিক করা ছিল। হোটেলের একদম ধারে ঘরটা। প্রথমে একটা হল মত বসার জায়গা তারপর নিচে একটা ঘর, লাগোয়া বাথরুম। ওপরে আর একটা ঘর এবং বাথরুম। ভালোই ব্যবস্থা। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে নৈশাহারে স্থানীয় খাবার, স্টেক ইত্যাদি এবং বিন্টাং নামক স্থানীয় লেমন ফ্লেভারড বিয়ার খেয়ে ফিরতে গিয়ে দেখি বৃষ্টি নেমেছে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই হোটেলে ফেরা হল। পরদিন ভোর ভোর বেরোনোর প্ল্যান। কুটার উত্তরে লিবার্টি নামক একটি অ্যামেরিকান জাহাজের ধ্বংসাবশেষে স্কুবা ডাইভিং করার পরিকল্পনা আছে। সকালে সাতটায় গাড়ী এসে নিয়ে যাওয়ার কথা।
স্কুবা ডাইভ বস্তুটা কী তা নিয়ে পাঠকদের (বহুবচন... হুঁ হুঁ বাওয়া!) ধারণা আছে আশা করি। তবু সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটা হল ভালো মত ট্রেনিং নিয়ে ধড়াচুড়ো পরে মুখে অক্সিজেন মাস্ক এবং পায়ে পাখনা লাগিয়ে জলের তলায় নামা এবং মাছেরদের রাজ্য থেকে ঘুরে আসা। সঙ্গে অবশ্যই ট্রেনার থাকেন। কুটার এই 'লিবার্টি শিপরেক' একটি পৃথিবী বিখ্যাত ডাইভ সাইট, সারা বিশ্বের ডাইভ-প্রেমিকরা আসেন এখানে। আমরাও গেলাম। প্রথমে শহরের মধ্যে যে সংস্থা আমাদের ডাইভের ব্যবস্থা করছে তাদের অফিসে গিয়ে ফর্ম-ফিলাপ, পোশাকআশাক পরে দেখে নেওয়া, সব ঠিক আছে কিনা। আমাদের ট্রেনার ছিলেন এক স্থানীয় ইন্দোনেশিয় যুবক এবং রবার্ট নামক বিশালদেহী এবং গম্ভীর এক জামাইকান। জামাইকান শুনেই ক্রিস গেলের কথা জিজ্ঞেস করায় খুব একটা পাত্তা পেলাম না বরং গম্ভীরভাবে তিনি যা বললেন, তা হল তাঁর এই ৪৫ বছরের জীবনে তিনি শুধু পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ডাইভিং করে গেছেন এবং অন্যান্য খেলাধুলো নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নন।
ছবিঃ দেবা
সেখান থেকে দু ঘন্টারও বেশী রাস্তা ঘুমোতে ঘুমোতে এবং মাঝে মাঝে কানের ভেতরে বায়ুর চাপের সামঞ্জস্য রাখার প্র্যাকটিস করতে করতে যাওয়া হল। জলের তলায় নামলে এই বায়ুর চাপের সামঞ্জস্য রাখাটাই একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
যাই হোক, আমাদের যাত্রাপথের শেষে ঠিক সমুদ্রের ধারে একটা রিসর্টের মত জায়গায় পৌঁছনো গেল। সুন্দর পার্কের মত, ধার দিয়ে সমুদ্রে সিঁড়ি নেমে গেছে। পার্কের মধ্যে একটা সুইমিংপুল যেখানে আরো অনেকে ডুবসাঁতার প্র্যাকটিস করছেন। আমরাও একটু ধাতস্ত হয়ে নেমে পড়লাম পুলে। অবশ্যই সমস্ত জিনিসপত্র চাপিয়ে। আমাদের একেবারেই বিগিনার্স কোর্স, দেবার এসব আগেই করা, তাই ও চলে গেল একটা ডাইভে। দুই ট্রেনার পড়লেন আমাদের নিয়ে। ঈশিতা, ড্যুড আর কঙ্কনার সঙ্গে সেই ইন্দোনেশিয়ান ছেলেটি আর আমাকে এবং শ্রেয়সীকে নিয়ে পড়ল রবার্ট। পরবর্তী এক ঘন্টা জলের মধ্যে সাঁতার, আকার-ইঙ্গিত, দম নেওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন দরকারী জিনিসের অনুশীলন চলল। আমি এবং শ্রেয়সী দুজনেই জলে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলাম না। রবার্টও যে খুব একটা সাহায্য করছিল তা নয়, মানে হয়তো চেষ্টা করছিল কিন্তু ওর গম্ভীর বকুনির চোটে আমি আর শ্রেয়সী দুজনেই উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম এবং শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম যে আমরা সমুদ্রের তলায় যাওয়া থেকে বিরত থাকব। কিছুই না, আমার মনে হয়েছিল যে, যদি জলের তলায় নেমে ছড়াই তখন আমার জন্য বাকিদেরও তাড়াতাড়ি উঠে আসতে হলে সেটা একটা লজ্জাজনক ব্যাপার হবে।
বাকিরা অনেক বোঝালেও আমরা রাজী হলাম না। সুতরাং মধ্যাহ্নভোজনের পর বাকি চারজন ট্রেনারদের সঙ্গে জলে নামল এবং আমি আর শ্রেয়সী সমুদ্রের ধারে বসে ঘন নীল জলের সৌন্দর্য উপভোগ করলাম।
মোটামুটি আধা ঘন্টার মধ্যেই একে একে চার মূর্তিমান/মতী জল থেকে উঠে এল। মোটামুটি কারো জলের তলায় কোন অসুবিধে হয়নি সেটা ভাল ব্যাপার।

ফেরার পথে ওদের জলের তলার গল্প শুনতে শুনতে এবং বিয়ার খেতে খেতে যখন আবার কুটায় ফিরলাম তখন সন্ধ্যা নেমেছে। কিন্তু রাত তখনও বাকি!
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”