Saturday, January 10, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৩

(আগে যা ঘটেছে)

মিরিক-পশুপতি নগর
"লে লে বাবু ছে আনা"

পঁচিশে বৈশাখের মত পঁচিশে ডিসেম্বর তারিখটাও সারা বছর মনে থাক। বড়দিন বলে কথা! ২০১৪-র পঁচিশে ডিসেম্বর শুরু হল একদম সকাল সকাল কনকনে ঠান্ডার মধ্যেঅত ঠান্ডার মধ্যেও লেপ মুড়ি দিয়ে বিছানার ওম পোহাবার উপায় নেই। সকাল নটার মধ্যে বিকাশের গাড়ী নিয়ে হাজির হওয়ার কথা। সে তো টাইম মত এসে পড়তে চাইলেও আমাদের ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি খতম করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়তে বেজে গেল প্রায় দশটা
দার্জিলিং থেকে ঘুম স্টেশন অবধি গিয়ে তারপর আমাদের গাড়ী ডানদিকের রাস্তা ধরল। ওখান থেকে মিরিক অবধি রাস্তাটা সত্যিই খুব সুন্দর। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে এগিয়ে চলেছে। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। রাস্তার দুপাশে উঁচু উঁচু পাইন, বার্চ আর ওক গাছের সারি। রাস্তার বেশীরভাগ অংশই ছায়ায় ঢাকা, আবছা আবছা আবার কোথাও কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। হয়তো কুয়াশার মধ্যে এই রাস্তার সৌন্দর্য একটা অন্যধরণের রূপ নেয়। সে সৌন্দর্য আমাদের দেখা হয়নি আর তার জন্য আমাদের যে খুব আপশোস আছে তাও নয়। এত সুন্দর আবহাওয়ার জন্যেই তো রোজ নিয়ম করে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছি। কুয়াশা হলে তো সেটা পুরো মাটি।
ছোটখাট পাহাড়ি জনবসতি পার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। রাস্তার দু ধারে হয়তো ছ-সাতটা বাড়ি, কাঠের দেওয়াল, টিনের ছাদ, সামনের বারান্দায় সারি দিয়ে রাখা টবের গাছে ফুল ফুটে উজ্জ্বল হয়ে আছে।  সেগুলোর মধ্যেই হয়তো দু-তিনটে মনিহারি দোকান, চাল-ডাল-আটার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে ঝুলছে ল্যেজ-এর প্যাকেট, সাজিয়ে রাখা আছে পেপসি-কোকোকোলার বোতল, মার্কিনী ব্যবসায়িক প্রচারের নিদর্শন। কোথাও কোথাও দোকানের সামনে টেবিল পেতে সাজিয়ে রাখা আছে মোমো, চাটনি আর স্যুপের পাত্র। বাকি বাড়িঘর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।

ঘন্টা খানেক এইভাবে চলার পর আমরা একটা বেশ ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেটাও একটা ছোট বসতি, রাস্তার দুদিকে ঘরবাড়ি। আমাদের ড্রাইভার বিকাশ জানালো যে এই জায়গার নাম ‘সীমানা’। যে রাস্তায় আমরা চলেছি সেটা আসলে ভারত-নেপাল সীমান্ত। ঐ রাস্তার ডানদিকটা নেপাল আর বাঁদিকটা ভারত। বাঁদিকে কোন রকম গন্ডগোল হলে আসবে দার্জিলিং পুলিশ কিন্তু ডানদিকে কিছু হলে তার দায়িত্ব নেপাল পুলিশের। ভাবা যায়! এখানে ডানদিকের বাড়ির কোন মেয়ের সঙ্গে বাঁদিকের বাড়ির কোন ছেলের বিয়ে হলে কি রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশ আসার জন্য তার দেশ বদলে যাবে। এইসব নিয়ে বকতে বকতেই আমরা এসে  পড়লাম একটা বেশ জমজমাট জায়গায়। কিছুই না, একটা ছোট্ট খোলা জায়গা, সামনের দিকে ঢালু জমি নেমে গেছে, ইংরেজিতে যাকে ‘cliff’ বলেসেখানে বেশ কয়েকজন পুরুষ-মহিলা ছোট ছোট দোকানে চা-অমলেট, বিদেশী চকোলেট-বিস্কুট-চুইংগাম বিক্রি করছেন। এমনকি একটা অপেক্ষাকৃত বড় দোকানে উপহার সামগ্রী, উলের সোয়েটার-গ্লাভস্‌, টুপি আর স্কার্ফ বিক্রি হতেও দেখলাম। আর আমাদের দেখে তাঁদের কি ডাকাডাকি। আরো অনেকের মত আমরাও সেখানে একটা ছোট ব্রেক নিলাম।
ওখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ একটা ভিউ পাওয়া যায়, শুধু তাই নয় নেপালের বেশ কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল সেখান থেকে। ছবি তোলা তো হলই, সঙ্গে চা খাওয়া হল, চকোলেট কেনা হল, এমনকি ঐ উলের জিনিসের দোকানেও কেনাকাটা হল। আগের দিন ফেরার সময় আমি আমার ডানহাতের গ্লাভস্‌টা হারিয়েছিলাম। ঐ ঠাণ্ডায় শুধু এক হাতে গ্লাভস্‌ পড়ে চলে না। তাই নতুন গ্লাভস্‌ কেনা হল, তার সঙ্গে কিনে ফেললাম ব্রাজিল লেখা, লোগো আঁকা হলুদ-সবুজ স্কার্ফ। খারাপ স্মৃতিটাকে ভুলেই তো এগিয়ে যেতে হবে, তাই না। মিনিট কুড়ি বিরতি নিয়ে আবার গাড়ী চলল, এবার গন্তব্য মিরিক।
বারোটা নাগাদ মিরিক পৌঁছে ওখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য সুমেন্দু লেকের পার্কিং লটে আমাদের গাড়ী থেকে নামিয়ে বিকাশ একটা মস্ত হাই তুলে বলল, “যান, ঘন্টা খানেক ঘুরে আসুন। আমি এখানেই আছি।”
মিরিকের লেকটা মস্ত বড়, অনেকটা সেই উটির লেকের মতই। অবশ্যই অত ঘিঞ্জি নয়, তাহলেও লোক আছে, বোটিং করার ব্যবস্থা আছে, সাজানো পার্ক আছে, লোকের বসার ব্যবস্থাও করা আছে। লেকের ওপর কাঠের ব্রিজ, সেটা দিয়ে অপরদিকে গেলে সেখানে পাইন গাছের বন। তার মধ্যে পায়ে হেঁটে ঘোরা যায় আবার টাট্টু ঘোড়ার পিঠে চড়েও ঘোরা যায়। আমাদের ব্রিজের ওপরেই এক ঘোড়াওয়ালা ধরল, সে আমাদের ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি করতে চায়। কিন্তু সে চাইলেই তো আর করছি না! সত্যি কথা বলতে কী গত কয়েক বছরে আমার ওজন যে পরিমাণে বেড়েছে তাতে হাতি বা ডাইনোসর ছাড়া আর কারোর পক্ষেই আমাকে তোলা খুব একটা সহজ কাজ নয়। এমনকি কলকাতার রাস্তায় বেশ কিছু রিকশাওয়ালা আজকাল আমাকে আর পিউকে একসঙ্গে নিতে রাজী হয় না! এইসব ভেবেই আমি বেচারা টাট্টু ঘোড়ার ওপর এই বিষম ভার চাপাতে রাজী হলাম না। পিউয়ের হাতেও আগেরদিনের পরে যাওয়ার ব্যাথা ছিল। তাই সেও কাটিয়ে দিল, যদিও এখন মনে হচ্ছে পড়ে যাওয়ার ভয়ও পেয়ে থাকতে পারে (এটা বেশ ভয় ভয়েই লিখলাম, আশা করি ভদ্রমহিলার চোখ এড়িয়ে যাবে)!
ঘোড়া চড়ার বদলে আমরা পায়ে হেঁটেই ঘুরলাম। দার্জিলিং-এর কনকনে ঠাণ্ডার পর মিরিকের মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগছিল। ওখানেও ছোটখাট দোকানের অভাব ছিল না। আমরা প্রথমে হামলা করলাম খাবারের দোকানগুলোতে। পিউয়ের দাবী মত পেট পুরে ফুচকা খাওয়া হল সেই সঙ্গে পাপড়ি চাট আর ঘুগনি। তারপর এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন হাঁটা, লোক দেখা, ছবি তোলা... কোন চাপ নেই, তাড়া নেই, দিব্যি লাগছিল। একটু সময় করে ধারের ছোট ছোট উপহারের দোকানগুলোয় ঢুঁ মারলাম, দরাদরিও করলাম। যদিও কিনলাম না কিছুই কিন্তু দেখলাম অনেক কিছু, সোয়েটার, টুপি, স্কার্ফ, চাবির রিং, খেলনা, কাপ, ঘর সাজানোর জন্য শৌখিন জিনিসপত্র।
বেরোবার আগে ঠিক করলাম ওখানেই ভালো করে পেট ভরে খেয়ে নেব। সেইমত দু প্লেট চিকেন মোমো অর্ডার দেওয়া হল। মোমগুলো সত্যিই বড় ভালো ছিল, কলকাতার যেকোন মোমোর তুলনায় সে মোমো অনেক বেশী সুস্বাদু। সুতরাং দু প্লেটের পর আরো এক প্লেট আমরা সহজেই গলাধঃকরণ করে ফেললাম। ভরপেট, খুশী মনে আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম আমরা।
আমাদের ফেরার পথের প্রধান আকর্ষণ ছিল ভারত-নেপাল সীমান্তে পশুপতি নগর মার্কেট। আগেই শুনেছিলাম যে নেপালের সীমান্ত থেকে দু-তিন কিলোমিটার ভিতরে এই বাজার অঞ্চলে অত্যন্ত সস্তায় জ্যাকেট, জুতো এবং কসমেটিকস সামগ্রী পাওয়া যায়। আমরাও ঠিক করলাম ঘুরে দেখে আসব একবার। সীমান্তে চেকপোস্টে নাম লিখিয়ে, প্যান কার্ড দেখিয়ে ঢুকে পড়লাম আমরা। জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম যে সিগারেট এবং অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোন কিছু আনার ব্যাপারেই কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
 স্বাভাবিকভাবেই বিকাশের গাড়ী নেপালে চলবে না তাই ওখান থেকে অন্য একটা মারুতি ভ্যানে করে পাঁচ মিনিট যেতেই সেই মার্কেট এসে হাজির। মোটামুটি এক কিলোমিটারেরও কম একটা রাস্তা, রাস্তার দুধারে পর পর জ্যাকেট আর কসমেটিক্সের দোকান। এমনকি অনেক দোকানে জ্যাকেট আর কসমেটিক্স একসঙ্গেই বিক্রি হচ্ছে।
পিউয়ের জ্যাকেট কেনার ইচ্ছে ছিল তাই অনেকগুলো দোকান ঘুরে প্রচুর দরাদরি করে দুটো জ্যাকেট কেনাও হল। এখানে কেনাকাটা করতে হলে যেটা মনে রাখবেন তা হল দোকানীরা যা দাম বলবে তার মোটামুটি ৩০% দাম থেকে দরাদরি শুরু করবেন এবং কয়েকটা দোকানে হতাশ হয়ে ফিরলেও শেষ অবধি এমন দোকানও পাবেন যেখানে ঐ একই জিনিস দোকানী প্রথমে যা চেয়েছিলেন (যেটা এমনিতেই কলকাতায় ঐ জিনিসের যা দাম তার থেকে ৩০-৪০% কম) শেষ পর্যন্ত তার অর্দ্ধেকেরও কম দামে জিনিসটি দিতে রাজী হয়ে যাবেন। পিউয়ের জ্যাকেট আর আমার পারফিউম কিনে সেটাই আমাদের অভিজ্ঞতা। কেনাকাটার পর আবার মারুতি ভ্যানে করে ফিরে যখন সীমান্ত পেরোচ্ছি তখন আমাদের ব্যাগ চেক তো দূরের কথা বুথের পুলিশগুলো একটা প্রশ্ন অবধি জিজ্ঞেস করেনি।
ফেরার রাস্তায় আমরা গল্প জুড়লাম বিকাশের সঙ্গে। ওর বাড়ীর গল্প, আর কে কে আছে, কবে থেকে ও গাড়ী চালাচ্ছে, গাড়ী চালিয়ে কত টাকা পায়, কোথায় কোথায় ঘোরে সেই নিয়ে প্রাণখোলা আড্ডা। ছেলেটা ভালো ছিল, মিশুকেও। গল্প করতে করতেই জানালো যে মাঝে মাঝে ও কলকাতায় গিয়ে গাড়ী চালাবার প্রস্তাব পায় কিন্তু যেতে চায় না। পাহাড়ের ছেলের কলকাতা শহরের প্রতি লোভ নেই, বরং কলকাতার গরম ওর ভালো লাগে না। আমরাও ওকে বারণ করলাম কলকাতা যেতে। দিব্যি আছে সহজ সরল পাহাড়ি ছেলে, শুধু শুধু কলকাতার বদমাইশ লোকেদের মধ্যে যাওয়ার দরকার কী ওর! সেটাই বললাম ওকে।

এই প্রসঙ্গে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেনের ব্যাপারটা লিখে রাখি। এমনিতে আমরা যখন গেছিলাম তখন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেন বন্ধ ছিল। যদিও কেউ একজন আমাদের বলল যে ঐ লাইন নাকি বড়দিনের পর চালু হবে, কিন্তু সেটা চালু হয়েছে কিনা জানি না। এখন টয়ট্রেন শুধু চলে ঘুম স্টেশন থেকে দার্জিলিং স্টেশন অবধি। দিনের মধ্যে চারবার স্টিম ইঞ্জিনে টানা ট্রেন আর অনেকবার ডিজেল ইঞ্জিনের টানা ট্রেনে। রাস্তার ধার দিয়ে পাতা সেই ট্রেন লাইন। ট্রেনও চলে রাস্তার গাড়ীগুলোর পাশ দিয়ে এবং সত্যি বলতে দেখে খুব ইন্টারেস্টিং লাগেনি। তা সত্ত্বেও প্রচুর চাহিদা এবং স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেনের টিকিট দু মাস আগে থেকে কেটে রাখতে হয় নাহলে ব্ল্যাকে কাটতে হয়! এইসব দেখেই আমরা আমাদের টয়ট্রেন ভ্রমণের প্ল্যান বাতিল করে দিয়েছিলাম। বিকাশও আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থনই করল, মাঝে তো একবার বলল, “আরে এই একই রাস্তা দিয়ে তো ট্রেন যাবে, ভেবে নিন না যে ট্রেনেই আছেন!” বলে নিজেই মুখে “কূঊঊঊঊঊ...” শব্দ করে বলল, “এই যে সিটিও দিয়ে দিলাম!”
বিকাশ যখন আমাদের হোটেলের সামনে নামালো তখন অন্ধকার নামছে পাহাড়ের গায়ে। সেদিনকার মত হিসেব মিটিয়ে বিকাশ চলে গেল বাড়ী। ভালো করে দেখে নিলাম গাড়ীর মধ্যে কিছু পড়ে রইল কিনা। যদিও কাল সকালে সে আবার আসবে আমাদের কালিম্পং নিয়ে যাওয়ার জন্য।

প্রথমে ভেবেছিলাম ম্যালে একবার যাব কিন্তু সারাদিনের ঘোরার ক্লান্তি আর ঐ প্রচণ্ড ঠান্ডার জন্য সে প্ল্যান বাতিল করলাম। হোটেলের ঘরেই রইলাম সন্ধ্যেটা, টিভি দেখলাম, বই পড়লাম, থুকপা দিয়ে ডিনারও হল। সময় করে সুটকেসটাও গুছিয়ে নিলাম। নতুন জ্যাকেটগুলোর জন্য জায়গা বের করার দরকার ছিল, তাছাড়াও বাকি জামাকাপড়ও পুরে ফেললাম। আমাদের এবারের দার্জিলিং পর্বের আজকেই শেষ রাত্তির। আগেই লিখেছি কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ব কালিম্পঙয়ের জন্য। 

3 comments:

  1. Acha protideen Thukpa keno? Okhane ki aar kono khabar pochondo hoini?

    ReplyDelete
  2. Asole jekhane chhilam seta anekta homestay er moto... tai beshi option chhilo na... ar tachhara tukpa ta oi thandae khete bhalo lagchhilo... shorir kharap er bhoy o chhilo na... tai Darjeeling e shudhui thukpa!!

    ReplyDelete
  3. Darun hocche, porer porber janye opekkha korchi.

    ReplyDelete