Saturday, January 17, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - 8


কালিম্পং
ভূত বাংলো

দার্জিলিং থেকে কালিম্পঙের রাস্তাটা বেশ অন্যরকম। প্রথমে কিছুটা শহরের মধ্যে দিয়ে, তারপর পাহাড়, আবার লামাহাট্টার পর কিছুটা গেলেই তিস্তা দেখতে পাওয়া যায়। এরপর তিস্তা বাজারের কাছে অনেকটা রাস্তা তিস্তার সঙ্গে সঙ্গে চলা, তারপর তিস্তার ব্রিজের ওপর দিয়ে এসে ফের পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে ওপরে ওঠা। প্রায় তিন ঘন্টার রাস্তা, তাতে আবার আমরা দুবার ব্রেক নিলাম।
দার্জিলিং থেকে হোটেলের সব হিসেব মিটিয়ে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে আমার বেরিয়েছিলাম নটা নাগাদ। পর পর দুদিন বেশ পরিষ্কার আকাশের পর সেদিন সকাল থেকেই আকাশের মুখ ভার। বিকাশও বলল যে, “আজ গড়বড় হ্যায়।” আজও আগের দিনের মতই ঘুম স্টেশন অবধি এসে তারপর ডানদিক না নিয়ে সোজা এগিয়ে গেলাম। তার পরেই একটা বাঁদিকের রাস্তায় গাড়ী ঘুরল। একটু পর থেকেই পাহাড়ি রাস্তা শুরু। টুকটাক গল্প করতে করতে এগোচ্ছি, আমি মাঝখানে আমার টিনটিন মার্কা নোটবুক খুলে একটু হিসেব করতে বসলাম, কিন্তু ঐ এবড়োখেবড়ো পাহাড়ির রাস্তায় চলন্ত গাড়ীতে হিসেব লেখার চেষ্টা যে খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ নয় সেটা বুঝে রণে ভঙ্গ দিতে হল খুব তাড়াতাড়িই।
প্রায় ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়ী থামল একটা বেশ সুন্দর দেখতে পার্কের সামনে। বিকাশ জানালো যে, এই জায়গার নাম লামাহাট্টা। লামাহাট্টাও একটা ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম তবে এখানকার প্রধান আকর্ষণ হল পাহাড়ের ঢালে বানানো চমৎকার ঐ পার্ক। বেশ যত্ন করে বানানো এবং সেই একই যত্ন নিয়ে রক্ষণাবেক্ষণও করা হয়। পুরো পার্ক জুড়ে রংবেরঙয়ের ফুল গাছগাছালির সারি। ততক্ষণে সকালের মুখ ভার কেটে গিয়ে রোদ উঠে গেছে। পার্কের একদিকে উঁচু উঁচু পাইন আর বার্চ গাছের বন, তার সামনে লাইন দিয়ে লাল-হলুদ-সবুজ-নীল রঙের পতাকা সকালের হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে।
আকাশের অন্যদিকের উজ্জ্বল নীল রঙের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের চেনা কাঞ্চনজঙ্ঘা। পার্কের মধ্যে জায়গায় ছোট ছোট ছাউনির মত বানানো আছে। শুধু তাই নয়, এই সবের মধ্যেই আছে একটা ওয়াচ টাওয়ার। সেখানে উঠলেই একসঙ্গে লামাহাট্টার পুরো গ্রামটা দেখা যায়। আর কাঞ্চনজঙ্ঘা তো আছেই। মনের আনন্দের প্রকৃতি এবং পিউয়ের প্রচুর ছবি তুলে ফেলা গেল।
পিউ সকালে ব্রেকফাস্টে বেশী কিছু খায়নি। তাই ওখানে একটা দোকানে গরম গরম ম্যাগি খেয়ে নিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। কিন্তু আধ ঘন্টা পরেই পরবর্তী বিরতি নিতে হল। পাহাড়ের রাস্তার বাঁকে এক জায়গায় বেশ কিছু গাড়ী দাঁড়িয়ে ছিল। সেখানে আমাদের গাড়ীটাও থামিয়ে দিয়ে বিকাশ বলল, “চলুন, তিস্তা নদী দেখবেন।”
দেখলাম, পাহাড়ের গায়ে বাঁধানো উঠোনের মত জায়গা, লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে নানা রকমের। কিন্তু ওখানকার প্রধান আকর্ষণ হল দূরে পাহাড়ের নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা নদীর সঙ্গম। বিকাশ বলল, ওখানটাকে বলে ত্রিধারা, কিন্তু অন্য নদীগুলোর নাম বলতে পারল না। অবশ্য তাতে কী বা আসে যায়? নদীর সৌন্দর্য কি আর তার নামের ওপর নির্ভর করে? তিস্তা নদী ভীষণ সুন্দর। আর এই নদীর জলের রঙ সবুজ। না পান্নার মত উজ্জ্বল সবুজও নয়, কচি কলাপাতার মত চোখ ঝলছে দেওয়া সবুজও নয়। এই সবুজ হালকা, পেস্তা রঙের, সামান্য নীল রঙ ঘেঁষা। এই যাত্রায় সেই প্রথম তিস্তা দর্শন। নদী দেখে, তার ছবি তুলে, তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা আবার এগিয়ে গেলাম আমাদের পথে।

তিস্তা নদী তখনকার মত বিদায় নিলেও একটু পর আবার আমাদের পথের সঙ্গী হল। জায়গাটার নাম তিস্তা বাজার। বুঝতেই পারছেন এখানে এসে দেখলাম আমাদের রাস্তার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে তিস্তা নদী। সেই নদীর সঙ্গে খানিকটা পথ চলার পর তিস্তা নদীর ওপরের ব্রিজ টপকে ওপাশে গিয়ে আমরা আবার পাহাড়-জঙ্গলের পথে ফিরে গেলাম। বিকাশ জানাল, কালিম্পং পৌঁছতে আর ঘন্টা খানেকের বেশী লাগবে না।

এই ফাঁকে কালিম্পঙে আমাদের থাকার ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলে নি। আমি যখন হোটেল বুক করছিলাম তখন সব জায়গাতেই আগে দেখছিলাম যে সরকারী থাকার জায়গাগুলোতে জায়গা আছে কিনা এবং সেগুলো অনলাইন বুক করা যাচ্ছে কিনা। দুটি ক্ষেত্রে দুটো প্রশ্নের উত্তরই হ্যাঁ হওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের টুরিস্ট লজে থাকার ব্যবস্থা করি। সত্যি বলতে কি WBTDC-এর ওয়েবসাইটটা বেশ ভালোই। সেখানেই দেখেছিলাম যে, কালিম্পঙে তিনটি সরকারী অতিথিশালা রয়েছে যেগুলোর মধ্যে আমি পছন্দ করেছিলাম মর্গান হাউস। বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে জেনেছিলাম যে, ওটা একটা ব্রিটিশ আমলের বাংলো, যেটা এখন সরকার অধিগ্রহন করে টুরিস্ট লজ বানিয়েছে। মর্গান হাউসের ছবি দেখে সঙ্গে সঙ্গেই পছন্দ হয়ে গেছিল আর যতই হোক সত্যজিৎ রায়ের গল্পের চরিত্রদের মত পুরনো বাংলোতে থাকার লোভ সামলানোও সহজ কাজ নয়। যেটা পরে জানলাম তা হল, মর্গান হাউসের নাকি ভূতের বাড়ী বলে কিঞ্চিৎ নাম আছে... (“নাম বলছেন কেন? বদনাম বোলেন...”) বাড়ীর প্রাক্তন মালকিন মিসেস মর্গানকে নাকি মাঝেমধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। আমার সঙ্গিনী সেটা শুনে আসার আগেই আমাকে বলে রেখেছিলেন যে ওখানে গিয়ে ভূতের সামান্য নামগন্ধ পেলেই তিনি ঘর ছেড়ে রিসেপশনে গিয়ে থাকবেন। যদিও ওনাকে সাহস করে জিজ্ঞাসা করা হয়নি যে, ভূতেদের রিসেপশন এড়িয়ে যাওয়ার কারণ কী হতে পারে!

যাই হোক, কালিম্পং শহরে ঢুকে রাস্তায় লোকজনকে জিজ্ঞেস করতে করতে আমরা মর্গান হাউসের দিকে এগিয়ে চললাম। যাকেই জিজ্ঞেস করি, সে বলে আরো সামনে যেতে হবে। সে এক মজার ব্যাপার। আমরা পাহাড়ের ওপরে উঠেই চলেছি কিন্তু মর্গান হাউস আর আসে না। যাকেই জিজ্ঞেস করি সে মাথা নেড়ে বলে, “আগে”। এইভাবে দোনামোনা করতে করতে এগোতে এগোতে দেখি আমাদের গাড়ী প্রায় একটা মিলিটারি ক্যাম্পে ঢুকে পড়ছে। ততক্ষণে আমি ধরেই নিয়েছি যে, কোন অজ্ঞাত কারণে কালিম্পঙের জনগণ আমাদের সঙ্গে খিল্লি করে আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় পাঠিয়ে দিয়েছে! কিন্তু ঐ মিলিটারি ক্যাম্পের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভদ্রলোককে আমতা আমতা করে যেই বলেছি, “ইয়ে... মর্গান হাউস যানা থা...” ভদ্রলোক মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বাঁদিকে একটা রাস্তা দেখিয়ে বললেন, “উধার চলে যাইয়ে!”
বোঝো কান্ড! সেই রাস্তা দিয়ে আরো মিনিট দুয়েক ওপরে ওঠার পর অবশেষে মর্গান হাউস খুঁজে পাওয়া গেল। ছবি দেখা ছিল তাই দূর থেকে দেখেই চিনে ফেললাম। বিকাশও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তার আগে অবধি ও ভাবছিল, আমরা ভুল রাস্তায় এসেছি, আর ওকে এখন আমাদের ওর গাড়ী করে নিয়ে ঠিক হোটেল খুঁজে বের করতে হবে!
অত কষ্ট করে খুঁজে পেতে হলেও মর্গান হাউসের সামনে গিয়ে মন ভালো হয়ে গেল। চমৎকার দেখতে, পুরনো ধাঁচের বাড়ী, তার চারদিকে বাগান, শুধু তাই নয় সামনের বারান্দার নীচেই সারি দিয়ে রাখা টবে ফুলগাছ। এমনকি বাড়ীটার বয়সের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তারও বাইরের দেওয়াল বেয়ে গাছের শিকড় নেমেছে। কিন্তু সেটা পুরোটাই বাড়ীটার সৌন্দর্যের একটা অংশ, বাড়ীটা ভাঙ্গাচোরা মোটেই নয়।
বিকাশ আমাদের মালপত্র নামিয়ে দিয়ে, টাকা-পয়সা নিয়ে ‘টা টা’ বলে ফিরে গেল দার্জিলিং। আমরা চেক ইন করেই হোটেলে কথা বলে কালিম্পং ঘোরার জন্য একটা গাড়ীর ব্যবস্থা করে ফেললাম। কথা হল গাড়ী আসবে ঠিক পনেরো মিনিট পর। আমরা ততক্ষণে ঘরে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে নেব। আর ঠিক এই সময়ে, মাঝ দুপুরে আমরা ভূতের খপ্পরে পড়লাম!!

গাড়ী আসার তাড়া ছিল। পিউ যথারীতি তার মধ্যেও ল্যাধ্‌ খাচ্ছিল, সুতরাং আমিই আগে বাথরুমে গেলাম ফ্রেস হওয়ার জন্য। হাত-মুখ ধুয়ে-টুয়ে বেরিয়ে দেখি, পিউ ঘরের মধ্যে এক জায়গায় চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ গম্ভীর, কপালে ভ্রূকুটি, আমাকে দেখে বলল, “এই, একটা খট্‌ খট্‌ করে আওয়াজ হচ্ছে মাঝে মাঝে!”
বুঝলাম পিউয়ের কল্পনায় মিসেস মর্গানের ভূত হাই হিল জুতো পরে হাঁটতে বেরিয়ে আওয়াজ করছেন। পিউয়ের আরো নাকি মনে হয়েছিল যে, ও যখন ঘরের পুরনো ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের মুখ দেখছিল তখনই আওয়াজটা প্রথম হয়। মানে মিসেস মর্গানের ভূতের বোধহয় পছন্দ নয় পিউ ওনার ড্রেসিং টেবিল ব্যবহার করে। মনে মনে একমত হতেই হল, হাজার হোক, ভূত বা পেত্নি যাই হোন না কেন মিসেস মর্গান তো মহিলাই বটে! এইসবের মাঝেখানেই আমি শুনতে পেলাম ‘খট্‌’ আওয়াজটা। পিউ চোখ বড় বড় করে বলল, “শুনলে?”
নিজের কানে শোনা শব্দকে অস্বীকার করি কী করে? বলতেই হল যে, শুনেছি। তারপর সেই শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়েই পেয়ে গেলাম... কী আবার? রুম হিটার!!
আরে হয়েছে কী, পুরনো দিনের বাংলোর রুম হিটারও পুরনো দিনের, সেটা আমাদের বেয়ারা, আমাদের ঘরে রেখে চালিয়ে দিয়ে গেছিল। সেই হিটার যখন মাঝে মাঝে গরম হয়ে যাচ্ছে, তখন সেটা নিজে থেকেই আওয়াজ করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং আবার একটু পরে চালু হয়ে যাচ্ছে। আর ওই চালু-বন্ধের চক্করেই ঐ ‘খট্‌ খট্‌’ শব্দের উৎপত্তি! ভূতের রহস্য সেই যে সমাধান হয়ে গেল তারপর রাতের দিকে হোটেলের বাইরে ঘোরাঘুরি করেও ভূতের নামগন্ধ পর্যন্ত দেখা গেল না। পিউ পরে বলেছিল যে, ঐ খট্‌ শব্দটা যদি শুধু ও শুনত আর আমি শুনতে পেতাম না, তাহলে নাকি ঐ ঘর তো বটেই এমনকি ঐ হোটেল ছেড়েই নাকি ও চলে যেত।

তার আগে তো আমরা সাঙ্গের গাড়ী করে কালিম্পং ঘুরতে বেরোলাম। হ্যাঁ, আমাদের গাড়ীর চালক ভদ্রলোক তাঁর নাম ‘সাঙ্গে’ ই বলেছিলেন, অন্তত আমি সেটাই শুনতে পেয়েছিলাম। কালিম্পঙে মোটামুটি নটা দেখার জায়গা আছে। তার মধ্যে মন্দির, মনস্ট্রি, স্ট্যাচু, নার্সারি, কলোনিয়াল বাড়িঘর, প্রকৃতি... কোন কিছুই বাদ নেই!

সাঙ্গের সঙ্গী হয়ে আমরা প্রথমে গেলাম দুরপিন ডেরা মনস্ট্রি। পাহাড়ের আরো ওপরে সুসজ্জিত একটা বৌদ্ধ মঠ। যখন গেলাম, তখন প্রধান মন্দির বন্ধ থাকলেও চারপাশ ঘুরে দেখায় কোন বাধা নিষেধ নেই। এমনকি মঠের তিনতলাতেও উঠে গেলেও কেউ কিছু বলছে। অন্য যেকোন বৌদ্ধ মঠের মত এই মঠের রঙও উজ্জ্বল। আর ওপর থেকেই দেখা যায় পাশের মিলিটারি স্কুলের মাঠ, চারপাশের পাহাড় এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য। খুব ভালো লেগেছিল ঐ দুরপিন ডেরা। সেখান থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম পাইন ভিউ নার্সারি। কালিম্পঙে এরকম নার্সারি অনেকগুলোই আছে কিন্তু পাইন ভিউয়ের বৈশিষ্ট্য হল এখানকার ক্যাকটাস। এত বিভিন্ন রকমের ক্যাকটাস আর অন্য কোন নার্সারিতে নাকি নেই। অন্যান্য ভ্রমনার্থীদের মত আমরাও দশ টাকার টিকিট কেটে ঘুরে এলাম, ভালোই লাগলো।
সেখানে থেকে বেরিয়ে একটা মন্দিরে ছোট্ট করে দর্শন সেরে আমরা চলে এলাম ডেলো পাহাড়ে। এখন ব্যাপারটা হল, ডেলো পাহাড়ের ডাকবাংলো যে গত কয়েক মাস ধরে সব খবরের কাগজের পাতায় স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে সেটা আমাদের ঠিক মনে ছিল না। নাহলে সেটাও নাহয় দর্শন করা যেত। আপাতত আমাদের গাড়ী ডেলো পাহাড়ের ওপরের একটা পার্কের সামনে আমাদের নামিয়ে দিল। ততক্ষণে প্রায় চারটে বেজে গেছে। কিন্তু ততক্ষণে তাপমাত্রা নামতে শুরু করেছিল। সেই কনকনে ঠাণ্ডায় পিউ তো হাত-পা-দাঁত কেঁপে অস্থির। আমিও সেরকম জুত পাচ্ছিলাম না। সুতরাং মিনিট দশেক ঘুরে, ছবি-টবি তুলে, ফুচকা আর বাদাম ভাজা খেয়ে আমরা ফেরার রাস্তা ধরলাম।
সেখান থেকে বেরিয়ে সাঙ্গে আমাদের পরপর তিনটে বিশাল মূর্তি দেখাতে নিয়ে গেল। দুটো বুদ্ধ মূর্তি, আর একটা হনুমানের। আর সঙ্গে একটা দুর্গা মন্দিরেও নিয়ে গেছিল, কিন্তু সেটা ছিল বন্ধ। সব দেখে যখন মর্গান হাউসে ফিরলাম তখন চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। ঠাণ্ডাও সেরকমই জমাটি।

গরম গরম কফি, ভেজ পাকোড়া আর এগ পাকোড়া খেতে খেতে সান্ধ্য আড্ডা চলল আমার আর পিউয়ের। মধ্যে অবশ্য সামান্য টেনশন হয়েছিল। কারণটা ছিল আমাদের বাকি ট্রিপের গাড়ী। আসলে, পরদিন সকালে কালিম্পং থেকে বাকি ট্রিপ মানে লাভা, লোলেগাঁও, গরুমারা আর জলদাপাড়ার জন্য আমাদের একটা গাড়ী ঠিক করা ছিল। কিন্তু সারা সন্ধ্যে চেষ্টা করেও তার মালিকের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারিনি। মনে মনে ঠিক করেই ফেলেছিলাম যে, গাড়ি থেকে ফোন না এলে কাল সকালে আবার রিসেপশনে কথা বলে এই সাঙ্গের গাড়ী নিয়েই লাভা চলে যাবো। যাই হোক, রাত প্রায় এগারোটা নাগাদ গাড়ীর মালিকের ফোন এসে গেল। জানিয়ে দিলেন কাল সকাল নটার মধ্যে ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে মর্গান হাউসে উপস্থিত থাকবে।
রাত্তিরে চাঞ্চল্যকর কিছুই ঘটল না। মিসেস মর্গানও এলেন না আমাদের সঙ্গে দেখা করতে। বরং টিভিতে ‘বিগ বস’ আর ম্যান ইউনাইটেডের খেলার মধ্যে কোনটা দেখা হবে সেই নিয়ে তর্ক করতে করতেই পিউ ঘুমিয়ে পড়ল। তার আগে অবশ্যই পেট পুরে ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন আর ক্যারামেল কাস্টার্ড দিয়ে নৈশাহার হয়ে গেছিল।

পরের গন্তব্য লাভা, ভুটানি ভাষায় যার মানে, ‘Heavenly abode of the Gods’, মানে আমার সঙ্গী গাইডবুকটি অন্তত তাই বলছিল!
(চলবে)

                                                                                                                                                   

Saturday, January 10, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ৩

(আগে যা ঘটেছে)

মিরিক-পশুপতি নগর
"লে লে বাবু ছে আনা"

পঁচিশে বৈশাখের মত পঁচিশে ডিসেম্বর তারিখটাও সারা বছর মনে থাক। বড়দিন বলে কথা! ২০১৪-র পঁচিশে ডিসেম্বর শুরু হল একদম সকাল সকাল কনকনে ঠান্ডার মধ্যে। অত ঠান্ডার মধ্যেও লেপ মুড়ি দিয়ে বিছানার ওম পোহাবার উপায় নেই। সকাল নটার মধ্যে বিকাশের গাড়ী নিয়ে হাজির হওয়ার কথা। সে তো টাইম মত এসে পড়তে চাইলেও আমাদের ব্রেকফাস্ট ইত্যাদি খতম করে সেজেগুজে বেরিয়ে পড়তে বেজে গেল প্রায় দশটা।
দার্জিলিং থেকে ঘুম স্টেশন অবধি গিয়ে তারপর আমাদের গাড়ী ডানদিকের রাস্তা ধরল। ওখান থেকে মিরিক অবধি রাস্তাটা সত্যিই খুব সুন্দর। পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা ঘুরে ঘুরে এগিয়ে চলেছে। কখনো চড়াই, কখনো উতরাই। রাস্তার দুপাশে উঁচু উঁচু পাইন, বার্চ আর ওক গাছের সারি। রাস্তার বেশীরভাগ অংশই ছায়ায় ঢাকা, আবছা আবছা আবার কোথাও কোথাও গাছের ফাঁক দিয়ে রোদ এসে পড়েছে। হয়তো কুয়াশার মধ্যে এই রাস্তার সৌন্দর্য একটা অন্যধরণের রূপ নেয়। সে সৌন্দর্য আমাদের দেখা হয়নি আর তার জন্য আমাদের যে খুব আপশোস আছে তাও নয়। এত সুন্দর আবহাওয়ার জন্যেই তো রোজ নিয়ম করে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখছি। কুয়াশা হলে তো সেটা পুরো মাটি।
ছোটখাট পাহাড়ি জনবসতি পার হয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। রাস্তার দু ধারে হয়তো ছ-সাতটা বাড়ি, কাঠের দেওয়াল, টিনের ছাদ, সামনের বারান্দায় সারি দিয়ে রাখা টবের গাছে ফুল ফুটে উজ্জ্বল হয়ে আছে।  সেগুলোর মধ্যেই হয়তো দু-তিনটে মনিহারি দোকান, চাল-ডাল-আটার সঙ্গে সঙ্গেই সেখানে ঝুলছে ল্যেজ-এর প্যাকেট, সাজিয়ে রাখা আছে পেপসি-কোকোকোলার বোতল, মার্কিনী ব্যবসায়িক প্রচারের নিদর্শন। কোথাও কোথাও দোকানের সামনে টেবিল পেতে সাজিয়ে রাখা আছে মোমো, চাটনি আর স্যুপের পাত্র। বাকি বাড়িঘর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে।

ঘন্টা খানেক এইভাবে চলার পর আমরা একটা বেশ ইন্টারেস্টিং জায়গায় এসে পৌঁছলাম। সেটাও একটা ছোট বসতি, রাস্তার দুদিকে ঘরবাড়ি। আমাদের ড্রাইভার বিকাশ জানালো যে এই জায়গার নাম ‘সীমানা’। যে রাস্তায় আমরা চলেছি সেটা আসলে ভারত-নেপাল সীমান্ত। ঐ রাস্তার ডানদিকটা নেপাল আর বাঁদিকটা ভারত। বাঁদিকে কোন রকম গন্ডগোল হলে আসবে দার্জিলিং পুলিশ কিন্তু ডানদিকে কিছু হলে তার দায়িত্ব নেপাল পুলিশের। ভাবা যায়! এখানে ডানদিকের বাড়ির কোন মেয়ের সঙ্গে বাঁদিকের বাড়ির কোন ছেলের বিয়ে হলে কি রাস্তার এপাশ থেকে ওপাশ আসার জন্য তার দেশ বদলে যাবে। এইসব নিয়ে বকতে বকতেই আমরা এসে  পড়লাম একটা বেশ জমজমাট জায়গায়। কিছুই না, একটা ছোট্ট খোলা জায়গা, সামনের দিকে ঢালু জমি নেমে গেছে, ইংরেজিতে যাকে ‘cliff’ বলে। সেখানে বেশ কয়েকজন পুরুষ-মহিলা ছোট ছোট দোকানে চা-অমলেট, বিদেশী চকোলেট-বিস্কুট-চুইংগাম বিক্রি করছেন। এমনকি একটা অপেক্ষাকৃত বড় দোকানে উপহার সামগ্রী, উলের সোয়েটার-গ্লাভস্‌, টুপি আর স্কার্ফ বিক্রি হতেও দেখলাম। আর আমাদের দেখে তাঁদের কি ডাকাডাকি। আরো অনেকের মত আমরাও সেখানে একটা ছোট ব্রেক নিলাম।
ওখান থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ একটা ভিউ পাওয়া যায়, শুধু তাই নয় নেপালের বেশ কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল সেখান থেকে। ছবি তোলা তো হলই, সঙ্গে চা খাওয়া হল, চকোলেট কেনা হল, এমনকি ঐ উলের জিনিসের দোকানেও কেনাকাটা হল। আগের দিন ফেরার সময় আমি আমার ডানহাতের গ্লাভস্‌টা হারিয়েছিলাম। ঐ ঠাণ্ডায় শুধু এক হাতে গ্লাভস্‌ পড়ে চলে না। তাই নতুন গ্লাভস্‌ কেনা হল, তার সঙ্গে কিনে ফেললাম ব্রাজিল লেখা, লোগো আঁকা হলুদ-সবুজ স্কার্ফ। খারাপ স্মৃতিটাকে ভুলেই তো এগিয়ে যেতে হবে, তাই না। মিনিট কুড়ি বিরতি নিয়ে আবার গাড়ী চলল, এবার গন্তব্য মিরিক।
বারোটা নাগাদ মিরিক পৌঁছে ওখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য সুমেন্দু লেকের পার্কিং লটে আমাদের গাড়ী থেকে নামিয়ে বিকাশ একটা মস্ত হাই তুলে বলল, “যান, ঘন্টা খানেক ঘুরে আসুন। আমি এখানেই আছি।”
মিরিকের লেকটা মস্ত বড়, অনেকটা সেই উটির লেকের মতই। অবশ্যই অত ঘিঞ্জি নয়, তাহলেও লোক আছে, বোটিং করার ব্যবস্থা আছে, সাজানো পার্ক আছে, লোকের বসার ব্যবস্থাও করা আছে। লেকের ওপর কাঠের ব্রিজ, সেটা দিয়ে অপরদিকে গেলে সেখানে পাইন গাছের বন। তার মধ্যে পায়ে হেঁটে ঘোরা যায় আবার টাট্টু ঘোড়ার পিঠে চড়েও ঘোরা যায়। আমাদের ব্রিজের ওপরেই এক ঘোড়াওয়ালা ধরল, সে আমাদের ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি করতে চায়। কিন্তু সে চাইলেই তো আর করছি না! সত্যি কথা বলতে কী গত কয়েক বছরে আমার ওজন যে পরিমাণে বেড়েছে তাতে হাতি বা ডাইনোসর ছাড়া আর কারোর পক্ষেই আমাকে তোলা খুব একটা সহজ কাজ নয়। এমনকি কলকাতার রাস্তায় বেশ কিছু রিকশাওয়ালা আজকাল আমাকে আর পিউকে একসঙ্গে নিতে রাজী হয় না! এইসব ভেবেই আমি বেচারা টাট্টু ঘোড়ার ওপর এই বিষম ভার চাপাতে রাজী হলাম না। পিউয়ের হাতেও আগেরদিনের পরে যাওয়ার ব্যাথা ছিল। তাই সেও কাটিয়ে দিল, যদিও এখন মনে হচ্ছে পড়ে যাওয়ার ভয়ও পেয়ে থাকতে পারে (এটা বেশ ভয় ভয়েই লিখলাম, আশা করি ভদ্রমহিলার চোখ এড়িয়ে যাবে)!
ঘোড়া চড়ার বদলে আমরা পায়ে হেঁটেই ঘুরলাম। দার্জিলিং-এর কনকনে ঠাণ্ডার পর মিরিকের মিঠে রোদ পিঠে নিয়ে ঘুরতে ভালো লাগছিল। ওখানেও ছোটখাট দোকানের অভাব ছিল না। আমরা প্রথমে হামলা করলাম খাবারের দোকানগুলোতে। পিউয়ের দাবী মত পেট পুরে ফুচকা খাওয়া হল সেই সঙ্গে পাপড়ি চাট আর ঘুগনি। তারপর এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন হাঁটা, লোক দেখা, ছবি তোলা... কোন চাপ নেই, তাড়া নেই, দিব্যি লাগছিল। একটু সময় করে ধারের ছোট ছোট উপহারের দোকানগুলোয় ঢুঁ মারলাম, দরাদরিও করলাম। যদিও কিনলাম না কিছুই কিন্তু দেখলাম অনেক কিছু, সোয়েটার, টুপি, স্কার্ফ, চাবির রিং, খেলনা, কাপ, ঘর সাজানোর জন্য শৌখিন জিনিসপত্র।
বেরোবার আগে ঠিক করলাম ওখানেই ভালো করে পেট ভরে খেয়ে নেব। সেইমত দু প্লেট চিকেন মোমো অর্ডার দেওয়া হল। মোমগুলো সত্যিই বড় ভালো ছিল, কলকাতার যেকোন মোমোর তুলনায় সে মোমো অনেক বেশী সুস্বাদু। সুতরাং দু প্লেটের পর আরো এক প্লেট আমরা সহজেই গলাধঃকরণ করে ফেললাম। ভরপেট, খুশী মনে আবার গাড়ীতে উঠে বসলাম আমরা।
আমাদের ফেরার পথের প্রধান আকর্ষণ ছিল ভারত-নেপাল সীমান্তে পশুপতি নগর মার্কেট। আগেই শুনেছিলাম যে নেপালের সীমান্ত থেকে দু-তিন কিলোমিটার ভিতরে এই বাজার অঞ্চলে অত্যন্ত সস্তায় জ্যাকেট, জুতো এবং কসমেটিকস সামগ্রী পাওয়া যায়। আমরাও ঠিক করলাম ঘুরে দেখে আসব একবার। সীমান্তে চেকপোস্টে নাম লিখিয়ে, প্যান কার্ড দেখিয়ে ঢুকে পড়লাম আমরা। জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছিলাম যে সিগারেট এবং অ্যালকোহল ছাড়া অন্য কোন কিছু আনার ব্যাপারেই কোন নিষেধাজ্ঞা নেই।
 স্বাভাবিকভাবেই বিকাশের গাড়ী নেপালে চলবে না তাই ওখান থেকে অন্য একটা মারুতি ভ্যানে করে পাঁচ মিনিট যেতেই সেই মার্কেট এসে হাজির। মোটামুটি এক কিলোমিটারেরও কম একটা রাস্তা, রাস্তার দুধারে পর পর জ্যাকেট আর কসমেটিক্সের দোকান। এমনকি অনেক দোকানে জ্যাকেট আর কসমেটিক্স একসঙ্গেই বিক্রি হচ্ছে।
পিউয়ের জ্যাকেট কেনার ইচ্ছে ছিল তাই অনেকগুলো দোকান ঘুরে প্রচুর দরাদরি করে দুটো জ্যাকেট কেনাও হল। এখানে কেনাকাটা করতে হলে যেটা মনে রাখবেন তা হল দোকানীরা যা দাম বলবে তার মোটামুটি ৩০% দাম থেকে দরাদরি শুরু করবেন এবং কয়েকটা দোকানে হতাশ হয়ে ফিরলেও শেষ অবধি এমন দোকানও পাবেন যেখানে ঐ একই জিনিস দোকানী প্রথমে যা চেয়েছিলেন (যেটা এমনিতেই কলকাতায় ঐ জিনিসের যা দাম তার থেকে ৩০-৪০% কম) শেষ পর্যন্ত তার অর্দ্ধেকেরও কম দামে জিনিসটি দিতে রাজী হয়ে যাবেন। পিউয়ের জ্যাকেট আর আমার পারফিউম কিনে সেটাই আমাদের অভিজ্ঞতা। কেনাকাটার পর আবার মারুতি ভ্যানে করে ফিরে যখন সীমান্ত পেরোচ্ছি তখন আমাদের ব্যাগ চেক তো দূরের কথা বুথের পুলিশগুলো একটা প্রশ্ন অবধি জিজ্ঞেস করেনি।
ফেরার রাস্তায় আমরা গল্প জুড়লাম বিকাশের সঙ্গে। ওর বাড়ীর গল্প, আর কে কে আছে, কবে থেকে ও গাড়ী চালাচ্ছে, গাড়ী চালিয়ে কত টাকা পায়, কোথায় কোথায় ঘোরে সেই নিয়ে প্রাণখোলা আড্ডা। ছেলেটা ভালো ছিল, মিশুকেও। গল্প করতে করতেই জানালো যে মাঝে মাঝে ও কলকাতায় গিয়ে গাড়ী চালাবার প্রস্তাব পায় কিন্তু যেতে চায় না। পাহাড়ের ছেলের কলকাতা শহরের প্রতি লোভ নেই, বরং কলকাতার গরম ওর ভালো লাগে না। আমরাও ওকে বারণ করলাম কলকাতা যেতে। দিব্যি আছে সহজ সরল পাহাড়ি ছেলে, শুধু শুধু কলকাতার বদমাইশ লোকেদের মধ্যে যাওয়ার দরকার কী ওর! সেটাই বললাম ওকে।

এই প্রসঙ্গে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেনের ব্যাপারটা লিখে রাখি। এমনিতে আমরা যখন গেছিলাম তখন নিউ জলপাইগুড়ি থেকে দার্জিলিং-এর টয়ট্রেন বন্ধ ছিল। যদিও কেউ একজন আমাদের বলল যে ঐ লাইন নাকি বড়দিনের পর চালু হবে, কিন্তু সেটা চালু হয়েছে কিনা জানি না। এখন টয়ট্রেন শুধু চলে ঘুম স্টেশন থেকে দার্জিলিং স্টেশন অবধি। দিনের মধ্যে চারবার স্টিম ইঞ্জিনে টানা ট্রেন আর অনেকবার ডিজেল ইঞ্জিনের টানা ট্রেনে। রাস্তার ধার দিয়ে পাতা সেই ট্রেন লাইন। ট্রেনও চলে রাস্তার গাড়ীগুলোর পাশ দিয়ে এবং সত্যি বলতে দেখে খুব ইন্টারেস্টিং লাগেনি। তা সত্ত্বেও প্রচুর চাহিদা এবং স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেনের টিকিট দু মাস আগে থেকে কেটে রাখতে হয় নাহলে ব্ল্যাকে কাটতে হয়! এইসব দেখেই আমরা আমাদের টয়ট্রেন ভ্রমণের প্ল্যান বাতিল করে দিয়েছিলাম। বিকাশও আমাদের সিদ্ধান্তকে সমর্থনই করল, মাঝে তো একবার বলল, “আরে এই একই রাস্তা দিয়ে তো ট্রেন যাবে, ভেবে নিন না যে ট্রেনেই আছেন!” বলে নিজেই মুখে “কূঊঊঊঊঊ...” শব্দ করে বলল, “এই যে সিটিও দিয়ে দিলাম!”
বিকাশ যখন আমাদের হোটেলের সামনে নামালো তখন অন্ধকার নামছে পাহাড়ের গায়ে। সেদিনকার মত হিসেব মিটিয়ে বিকাশ চলে গেল বাড়ী। ভালো করে দেখে নিলাম গাড়ীর মধ্যে কিছু পড়ে রইল কিনা। যদিও কাল সকালে সে আবার আসবে আমাদের কালিম্পং নিয়ে যাওয়ার জন্য।

প্রথমে ভেবেছিলাম ম্যালে একবার যাব কিন্তু সারাদিনের ঘোরার ক্লান্তি আর ঐ প্রচণ্ড ঠান্ডার জন্য সে প্ল্যান বাতিল করলাম। হোটেলের ঘরেই রইলাম সন্ধ্যেটা, টিভি দেখলাম, বই পড়লাম, থুকপা দিয়ে ডিনারও হল। সময় করে সুটকেসটাও গুছিয়ে নিলাম। নতুন জ্যাকেটগুলোর জন্য জায়গা বের করার দরকার ছিল, তাছাড়াও বাকি জামাকাপড়ও পুরে ফেললাম। আমাদের এবারের দার্জিলিং পর্বের আজকেই শেষ রাত্তির। আগেই লিখেছি কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ব কালিম্পঙয়ের জন্য। 

Wednesday, January 7, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ২


দার্জিলিং-২
দার্জিলিং জমজমাট

রক গার্ডেনের পর আমাদের গন্তব্য ছিল পদ্মজা নাইডু হিমালয়ান জুওলজিকাল পার্ক এবং হিমালয়ান মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউট। একই ক্যাম্পাসের মধ্যে পাশাপাশি এই চিড়িয়াখানা, মিউজিয়াম এবং সেই সঙ্গে পর্বতারোহণ শেখার স্কুল। চিড়িয়াখানাটা সত্যিই ভাল, বিভিন্ন পাহাড়ি ছাগল, হরিণ, ইয়াক, ভাল্লুক, বিভিন্ন ধরনের লেপার্ড, বাঘ এবং অবশ্যই বিরল প্রজাতির লাল পান্ডা এবং নানা ধরনের পাখী এই চিড়িয়াখানার বাসিন্দা। তাদের এবং তাদের সঙ্গে আমাদেরও প্রচুর ছবি তোলা হল।
এভারেস্ট মিউজিয়ামটাও বেশ ভাল, যত্নের ছাপ সর্বত্র। তেনজিং নোরগে ও অন্যান্য পর্বতারোহীদের ব্যবহৃত পোশাক, সরঞ্জাম, গাঁইতি, তাঁবু এসব দেখার মধ্যে সত্যিই একটা অন্য রকম ব্যাপার আছে। তার সঙ্গে আছে হিমালয়ের বিভিন্ন মডেল ছাড়াও পাহাড়ের বুকে পাওয়া বিভিন্ন পাখী, সাপ ও অন্যান্য মৃত জন্তুদের স্টাফড দেহ।
তবে শুধু জন্তু জানোয়ার নয় ওখানে গিয়েই আমাদের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল আমাদের ট্যুরের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক মানুষটির সঙ্গে। তাঁর নাম রূপেন। পাহাড়ি লোকটি ছিলেন চিড়িয়াখানা এবং মিউজিয়ামে আমাদের গাইড। বেশ জ্ঞানী এবং মিশুকে লোক এবং তার সঙ্গে সঙ্গেই ফটো তলায় তাঁর খুব উৎসাহ। মাঝে মাঝে তিনি আমার ক্যামেরা চেয়ে নিয়ে আমার এবং পিউয়ের বেশ কিছু ন্যাচারাল ছবি এবং পশুপাখীদের ছবি তুলে ফেলেছিলেন। এরপর মাউন্টেরিয়াং ইনস্টিটিউটের কাছে এসে তিনি একটু বেশীই উৎসাহিত হয়ে পড়েন। দেওয়ালে করা পর্বতারোহণের একটি মুরালের সামনে তিনি আমার আর পিউয়ের নীচের ছবিটি তোলেন এবং তারপর মন্তব্য করেন, “এই দেখুন, তেনজিং নোরগে ছন্দা গায়েনকে পাহাড়ে উঠতে হেল্প করছেন!”

এর কিছুটা পর হঠাৎ একটা গাছের সামনে এসে ভদ্রলোক দাবী করলেন যে, আমাকে ঐ গাছটায় উঠতে হবে এবং তিনি সেটার ছবি তুলবেন। অনেক বুঝিয়েও যখন তাঁকে নিরস্ত করা গেল না তখন বাধ্য হয়েই দুরু দুরু বক্ষে আমাকে সেই শ্যাওলাধরা গাছে উঠতে হল এবং সেই প্রচণ্ড নার্ভাসনেসকে ঢেকে দেওয়ার জন্য মুখে একটা বীরের হাসি ঝুলিয়ে রাখতে হল আর ভদ্রলোক পটাপট কয়েকটা ছবি তুলে ফেললেন।
মিউজিয়াম দেখে আমরা যখন আবার চিড়িয়াখানা ফিরে এলাম ততক্ষণে আমি আমার ক্যামেরার ওপর থেকে আমার সমস্ত দাবী প্রত্যাহার করে নিয়েছি। সেটা রূপেনের কাছেই আছে এবং সেই দিয়ে তিনি লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে, লেপার্ডের খাঁচায় প্রায় ঢুকে পড়ে আমাকে ছবি তুলে এনে দিচ্ছেন।
তার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রানিং কমেন্ট্রি চলছে অবশ্য, যেমন বাঘের খাঁচায় দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রারত বাঘটিকে দেখিয়ে তিনি বললেন, “ইসকা নাম হ্যায় সৌরভ গাঙ্গুলী, বেঙ্গল টাইগার!”
ভদ্রলোক বোধহয় ‘গুণ্ডা’ দেখেননি নাহলে জানতেন যে পৃথিবীতে বেঙ্গল টাইগার বলতে মিঠুনদাকেও ডাকা হয়!
ভাল্লুকের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়ে ছবিও হল রূপেনের খেয়ালে। তবে রূপেন সবচেয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল লাল পান্ডার ছবি তুলতে গিয়ে। লাল পান্ডা বিরল প্রাজাতির অত্যন্ত অলস একটি প্রানী। আমরা যেটিকে দেখেছিলাম সেটি একটি গাছের ডালে বসে ছিল। আমরা যখন তার সামনে গিয়ে পৌঁছলাম তখন সে মুখ তুলে আমাদের দেখছিল কিন্তু তারপর বোধহয় সে বোর হয়ে গিয়ে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়েই পড়ল। মাঝে আমাদের দেখে একবার মাথা তুলেছিল কিন্তু ওইটুকুই। তাও পরে হোটেলে ফিরে দেখলাম রূপেন ঐ লাল পান্ডাটির পনেরো খানা ছবি তুলেছে যার অন্তত বারোটা ছবির ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের মধ্যে কোন পার্থক্যই নেই!

কিন্তু এসব সত্ত্বেও বলতেই হবে যে রূপেন দেখিয়েছিল খুব ভালো করে, আর আপনারা ওখানে গেলে ওকে গাইড নিলে খুব একটা ঠকবেন না।
চিড়িয়াখানা থেকে আমরা গেলাম একটা চা-বাগানে যেটার নাম আমার মনে নেই। তবে সেখানে থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম, তার সঙ্গে লেবং রেসকোর্সেরও ছবি তোলা হল। চা বাগানের লাগোয়া দোকানে চা খাওয়া হল সঙ্গে ঐ বাগানের চা-পাতা কেনাও হল। ভালোই!
সেখান থেকে আমরা গেলাম শহরের আর-এক চত্বরে জাপানী মন্দির আর পিস্‌ প্যাগোডা দেখতে। রাস্তায় আমাদের গাড়ীর ড্রাইভার বিকাশ সেন্ট পলস্‌ স্কুল দেখিয়ে দিল যেখানে ‘ম্যায় হুঁ না’ সিনেমার শুটিং হয়েছিল! শান্তি স্তুপ দেখে ভালই লাগলো যদিও ঐ ধরণের স্তুপ আমি আগে রাজগীরেও দেখেছি। তবে স্তুপের দেওয়ালের কিছু কিছু কাজ সত্যিই বেশ ভালো এবং যথারীতি ঐ স্তুপের ওপরে উঠলেও দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়া যায়।
শান্তি স্তুপ ছিল সেদিনকার মত শেষ ঘোরার জায়গা। তারপর বিকাশ আমাদের দার্জিলিং চৌরাস্তায় ঠিক কেভেনটার্সের সামনে নামিয়ে দিয়ে, “কাল আবার দেখা হবে বলে” কেটে পড়ল। বিকাশকে আমাদের বেশ পছন্দ হয়ে গেছিল তাই পরের দিন ওর গাড়ীতেই মিরিক যাওয়া হবে বলে ঠিক করে ফেলেছিলাম।
সারাদিন ঘুরে খিদে তো পেয়েইছিল তাছাড়াও আমাদের দুজনের জন্যেই কেভেনটার্স ছিল অবশ্য দ্রাষ্টব্য। একদিকে আমি ভাবছি ওখানে ফেলুদা সেই কোন ছোট্টবেলায় তোপসেকে নিয়ে গেছিল আর অন্যদিকে পিউ ভাবছে ওখানেই রণবীর কাপুর থুড়ি বরফি শ্রুতিকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। পিউ এটাও আশা করেছিল যে ওর জন্যও কেউ ক্লক টাওয়ারে চড়ে হাত-পা নাড়বে তবে আমি অবশ্যই সে রিস্ক নিইনি। অত পুরনো ক্লক টাওয়ার, ধসে গেলে দেখবে কে!
কেভেন্টার্সে গিয়ে আমার ক্যামেরা হারাল। মানে হঠাৎ দেখলাম আমার সঙ্গের ব্যাগে আমার ক্যামেরা নেই। খাওয়া মাথায় উঠল! ব্যাগের সব জিনিস বের করে বার দুয়েক ঘেঁটেও যখন পাওয়া গেল না তখন বিকাশকে ফোন করা হল, তার গাড়ীতে পড়ে আছে কিনা জানার জন্য। সেও ‘দেখে দু মিনিট পর ফোন করছি’ বলে ফোনটা দিল কেটে। সে এক অসহ্য দু মিনিট! যাই হোক দ্বিতীয়বার তাকে ফোন করে জানা গেল যে ক্যামেরা তার গাড়ীতেই আছে এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যে সে নিজে কেভেনটার্সের দোতলায় এসে ক্যামেরা দিয়ে গেল।
ক্যামেরা পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড খিদে পেয়ে গেল আমাদের। সকালের সেই ব্রেকফাস্টের পর থেকে কিছু না খেয়েই ঘুরছি। সুতরাং দু প্লেট চিকেন স্যান্ডুইচার সঙ্গে দু প্লেট অমলেট এবং বেকন অর্ডার হয়ে গেল প্রথমেই। সঙ্গে কফি। তারপর আরো দু প্লেট হ্যাম স্যান্ডউইচ খাওয়ার পর আমাদের আত্মা সন্তুষ্ট হল। খাওয়ার আসার ফাঁকে মনের সুখে কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুললাম। পিউ একগাদা সেলফি তুলল, পাশের টেবিলের একটা বাচ্চা মেয়ের সঙ্গে গল্প করল আর ওখানকার কর্মচারীদের মধ্যে কাকে কাকে বরফি সিনেমায় দেখিয়েছে সেই নিয়ে গবেষণা করল।
আধ ঘন্টা পরে যখন আমরা কেভেন্টার্স থেকে মৌরি চিবোতে চিবোতে বেরোলাম তখন আমাদের পেট ভর্তি, মন প্রসন্ন! অতঃপর শুরু হল দার্জিলিং-এর শেষ বিকেলের মিঠে রোদে আমাদের উদ্দেশ্যহীন পদচারণা।
এই দোকান, সেই দোকান... কোনটা কিউরিও শপ তো কোনটা কেকের দোকান, আর গরম কাপড়ের দোকান তো আছেই। ঘোরাই আসল, তার সঙ্গে যদি কোন জ্যাকেট পছন্দ হয় এবং পছন্দমত সস্তা দামে পাওয়া যায় তাহলে কেনেকাটাও হবে। জ্যাকেট যদিও হল না কিন্তু বেশ কয়েকটা কিউরিও শপ ঘুরে শেষ অবধি ‘নেপাল কিউরিও শপ’ (হুঁ হুঁ বাওয়া! ফেলুদা ওখানেই গেছিল) থেকে আমি আমার জন্য একটা ইয়াকের হার দিয়ে বানানো তিব্বতী ধাঁচের গনেশ, বন্ধু মৃন্ময়ের জন্য জপযন্ত্র (যার ভেতরে মন্ত্র লেখা কাগজ আছে কিনা দেখে নিয়েছিলাম), বাবার জন্য ছোট্ট ভোজালীর মত দেখতে পেপার নাইফ... এইসব কিনে ফেললাম। জিনিসপত্র কিনতে কিনতে এবং আরো অনেক রকমের ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম ম্যালে।
দার্জিলিং-এর ম্যাল আমার খুব পছন্দ হয়েছে। সুন্দর ছড়ানো একটা জায়গা। একদিকে ক্রিসমাস উপলক্ষে বানানো একটা স্টেজের ওপর বাচ্চারা ছোটাছুটি করছে, অন্যদিকে পরপর পুরনো পুরনো চায়ের দোকান। জায়গায় জায়গায় বেঞ্চ পাতা আছে যেখানে বসে আড্ডা মারা যায়। আবার চাইলে কোন চায়ের দোকানে ঢুকে পৃথিবীবিখ্যাত কোন চায়ের কাপে চুমুক মারাও যায়। ফেলুদা মকাইবাড়ির চা ফ্রি-তে পেত। আমরা না হয় পাই না কিন্তু তাই বলে খাব না তা কি হতে পারে! সুতরাং আমরা দুজনে গোল্ডেনটিপসে ঢুকে পড়ে দু কাপ মকাইবাড়ির চা অর্ডার দিয়ে দিলাম। একটু পরেই দুটো বেশ বড় কাপে প্রায় কমলা রঙের সেই মহার্ঘ্য পানীয় এল। আমরা দুজনে খেলাম এবং দুঃখের বিষয় তেমন কিছুই আলাদা করে বুঝলাম না! বেরসিক আর কাকে বলে!
সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকেই ঠাণ্ডাটা বেশ তাড়াতাড়িই বাড়ছিল। সেই শীত উপেক্ষা করেই ঘুরছিলাম তবে সাড়ে ছটা নাগাদ রণে ভঙ্গ দিলাম। চৌরাস্তায় এসে একটা গাড়ি নিয়ে নিলাম আমাদের হোটেলে পৌঁছনোর জন্য। আমাদের হোটেল মানে পাহাড়ী সোলের ঘরোয়া ব্যবহার এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার অসাধারণ ভিউয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রধান যে সমস্যাটি আছে সেটা হল হোটেলটা ম্যাল থেকে প্রায় পাঁচ-ছ কিলোমিটার দূরে। তাই রীতিমত ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে হোটেলে ফিরতে হল। হোটেলে ফিরে সোজা লেপের তলায়। তার আগে ডিনারের অর্ডার দিয়ে দিলাম, দু বাটি চিকেন থুকপা, আমার এবং পিউয়ের জন্য। ঐ কনকনে ঠান্ডার মধ্যে এর থেকে ভালো খাবার আর হয় না।
শুয়েও পড়লাম তাড়াতাড়ি। কাল পঁচিশে ডিসেম্বর, বড়দিন। দার্জিলিং দেখা শেষ তাই আমাদের কালকের প্ল্যান মিরিক যাওয়া আর সঙ্গে সামান্য বিদেশ ভ্রমণ, যদিও বিনা পাসপোর্টে!
(চলবে)

Monday, January 5, 2015

উত্তর বাংলার আনাচে কানাচে - ১

সবাইকে ২০১৫ সালের শুভ নববর্ষের প্রীতি ও শুভেচ্ছা। নতুন বছরের প্রথম পোস্ট, স্পেশাল তো বটেই। আর শুধু তাই নয়, এটা আমার ব্লগের শততম পোস্টও বটে। যাকে বলে শতবার্ষিকী পোস্ট বা পঁচিশ টাকার পোস্ট (শত বার সিকি = ২৫ টাকা)। পিজের জন্য দুঃখিত, তবে সব সময় তো আর লোভ সামলানো যায় না!
--------------------------------------------------------------------------------------

ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যানটা বানানো হয়েছিল সেই সেপ্টেম্বর মাসে। প্রথমে যেটা নিয়ে সবচেয়ে বেশী বাগবিতণ্ডা হয়েছিল তা হল গন্তব্যস্থান! উত্তর ভারত না উত্তর বঙ্গ, সেটাই ছিল প্রশ্ন। একদিকে সিমলা, কুলু, মানালি এবং জিম করবেট ন্যাশানাল পার্ক আর অন্যদিকে দার্জিলিং, কালিম্পং আর গরুমারা, জলদাপাড়ার ন্যাশানাল পার্ক।
শেষ অবধি ডিসেম্বর মাসে উত্তর ভারতের কুখ্যাত কুয়াশার কথা ভেবে আমরা ঐ অপশনটা বাতিলই করে দিলাম। পরে যখন ঘুরতে ঘুরতে মোবাইলে উত্তর ভারতের ঘন কুয়াশায় ট্রেন লেট আর বাতিলের খবরগুলো দেখছিলাম তখন নিজেদের সুবিবেচনার প্রতি শ্রদ্ধা যারপনাই বেড়ে গেছিল।
সুতরাং উত্তর বঙ্গ। ক্যালন্ডার দেখে অফিসে ছুটির প্ল্যান কনফার্ম করার পর ঘোরার দিনগুলো ফাইনাল করলাম। সঙ্গীসাথি বেশী না পাওয়ায় শেষ অবধি গেলাম আমরা দুজনেই। আমি এবং পিউ। সেই ফেসবুক-খ্যাত ভদ্রমহিলা যিনি দয়া করে আমার সহধর্মিনী হয়েছেন গত বছর।
ঘোরার দিন ঠিক হল, অতঃপর ট্রেনের টিকিট কাটা, ইন্টারনেট ঘেঁটে ফেলে বিভিন্ন সাইট থেকে ফিডব্যাক দেখে হোটেল ঠিক করা, অনলাইন বুকিং করা... এসব করতে লেগে গেল দিন দশেক। এই সবের চক্করে ২রা জানুয়ারীর ফেরার টিকিট কাটতে ভুলেই গেছিলাম। যখন মনে পড়ল তখন দোসরার কোন ট্রেনেই টিকিট নেই। সুতরাং দুটো টিকিট কাটা হল। একটা দু তারিখের দার্জিলিং মেলের ওয়েটিং লিস্ট, অন্যটা তিন তারিখের শতাব্দীর কনফার্ম টিকিট, ট্রেনের সময় ভোর ৫:৩৫।
ফেরার ট্রেনের কথা বলে দিলাম বটে তবে আগে বলা উচিত ছিল যাওয়ার কথা লেখা। সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ পরিকল্পনা বলতে গেলে এইরকম...
ডিসেম্বর ২২ – শেয়ালদা স্টেশান থেকে রাত ১১টার পদাতিক এক্সপ্রেসে যাত্রা শুরু
ডিসেম্বর ২৩-২৫ – দার্জিলিং
ডিসেম্বর ২৬ – কালিম্পং
ডিসেম্বর ২৭ – লাভা
ডিসেম্বর ২৮-২৯ – লোলেগাঁও
ডিসেম্বর ৩০ – গরুমারা
ডিসেম্বর ৩১- জানুয়ারী ১ – জলদাপাড়া
জানুয়ারী ২/৩ – ফেরা

আর বেশী ধানাই-পানাই না করে ঘোরার গপ্পগুলোতে চলে যাই। একবারে হয়তো সবগুলো লেখা হবে না, কয়েক খন্ড লেগে যেতে পারে। শুধু দার্জিলিং-য়ের গল্প লিখতেই দুটো পর্ব লেগে যাবে। তাই প্রথম খণ্ড দার্জিলিং-১।


দার্জিলিং-১
শীতল শহরের উষ্ণ মানুষগুলি

নিউ জলপাইগুড়ি অবধি রাতের ট্রেন যাত্রায় সেরকম স্মরনীয় কিছু হয়নি। তবে আমাদের ক্যুপের অন্যান্য সহযাত্রীরা যখন লুচি-আলুরদম দিয়ে নৈশভোজ করছিলেন তখন সেটা দেখে পিউ ফিসফিস করে লুচি-আলরদমের জন্য বায়না ধরেছিল! সুতরাং ওনাদের যদি পরদিন সকালে পৈটিক গোলযোগ ঘটে থাকে তাহলে তার জন্য কে দায়ী ছিল তা আমরা এখন জানি!
এনজেপি স্টেশানে নেমে ‘নিউ সিকিম ট্র্যাভেল’র কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে দার্জিলিং-র জন্য রওনা হলাম। সে যাত্রা খুব একটা সুখপ্রদ হয়নি। আসলে গাড়ির ড্রাইভার লোকটি খুব একটা সুবিধার ছিল না। একটু যেতে না যেতেই গাড়ী গড়বড় করতে লাগল। সেটা ঠিক করতে লাগলো মিনিট চল্লিশেক। তারও কিছুটা পর ড্রাইভারটি আমাদের মিরিক ভ্রমনের প্রস্তাব দিল। অবশ্যই একটু বেশী টাকার বিনিময়ে। এই প্রস্তাব আমরা আগেই পেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের প্ল্যান ছিল আগে দার্জিলিং পৌঁছে তারপর যেখানে যাওয়ার যাওয়া যাবে। সেটা মধুরভাবে তাকে জানিয়ে দেওয়ার পরেই তার গাড়ী আবার বিগড়লো। বেশী বর্ণনায় যাচ্ছি না তবে বেশ কিছুটা ঝামেলার পর অন্য একটা সুমোয় আরো কিছু লোকের সঙ্গে আমরা দার্জিলিং-এর পাহাড়ি সোল হোটেলে যখন পৌঁছলাম তখন পাঁচটা বেজে গেছে। অন্ধকার নামছে আস্তে আস্তে, কিন্তু তাতেও হোটেলের বারান্দা থেকে আকাশের গায়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার প্রথম দর্শনে কিন্তু বাধা পড়েনি।
হোটেলে পৌঁছে একটু ধাতস্ত হওয়ার পরেই যেটা অনুভব করলাম তা হল হাড় কাঁপানো শীত। দার্জিলিং ঠান্ডা হবে জানতাম কিন্তু এতটা ঠান্ডা হতে পারে তার ধারনা ছিল না। পিউয়ের ঠান্ডার ধাত আমার চেয়েও বেশী আর তাই রুম হিটার, ইলেকট্রিক কম্বল, লেপ থাকা সত্ত্বেও বেশ ভালোই কাঁপুনি ধরেছিল ওর। প্রথম দিনের টুকটাক গন্ডগোলের পার্ট হিসেবেই হয়তো সন্ধ্যেবেলা বার দুয়েক লোডশেডিং হল, দ্বিতীয়বার প্রায় ঘন্টা খানেকের বেশী। হোটেলের অমৃত বলে একটি ছেলেকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল এরকম লোডশেডিং দার্জিলিং-এ প্রায়ই হয়। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে ভ্রমণের বাকি দিনগুলোতে কিন্তু কোথাওই বিদ্যুৎ নিয়ে কোন সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। প্রথম দিন আরো মজা হল রাতের খাবার নিয়ে। তখনও বুঝিনি যে ওসব জায়গায় লোকে কত তাড়াতাড়ি খেয়ে নেয়। তাই আমরা যখন ডিনার টাইম বললাম ৯.৩০ তখন অমৃত মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, “ইতনা দের তক্‌ ডিনার নেহি মিলেগা সাব”
জিজ্ঞেস করে জানা গেল যে, ঐ হোটেলে ডিনারের টাইম ৭.৩০ থেকে রাত ৯টা অবধি। সেদিন আর বাকি দিনগুলোতে আমরা ডিনার অর্ডার করতাম ৮.৩০ নাগাদ কিন্তু ৮টা বাজতে না বাজতেই ওরা ডিনারের জোগাড়যন্ত্র শুরু করে দিত। আমি প্রথম দিন খেয়েছিলাম চিকেন থালি, যেখানে পিউ নিল থুকপা। থুকপা আর কিছুই নয়, একটা মস্ত বড় বাটিতে স্যুপ, যার মধ্যে চিকেন, নুডলস আর অন্যান্য সবজি দেওয়া। খেতে খুবই ভালো এবং ঠান্ডা জায়গায় খাওয়ার পক্ষে আদর্শ। প্রথম রাত্তিরে বেশ  তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়লাম কারণ ততক্ষণে পরের দিনের গাড়ী ঠিক হয়ে গেছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য টাইগার হিল। গাড়ীর সময় ভোর সাড়ে চারটে।
জীবনে প্রথম টাইগার হিলে সানরাইজ দেখার বর্ণনা পড়েছিলাম সেই ছোট্টবেলায় টেনিদার উপন্যাস ‘ঝাউ-বাংলোর রহস্য’ পড়ার সময়। তার পরে আজ অবধি ঐ উপন্যাসটি আরো বার দশেক পড়ার ফলে এখন সে বর্ণনা প্রায় মুখস্ত)

“পরদিন ভোর চারটায় টাইগার হিলে রওনা হলুম আমরা। বাপস্‌, কী ঠাণ্ডা! দার্জিলিঙ ঠাণ্ডায় জমে আছে। ঘুম স্টেশন রাশি রাশি লেপ কম্বল গায়ে জড়িয়ে ঘুমে অচেতন। শীতের হাওয়ায় নাক-কান ছিঁড়ে যাওয়ার জোর। ল্যান্ড রোভার গাড়ি, ঢাকাঢাকি বিশেষ নেই, প্রাণ ত্রাহি ত্রাহি করে উঠল।
টেনিদা চটে বললে- ধুত্তোর ঘোড়ার ডিমের টাইগার হিল। ক্যাবলার বুদ্ধিতে পড়ে যত ভোগান্তি। একেবারে জমিয়ে দিলে।
হাবুল বললে- হ, আমাগো আইসক্রিম বানাইয়া ছাড়ব।
...
তারপর সেই সূর্য উঠল। কেমন উঠল? কী রকম রঙের খেলা দেখা দিল মেঘ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপরে? সে আর আমি বলব না। তোমরা যারা টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখেছ, তারা তো জানোই; যারা দেখোনি, না দেখলে কোনওদিন তা জানতে পারবে না।
ক্লিক ক্লিক ক্লিক! খালি ক্যামেরার শব্দ। আর চারদিকে শুনতে পাচ্ছি, ‘অপূর্ব! অদ্ভুত! ইউনিক!’
টেনিদা বললে- সত্যি ক্যাবলাকে মাপ করা যেতে পারে। এমন গ্রান্ড সিনারি কোনওদিন দেখিনি।”

প্রতিটা শব্দ মিলে না গেলেও আমাদের অভিজ্ঞতাও ঐ রকমই। গাড়ী এল ভোর সাড়ে চারটের আগেই। আমরাও তিন-চার স্তরে গেঞ্জি, সোয়েটার, জ্যাকেট পরে তৈরি ছিলাম, সঙ্গে টুপি, মাফলার, গ্লাভস... তারপরেও শীত হার মানাচ্ছিল না। কিন্তু অত আগে বেরিয়েও হিলের প্রায় দু কিলোমিটার আগেই গাড়ী থেকে নামতে হল। কারণ তার আগের রাস্তাইয় লাইন দিয়ে গাড়ী দাঁড়িয়ে আছে। বুঝতে পারলাম যে টাইগার হিলে সূর্যোদয় দেখার জন্য লোকে বোধহয় রাত তিনটের সময়ও হোটেল থেকে বেড়িয়ে পড়েছে। সত্যি বলতে কী, বেশ ভালোই খাটাখাটনি করতে হয়েছে, ঐ পাহাড় বেয়ে ওঠা, কনকনে ঠান্ডার মধ্যে... পিউয়ের প্রায় জিভ বেরিয়ে গেছিল। অতঃপর প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ অপেক্ষার পালা। টাইগার হিলের ওপর তখন প্রায় হাজার দুয়েক লোক, সকলেই মাথা থেকে পা অবধি যতরকম সম্ভব গরম কাপড়ে ঢেকে হাতে স্টিল ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা বা নিদেনপক্ষে মোবাইল ফোন নিয়ে রেডি।

একদিকে সূর্য ওঠার আগের আকাশ আস্তে আস্তে লাল রঙ ধরছে অন্যদিকের আকাশের বুকে জেগে আছে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার আশে পাশের অন্যান্য শৃঙ্গগুলি। শেষ অবধি সূর্য ওঠার পর যখন কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথায় লাল রঙের টোপর ফুটে উঠল তখন বাকি সবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মুখ দিয়েও একটা বিস্ময়সূচক বাঃ বেরিয়ে এলো। ছবি যে কত উঠল সেটা আর গুনে দেখেনি। কিন্তু শুধু হাতের ক্যামেরাতেই নয় মনের ক্যামেরাতেও সেই ছবি রয়ে গেল চিরকাল। আর শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা তো নয় তার পাশের অন্য শৃঙ্গগুলোতেও রঙ ধরল একে একে।
টাইগার হিল থেকে যখন নেমে আসছি তখন ফোনে দেখলাম টেম্পারেচার ৬ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যখন গেছিলাম তখন বোধহয় ২-৩ ডিগ্রী ছিল। ওখান থেকে নেমে হোটেল যাওয়ার আগে আমরা গেলাম বাতাসিয়া লুপ। ফুলের বাগান, স্মৃতিস্তম্ভ আর টয়ট্রেনের লাইন সব একসঙ্গে উপস্থিত বাতাসিয়া লুপে। সেখানেও ছবি তুলে ফেললাম কাঞ্চনজঙ্ঘার। সঙ্গে ভাড়া করা দূরবীনে দেখলাম নাথুলা পাস, কাঞ্চনজঙ্ঘা আর অন্যান্য শৃঙ্গের ক্লোজআপ... তাও মন্দ লাগলো না। ওখানেই আমি আর কম্পনরতা পিউয়ের কিছু সেলফি নিয়েছিলাম, কিন্তু সেই ছবিগুলো শেয়ার করলে আমার হঠাৎ করে শারীরিক অসুস্থতার কারনে এই ব্লগ লেখা বন্ধ হয়ে যেতে পারে, তাই সেই ছবি দেওয়া থেকে বিরত রইলাম।
তবে ওখানেই এক পেঁয়াজী বিক্রেতার সঙ্গে পিউয়ের কথপোকথনটা এখানে তুলে দিচ্ছি,
পিউঃ ইঁহা কিতনা ঠান্ড হ্যায়!
বিক্রেতাঃ হাঁ, হাম ভি যাব আয়ে থে তো অ্যায়সা হি লাগতা থা।
পিউঃ আপ কা ঘর কাঁহা হ্যায়?
বিক্রেতাঃ বিহার, কভি কভি যাতে হ্যায় ঘর...
পিউঃ যাতে হ্যায় তো ফির সে আতে কিঁউ হ্যায়? ইতনা ঠান্ড মে ম্যায় একবার যাতি তো লোটকে নেহি আতি!

হোটেলে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে আমরা আবার বেরোলাম দশটা নাগাদ। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল রক গার্ডেন। পাহাড়ের গায়ে বানানো একটি বাগান, ছোট্ট, সুন্দর, রঙচঙে... সঙ্গে একটা জলপ্রপাতের ধারা নেমেছে। যদিও রক গার্ডেনের কাছের গঙ্গা মাইয়া জলপ্রপাতের রাস্তা বন্ধ কিন্তু শুধু রক গার্ডেনের জন্যই একবার যাওয়াই যায়। রক গার্ডেনের আর এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল নেমে আসার সময় পিউয়ের একবার হোঁচট খেয়ে পড়া। এমনিতে বিশেষ লাগেনি তবে বাঁ হাতের ওপর ভর দিয়ে পড়ার ফলে পরের কদিন বেশ ব্যাথা ছিল আর গোটা ট্রিপে সময় সময়ে আমাকে ওর হাতে ভোলিনি লাগিয়ে যেতে হয়েছে।


আজ এই পর্যন্তই... বাকিটা আবার কাল-পরশুর মধ্যেই আসবে!
(চলবে)

পর্ব - ২           পর্ব - ৩          পর্ব - ৪            পর্ব - ৫            পর্ব - ৬            পর্ব - ৭

Saturday, December 20, 2014

আমার এক ডজন

নিজের মনের খেয়ালখুশির পোস্ট। এক থেকে বারো, এই সংখ্যাগুলোর প্রত্যেকটাই আমাকে কিছু না কিছুর কথা মনে করিয়ে দেয়। সেগুলোই লিখে ফেললাম পরপর। আর 'নবাব কিনলে আরাম ফ্রি'-র মতই এক থেকে বারোর সঙ্গে শূন্য ফ্রি!
সময় থাকলে আপনাদের গুলোও কমেন্টে লিখে ফেলুন না হয়!!

0 – The score which put Don and Dada together in their last innings

1 – Shreya... একমেবদ্বিতীয়ম

2 – মানিকজোড়

3 – The Three Musketeers, Bengali kind

4 - Fab Four

5 – পান্ডব, মহাভারত বা গোয়েন্দা কাউকেই পোষায় না

6 -  দাদা মারত, বাপি বাড়ি যা

7 – Harry Potter, from seven horcruxes to seven players in a Quidditch game.

8 – দুর্গা পুজোর অষ্টমী

9 – 9/11, sad but true

10 – Pele

11 – Number of kids in Yadav household in Patna

12 – এক ডজন গপপো, আরো এক ডজন, আরো বারো...

Saturday, December 6, 2014

আমার আনন্দমেলা

প্রত্যেকবারই জন্মদিনের দিন ব্লগে নতুন কিছু পোস্ট করতে ইচ্ছে করে, তা সে রবীন্দ্র জাদেজার জন্মদিন নিয়েই হোক না কেন! তবে এবারের জন্মদিন সত্যিই স্পেশাল! ছুটির দিন, সঙ্গে শুদ্ধ এবং বিম্ববতীর বিয়ে-রিসেপশান, পিউয়ের দেওয়া জন্মদিনের উপহার 'The Class of '92' স্পেশাল কালেকশন ডিভিডি! ফাটাফাটি লং উইকএন্ড। 
আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় উপহার এল পাঁচ তারিখ। জন্মদিনের আগের দিন!
জীবনে কবে থেকে আনন্দমেলা পড়ছি মনে নেই। বোধ হয় সেই চার-পাঁচ বছর বয়স থেকেই, মানে পড়তে শিখেছি যেদিন সেদিন থেকে। একটা সময়ে তো প্রত্যেকটা সংখ্যা নিয়ম করে পড়তাম। যদিও খুব যত্ন করে আর তাড়াতাড়ি। ব্যাপার আর কিছুই নয়। আমার বাবা যে ভদ্রলোক কাগজ দিতেন তার সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন যে প্রত্যেক পনের দিন অন্তর আনন্দমেলা বেরোলে আমি সেটা দুদিনের মধ্যে পড়ে নিয়ে ফেরত দিয়ে দিতে হবে। সেটা তখন চলে যাবে অন্য কারোর বাড়িতে। এর সুবিধা ছিল এই যে বইগুলো পড়াও হয়ে যেত কিন্তু পয়সা লাগত না। কার লেখা না পড়েছি আনন্দমেলায়... সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বিমল কর, সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়, মতি নন্দী, সমরেশ মজুমদার তো বটেই পুরনো আনন্দমেলা জমানোর অভ্যেস ছিল যেহেতু তাই সত্যজিৎ রায়, প্রেমেন্দ মিত্র, সমরেশ বসু, জরাসন্ধ এমনকি আমার প্রিয় এবং অসম্ভব গর্বের জায়গায় আছেন যিনি সেই শরদিন্দু বন্দোপাধায়ের লেখাও পড়েছি। আমার ছোটবেলা মানেই তাই আনন্দমেলা! আর তাই এই ব্লগের লোগোতেও আমার প্রিয় লেখক, চরিত্র, অভিনেতা, খেলোয়াড়দের সঙ্গে আনন্দমেলার উপস্থিতি।

আর এই অসাধারণ সব লেখকদের লেখা পড়তে পড়তেই আস্তে আস্তে নিজের ইচ্ছে হয়েছে কলম ধরার। কিছু লেখার, নিজের কথা, নিজের গল্প। ছোটবেলায় লেখালেখি করেছি, বন্ধুদের পড়িয়েছি সেইসব নিছক ছেলেমানুষির কাঁচা হাতের লেখা ফেলুদার গল্প বা ভূতের গল্প। একটা সময়ে নানা কারণে লেখালেখি বন্ধ ছিল। তারপর আবার মনের জানালা খুলে বসেছিলাম সেই ২০০৮ থেকে। শুরু করেছিলাম এই ব্লগ। তারপর কখনো 'কথা তো বলার জন্যেই' আবার কখনো cricketworld.com সাইটে লেখা বেরিয়েছে। সযত্নে সেই ওয়েবপেজগুলোকে জমিয়ে রেখেছি আমার ল্যাপটপে।
সাহস করে লেখা পাঠিয়েছিলাম আনন্দমেলায়। সেটা সেই ২০১৩-র মাঝামাঝির কথা। একটা আইডিয়াকে সাজিয়ে গুছিয়ে পিউ, কণাদ আর অভিষেকদাকে পড়িয়ে ওদের মতামত নিয়ে ঝাড়ামোছা করে পাঠানো একটা গল্প। তারপর প্রতীক্ষা। শুনেছিলাম তিন মাসের মধ্যে ওনারা জানিয়ে দেন লেখা পছন্দ হলে। তিন মাস কেটে গেল, তারপর ছ মাস... কোন ফোন-চিঠি পেলাম না... ভেবে নিলাম এ লেখা আর বেরোবে না। তারপর তো ভুলেই গেছিলাম যে আনন্দমেলায় পাঠিয়েছি লেখা। গত সপ্তাহের পুরোটাই ছিল ফিল হিউজময়, তার অকালমৃত্যু আমায় দুঃখ দিয়েছে খুব। ভালো লাগছিল না কিছুই।  হঠাৎ তিন তারিখ অফিস যাওয়ার সময় একটা ফোন। আনন্দমেলা থেকে। লক্ষ্মীমন্ত, আমার লেখা গল্প বেরোচ্ছে এই সংখ্যায়। 
প্রথমে কিছুটা সময় কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলাম। বুঝলামই না কী হচ্ছে! তারপর আস্তে আস্তে উপলব্ধি করলাম এর মানে কী। আসল লোকেদের জানানো হল কিন্তু তাও সন্দেহ ছিল। না আঁচালে বিশ্বাস নেই। শেষ পর্যন্ত গতকাল রাতে anandamela.in সাইটে নিজের নাম দেখে চক্ষুকর্নের বিবাদ ভঞ্জন হল। সকালে বইটাও পেলাম। আমার নাম ছাপার অক্ষরে, প্রথমবার, আনন্দমেলাতে। আমার আনন্দমেলা! সেই আনন্দমেলা, আমার ছোটবেলার সবচেয়ে ভালো বন্ধু, যে আনন্দমেলার পুরনো যেকোন সংখ্যা খুলে আজও পড়তে বসে যেতে পারি আমি। 
জানি এ লেখার কোন মাথামুন্ডু নেই। হয়তো অর্থহীন নিজস্তুতির মত শোনাচ্ছে এটা। তবু এটা লিখতে চাই। ভবিষ্যতে এই লেখা দেখলেই যে মনে পড়ে যাবে, কোন স্বপ্ন খুব মন দিয়ে দেখলে সেটা কোন একদিন সত্যিও হয়ে যায়।


Friday, November 28, 2014

63 Not Out

Source: Abhishek Mukherjee

Dear Phill,

I am still recovering from shock of the events of last couple of days and in no mood to write a big well structured letter. So, this one will be more of a short note, a note of thanks and farewell.
Being an intense follower of the game I have heard your name at least six years back when even before making your test debut you were touted as taking the responsibility of opening for Australia after retirement of Hayden and Langer, one of the most successful opening pairs in the history of the game. Then you were selected to play your first test in 2009 after Matthew Hayden’s retirement and I faintly remembered you had a great beginning of your international career. But like the entire Australian team on this post-2007 era, your form also deviate. You were dropped. But you were there somewhere all the time. Whenever I read any article about Australian cricket in Cricinfo and other sites your name kept coming up. I remember noticing that you had made a debut hundred in ODIs (Now I know you are the only Australian to do so), I remember the controversy involving you when you tweeted about you not getting selected in the next day’s test matches before the official team announcement. May be it was an immature move in today’s sporting world of professionalism and formality but it showed your discontent in not getting selected for your country.
Source: Twitter
I remember you from your last tour of India. You were particularly unstable and struggled a lot against the Indian spinners from the beginning. But you showed wonderful grit and application to finally produce couple of good, fighting innings for a team who were getting thrashed in the ground and also involved in  ‘homeworkgate’ off the fields.
All these were small memories Phill, may be ten-fifteen years down the line, I would have forget all those things but now that will not be the case. Since last Tuesday, you have become part of the Legends of this great game. You know Indians are now in Australia to play a test series, you could have been a part of that too. I was checking the scorecard of the Indian team’s practice match when I saw the news that you were hurt and taken to hospital in a very critical condition. I remembered a similar incident occurred to Nari Contractor, then Indian captain, during India’s tour of West Indies in 1962. Contractor survived, but had to left cricket at the age of 28. I thought similar fate was waiting for you and that made me sad. But little I knew I was ambitious. Yesterday, the worst possible thing happened and I was saddened beyond words. 
Source: Twitter
Look Phill, I have not played cricket at any serious level. But still I think myself as a part of the cricketing fraternity of the world as a fan. I love to read about cricket, watch cricket matches of any era, between any teams and get in a cricket related discussion every day, may be at work or with my friends, my parents or my wife. And as a follower of this nobel game, I felt heartbroken for your demise.
Phill, I know I am just a cricketing muggle compared to cricketing wizards like you, who has represented their countries but I am five years older to you and it felt like a younger brother has passed away. You were so young, with so much boundless potential and opportunity to represent your country for next 10-12 years that it made everyone hurt. But still it makes me a little happy to think that you had left us while doing what you loved the most, playing cricket. I hope that there must be an Australian cricket team in heaven with Bradman and Tramper in the team. There you can resume your innings from 63 not out. As one of my friends has written in Facebook, you were retired, we are hurt.
Be well, my dear brother. Hope god takes care of you up there and once you become an angel please protect Sean Abbot, a young boy who is feeling the most terrible among all of us.
A follower of the game you loved
PS. Advance Happy Birthday Bro!

Source: Sify.com
"It’s always very easy to give up. All you have to say is ‘I quit’ and that’s all there is to it. The hard part is to carry on”